তিন তালাক বন্ধে সুপ্রিম কোর্টের রায় অসাংবিধানিক, মন্তব্য সিদ্দিকুল্লার।

siddiqullah-chowdhury-759তিন তালাক বন্ধে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায়কে অসাংবিধানিক বললেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রী এবং জমিয়তে উলেমা-ই-হিন্দ-এর রাজ্য সভাপতি সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী। গত ২৩শে সেপ্টেম্বর এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন। তিনি আরো বলেন, ”সুপ্রিম কোর্ট এবং কেন্দ্র সরকারের কোনো অধিকার নেই মুসলিম পার্সোনাল আইনে দখল দেবার এবং তার পরিবর্তন করার। আমরা সুপ্রিম কোর্টের রায়কে মানি না ”। তিনি আরো বলেন যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা এই রায় দিয়েছেন কোনোরকম ইসলামিক আইনের জ্ঞান ছাড়াই। তিনি মন্তব্য করেন, ”সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের উচিত ছিল এই রায় দেবার আগে ইসলামিক পন্ডিতদের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, কোরানে তালাকের কথা নেই। কিন্তু  আপনাদেরকে বলি কোরানে তালাকের কথা রয়েছে। আর আমরা সেই আইন মেনে চলবো”।

Advertisements

বীরভূমের পর মালদহ – বিয়ের ১মাস পর বিবিকে তালাক, থানায় অভিযোগ দায়ের

রাজ্যে আবার তিন তালাক৷ বীরভূমের পর মালদহে৷ স্বামী তিন তালাক দেওয়ায় ইংরেজবাজার থানায় গতকাল ১০ই মার্চ, শনিবার অভিযোগ দায়ের করলেন এক তরুণী৷ বিয়ের এক মাসের মাথায় তিন তালাক শুনতে হয়েছে তাঁকে৷ তার পরেও তিনি স্বামীর ঘর করতে চেয়ে চেষ্টা করেছেন প্রায় সাত মাস৷ কখনও শ্বশুরবাড়ির মতি ফেরানোর চেষ্টা করেছেন৷ কখনও সমাজের মধ্যস্থতায় জট কাটানোর চেষ্টা করেছেন৷ কিন্তু  কোনও সুফল মেলেনি৷ শেষ পর্যন্ত শনিবার আফসানা অভিযোগ দায়ের করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নাম ঢুকে গেল প্রতিবাদী মুসলিম মহিলা ইশরত জাহান , আফরিন রহমান , সায়রা বানো , গুলশন পারভিন, আতিয়া সাবরিদের তালিকায়৷ যদিও আফসানা সুবিচার পাবেন কি না , তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে আইনজীবী মহলের বক্তব্যে৷

মালদহের পুলিশ সুপার অর্ণব ঘোষ অবশ্য বলেন, ‘অভিযোগটি আমরা গুরুত্ব দিয়েই দেখছি’। আফসানার পাশে দাঁড়াচ্ছেন নারীবাদী মহিলারা৷ কলেজ শিক্ষিকা তথা নারী নির্যাতন বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী আইরিন সবনম বলেন , ‘আফসানা একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন৷ অনেক মেয়েই এভাবে ভুগছেন৷ কিন্তু  সাহস করে তাঁরা প্রতিবাদের পথে হাঁটেন না৷ বলার জায়গাও এতদিন ছিল না৷ সুপ্রিম কোর্ট তিন তালাক বন্ধের রায় দেওয়ার পর অন্তত আমাদের বলার জায়গা হয়েছে৷ আমরা আফসানার পাশে আছি’৷ ইংরেজবাজারের গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান ইমাম কৌশার আলি আদালত প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলেন , ‘শরিয়তের বিধান অনুযায়ীও একবারে তিন তালাক দেওয়া যায় না৷ আফসানা যার নামে অভিযোগ করছেন , সে তালাক দিয়ে থাকলেও আফসানা আরও দু’বার সুযোগ পাবেন৷ ’আইনজীবী মহল কিন্তু  আশার কথা শোনাতে পারেনি৷ মালদহের বিশিষ্ট আইনজীবী বিপুল দত্ত বলেন , ‘প্রথমত , তিন তালাকের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিলেও এখনও নির্দিষ্ট কোনও আইন হয়নি ওই প্রথা রদে৷ ফলে এই ধরনের অভিযোগেও বধূ নির্যাতন ও প্রতারণার অভিযোগে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮ ও ৪২০ ধারার মতো আইনে মামলা হয়৷ আর এই ঘটনাটি যেহেতু সুপ্রিম কোর্টের রায় দেওয়ার আগে , তাই তরুণীটি তার সুবিধা পাবেন কি না , তা নিশ্চিত নয়৷ কেননা , সুপ্রিম কোর্টের ওই রায় কবে থেকে কার্যকর হবে , তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়৷ ’ প্রায় একই অভিমত আফসানার আইনজীবী সুদীন্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের৷ তবে আফসানা এখন অনড়৷

ইংরেজবাজার থানার সাট্টারির বাসিন্দা আফসানার বক্তব্য , ‘আমি ওঁকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম৷ ওঁর সঙ্গেই ঘর করতে চাই৷ কিন্তু  ও যে মানসিকতা দেখাচ্ছে , তাতে বুঝতে পারছি , ওর সঙ্গে থাকা আর সম্ভব হবে না৷ তাই এ বার আমিও দেখাতে চাই , এভাবে একটি মেয়েকে দূর করে দেওয়া যায় না৷ আমি শেষ পর্যন্ত লড়ব৷ ’ তালাক দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে আফসানার স্বামী ওয়েদুল৷ কিন্তু  তালাক কেন ? প্রশ্ন করতেই ‘ব্যস্ত আছি ’ বলে ফোন কেটে দেয় ওয়েদুল৷ একই গ্রামে ওয়েদুল ও আফসানার বাড়ি৷ সেই সূত্রে তাঁদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা৷ আফসানা বলেন , ‘ও আমাকে অনেক স্বপ্ন দেখাত৷ তাড়াতাড়ি বিয়ে করার জন্য চাপ দিত৷ কিন্তু  আমি মাধ্যমিকের আগে বিয়ে করতে চাইনি৷ তাছাড়া তখন আমার বয়স ১৮ হয়নি৷ ’শেষ পর্যন্ত মাধ্যমিক শেষ হতেই ২০১৭ -এর ৬ জুলাই ওয়েদুলের সঙ্গে আফসানার বিয়ে হয়৷ ভালোবাসার বিয়ে হলেও আফসানার পরিবারকে ১ লক্ষ টাকা নগদ ও ৫ ভরি সোনা যৌতুক দিতে হয়েছিল৷ আফসানার অভিযোগ৷ এর পরেও পণের দাবিতে চলতে থাকে অত্যাচার৷ বিয়ের এক মাসের মাথায় ৭ অগস্ট আফসানাকে তিন তালাক শোনায় ওয়েদুল৷ অভিযোগ দায়ের করতে এত দেরি হল কেন ? আফসানার বাবা নূর কালাম মোমিন বলেন , ‘প্রথমে ভেবেছিলাম , ওদের বয়স কম৷ মাথা গরম করে এ সব করে ফেলেছে৷ আমি তাই নিজে জামাইয়ের সঙ্গে কথা বলি৷ কিন্ত্ত ও একরোখা৷ দাবি মতো টাকা দিতে পারিনি৷ তাই তালাকের অন্যথা হবে না বলে জানিয়ে দেয় জামাই৷ তাই থানায় আসতে হল৷ ’বেআইনি হলেও পণ না -পেয়ে তালাক , সুবিচার নিয়ে সংশয়প্রতিবাদে অনড় আফসানা

তালাক দেবার হুমকি, স্বামী গ্রেপ্তার বারুইপুরে

তালাককাণ্ডে অভিযুক্ত স্বামী সাবির আহমেদকে গ্রেন্তার করল পুলিশ৷ ধৃতকে বুধবার বারুইপুর মহকুমা আদালতে তোলে পুলিশ৷ দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার বারুইপুর কেয়াতলার বাসিন্দা নূরনেহার বিবি গত ৯ই ডিসেম্বর, মঙ্গলবার বারুইপুর থানায় অভিযোগ করেন, তিন-তালাক দেওয়ার জন্য ক্রমাগত তাঁর উপর চাপ সৃষ্টি করছিলেন স্বামী সাবির ও শাশুড়ি সালেহার বিবি৷ অভিযোগ, দু’দিন আগে নূরনেহারের বাপের বাড়িতে হঠাৎই চড়াও হন সাবির৷ জানতে চান, কবে তালাক দেবেন৷ নূরনেহার রাজি  না হওয়ায় তাকে তার  মারধর করেন এবং  বিড়ির ছেঁকা দেন৷ এরপর নূরনেহার থানায় স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন৷ তারপরেই পুলিশ সাবির আহমদকে গ্রেপ্তার করে।

তিন তালাক বিরোধী আইন চান না মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি

নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাকযুদ্ধ অব্যাহত। বিমুদ্রীকরণকে হাতিয়ার করে এতদিন তুলোধনা চলছিল, এবার নতুন সংযোজন তিন তালাক বিল। একই সঙ্গে অসমে বাঙালি নির্যাতন থেকে ব্যাঙ্কিং বিল প্রভৃতি ইস্যুতে বুধবার সরব হলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৱুধবার বীরভূমের আহমদপুরে জনসভা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জনসভায় বক্তব্য রাখার সময় তিন তালাক বিরোধী বিল প্রসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘সব কিছু নিয়ে রাজনীতি করছে বিজেপি। তিন তালাক বিরোধী বিল রাজনৈতিক কারণে এনেছে কেন্দ্র। এইবিলে আরও বিপদে পড়বেন মহিলারা। মহিলাদের নিরাপত্তা দিতে পারে তৃণমূল।’’ গতকাল ৫ই জানুয়ারী, শুক্রবার রাজ্যসভায় তিন তালাক বিলটি উঠলে টিএমসি-এর এম পি ডেরেক ও’ব্রায়েন তুমুল চিৎকার চেঁচামেচি করে বিলটির বিরোধিতা করেন। এমনকি রাজ্যসভা টিভি সম্প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে যে তিনি কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদের সঙ্গে তর্কাতর্কিতে জড়িয়ে পড়েছেন। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছে যে এটি হলো মমতা ব্যানার্জীর মুসলিম তোষণের আর একটি নমুনা মাত্র। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে মুসলিম মহিলাদের সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ নয় মমতা ব্যানার্জির কাছে, মুসলিম ভোটই বড়ো কথা।

লোকসভায় পাশ হলো তিন তালাক বিল, বিরোধিতা কংগ্রেস ও ওয়েইসির

লোকসভায় পাশ হয়ে গেল বহুচর্চিত তিন তালাক বিল। বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের অন্যায়ভাবে বিচ্ছেদ রুখতেই আজ এই বিল কেবল লোকসভায় পেশই হল না, একইসঙ্গে স্পিকারের বিশেষ অনুমতি আদায় করে তা পাশও করিয়ে নিল মোদি সরকার। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টার উপর আলোচনা শেষে পাশ হল ‘দ্য মুসলিম উইমেন (প্রোটেকশন অব রাইটস অন ম্যারেজ) বিল, ২০১৭’। লোকসভায় পাশ হওয়ার পর বিলটি এখন যাবে রাজ্যসভায়। সংসদের উচ্চকক্ষ থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে গেলে সেটি যাবে রাষ্ট্রপতির কাছে। তিনি সই করলে বিলটি আইনে পরিণত হবে। অর্থাৎ তখন থেকে কার্যকর হবে তিন তালাক আইন। বিলটি পেশ এবং পাশের সময় কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ বলেন, ‘‘মহিলাদের সমানাধিকার, সম্মান এবং ন্যায়ের লক্ষ্যেই এই বিল আনা হয়েছে। যার জেরে এখন থেকে কোনও পুরুষই অন্যায়ভাবে কোনও মুসলিম মহিলাকে তিন তালাক (তালাক-এ-বিদ্দাত) দিতে পারবেন না।’’ তিনি বলেন, এই বিলটিকে কখনও রাজনীতি, ভোট ব্যাঙ্ক, কিংবা ধর্মের মোড়কে দেখা উচিত হবে না। কারণ এটি দেশের মহিলাদের অধিকারের জন্য তৈরি।কী এই তিন তালাক বিল? এক, এর ফলে কোনও ব্যক্তি তাঁর স্ত্রী’কে উদ্দেশ্য করে ‘তালাক’ বললে তা বাতিল এবং বেআইনি হিসেবে গ্রাহ্য হবে। নির্দিষ্ট ব্যক্তি মুখে, অথবা লিখে, অথবা অন্য যে কোনও পদ্ধতিতেই ‘তালাক’ বলুন না কেন, তাকে মান্যতা দেওয়া হবে না। দুই, এক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির তিন বছর পর্যন্ত জেল এবং জরিমানা হতে পারে। তিন, দোষী ব্যক্তি তাঁর স্ত্রী এবং নাবালক সন্তানদের ‘অস্তিত্ব ভাতা’ (জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ভাতা বা সাবসিস্টেন্স অ্যালাওয়েন্স) দিতে বাধ্য থাকবেন। এবং এই ভাতার পরিমাণ সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট নির্ধারণ করে দিতে পারেন। চার, তালাকপ্রাপ্ত মুসলিম মহিলাই তাঁর নাবালক সন্তানের দায়িত্ব নিতে পারবেন।

আজ তিন তালাক বিল পেশ হবে বলে সরকার আগে থেকে জানিয়ে দিলেও তা যে এদিনই আলোচনা শেষে পাশ করানোর পরিকল্পনা কেন্দ্র করেছে, বিরোধীদের তা জানায়নি মোদি সরকার। তাই বিলটি নিয়ে সেভাবে কারও প্রশ্ন না থাকলেও যে পদ্ধতিতে বিল পেশ এবং পাশ করা হল, তা নিয়ে প্রবল আপত্তি তোলে সিপিএম, কংগ্রেস, বিজেডি, আরজেডি, সপা, এনসিপি’র মতো দলগুলি। হায়দ্রাবাদের সংখ্যালঘু এমপি আসাদউদ্দিন ওয়েইসি সরকারের এই তাড়াহুড়োর বিল পেশের উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করেন। সবমিলিয়ে উত্তাল হয় লোকসভা। ওয়াকআউট করে সিপিএম। যদিও এত কিছুর মধ্যেও তিন তালাক বিল নিয়ে নিশ্চুপ ছিল তৃণমূল। তারা আলোচনায় অংশও নেননি। ভোটাভুটিতেও ছিলেন না। অথচ এদিন রাতে টানটান উত্তেজনায় বিল পাশের সময় সভায় হাজির ছিলেন তৃণমূলের লোকসভার নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এমপি ইদ্রিশ আলি।

তিন তালাক বিলের বিরোধিতা অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’বোর্ডের

সুপ্রিম কোর্ট অসাংবিধানিক ঘোষণা করার পরই তিন তালাক বিলে সায় দেয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা। বিল পেশ করা হয়েছিল সংসদের উভয় কক্ষে। ফলে আইনে পরিণত হতে চলেছিল এই বিল। যার ফলে তিন তালাক দেওয়া অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হয়। কিন্তু এবার তারই বিরোধিতা করল অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’বোর্ড। গত ২৪শে ডিসেম্বর, রবিবার জরুরিভিত্তিতে বৈঠকে বসেন সংগঠনের সদস্যরা। তারপরই এই বিল প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

তিন তালাক বিল সংসদের উভয়কক্ষে পেশ হওয়ার পর থেকেই এ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল। মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশের অভিযোগ ছিল, এই বিল নিয়ে আসা মানেই সরাসরি শরিয়তি আইনে হস্তক্ষেপ। যদি মুসলিম জনজাতির জীবনের মান উন্নয়ন নিয়েই এই বিল আনতে হয়, তাহলে মুসলিমদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করা উচিত ছিল। অন্য আর এক পক্ষের অভিযোগ ছিল, এ নিয়ে রাজনীতি করছে শাসকসদল বিজেপি। হিন্দুদের সন্তুষ্ট করতেই তড়িঘড়ি বিল প্রণয়ন করা হয়। এ নিয়েই এদিন জরুরি বৈঠকে বসেন অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’বোর্ডের সদস্যরা। বৈঠক শেষে সংগঠনের তরফে সাজ্জাদ নোমানি জানান, ‘‘এই বিল তৈরির সময় কোনওরকম প্রক্রিয়া মানা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কারও সঙ্গে আলোচনাও করা হয়নি।’’ সংগঠনের প্রেসিডেন্ট এ কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানাবেন। এই বিল স্থগিত ও প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়েছে সংগঠনের তরফে।

মোদী কিছু করতে পারবেন না, হুমকি দিয়ে স্ত্রীকে তালাক উত্তরপ্রদেশে

তাৎক্ষণিক তিন তালাক রদে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। মহিলাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে তৎপর কেন্দ্রও। খুব শিগগিরি আইন করে এই প্রথা নিষিদ্ধ হবে। সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুসারে, এখনই তিন তালাক দেওয়া আইনত দণ্ডনীয়। তবে তাতে এই ধরনের ঘটনা কমছে না। ফের তিন তালাকের শিকার হলেন এক মহিলা। ঐতিহাসিক রায় ঘোষণার পরই এক অধ্যাপক তিন তালাক দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রীকে। মহিলার অভিযোগে শোরগোল পড়ে দেশে। যদিও অভিযুক্ত অধ্যাপকের দাবি ছিল, সবরকম নিয়ম মেনেই তিনি বিচ্ছেদের আবেদন জানিয়েছিলেন। সে ঘটনার রেশ মিটতে না মিটতেই ফের সামনে এল তিন তালাকের ঘটনা। এবার নিগ্রহের শিকার হলেন উত্তরপ্রদেশের বেরিলির এক মহিলা। তাঁর অপরাধ? সংবাদসংস্থা এএনআইকে তিনি জানাচ্ছেন, তিন তালাক রদের উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাই তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে এক সভার আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি তাতে অংশগ্রহণ করেন। সভা শেষে ফেরার পরই তাঁকে তিন তালাক দেওয়া হয়। তবে ঘটনার জল যে শুধু এই পর্যন্ত গড়িয়েছে তা নয়। স্বামীর বিরুদ্ধে আরও বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন মহিলা। বধূর দাবি, স্বামী তাঁকে তালাক দেওয়ার জুতসই সুযোগ খুঁজছিলেন। কেননা অপর এক মহিলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রয়েছে। এমনকী তাঁর স্বামীর ঔরসে সেই মহিলার এক সন্তানও আছে। এই মহিলা তাঁর স্বামীর বিশেষ আত্মীয় হয় বলেও জানিয়েছেন লাঞ্ছিতা। তাঁর অভিযোগ, এই কারণেই বারবার তাঁকে তালাকের হুমকি দেওয়া হত। শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিল স্বামী।

সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে তালাক বন্ধে বিল আনতে চলেছে কেন্দ্র সরকার

সংসদের আসন্ন শীতকালীন অধিবেশনেই তিন তালাক নিয়ে বিল আনতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার৷ সূত্রের খবর, এই বিলের খসড়া তৈরি করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্দেশে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছে বিশেষ মন্ত্রিগোষ্ঠী৷ সেই খসড়া পেশ করা হবে মন্ত্রিসভায়৷ সেখানে খসড়া অনুমোদন হলে তা বিল আকারে পেশ করা হবে সংসদে, যা পাশ করলে আইনে পরিণত হবে৷ তিন বার ‘তালাক’ বলে বিয়ে ভেঙে দেওয়ার এই প্রক্রিয়াকে (তালাক-এ-বিদ্দত) ইতিমধ্যেই অসাংবিধানিক ঘোষণা করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট৷ সর্বোচ্চ আদালতই কেন্দ্রকে নির্দেশ দিয়েছিল এই সংক্রান্ত আইন তৈরি করার৷ বিরোধীদের অবশ্য অভিযোগ, শীতকালীন অধিবেশনেরই যেখানে কোনও ঠিক নেই সেখানে এত আগে এই ঘোষণার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে মোদী সরকারের৷ গুজরাট নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই ঘোষণার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে৷ এমন অভিযোগের নেপথ্যে বিরোধীদের যুক্তি, রাহুলের মন্দির-রাজনীতির পাল্টা হিসেবে যে ভাবে সংখ্যালঘুদের দরজায় যাওয়া শুরু করেছে বিজেপি তাতেই স্পষ্ট তাদের গতিপথ কী? গুজরাট ভোটকে সামনে রেখে মহারাষ্ট্রের সংখ্যালঘু বিজেপি সদস্যাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মোদীর রাজ্যের প্রতিটি জেলায় গিয়ে তিন তালাক নিয়ে প্রচার চালানোর৷ এ বার তিন তালাক সংক্রান্ত প্রস্তাবিত বিলের আগাম প্রচারের মাধ্যমে তারা গুজরাটের মুসলিম মহিলা ভোটারদের কংগ্রেসের থেকে দূরে সরিয়ে নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একটা বড় অংশ৷

সরকারপক্ষ অবশ্য এসব যুক্তি উড়িয়ে দিয়েছে৷ তাদের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তিন তালাক নিষিদ্ধ হওয়ার পর এবার দেশ থেকে তিন তালাকের শিকড় উপড়ে ফেলতে উদ্যোগী হয়েছে মোদী সরকার৷ এই বিলের মাধ্যমে দেশের সব স্তরের মুসলিম মহিলাদের অধিকার সুরক্ষিত হবে৷ এতে সব কটি রাজনৈতিক দলের সম্মতিও রয়েছে বলে জানিয়েছে বিজেপি৷ দলের এক শীর্ষ স্থানীয় নেতা মঙ্গলবার জানিয়েছেন, ‘তিন তালাকের নামে সংখ্যালঘু সমাজের বিভিন্ন স্তরে মহিলাদের উপরে যে ভাবে অত্যাচার করা হয়, তা চিরতরে বন্ধ করার জন্য কঠোর আইন প্রণয়নের ভাবনা রয়েছে সরকারের৷ চেষ্টা করা হচ্ছে এই বিষয়ে সংসদের শীতকালীন অধিবেশনেই বিল আনার৷’ ২২আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে ‘তালাক-এ-বিদ্দত’-কে অসাংবিধানিক এবং অবৈধ আখ্যা দেওয়া হয়৷ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই প্রথা এদেশে ব্রাত্য, সাফ জানিয়েছিল আদালত৷ সেই রায় মেনে এ বার মুসলিম মহিলাদের অধিকার এবার আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত করতে চাইছে কেন্দ্র৷ বহু বছর ধরে চলে আসা এই প্রথার ফলে নানা ভাবে শোষণের শিকার হচ্ছিলেন মহিলারা৷ কখনও ফোনে তিন বার তালাক বলেই তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে দিচ্ছিলেন স্বামীরা, কখনও শুধুমাত্র এসএমএস পাঠিয়েই দায় সারা হচ্ছিল৷ থানা-পুলিশ করেও কোনও সুরাহা হচ্ছিল না৷ এমন অবস্থায় অনেকেই আদালতের দ্বারস্থ হন৷ তার পরই বিষয়টি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় সুপ্রিম কোর্ট৷ খতিয়ে দেখা হয় প্রাচীন এই প্রথার বৈধতা৷ শেষমেশ স্বস্তি পান মহিলারা৷ এ বার সেই স্বস্তিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার পালা৷ এমনটা হলে কোনও ব্যক্তি আইন অমান্য করে স্ত্রীকে তিন তালাক দিলে তাঁকে সাজা পেতে হবে৷ প্রসঙ্গত, আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও দেশের নানা প্রান্ত থেকে তিন তালাকের খবর আসছে, আইন পাশ হলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে পুলিশ৷

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ‘তিন তালাক’ বিলকে ভিত্তি করে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি তাদের পায়ের তলার মাটি আরও শক্ত করতে চাইছে, বিশেষত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত রাজ্যগুলিতে৷ ২০১৯-এর মহারণ যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে ভোটের হিসেব-নিকেশ৷ যোগ-বিয়োগ ঠিকঠাক হলে সেই হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ‘তিন তালাক’৷ বিজেপি ঠিক যেমনটা চাইছে৷ সেক্ষেত্রে চিরাচরিত ভোটব্যাঙ্ক নিয়ে ভাবনায় পড়তে হতে পারে কংগ্রেসকে৷

সায়রা বানো (৩৬ )উত্তরাখণ্ডের বাসিন্দা সায়রাকে ২০১৫-এর অক্টোবরে তালাক দেন স্বামী রিজওয়ান আহমেদ৷ দুই সন্তানকেও নিয়ে চলে যান৷ সায়রাকে ছ’বার গর্ভপাতে বাধ্য করিয়েছিল তাঁর শ্বশুরবাড়ি থেকে৷ তিনি তিন তালাক বাতিলের দাবিতে আর্জি জানান সুপ্রিম কোর্টে৷ তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্র হলফনামা দাখিল করে আদালতে৷ ইশরাত জাহান (৩১) ২০১৫-এর এপ্রিলে হাওড়ার ইশরাতকে দুবাই থেকে ফোন করে তালাক দেন তাঁর স্বামী মুর্তাজা৷ নিমেষে ভেঙে যায় ১৫ বছরের দাম্পত্য৷ অন্য মহিলাকে বিয়ে করে ইশরাতের চার সন্তানকে নিয়ে যান স্বামী৷ সন্তানদের ফেরত চেয়ে আদালতের শরণাপন্ন হন ইশরাতগুলশন পরভিন (৩১)৷ উত্তরপ্রদেশের রামপুরের গুলশনকে ১০ টাকার স্ট্যাম্প পেপারে বিচ্ছেদের নোটিস দেওয়া হয় ২০১৫-য়৷ দু’বছরের পুত্রকে নিয়ে ঘরছাড়া হন তিনি৷ পণপ্রথা ও গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হয়েছেন আফরিন রহমান(২৬)৷ ২০১৪-য় বিয়ের পোর্টাল দেখে শুভ পরিণয়৷ বিয়ের তিন মাসের মধ্যে বিবাদের সূত্রপাত৷ দাবি ওঠে পণের৷ শারীরিক অত্যাচার চলতে থেকে৷ বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় আফরিনকে৷ রাজস্থানের জয়পুরের বাসিন্দা আফরিন পিত্রালয়ে আশ্রয় নেন৷ সেখানে স্পিড পোস্টে পৌঁছোয় তালাকনামা৷ আতিয়া সাবরির(৩০) বিয়ের তিন বছরের মাথায় ২৫ লক্ষ টাকা পণ চাওয়া হয় সাহারানপুরের বাসিন্দা আতিয়ার কাছ থেকে৷ থানায় অভিযোগ জানান দুই সন্তানের মা৷ তার জেরে একটুকরো কাগজে তালাকনামা লিখে বিয়ে ভেঙে দেন স্বামী৷

নিষিদ্ধ ‘তালাক-এ-বিদ্দত’, তিন তালাক নয় ‘তালাক-এ-বিদ্দত’ অনুযায়ী তিন বার তালাক উচ্চারণ করেই বিয়ে ভেঙে দিতে পারেন কোনও মুসলিম পুরুষ৷ এই উপায়ে ফোন, ইমেল এমনকি টেক্সট মেসেজ করেও তালাক দেওয়া সম্ভব৷ পরে স্বামী যদি ফের সম্পর্ক জুড়তে চান, তা হলে একমাত্র উপায় হল ‘নিকাহ হালালা’৷ অর্থাৎ অন্য কাউকে বিয়ে করে, সেই বিয়ে ভেঙে স্ত্রীকে ফিরে আসতে হবে৷ শুধুমাত্র এই ‘তালাক-এ-বিদ্দত’ই নিষিদ্ধ করল সুপ্রিম কোর্ট, তিন তালাক প্রথার অন্য দুই পদ্ধতি ‘তালাক-এ-সুন্নত’ এবং ‘তালাক-এ-এহসান’ আগের মতোই চালু থাকছে৷ ‘তালাক-এ-এহসান’ কী? বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সাধারণত মুসলিমরা এই পদ্ধতিকেই সবথেকে যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন৷ ‘এহসান’ কথার অর্থ সেরা৷ এই পদ্ধতিতে এক বারেই তিন বার ‘তালাক’ বলতে হয় স্বামীকে৷ তবে, সেই সময় স্ত্রীকে ‘পবিত্র’ অবস্থায় থাকতে হয়, অর্থাৎ মেনস্ট্রূয়েশন চললে হবে না৷ এরপর বিচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার জন্য তিন মাস অপেক্ষা করতে হয় স্বামীকে৷ তবে, তার আগেই মিটমাট করে নেওয়া সম্ভব৷ ‘তালাক-এ-সুন্নত’ কী? এই পদ্ধতিতে প্রথম বার ‘তালাক’ বলার পর এক মাস পূর্ণ না হলে দ্বিতীয় বার ‘তালাক’ বলা সম্ভব নয়৷ এই উপায়ে স্ত্রী বিচ্ছেদের জন্য প্রস্ত্তত হতে তিনটি মেনস্ট্রূয়াল সার্কেল সময় পান৷ অনেক সময়ে তিন বার ‘তালাক’ বলার আগেই সমস্যা মিটে যায়৷

কী ছিল রায়? তিন বার ‘তালাক’ বলে তৎক্ষণাৎ বিয়ে ভেঙে দেওয়ার প্রথা (‘তালাক-এ-বিদ্দত’) নিষিদ্ধ করে দিল সুপ্রিম কোর্ট৷ আদালতের মন্তব্য, এই প্রথা অসাংবিধানিক৷ এটা কোনও ভাবেই ধর্মীয় স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়৷ এই প্রথা সাংবিধানিক নৈতিকতার পরিপন্থী আপাতত ৬ মাসের জন্য ‘তালাক-এ-বিদ্দত’-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আদালত৷ তার মধ্যে আইন তৈরি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারকে৷ ৬ মাসের মধ্যে কেন্দ্র আইন তৈরি করতে না পারলেও নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে৷ রাজনৈতিক দলগুলিকে নিজেদের বিভেদ সরিয়ে এই আইন তৈরিকে কেন্দ্রকে সাহায্য করতে বলেছেন বিচারপতিরা৷ কেন্দ্র তার সওয়ালে বলেছিল, তিন তালাক প্রথা মহিলাদের মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে, এদিন কার্যত সেই মতকেই মান্যতা দিল সুপ্রিম কোর্ট৷ ‘তালাক-এ-বিদ্দত’ প্রথার সুযোগ নিয়ে অনেকেই স্কাইপ, হোয়াটসঅ্যাপ, এমনকি কাগজে তিন বার ‘তালাক’ লিখেও বিয়ে ভাঙে৷