২০১৭ সালে ১০৭ জন হিন্দু খুন, ২৫জন হিন্দু নারী ও শিশু ধর্ষিত, ২৩৫টি মন্দির ভাঙচুর বাংলাদেশে

বাংলাদেশে গত ১লা জানুয়ারী, ২০১৭ থেকে ৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৭ পর্যন্ত মোট ১০৭ জন হিন্দু খুন, ২৫ জন হিন্দু নারী ও শিশু ধর্ষিত হয়েছে মুসলিম মৌলবাদীদের দ্বারা। এছাড়াও গত বছরে বাংলদেশের মোট ২৩৫ টি মন্দিরে ভাঙচুর চালিয়েছে মুসলিম জনতা। গত ১৩ই জানুয়ারী, শনিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই তথ্য তুলে ধরলো বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোট। বাংলাদেশের ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে এবিষয়ে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোটের সম্পাদক পলাশ দে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ৭৮২ জন হিন্দু দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, ২৩ জনকে ইসলামে জোর করে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। তিনি এই সম্মেলনে দাবি করেন যে, প্রশাসনের অবহেলা ও ক্ষমতাশালী লোকেদের অত্যাচারের কারণে বাংলাদেশের হিন্দুসমাজ আজ বিপন্ন, সে যে সরকার ক্ষমতায় থাকুক না কেন। তিনি আরো বলেন যে, নির্বাচনের সময় বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুর ওপর যে অত্যাচার হয়, তা পৃথিবীর কোনো দেশে হয় না। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোট যে সংখ্যা প্রকাশ করেছে, নির্যাতিত ও ধর্ষিত ও দেশত্যাগী হিন্দুর সংখ্যা এর থেকে অনেক বেশি।

Advertisements

বাংলাদেশের নড়াইলে হিন্দু জেলে সম্প্রদায়ের ওপর হামলা যুবলীগ নেতার

গত ৮ই ডিসেম্বর, সোমবার বাংলাদেশের নড়াইলের লোহাগড়ায় যুবলীগ নেতার নেতৃত্বে শহরের কুন্দশী এলাকায় হিন্দু জেলে সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় সন্ত্রাসীদের হামলায় মহিলাসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। বাধা দিতে গেলে সন্ত্রাসীরা বাড়িঘরসহ আসবাবপত্র ভাঙচুর করে।

আহতদের লোহাগড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় লোহাগড়া থানায় মামলা করা হলেও পুলিশ এজাহারভুক্ত কোনো আসামিকে আটক করতে পারেনি।

পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বিকেল চারটের দিকে লোহাগড়া পৌরসভার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের কুন্দশী জেলেপাড়ার বিজুষ বিশ্বাস ওরফে পাগলের মাছ ধরার জাল ভাড়া দেওয়াকে কেন্দ্র করে একই গ্রামের রুলু মোল্লার সঙ্গে ঝগড়া হয়। এর জের ধরে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে লোহাগড়া উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জিয়াউর শিকদার নেতৃত্বে রুলু, টুলু, রবি, সুমন, বিল্লালসহ ৩০-৩৫ জনের একদল সন্ত্রাসী রামদা, হাতুড়ি ও লাঠিসোটা নিয়ে জেলাপাড়ার বিজুষ বিশ্বাস ওরফে পাগলের বাড়িতে হামলা করে। এসময় সন্ত্রাসীরা বলরাম বিশ্বাসের ছেলে সুবল বিশ্বাস (১৮), তার মা নমিতা বিশ্বাস (৪৭), বিজুষ বিশ্বাস ওরফে পাগলের স্ত্রী শিখা বিশ্বাস (৪১), পরিতোষ বিশ্বাস (৪১) এবং তার স্ত্রী বাসন্তী বিশ্বাসকে (৩৬) বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। সন্ত্রাসীরা ঘরে ঢুকে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য মালামাল নিয়ে যায় বলেও অভিযোগ করা হচ্ছে। পরে এলাকাবাসী আহতদের উদ্ধার করে লোহাগড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।

এ ঘটনায় বলরাম বিশ্বাসের স্ত্রী নমিতা বিশ্বাস রাতেই পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে লোহাগড়া থানায় মামলা করেছেন।
লোহাগড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শফিকুল ইসলাম মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাটি নিশ্চিত করে বলেন, ‘‘আসামিদের আটকের চেষ্টা চলছে।’’

অভিযুক্ত যুবলীগ নেতা জিয়াউর শিকদার পলাতক থাকায় তার বক্তব্য জানা যায়নি।

বাংলাদেশে হিন্দু মন্দিরে হামলায় ২২৮ জনের বিরুদ্ধে পুলিশের চার্জশিট

বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু মন্দির ও বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার মামলায় ২২৮ জনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত চার্জশিট পেশ করল পুলিশ। রবিবার এই চার্জশিট আদালত পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে। পুলিশের পরিদর্শক মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, কিছু ত্রুটি থাকায় এবং ব্রিফ তৈরি করতে দেরি হওয়ায় এদিন বিচারকের সামনে চার্জশিট পেশ না করা গেলেও আগামী দুই দিনের মধ্যে তা আদালতে দাখিল করা হবে। নাসিরনগর উপজেলার হরিণবেড় গ্রামের রসরাজ দাস নামে এক যুবকের ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায়। ২০১৬-এর ২৯ অক্টোবর অভিযুক্ত যুবককে পিটিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয় স্থানীয়রা। কিন্তু ৩০ অক্টোবর এলাকায় পৃথক দু’টি সমাবেশ থেকে ১৫টি মন্দির, শতাধিক ঘরবাড়িতে ভাঙচুর, লুটপাট চালানো হয় ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এরপর ৪ নভেম্বর ভোরে ও ১৩ নভেম্বর ভোরে আবার উপজেলা সদরে হিন্দুদের অন্তত ছয়টি ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঘটনায় নাসিরনগর থানায় মোট আটটি মামলা দায়ের করা হয়। বাকি সাতটি মামলার তদন্ত এখনও চলছে। শাসকদল জেলা আওয়ামি লিগের দলীয় বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেলতে এই হামলা বলে জানিয়েছেন স্থানীয় নেতারা। হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখিকে হামলার মূল ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে তাকে চেয়ারম্যান পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। নাসিরনগর থানার ওসি আবু জাফর জানান, মামলার দীর্ঘ তদন্তে আওয়ামি লিগ নেতা, বিএনপি নেতা এবং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। তাণ্ডবের ঘটনায় দায়ের হওয়া আটটি মামলার মধ্যে গৌর মন্দিরে হামলার মামলাটির তদন্ত শেষ হয়েছে। গৌর মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক নির্মল চৌধুরী বাদী হয়ে নাসিরনগর থানায় এ মামলা দায়ের করেন।

মামলাটির দীর্ঘ তদন্তের পর ২২৮ আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আসামিদের কয়েকজন হলেন নাসিরনগর সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামি লিগের সহ প্রচার সম্পাদক মহম্মদ আবুল হাসেম, হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাময়িক বরখাস্ত চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখি, হরিপুর ইউনিয়ন আওয়ামি লিগ সভাপতি ফারুক মিয়া, চাপরতলা ইউনিয়ন আওয়ামি লিগ সভাপতি সুরুজ আলি, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ আব্দুল হান্নান, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম চকদার প্রমুখ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মহম্মদ মিজানুর রহমান জানান, তাণ্ডবের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রায় এক বছর তদন্ত শেষে চার্জশিট এখন চূড়ান্ত হয়ে কোর্ট পরিদর্শকের কাছে রয়েছে। দু-একদিনের মধ্যে আদালতে দাখিল করা হবে।

হিন্দুদের নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে ভারতকে আস্বস্ত করলো বাংলাদেশ সরকার

sushama swaraj hinduder nirapotta bangladeshফেসবুকের একটি ভুয়ো পোস্টকে কেন্দ্র করে রংপুরে হিন্দুদের ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। ওই হামলায় যাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ঘটনানো হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার তাদের ক্ষতিপূরণ দেবে বলেও নিশ্চিত করেছেন সুষমা। কারণ এই প্রথমবার বাংলাদেশ দাঙ্গায় আক্রান্ত হিন্দুদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া নিয়ে আশ্বস্ত করছে ভারতকে।

গত রবিবার ট্যুইটারে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই একথা জানিয়ে লেখেন, “ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন থেকে আমরা বিস্তারিত তথ্য পেয়েছি। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ভারতীয় হাইকমিশনারকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, ওই হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি নির্মাণে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে এবং তাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রদান করা হবে”। উল্লেখ্য, অশিক্ষিত এক হিন্দুর নামে ফেসবুকে ভুয়ো আকাউন্ট বানিয়ে, ধর্মীয় অবমাননাকর ছবি এবং স্ট্যাটাস দেওয়ার অভিযোগে শুক্রবার বিকালে রংপুরে হিন্দুদের বেশ কয়েকটি বাড়িঘরে আগুন লাগানো এবং ভাঙচুর চালানো হয়। ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছালে, পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে একজন নিহত হন। পরে সদর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে এবং সঙ্গে এই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারটা ভারতের ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকেও জানানো হয়েছে।
হাসিনা সরকার যে কোন অবস্থাতেই ভারতের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রাখতে ইচ্ছুক বলেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন। অনেকে আবার এই পদক্ষেপের জন্য নরেন্দ্র মোদি সরকারের কূটনৈতিক দৌতের ফল বলেও মনে করছেন। কিন্তু কারণ যাই থাক না কেন, যতদিন না এই ধরণের দাঙ্গা বন্ধ হচ্ছে এবং দাঙ্গাকারিদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দেওয়া যাচ্ছে ততদিন আক্রান্তদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে না।

হিন্দুদের হুমকির ঘটনা বাংলাদেশের পিরোজপুর সদর উপজেলায়, বহু হিন্দু এলাকাছাড়া

পিরোজপুর সদর উপজেলার সিকদার মল্লিক ইউনিয়নের দক্ষিণ সিকদার মল্লিক গ্রামের বাসিন্দা দেবাশীষ মাঝি ৪ জুন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের পর থেকে ঘরছাড়া। এলাকায় নবনির্বাচিত চেয়ারম্যানের লোকজন তাঁকে প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। অজ্ঞাত স্থানে বসে মুখোমুখি আলাপচারিতায় দেবাশীষবাবু বলেন, ‘ভোটের পর এক দিনও বাড়িতে ঘুমাইনি। মা বলছে দেশ ছেড়ে পালিয়ে বেঁচে থাক। আসলেই কি আমরা এই দেশে থাকতে পারব না?’

একই প্রশ্ন করেছেন ওই ইউনিয়নের কৃষ্ণেন্দু হালদার, সন্তোষ বৈরাগী, নয়ন মাঝি, রিপন মণ্ডলসহ আরও অনেকে। এই ইউনিয়নের হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে বলছেন, ৪ জুন সর্বশেষ দফা ইউপি নির্বাচন আতঙ্ক হয়ে এসেছে হিন্দু-অধ্যুষিত সাতটি গ্রামে। নির্বাচনের পর থেকে গত তিন সপ্তাহে অর্ধশত হিন্দু ব্যক্তি হুমকি ও মারধরের শিকার হয়েছেন। পুরুষদের মধ্যে অনেকেই ভয়ে এলাকাছাড়া।

সিকদার মল্লিক ইউনিয়নের নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পান সদ্য ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য হওয়া শহীদুল ইসলাম হাওলাদার। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান সিকদার ছিলেন বিদ্রোহী প্রার্থী। হিন্দুরা জানান, নির্বাচনে শহীদুল চেয়ারম্যান হলেও হিন্দু-অধ্যুষিত ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডে কামরুজ্জামান জয়ী হন। এরপর থেকে এই চার ওয়ার্ডের সিকদার মল্লিক, দক্ষিণ সিকদার মল্লিক, নন্দীপাড়া, উত্তর গাবতলা, দক্ষিণ গাবতলা, জুজখোলা ও পূর্ব জুজখোলা গ্রামে হিন্দুদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

উপজেলা ও ইউনিয়নের হিন্দু নেতারা বলছেন, শহীদুলের বাবা রফিকুল ইসলাম ওরফে রুনুও দুবার এই ইউপির চেয়ারম্যান ছিলেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচপাড়া বাজারের কালীমন্দিরের জায়গা দখলসহ হিন্দু ব্যক্তিদের নির্যাতনের অভিযোগ আছে। এসব কারণেই হিন্দুদের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী কামরুজ্জামানকে ভোট দেন। এতেই ক্ষুব্ধ হন শহীদুল। তবে তিনি এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলেছেন।

পিরোজপুর জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিমল চন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘সিকদার মল্লিক ইউনিয়নের হিন্দু লোকজন গত তিন সপ্তাহে হামলা, হুমকি, মারধরের ১০৯টি ঘটনার কথা আমাকে জানিয়েছে। আমি পুলিশ প্রশাসনকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছি।’

পরাজিত প্রার্থী কামরুজ্জামান সিকদার বলেন, ‘১, ২, ৩ ও ৪—এই চারটি ওয়ার্ডই হিন্দু-অধ্যুষিত। এর প্রত্যেকটায় আমি জয়ী হয়েছি। কিন্তু বাকি পাঁচটি ইউনিয়নে শহীদুল জয়ী হন। হিন্দুরা কেন আমাকে ভোট দিল, সে কারণেই নির্বাচনের দিন থেকেই হিন্দুদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’

এলাকায় গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ৪ জুন নির্বাচনের দিন হামলার শিকার হন সিকদার মল্লিক গ্রামের সন্তোষ বৈরাগী।সন্ধ্যায় গাবতলা স্কুলের কাছেই চিত্ত বড়াল, রতন খাঁ, সচীন শিকদার, সুকুমার সিকদার ও প্রবীণ মণ্ডলকে মারধর করা হয়। এ ছাড়া সিকদার মল্লিক গ্রামের অমূল্য মিস্ত্রির বাড়িতেও হামলা হয়। এসব ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে ওই রাতেই এলাকার কয়েকটি হিন্দু পরিবার বাড়ি ছেড়ে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন বাগান ও মাছের ঘেরে আশ্রয় নেয়।

হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন জানান, নির্বাচনের পরদিন ৫ জুন দক্ষিণ গাবতলা গ্রামের আকুল মিস্ত্রি, কুমুদ মাঝি, সোনা মিস্ত্রি ও অসীম মাঝিকে হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া ৬ জুন ভবতোষ মণ্ডল, ৭ জুন নির্ঝর মণ্ডলকে হুমকি দেওয়া হয়। ২০ জুন জুজখোলা মিরুয়া গ্রামের হ্যাপি ঘরামির কাপড়ের দোকান দখল করে ক্লাব করতে যায় চেয়ারম্যানের লোকজন। বাধা দিলে হ্যাপি ও তাঁর স্বামী বিমল ঘরামিকে মারধর করা হয়।

পিরোজপুর সদর থানার ওসি এস এম মাসুদ উজ জামান গতকাল বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’ নির্যাতন ও হুমকির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে শহীদুল ইসলাম এসব ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, ‘এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে।’

বাংলাদেশে ২০০১ সালে অক্টোবরের সেই রক্তাক্ত দিনগুলিঃ….

বাংলাদেশে ২০০১ সালে অক্টোবরের সেই রক্তাক্ত দিনগুলিঃ….

দুটি মোটরসাইকেল নিয়ে গতকালের মতো আজও রাহুলরা চারজন বেরিয়ে গেল। আজ বেরিয়েছে খুব ভোরে। সূর্য ওঠার আগে। প্রাতরাশ করবে দৌলতখান বাজারে গিয়ে। সেখানে স্পট ভিজিট করে যাবে লালমোহনের উমেদচর গ্রামে। তারা দৌলতখানের লেজপাতা গ্রামে এল প্রথম। আনিসই তাদের এই গ্রামে প্রথম নিয়ে এল। লেজপাতা গ্রামের সরকার বাড়িতে তেরোটি হিন্দু পরিবার বাস করে। বাড়ির কোন পুরুষের গায়েই কাপড় নেই। সবাই গামছা পরিহিত। নতুন গামছা। বাজার থেকে বাকিতে আনতে হয়েছে। ঘরের কিছু তো রাখেনি, পরনের কাপড়ও লুট করে নিয়েছে। উলঙ্গ করে সরকার বাড়ির প্রতিটি পুরুষকে হকি স্টিক দিয়ে পিটিয়েছে নির্বাচনের পরদিন রাতে। এ বাড়ির সকলেই যখন ঘুমিয়েছিল, পঁচিশ থেকে ত্ৰিশজনের একটি দল এসে বিকট শব্দে বাড়ির উঠোনে বোমা ফাটায়। বোমার শব্দে বাড়ির সবার ঘুম ভেঙে যায়। পরেশচন্দ্ৰ মিস্ত্রীর স্ত্রী প্রভারানি রাহুলদের জানায়, বোমা বিস্ফোরণের পর সন্ত্রাসীরা ‘নারায়ে তাকবির – আল্লা হু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে আমাদের দরজায় আঘাত করে। প্রভারানি পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে ঘরের পেছনের পুকুরে লাফিয়ে পড়ে শুধু নাক ওপরে রেখে বাকি সমস্ত শরীর জলে ডুবিয়ে নিজেকে বাঁচানোর  প্রাণপণ চেষ্টা করে। কিন্তু নরপশুরা টর্চলাইট মেরে চুল ধরে টেনে তোলে প্রভারানিকে। পুকুরের পাড়েই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওরা। তার নাক-ফুলটি পর্যন্ত খুলে নিয়ে যায়। এসব বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে প্রভারানি। এই বাড়ির চার যুবতী মেয়ে বীণা, পলি, মিলন, শিপ্রা দৌড়ে হোগলাপাতার বনে গিয়েও ইজ্জত বাঁচাতে পারে নি, কাঁদতে কাঁদতে জানায় প্রভারানি। রিঙ্কু নামে পাঁচ বছরের একটি বাচ্চাকে দেখিয়ে বলে, ওর নাকের মাংস ছিড়ে নিয়ে গেছে নাক-ফুল লুট করার সময়। মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা ভ্যান ও রিক্সা নিয়ে এসেছিল। বাবা-মায়ের সামনে কন্যাকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে উলঙ্গ করে উল্লাস করেছে প্রথমে। তারপর ধর্ষণ করেছে, পর্যায়ক্রমে। যাবার সময় পনেরোটি ভ্যান ও রিক্সা ভর্তি করে সরকার বাড়ির তেরো পরিবারের তৈজসপত্র, বিছানা, কাপড়, সামান্য ধান-চাল যা ছিল সবকিছু নিয়ে যায়। এ বাড়ির দুই পরিবারের তিনটি গরু ছিল, তাও নিতে ভুল করেনি।

এখান থেকে রাহুল্যরা আসে। চরপাতা ইউনিয়নের অঞ্জুরানি মেম্বারের বাড়িতে। অঞ্জরানি চরপাতা ইউনিয়নের নির্বাচিত সদস্যা। কিন্তু সে বাড়িতে নেই। মুখোশ পরে একদল যুবক  নির্বাচনের ভোটকেন্দ্ৰে যাওয়ার চারদিন আগে অঞ্জুরানির ঘর থেকে টেলিভিশন ও অন্যান্য আসবাবপত্র লুট করে। তার পনেরোদিন আগে খুন হয়েছে অঞ্জুরানির বডিগার্ড। রাহুলদের এসব জানায় অঞ্জুরানি মেম্বার বাড়ির নিত্যহরি রায়। হাওলাদার বাড়ির বৃদ্ধা পুষ্পাঞ্জলি হাওলাদার তাদের জানায় সুপারিবাগান, বাড়িঘর সবকিছু লুট করা হয়েছে। গত পাঁচবছর তাদের মধ্যে কোনো ভয়, আতঙ্ক ছিল না। কিন্তু নির্বাচনের পরদিন থেকে এখানকার আওয়ামিলিগের নেতারা সব পালিয়ে গেছে। তারা উপস্থিত থাকলে আমাদের এত বড়ো ক্ষতি হত না।

চরদুয়ারি গ্রামের হিন্দুবাড়ির যুবতীদের ওপর একের পর এক নির্যাতন করা হয়েছে। সব কিছু হারিয়ে বাড়ির মেয়েরা প্রায় উন্মাদ। তারা বাড়ির দরজা খুলে আছে এবং একটি বাড়ির গেটে লিখে রেখেছে ‘যা খুশি কর। এই মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার সাহস পেল না রাহুলরা। বারি অবশ্য কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু আনিস থামিয়ে দিল। এর আগে সে এই এলাকা একবার ঘুরে গেছে। পুরুষ দেখলেই এই মেয়েরা উলঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের উপর একদিন নয়, ধারাবাহিকভাবে পাশবিক অত্যাচার চালানো হয়েছে। তারা এখন উন্মাদ। বাইরের পুরুষদের দেখলে তারা আর ভীত হয় না। নরপশু তাদের শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলেছে। এজন্য বাইরের পুরুষ দেখলে তারা ভাবে নতুন কেউ এসেছে সেই ক্ষত আরও একটু বাড়ানোর জন্য।

পাগলের বেশে রাস্তায় হাঁটছে নূরজাহান বেগম। ওরা মোটরসাইকেল থামায়। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে নূরজাহান বলে, এসব কথা লিখবেন না। তাহলে ওরা আমাদের মেরে ফেলবে। অসিত বালার বাড়িতে কাজ করে নূরজাহান। বারো হাজার টাকা দিয়ে অত্যাচার থেকে রেহাই পেয়েছে। অসিত বালা। কিন্তু এই টাকার কথা কাউকে বললে তাদের সবাইকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে গেছে সন্ত্রাসীরা। বালা বাড়িতে প্রতি বছর ধূমধামের সঙ্গে দুর্গাপূজা হয়। এবার পূজামণ্ডপ খালি। পূজামণ্ডপের সামনে ব্যথিত কুকুর কঁদছে। অসিত বালা বারো হাজার টাকা দিয়ে নিজে নির্যাতন থেকে বেঁচেছে বটে,  কিন্তু ও বাড়ির অন্যান্য শরিকদের কেউ রেহাই পায়নি। অসিত
বালা নির্বাচনের আগে বাড়ির মেয়েদের মির্জাকালুর শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। নূরজাহান তার রান্নাবান্নার কাজ করে দিত। অসিত বালা রক্ষা পেলেও তার কাজের মেয়ে নূরজাহান রক্ষা পায়নি। তারপর থেকেই সে পাগলের মতো রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। নিজের কথা কিছুই বলে না। শুধু সাংবাদিক শুনলে বলে, এসব কথা লিখবেন না। ওরা আমাদের মেরে ফেলবে।

আনিস জানায় এবার আমরা চরকুমারী গ্রামে যাব।অক্টোবরের দুই তারিখে নির্বাচনের পরদিন রাতে কী ঘটেছিল সে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে চরকুমারী গ্রামের মধ্যবয়সী নেপাল রায়। গ্রামের তেলি বাড়িতে বসে সে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিল রাহুলদের। ফরিদ খালিফা এই গ্রামে ধাৰ্মিক মানুষ হিসেবে পরিচিত। সে এসে জানায়, বাড়িতে হামলা হতে পারে। হামলাকারীরা বাড়ির জিনিসপত্র নিয়ে গেলে তা ফিরে পাবে। নতুন করে কিনতে পারবে। কিন্তু বাড়ির আওরতদের ওপর হামলা হলে তা আর ফিরে পাবে না। নেপাল রায়রা আপদে-বিপদে ফরিদ খালিফার কাছে ছুটে গেছে সব সময়। তাকে মুরুব্বি হিসেবে মান্য করে। তিনিই যখন বাড়িতে এসে হামলার কথা বলছেন, তা অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।

নেপাল জিজ্ঞেস করে, তাহলে আমরা কী করব?
ফরিদ জবাব দেয়, আওরতদের দূরে কোনো আত্মীয়ের বাড়ি পাঠিয়ে দাও।
নেপাল বলে, কিন্তু এখন তো সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আপনার দল তো জিতেছে, আপনি একটু ওদের বলে আমাদের রক্ষা করুন |
ফরিদ কিছুটা রেগে গিয়ে বলে, যারা হামলা করবে তাদের তো আমি চিনি না। শুনেছি হামলা হতে পারে। একটা কাজ করতে পারো, আজকের রাতটা বাড়ির আওরতদের আমার বাংলাঘরে পাঠিয়ে দিতে পারো।

নেপাল সরল বিশ্বাসে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায়। ফরিদ খালিফা আজকের রাতটা বাড়ির ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন নারীকে বাড়িতে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়ে যে উপকার করলেন, তা সে সারা জীবন মনে রাখবে। রাত পোহালেই দূরের কোনো আত্মীয় বাড়ি পাঠিয়ে দেবে স্ত্রী, কন্যা ও বিধবা বোনকে। অন্যান্য শরিকরাও তাই স্থির করে। ফরিদ খালিফার বাংলাঘরে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন বিভিন্ন বয়সের নারীরা কেউ ঘুমিয়েছে, কেউ অন্ধকারে উপরের দিকে তাকিয়ে বাড়ির কথা, ঘরের কথা ভাবছে। এ সময় ফরিদ খালিফা এসে ডাক দেয়। প্রথম ডাকে কেউ জবাব দেয় না। দ্বিতীয়বারও নয়। তৃতীয়বার দরজায় ধাক্কা মেরে যখন ডাকে, তখন একজন উঠে দরজা খুলে দেয়। যে দরজা খুলে দেয় সে নেপালের কন্যা। এবার ক্লাস নাইনে পড়ছে। ফরিদ মেয়েটির মুখে লাইট মারে। তারপর পুরো শরীরে। এরপর পুরো ঘরে। তড়িৎগতিতে টর্চলাইট দরজার বাইরের দিকে ঘুরিয়ে কাদের যেন ভেতরে আসতে আহ্বান করে। একদল নরপশু হুড়মুড় করে ঘরে ঢোকে। ফরিদ নেপাল রায়ের মেয়ের হাত ধরে রেখেছে এক হাতে। সবার ভেতরে ঢোকা হয়ে গেলে অপর হাতে দরজা বন্ধ করে দেয়। এরপর একজনকে হারিকেন জালাতে বলে। সবার উদ্দেশ্যে একটি চকচকে ধারালো ছুরি দেখিয়ে জানিয়ে দেয়, কেউ চিৎকার করলে এই ছুরি তার গলায় বসে যাবে। তারপর নেপাল রায়ের মেয়েকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় ঘরের এক কোণে অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি জায়গায়। রাত বারোটা থেকে তিনটে পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশজন নরপশু এই নারীদের শরীর খুবলে খায়। নেপাল রায়ের মেয়েটি যখন অঞ্জন হয়ে পড়ে তখন ফরিদ ডাকে নেপালের স্ত্রীকে। রক্তাক্ত কন্যাকে দৌড়ে গিয়ে বুকে তুলে নিতে যাচ্ছিল সবিতা। কিন্তু ফরিদ এক ঝটকায় সেখান থেকে ছিনিয়ে আনে সবিতাকে। বিবস্ত্র করে মেয়ের পাশে ধাক্কা মেরে শুইয়ে দেয় সবিতাকে। আর বলতে পারে। না, নেপাল রায় – অজ্ঞান হয়ে পড়ে।

লেখকঃ প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শ্রী সালাম আজাদ… ।।
সৌজন্যেঃ স্বদেশ সংহতি সংবাদ। পূজা সংখ্যা ২০১৭; পৃষ্ঠা – ১২

হুগলির পান্ডুয়াতে হিন্দু যুবককে তুলে নিয়ে গেল মুসলিম দুষ্কৃতিররা

হুগলি জেলার পাণ্ডুয়া থানার অন্তর্গত বৈচি গ্রামের ঘটনা। গতকাল সকালে গ্রামের বাসিন্দা কিষান সাহু(১৮) স্থানীয় সবজি বাজারে গিয়েছিলো। কিন্তু পাশের মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম পাটকে মাঝের পাড়ার মুসলিমরা তাকে তুলে নিয়ে চলে যায়। স্থানীয় হিন্দু বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গত জগদ্ধাত্রী পূজার অষ্টমীর দিন বৈচি গ্রামের পূজা মণ্ডপে পাটকে মাঝের পাড়ার মুসলিম যুবকেরা এসে ঝামেলা করছিলো। তখন তাদের চলে যেতে বলাতে বচসা হয়। সেসময় মুসলমানরা হুমকি দেয়। কিন্তু এই ঘটনা জানাজানি হতেই বৈচির বাসিন্দারা দলবেঁধে মুসলিম পাড়ায় গিয়ে কিষানকে উদ্ধার করে আনে। থানা থেকে পুলিশ ও স্থানীয় তৃণমূল নেতারা হিন্দুদের শান্ত থাকতে অনুরোধ জানান এবং দোষীদের গ্রেপ্তার করারও প্রতিশ্রুতি হিন্দুদেরকে দেওয়া হয়েছে।

বাসন্তীতে কালীপূজার অনুষ্ঠানে আক্রমণ

বাসন্তী থানার অন্তর্গত ৪নং হরেকৃষ্ণপুর “মা সুমিত্রা নবজীবন মিলন সংঘ” প্রতিবছরের মতো এবারও কালীপূজার আয়োজন করে। গত ২৪শে অক্টোবর ক্লাবের সদস্যরা আনুমানিক রাত ১২টা নাগাদ মাইকে গান চালিয়ে আনন্দ করছিল। অভিযোগ, সেই সময় আবু সালাম মোড়ল, আবু কাসেম মোড়ল, আবু কালাম মোড়ল, পিঙ্কু মোল্লা, আবুল মোল্লা সহ বেশ কয়েকজন মুসলিম যুবক ঘটনাস্থলে এসে মাইক বন্ধ করতে বলে। ক্লাবের সদস্যরা রাজি না হলে অভিযুক্তরা বিশ্রী ভাষায় গালাগাল করতে করতে তাদের ওপর চড়াও হয়। প্যান্ডেলের লাইট, মাইক প্রভৃতি ভাঙচুর করে। দীপক মন্ডলের নেতৃত্বে ক্লাবের সদস্যরা বাধা দিলে উভয়ের মধ্যে মারামারি লেগে যায়। এই সময় আবু কালামরা দীপকের দুই বোন সরস্বতী মন্ডল ও মল্লিকা মন্ডলকেও মারধর করে। জয়দেব হালদার, দেবু দলুই, প্রদীপ মন্ডল, গৌর হালদার দুষ্কৃতীদের মারে কমবেশি আহত হয়। উল্লেখ্য, খবর পেয়ে হিন্দু সংহতির কর্মীরা ঘটনাস্থলে এলে অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। যাওয়ার সময় সাউন্ড মিক্সচার মেশিন (আনুমানিক মূল্য চার হাজার টাকা) ও দীপক মন্ডলের মানিব্যাগটি যাতে তিন হাজার টাকা ছিল ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

ক্লাবের পক্ষ থেকে উক্ত অভিযুক্তদের নামে বাসন্তী থানায় একটি কেস দায়ের (জিডি নং ৮২৭/২৭) করা হয়েছে। মুসলমানদের পক্ষ থেকেও প্রদীপ মন্ডল, দীপক মন্ডল, সুকুমার হালদার, স্বপন হালদার, দেবু দলুই-এর নামে পাল্টা একটি  অভিযোগ থানায় করা হয়েছে। তবে বাসন্তী থানা অভিযোগ নিলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয় নি বলে সূত্র মারফত জানা গেছে।

ব্লক সভাপতিকে পুজো উদ্বোধনে বাধা দেওয়ায় হিন্দুদের নির্যাতন মুর্শিদাবাদে

মুর্শিদাবাদ জেলার সালার ব্লকের অন্তর্গত কাগ্রাম অঞ্চল। কাগ্রামে দীঘদিন ধরে একটি সর্বজনীন জগদ্ধাত্রী পূজা হয়ে আসছে। সালার ব্লকটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত হলেও কাগ্রাম অঞ্চলটি হিন্দু প্রধান। কিন্তু গন্ডগোল বাঁধলো পুজোর আগের দিন। পুজো কমিটির কয়েকজন সদস্য দাবি করে যে তারা সালারের তৃণমূল ব্লক সভাপতি সিরাজ শেখকে দিয়ে পুজো উদ্বোধন করতে চায়। এতে বাকি সদস্যরা আপত্তি তোলেন। তারা দৃঢ় প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন যে কোনো মুসলিমকে দিয়ে তারা পুজো উদ্বোধন করবেন না। খবর সভাপতির কানে পৌঁছে যেতেই হিন্দুদের ওপর নেমে আসে অত্যাচার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুজো কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন যে জগদ্ধাত্রী পুজোর আগের দিনে রাতে সালার থানার ওসি প্রতিবাদকারী সদস্যদের বাড়িতে যায় এবং ব্যাপক মারধর করে। এমনকি ঐদিন রাতে পাঁচজন সদস্যকে থানায় তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে থানায় মারধর করা হয় তাদের। পুলিশের পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি করা হয় যাতে  ব্লক সভাপতিকে দিয়ে পুজো উদ্বোধন করা হয়। তবে হিন্দুদের ক্ষোভ বাড়তে থাকায় তাদের থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতো কিছু সত্বেও হিন্দুরা মাথানত করেনি। অন্যান্য বছরের মতো এবছরও পুজো হয়েছে।

মগরাহাটে জগদ্ধাত্রী প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার সময় হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ১৩জন হিন্দু

দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার মগরাহাট থানা বিখ্যাত হিন্দু নির্যাতনের জন্যে। এই মগরাহাট ব্লকে হিন্দুরা সংখ্যালঘু। তাইতো হিন্দুদের ওপর নেমে আসে একের পর এক আক্রমণ। এবার ঘটনা মগরাহাট থানার অন্তর্গত হলুদবেড়িয়ার। গত ২৮শে অক্টোবর, শনিবার হলুদবেড়িয়া গ্রামের হিন্দুরা জগদ্ধাত্রী প্রতিমা আনছিল বাজনা বাজিয়ে নাচতে নাচতে। কিন্তু প্রতিমা নিয়ে আসার পথে হরিশংকরপুরের রাস্তায় একদল মুসলিম পথ আটকায় তাদের, বলে যে পাশেই মসজিদ আছে, তাই মাইক-বাজনা বন্ধ করে যেতে হবে। এই নিয়ে দুই পক্ষের বচসা শুরু হয়। কিছু মুসলমান জড়ো হয় ওখানে। শুরু হয়ে যায় দুই পক্ষের সংঘর্ষ। মুসলিমদের সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন হিন্দু আহত হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে মগরাহাট থানার পুলিশ। পরে পুলিশ পাহারা দিয়ে হলুদবেড়িয়া গ্রামে প্রতিমা দিয়ে আসে। পরে পুলিশ সংঘর্ষে জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ১৩ জন হিন্দুকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে হলুদবেড়িয়া গ্রামের জগদ্ধাত্রী পুজোর মণ্ডপের সামনে পুলিশ পিকেট রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।

সুরেন্দ্র সিনহাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করলো হাসিনা সরকার

surendra sinhaগত ১৩ই অক্টোবর, শুক্রবার রাত ১১টা ৫৭ মিনিটে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা থেকে রওনা হলেন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রথম হিন্দু প্রধান বিচারপতি এস কে সিন্‌হা। ছুটি নিয়ে বিমানবন্দরের পথে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, “প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করলে এটি সহজেই অনুমেয় যে, সরকার উচ্চ আদালতে হস্তক্ষেপ করছে এবং এর দ্বারা বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হবে। এটি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।” বাংলাদেশের বর্তমান প্রধান বিচারপতির চাকরির মেয়াদ রয়েছে আরও সাড়ে তিন মাস।

বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করে বিচারপতি সিন্‌হার দেওয়া চিঠির উল্লেখ করে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ‌আমেরিকা এবং ব্রিটেন— এই চারটি দেশে যেতে চান। আগামিকাল ১৩ই অক্টোবর দেশ ত্যাগ করতে চান এবং ১০ নভেম্বর দেশে ফিরে আসবেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।” বাংলাদেশের আইন মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, বর্ধিত ছুটিতে প্রধান বিচারপতির বিদেশে অবস্থানের সময়ে, অর্থাৎ ২ নভেম্বর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত, অথবা তিনি দায়িত্বে না ফেরা পর্যন্ত বিচারপতি মহম্মদ আব্দুল ওয়াহাব মিঞা প্রধান বিচারপতির কার্যভার সামলাবেন। চলতি বছরের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ  রায় প্রকাশের পর থেকেই সরকারে থাকা আওয়ামি লিগের তীব্র আক্রমণের মুখে পড়েন বিচারপতি এস কে সিনহা।বাংলাদেশের বিচারপতিদের পদ থেকে অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফেরাতে আনা হয়েছিল সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী। সেই সংশোধনী বাতিল করে জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনকালে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ফিরিয়ে আনে সুপ্রিম কোর্ট। সাত বিচারপতির ঐকমত্যের ৭৯৯ পৃষ্ঠার এই রায়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নিজের পর্যবেক্ষণের অংশে দেশের বিভিন্ন বিষয়ের সমালোচনা করেন।

আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামি লিগের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রধান বিচারপতির তীব্র সমালোচনা করা হয়। পর্যবেক্ষণে বঙ্গবন্ধুকে ‘খাটো করা হয়েছে’ অভিযোগে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের দাবিও এসেছিল। তখন বিএনপি এ রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলে স্বাগত জানিয়েছিল। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রধান বিচারপতির বক্তব্য প্রসঙ্গে আওয়ামি লিগের আইন সম্পাদক রেজাউল করিম বলেন, “প্রধান বিচারপতি বিদেশ যাওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছেন। সেখানে তিনি অসুস্থতার কথা বলেছেন। কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয়, তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছে।” তিনি বলেন, “প্রধান বিচারপতি আইসিডিডিআরবিতে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। এর থেকেই বোঝা যায় তিনি অসুস্থ। তিনি তাঁর লিখিত আবেদনেও বলেছেন, তিনি অসুস্থ। তাঁর ছুটি চাওয়ার পেছনে আওয়ামি লিগ বা সরকারের কোনও চাপ ছিল না।”