কেরালা থেকে গ্রেপ্তার জেএমবি জিহাদি বোমা বিশেষজ্ঞ আব্দুল মতিন

abdul motinদক্ষিণ ভারতে বসে পশ্চিমবঙ্গে জঙ্গি কার্যকলাপ চালানোর ঘটনায় আব্দুল মতিন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করল এসটিএফ। কেরলের মাল্লাপুরম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেখানকার আদালত তার আটদিনের ট্রানজিট রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। তাকে এদিন কলকাতায় এনে ব্যাঙ্কশালের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে তোলা হয়। সরকারি আইনজীবী অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলেন, বুদ্ধগয়া বিস্ফোরণকাণ্ডে আব্দুল মতিনের যোগ থাকার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। সেইসঙ্গে এরাজ্যে জঙ্গি কার্যকলাপে তার যোগ থাকার তথ্যপ্রমাণ মিলেছে। তাই আরও তদন্তের জন্য তাকে হেফাজতে নেওয়া প্রয়োজন। আদালত আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাকে এসটিএফের হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেয়। সূত্রের খবর, বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণকাণ্ডের দুই ষড়যন্ত্রী ইউসুফ এবং কওসরের সঙ্গে আব্দুল মতিনের ঘনিষ্ঠতা ছিল। গত দু’বছর ধরে মতিন অনুমোদনহীন মাদ্রাসা থেকে শিক্ষিত ছেলেদের জোগাড় করে জঙ্গি সংগঠনে নিয়ে আসত বলে জানা গিয়েছে। এমনকী বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজেও তার যুক্ত থাকার প্রমাণ মিলেছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, অসমের বরপেটার বাসিন্দা আব্দুল মতিন ২০১০ সাল নাগাদ মালদহের কালিয়াচকের একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। সেই সময় সে জেহাদি সংগঠনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। প্রথমে কালিয়াচকের মাদ্রাসায় জাহিরুল শেখের কাছে জেহাদি কার্যকলাপের শিক্ষা নেয় এবং পরবর্তীকালে বর্ধমানের শিমুলিয়ার মাদ্রাসায় খাগড়াগড়কাণ্ডে জড়িত ইউসুফের কাছে জেহাদি পাঠ সম্পূর্ণ করে।
তদন্তে গোয়েন্দারা জেনেছেন, কালিয়াচকে মতিনের জেহাদি চর্চায় খুশি হয়ে ইউসুফই তাকে শিমুলিয়ায় নিয়ে গিয়েছিল। সেখানকার পাঠ চোকানোর পর মুর্শিদাবাদের লালগোলার মুকিমনগর এলাকার একটি মাদ্রাসায় হাতকাটা নাসিরুল্লার কাছে তার বিস্ফোরক বানানোর তালিম শুরু হয়। আইইডি থেকে টাইম বোমা—সবই বানাতে সে শিখে যায় দ্রুত। এরপরে মুকিমনগরেই সে অন্যদের বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে।
২০১৪ সালে খাগড়াগড় বিস্ফোরণের কিছুদিন আগেই এরাজ্যে জেএমবি মডিউলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে কাজ শুরু করে মতিন। সেই থেকেই ইউসুফ শেখ এবং কওসরের সঙ্গে তার পুরোদমে কাজ শুরু। আরও প্রশিক্ষণের জন্য এরপর সে বাংলাদেশে যায়। এমনকী সেখান থেকে বিভিন্ন সময় বিস্ফোরণের সামগ্রীও এরাজ্যে নিয়ে আসে। খাগড়াগড় কাণ্ডের পর সে ইউসুফের সঙ্গে বাংলাদেশে পালিয়েছিল। সেখানে কওসরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। এরপর কওসরের নির্দেশেই সে দক্ষিণ ভারতে ফিরে আসে। ২০১৬ সাল থেকে মতিন ফের জেএমবি’র নতুন মডিউল তৈরির কাজ শুরু করে। মূলত অসম এবং পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী যুবকরা, যারা বিভিন্ন রাজ্যে শ্রমিকের কাজ করে, তাদের ‘মস্তিষ্ক প্রক্ষালন’ করে জেহাদি প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে সে। এরপর কওসরের সঙ্গে ফের তার যোগাযোগ হয়। এমনকী বুদ্ধগয়ায় বিস্ফোরণ ঘটানো নিয়ে তাদের যে বৈঠক হয়েছিল, সেখানেও মতিন হাজির ছিল। বুদ্ধগয়ায় বিস্ফোরণের পর মতিন ফের মাঝেমধ্যেই এরা঩জ্যে আসা শুরু করে। জেএমবি’র পুরনো লোকজনকে ফের সক্রিয় করে তোলাই তার কাজ ছিল। কিন্তু শুধুমাত্র শ্রমিক দিয়ে সব কাজ হবে না, তাই অনুমোদনহীন মাদ্রাসার মাধ্যমে সেখানকার শিক্ষিত যুবকের জেহাদি প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করে।
মুর্শিদাবাদ, মালদহ এবং উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন মাদ্রাসাই এবার মতিনের লক্ষ্য ছিল। পাশাপাশি বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণও দেওয়া শুরু করেছিল সে। তদন্তে গোয়েন্দারা জেনেছেন, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু এবং কেরলে বসেই জেএমবি মডিউলগুলি সক্রিয় করা এবং বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল মতিন। সম্প্রতি কওসরকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় এসটিএফ মতিনের নাম পায়। সেই সূত্রেই তার খোঁজ চলে। অবশেষে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
Advertisements

মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে প্রচুর বিস্ফোরকসহ গ্রেপ্তার রুবেল শেখ, জেএমবি যোগের সম্ভাবনা

গত ৫ই ফেব্রুয়ারী, সোমবার আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমান বিস্ফোরক, গুলি ও জিহাদি পুস্তিকাসহ এক মোটর ভ্যান চালককে গ্রেপ্তার করলো মুর্শিদাবাদ জেলার সামশেরগঞ্জ থানার পুলিশ। ধৃতের নাম আজহার শেখ ওরফে রুবেল। তার বাড়ি থেকে পাইপগান, নাইন এমএম পিস্তলসহ প্রায় ২৫কেজি বিস্ফোরক ও জামাত-উল-মুজাহিদিন-এর প্রচুর পুস্তিকা পাওয়া গিয়েছে। তার বাড়ি রতনপুর গ্রামে। জানা গিয়েছে, ধৃত রুবেল মোটর ভ্যানের চালক। সে ডাকবাংলো স্ট্যান্ডে ভ্যান নিয়ে থাকতো। সে যে জিহাদি কাজকর্ম করছে তা পুলিশের কাছে অজানা ছিল। পুলিশ গাড়ি চেকিং করে, তাই জঙ্গিরা মোটরভ্যানে করেই অস্ত্র ও বিস্ফোরক পাচার ও মজুত করতো। গতকাল ৬ই ফেব্রুয়ারী, মঙ্গলবার তাকে জঙ্গিপুর এসিজেএম আদালতে তোলা হলে বিচারক ১৪দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন।

কোলকাতায় ধৃত ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’-এর দুই জিহাদি, ব্যবহার করছিলো হিন্দু নামও

kolkatay dhrito ansarullah bangla teamআল কায়েদার শাখা সংগঠন ‘আনসারউল্লা বাংলা টিম’ এই রাজ্যকে ঘাঁটি করে শাখা বিস্তার করতে চাইছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। তার দায়িত্বে ছিল বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ সামসেদ মিঞাঁ ওরফে তনবীর। এরাজ্য সহ সীমান্তের ওপারে নাশকতার পরিকল্পনাও তার নেতৃত্বে চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। মঙ্গলবার সেই তনবীরকে কলকাতা স্টেশন থেকে গ্রেপ্তার করলেন কলকাতা পুলিশের এসটিএফের কর্তারা। একইসঙ্গে ধরা হয়েছে তনবীরের সঙ্গী রিয়াজুল ইসলাম এবং বসিরহাটের খোলাপোঁতার বাসিন্দা মনোতোষ দে কে। উদ্ধার হয়েছে ভোটার কার্ড, জাল আধার কার্ড, ল্যাপটপ, বিস্ফোরক তৈরির বই, আল কায়েদার ম্যাগাজিন সহ বিভিন্ন সামগ্রী। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় লালবাজারে সাংবাদিক সম্মেলন করে এদের গ্রেপ্তারির খবর জানান ডিসি (এসটিএফ) মুরলীধর শর্মা। তিনি বলেন, তনবীর এবং রিয়াজুল যে জঙ্গি সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত, তা তারা স্বীকার করেছে। অস্ত্র কেনার মাধ্যমেই তনবীরের যোগাযোগ মনোতোষের সঙ্গে।

মাস দুয়েক আগে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার কর্তাদের কাছে খবর আসে, সীমান্ত পেরিয়ে এদেশে এসেছে ‘আনসারউল্লা বাংলা টিম’-এর অন্যতম মাথা তনবীর ও তার এক সঙ্গী। উত্তর ২৪ পরগনার এক আগ্নেয়াস্ত্র কারবারির সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখছে। তাদের পক্ষ থেকে বিষয়টি এসটিএফকে জানানো হয়। তার ভিত্তিতে খোঁজ করতে গিয়ে জানা যায়, বসিরহাটের বাসিন্দা মনোতোষ বেআইনি অস্ত্রের কারবারী। তার কাছেই যাতায়াত রয়েছে তনবীরের। সেখান থেকেই কয়েকবার অস্ত্র কিনে সে বাংলাদেশে নিয়ে গিয়েছে।

পুলিশ খবর পায়, রাজ্যে চলা জিহাদি প্রশিক্ষণ শিবিরের প্রয়োজনে অস্ত্র কেনার জন্য নমুনা দেখতে তনবীর আসবে মনোতোষের কাছে। কলকাতা স্টেশন এলাকায় তারা দেখা করবে। সেই মতো স্পেশাল টাস্ক ফোর্স, অর্থাৎ এসটিএফের টিম সেখানে হানা দিয়ে তনবীরসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। মনোতোষের কাছ থেকে উদ্ধার হয় বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র ও কার্তুজ। যা নমুনা হিসাবে আনা হয়েছিল।

তদন্তে জানা যাচ্ছে, পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার তনবীর বাংলাদেশে একাধিক ব্লগার খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত। বাংলাদেশে ধরপাকড় শুরু হওয়ায় সে ও তার এক সঙ্গী বছর দেড়েক আগে এদেশে পালিয়ে আসে। নতুন করে কাউকে হত্যার উদ্দেশ্যেই সে আগ্নেয়াস্ত্র জড়ো করছিল। জামাতের সংগঠন এদেশে দুর্বল হয়ে পড়ায়, ‘আনসারউল্লা বাংলা টিম’ এরাজ্য সহ ভারতে নিজেদের সংগঠন বিস্তারে উদ্যেগী হয়। তনবীরকে নতুন দায়িত্ব দিয়েই এখানে পাঠানো হয়। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে খবর, একদিকে নতুন জিহাদি নিয়োগ করে সংগঠন বাড়ানো, অন্যদিকে নাশকতা ঘটিয়ে এদেশে তাদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার লক্ষ্যে তারা কাজ শুরু করেছিল। এদেশে এসে তনবীর নাম বদলে হয় তুষার বিশ্বাস ও রিয়াজুল হয় সুমন। তনবীর ভুয়ো আধার কার্ড ও প্যান কার্ড তৈরি করে ফেলে। যা দিয়ে ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টও খুলে বসে অভিযুক্তরা। গোয়েন্দারা ধৃতদের জেরা করে জেনেছেন, সীমান্ত লাগোয়া কিছু এলাকায় আইইডি তৈরির প্রশিক্ষণ চলছে। বিস্ফোরক তৈরি শেখাচ্ছে তনবীর। এরাজ্যের যুবকরা ছাড়া বাংলাদেশ থেকেও জিহাদিরা আসছে। বিভিন্ন জায়গায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে গোপনে আইইডি তৈরি করা হচ্ছে।

যে সমস্ত বিস্ফোরক তৈরির কারখানা করা হয়েছে, সেখানে বিভিন্ন রাসায়নিক পৌঁছে দিচ্ছে তনবীর। যা আনা হচ্ছে মধ্য কলকাতার বিভিন্ন জায়গা থেকে। আইইডির মাধ্যমেই বেশ কয়েকটি জায়গা উড়িয়ে দেওয়ার ছক করেছিল তারা।