জাল পাসপোর্ট তৈরির ঘটনায় পানিহাটিতে গ্রেপ্তার দুই

জাল পাসপোর্ট, আধার কার্ডসহ বিভিন্ন সরকারি পরিচয়পত্র তৈরির অপরাধে পানিহাটি থেকে আরও দু’জনকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ৷ সোমবার রাতে বাংলাদেশি সৈয়দ আহমেদ খানকে গ্রেপ্তারের পরই পুলিশ এই জালচক্রের হদিস পায়৷ জেরা করে গত ১২ই ডিসেম্বর, মঙ্গলবার রাতে পানিহাটির এঞ্জেলনগরে আহমেদ যে বাড়িতে ভাড়া থাকত, সেই বাড়ির মালিক প্রবীর বিশ্বাস ওরফে ভোলা এবং রাজা রামচাঁদ রোডের দোকানদার বিপ্লব শর্মাকে খড়দহ থানার পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে৷ বিপ্লবের একটি দুধের এবং জেরক্স-এর দোকান রয়েছে৷ প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, আধার কার্ড করার সরকারি কাজ পেয়েছিল বিপ্লব৷ ওই দোকান থেকেই সে আধার কার্ড-এর কাজ করত৷ সেখান থেকেই জাল পাসপোর্ট, আধার কার্ড ছাপানো হত বলে প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে৷

Advertisements

ফ্রান্সে ‘দুলাভাই’-য়ের কাছে যেত বলে পাসপোর্ট জালিয়াতিতে ধৃত মিনহাজুদ্দিনের স্বীকারোক্তি

ফ্রান্সে ‘দুলাভাই’-য়ের কাছে যেত পাসপোর্ট জালিয়াতি কাণ্ডে ধৃত বাংলাদেশী মহম্মদ মিনহাজুদ্দিন ওরফে রোহিত। ধৃতের কাছ থেকে এমন তথ্য জানতে পেরে ফ্রান্সে ঘাঁটি গেড়ে থাকা ‘দুলাভাই’ সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছে মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশ। একই সঙ্গে পুলিশ জানতে পেরেছে, পাসপোর্ট জোগাড় করতে তিনবার ভারতে এসেছিল ধৃত বাংলাদেশী। অন্যদিকে, বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ এবং ধুরপার্টির দৌরাত্ম্য রুখতে সীমান্ত গ্রামে প্রচার শুরু করেছেন খোদ পুলিশ সুপার মুকেশ কুমার। সোমবার তিনি রানিনগরে সীমান্ত সম্প্রীতি ফুটবল টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত পর্বের খেলায় যোগ দিয়ে জালিয়াতি চক্র ও অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীদের সজাগ থাকার পরামর্শ দেন।

জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমে গত ১৬নভেম্বর মহম্মদ মিনহাজুদ্দিনসহ তিন বাংলাদেশীকে গ্রেপ্তার করে মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশ। আদালতের নির্দেশে ধৃতরা এখন জেল হেফাজতে রয়েছে। বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে ধৃতদের বাড়ি। ধৃতদের জেরা করে পুলিশ চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য জানতে পেরেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সে বসবাস করছে ধৃত রহিতের ‘দুলাভাই’। সে রোহিতকে ধোবিখানার কাজে নিযুক্ত করে দেবে বলে জানিয়েছিল। সেজন্য তিন সঙ্গীকে নিয়ে ‘দুলাভাই’-য়ের কাছে যাচ্ছিল বলে রোহিত জানিয়েছে। ধোবিখানার কাজ না জুটলে সেখানে দিনমজুরির কাজ করবে বলেও সে জানিয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছে, রোহিতের ‘দুলাভাই’-য়ের সম্পর্কে খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে। সে কবে, কী ভাবে ফ্রান্সে পাড়ি দিয়েছে তা জানার চেষ্টা চলছে। প্রয়োজন পড়লে এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হবে।

পুলিশ সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, ফ্রান্সে যাওয়ার পাসপোর্ট জোগাড় করতে এদেশে তিনবার এসেছে রোহিত ওরফে মহম্মদ মিনহাজুদ্দিন। জালিয়াতি চক্রের সহযোগিতায় সে নৈহাটি, হুগলী, বারাসাত ও বহরমপুরের হোটেলে একাধিকবার রাত কাটিয়েছে। মোটা অংকের টাকা খরচ করে জালিয়াতি চক্রের মাধ্যমেই ভারতীয় নাগরিকত্বের জাল সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে সে। তাই ধৃত রোহিতকে সন্দেহের তালিকার বাইরে রাখছে না পুলিশ। বাংলাদেশে সে কী করত তা জানার চেষ্টা চলছে। পুলিশের একাংশের সন্দেহ, ধৃতের সঙ্গে বাংলাদেশী জেহাদি সংগঠনের যোগাযোগ থাকতে পারে। জেলা পুলিশের এক কর্তা বলেন, ধৃতের ভূমিকা ও বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হচ্ছে।

কম্পিউটার প্রিন্টিং-এর আড়ালে চলতো জাল পাসপোর্টের কারবার

Computer printinger arale jal pasportজাল পাসপোর্ট কাণ্ডে আরও বিস্ময়কর তথ্য পেল মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশ। আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, খোদ জেলার পুলিশ সুপারের অফিসের কাছেই জালিয়াতি চক্র ঘাঁটি গেড়েছিল। ঘাঁটির নিয়ন্ত্রক ছিল জালিয়াতি চক্রের অন্যতম মাস্টার মাইন্ড সাইফুল শেখ। তাই বৃহস্পতিবার সাইফুলকে হেফাজতে নেওয়ার জন্য আদালতে আবেদন জানায় পুলিশ। তা মঞ্জুর করেছেন বিচারক। অন্যদিকে, মুহুরি, কম্পিউটার প্রিন্টিং ও গৃহ শিক্ষকতার আড়ালে জেলায় জাল বিছিয়েছে জালিয়াতি চক্র। টানা সাত দিন ধরে ঘটনার তদন্ত চালিয়ে পুলিশ এমন তথ্য হাতে পেয়েছে।

মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের সাইফুল শেখকে পাসপোর্ট জালিয়াতি চক্রের মাস্টার মাইন্ড হিসেবে মনে করছে পুলিশ। শহর সংলগ্ন পর্বতপুরে সাইফুলের বাড়ি। ধৃতের সঙ্গে কয়েকজন মুহুরির ভালো সম্পর্ক ছিল। শহরের প্রাণ কেন্দ্র পুরনো ফৌজদারি কোর্ট চত্বরেই তাদের সেরেস্তা রয়েছে। যা পুলিশ সুপারের অফিসের পাশেই রয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সেরেস্তাগুলিতে কম্পিউটার ও প্রিন্টার রয়েছে। সেই সেরেস্তাগুলিকে কেন্দ্র করেই জালিয়াতি কারবারের ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল সাইফুল। বরাত দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেরেস্তাগুলি থেকে মিলত জাল সচিত্র ভোটারকার্ড, আধারকার্ড ও জন্ম সার্টিফিকেট। এর বাইরে ধৃত সাইফুল জমির দালালি করত বলেও পুলিশ জানতে পেরেছে। সে জমির জাল দলিল তৈরি করত বলেও পুলিশের অনুমান। এসব দিক বিবেচনা করেই ধৃত সাইফুলকে চক্রের অন্যতম মাথা বলেই মনে করছে পলিশ। উল্লেখ্য, সাইফুলের ঘনিষ্ঠ ওই মুহুরিদের ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এদিন বহরমপুর সিজেএম আদালতে সাইফুলকে তোলা হয়। আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ১৭নভেম্বর সাইফুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৮নভেম্বর ধৃতকে ৬ দিনের জন্য পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন বিচারক। এদিন ধৃতকে আদালতে হাজির করে পুলিশ তাকে ফের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানায়। পুলিশের আবেদনের বিরোধিতা করে ধৃতের জামিনের আবেদন করেন তার আইনজীবী অর্কজ্যোতি ভট্টাচার্য। সরকারি আইনজীবী ও ধৃতের আইনজীবীর বক্তব্য শোনার পাশাপাশি মামলার কেস ডায়েরি পর্যবেক্ষণ করার পর ধৃতের জামিনের আবেদন খারিজ করেন সিজেএম পিনাকী মিত্র।পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, হেফাজতে থাকাকালীন ধৃতের কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার হয়েছে। তাতে সন্দেজনক কিছু ভয়েস রেকর্ড রয়েছে। ধৃতের কাছ থেকে আরও কিছু তথ্য মিলবে বলেই আশা করা হচ্ছে। তাই ধৃতকে ফের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। সরকারি আইনজীবী বিশ্বপতি সরকার বলেন, মামলার তদন্তের প্রয়োজনে পুলিশ ধৃতকে দু’দিনের জন্য হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানায়। বিচারক তা মঞ্জুর করেছেন।

এদিকে, সাইফুল ছাড়াও জাল পাসপোর্ট কাণ্ডে ধৃত বাংলাদেশি মহম্মদ মিনাজুদ্দিন শেখ ওরফে রহিত, বারাসতের বাসিন্দা সাইমুদ্দিন, কান্দির জিয়ারুল হক, বহরমপুরের ঈদ মহম্মদ শেখ ও পুলিশ কনস্টেবল রাজু মণ্ডলকে আদালতে তোলা হয়। এক সময় প্রয়াত তৃণমূল নেতা মান্নান হোসেনের নিরাপত্তারক্ষী ছিল রাজু। আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজুর জামিনের আবেদনও খারিজ করে দিয়েছে আদালত। রাজু সহ পাঁচ ধৃতকে ৩০নভেম্বর পর্যন্ত জেল হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, ধৃতদের মধ্যে ঈদ মহম্মদ শেখ ও জিয়ারুলের সঙ্গে সাইফুলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বহরমপুরের প্রান্ত পাড়ায় ঈদের বাড়ি। তার বাবা মুহুরি। ফৌজদারি কোর্টে রেজিস্ট্রি অফিসের কাছে তাদের সেরেস্তা। ঈদ মহম্মদ কম্পিউটার চালাতে এবং জমির দলিল তৈরির কাজে পটু। কান্দির বাঘছাড়া গ্রামের বাসিন্দা জিয়ারুল পেশায় গৃহ শিক্ষক। এলাকায় তাকে সকলে মাস্টার হিসাবে চেনেন। এনিয়েই গোয়েন্দা ও পুলিশের সন্দেহ, মুহুরি, কম্পিউটার প্রিন্টিং এবং গৃহ শিক্ষকের আড়ালেই জালিয়াতি চক্রের জাল ছড়ানো হয়েছে

জাল পাসপোর্ট কাণ্ডে গ্রেপ্তার প্রয়াত মান্নান হোসেনের নিরাপত্তারক্ষী

জাল পাসপোর্ট চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রয়াত তৃণমূল নেতা মান্নান হোসেনের নিরাপত্তারক্ষী এক পুলিশ কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করল বহরমপুর থানার পুলিশ ও জেলা পুলিশের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ। ধৃত কনস্টেবল আগেই সন্দেহের তালিকায় ছিল। প্রমাণ হাতে মেলায় সোমবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান জেলার পুলিশ সুপার মুকেশ কুমার। সাংবাদিক সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, ধৃত পুলিশ কনস্টেবলের নাম রাজু মণ্ডল। বাড়ি নদীয়া জেলার শান্তিপুরে।

পুলিশ সুপার আরও বলেন, জাল পাসপোর্ট চক্রে তিন বাংলাদেশি সহ মোট ১২জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে নেমে বিভিন্ন জায়গায় হানা দিয়ে প্রচুর নকল আধার কার্ড, নকল ভোটার কার্ড, নকল প্যান কার্ড বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে নকল জন্ম সার্টিফিকেট সহ বহু নথি। সোমবার এই চক্রে জড়িত ১১জনকে আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের পুলিশ হেপাজতে নেওয়া হয়েছিল। সোমবার রাজু মণ্ডলকে বহরমপুর আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

জাল পাসপোর্ট চক্রের হদিশ মেলায় গত ১৬ নভেম্বর মহম্মদ মীনহাজুদ্দিন, তানবীর ইসলাম ও খন্দেকর মুকলেসুর রহমান নামের তিন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্স যাওয়ার পাসপোর্ট মেলে না। সেই কারণে মীনহাজুদ্দিন ভারত থেকে নকল পাসপোর্ট বানাতে ওই চক্রের সঙ্গে ১২ লক্ষ টাকায় চুক্তি করে। অগ্রিম সাড়ে চার লক্ষ টাকা দিয়েও দেয়। ১৩ নভেম্বর আসল পাসপোর্ট দেখিয়েই ভারতে এসে জানতে পারে তার ছবি বসিয়ে মনোজ মণ্ডল নামে নকল আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ভোটার কার্ড সহ যাবতীয় নথি তৈরি হয়ে গিয়েছে। পাসপোর্ট অফিসে জমাও দেওয়া হয়।

ইতিমধ্যে তদন্তে নেমে বহরমপুর থানার পুলিশ ও স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ যৌথ অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। টানা জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে বারাসত থেকে সাহিনুদ্দিন শেখ, কলকাতার নাকতলা থেকে সুরজিৎ ঘোষ সহ বহরমপুর, কান্দি খড়গ্রাম থেকে মোট এগারো জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বারাসতে যেখান থেকে প্রিন্ট করা হতো সেখানে হানা দিয়ে পুলিশ বহু নকল নথি বাজেয়াপ্ত করে। আদালতে তুলে পাঁচ জনকে পাঁচ দিনের পুলিশ হেপাজতে নিয়ে তদন্ত চালাতেই কনস্টেবল রাজু মণ্ডলের নাম উঠে আসে।

ধৃত কনস্টেবল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন জেলা সভাপতি প্রয়াত মান্নান হোসেনের দেহরক্ষী ছিল। প্রভাবশালী নেতার নাম ভাঙিয়েই সে কোটি কোটি টাকার পাসপোর্ট চক্রের জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান পুলিশের। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট জালিয়াতিতে আরও বেশ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মুকেশ কুমার। তবে পাসপোর্ট অফিসের কারও নাম সন্দেহের তালিকায় নেই বলেই তিনি জানিয়েছেন। যদিও তদন্তের জন্য এখনই তাদের সামনে আনতে চায়নি পুলিশ। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি ধরেই তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। তবে জাল পাসপোর্ট কাণ্ডে পুলিশের নাম জড়িয়ে পড়ায় জেলায় কার্যত চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।