পুলিশকে ধোঁকা দেওয়ার কৌশল জঙ্গিদের শেখাত মাহি

policeke dhoka dewar kousol ansarulla bangla team mahiআনসারুল্লা বাংলা টিম (এবিটি)-এর সদস্য মাহি ওরফে মহম্মদ আফতাবকে কলকাতা স্টেশনে অল্পের জন্য ফস্কেছিলেন এসটিএফের কর্তারা। শুধু কলকাতা নয়, বাংলাদেশের পুলিশকেও দুবার বোকা বানিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছে এই জঙ্গি। পুলিশকে কীভাবে ধোঁকা দিতে হবে, সেই কৌশল এবিটি জঙ্গিদের শেখাত সে। তার কাছ থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে এবিটির অনেকেই বাংলাদেশ পুলিশের নাগাল থেকে বেরিয়ে গিয়েছে বলে খবর। ধৃতকে জেরা করে এমনই তথ্য হাতে এসেছে গোয়েন্দাদের। সেই কৌশল সম্পর্কেই আধিকারিকরা তার কাছ থেকে তথ্য জোগাড়ের চেষ্টা করছেন।
এবিটি জঙ্গি মাহি পুলিশকে নাজেহাল করতে কতটা অভ্যস্ত, সেই তথ্য এবার গোয়েন্দাদের কাছে আসছে। তার বক্তব্য, এবিটিতে যোগ দেওয়ার পরই তাদের একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তা হল পুলিশ কাছাকাছি পৌঁছে গেলে বা ঘিরে ফেললে, সেই জাল ভেদ করে কীভাবে পালাতে হবে। সেখানেই বলা হয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী তা মোকাবিলা করে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনও অবস্থাতেই পুলিশের কাছে ধরা দেওয়া যাবে না। এর জন্য সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে নকল মহড়া দিত। যাতে দেখে নেওয়া যায় কে কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই কাজ করতে পারছে। এই কাজে মাহির দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। সেই কারণেই এবিটিতে এই নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের দায়িত্বও দেওয়া হয় তাকে। আর যদি কখনও কেউ গ্রেপ্তার হয়েও যায়, তাহলে জেরায় কিছুই বলা যাবে না বলে সংগঠনের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। ফাঁস করা যাবে না সংগঠনের কোনও গোপন তথ্য। উল্টে তদন্তকারী আধিকারিককেই চাপে ফেলে দিতে হবে। তাদের লড়াই কী নিয়ে, সেই বিষয়টি তুলে ধরতে হবে গোয়েন্দাদের কাছে। প্রয়োজনে নিজেদের আদর্শ তুলে ধরে আধিকারিকদের এমনভাবে বিভ্রান্ত করতে হবে, যাতে মূল বিষয়টি ঘেঁটে দেওয়া যায়। শুধু তাই নয়, এই সংগঠন সম্পর্কে পুলিশের কাছে কী তথ্য রয়েছে, তা জেরা চলাকালীন বুঝে নিতে হবে। তার বাইরে একটি বাড়তি তথ্যও দেওয়া যাবে না।
এই কৌশলকে হাতিয়ার করেই দু’বার বাংলাদেশ পুলিশের নাগালের বাইরে চলে যায় মাহি। সে নিজেই আধিকারিকদের জানিয়েছে, মীরপুর কলেজের এক অধ্যাপককে খুন করতে এবিটি টিম গিয়েছিল। সেই দলে সেও ছিল। কিন্তু অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই মাহি জেনে যায়, পুলিশ এলাকা ঘিরে ফেলেছে। এরপর কলেজের পিছন দিক দিয়ে সে পালিয়ে যায়। বাংলাদেশ পুলিশ টিম বুঝেই উঠতে পারেনি, ওই রাস্তা দিয়ে সে পালাতে পারে। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে একটি বিয়ে বাড়িতে। বাংলাদেশে তার এক আত্মীয়ের বিয়ে ছিল। পাত্র ছিল এবিটিরই সদস্য সাহাদ। পাত্রের জন্য সে অপেক্ষা করছিল বিয়েবাড়িতে। বিয়ে করতে আসার সময় মাঝপথেই বাংলাদেশ পুলিশ সাহাদকে গ্রেপ্তার করে। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করতে রওনা হয়। এই খবর পৌঁছে যায় মাহির কাছে। বিয়েবাড়িতে পুলিশ পৌঁছানোর কয়েক সেকেন্ড আগেই সে বেরিয়ে যায়। আর তৃতীয়বার সে কলকাতা পুলিশকে ধোঁকা দিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এসটিএফের কছে খবর ছিল দুই এবিটি জঙ্গি রয়েছে কলকাতা স্টেশনে। সেইমতো আধিকারিকরা সেখানে নজরদারি চালাচ্ছিলেন। এই সময়ই তনবীর ও রিয়াজ ধরে পড়ে যায়। কিন্তু পুলিশ যে কলকাতা স্টেশনে এসেছে, তা কোনওভাবে জেনে গিয়েছিল মাহি। পুলিশ যাতে ধরতে না পারে সেজন্য সে একটি কচুরির দোকানে কচুরি খেতে চলে যায়। এসটিএফের অফিসাররা ভেবেছিলেন দু’জন এসেছে। তাই তাদের নিয়েই চলে আসেন। এর কিছুক্ষণ পর ফের মাহি ওই স্টেশনে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, পুলিশ চলে গিয়েছে। তারপরই সে রওনা হয়ে যায় হাওড়ায়।

Advertisements

জিন্নার স্বপ্ন ‘বৃহত্তর বাংলা’ তৈরি করার চক্রান্ত করছিল আনসারুল্লা বাংলা টিম

জেএমবি’র কায়দাতেই বৃহত্তর বাংলা গঠনের ছক কষেছিল বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লা বাংলা টিম (এবিটি)। সেই লক্ষ্যেই তারা বিভিন্ন জায়গায় ধীরে ধীরে ষড়যন্ত্রের জাল ছড়িয়ে ছিল। মূলত বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও মায়ানমারকে নিয়েই তারা এই ঘুঁটি সাজিয়েছিল। ধৃত এবিটি জঙ্গিদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ম্যাপ ও অন্যান্য কাগজপত্র ঘেঁটে এমন তথ্যই হাতে পেয়েছেন গোয়েন্দারা। এ রাজ্যের কোন কোন এলাকাকে বৃহত্তর বাংলার অন্তর্ভুক্ত করা হবে, সেই নকশাও তৈরি করে ফেলেছিল জঙ্গিরা। আসলে কোমর ভেঙে যাওয়া জেএমবি’র অসম্পূর্ণ কর্মসূচিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল তারা। তাই অস্ত্র জোগাড় ও বিস্ফোরক তৈরি করতে শুরু করেছিল তারা। এদিকে, ধৃত পাঁচ জঙ্গির বিরুদ্ধে মঙ্গলবার ইউএপিএ ধারা যুক্ত করেছে কলকাতা পুলিশের এসটিএফ। তদন্তকারী সংস্থা এদিন আদালতে তা জানায়। মঙ্গলবার নেপাল সীমান্ত এলাকা থেকে পাকড়াও করা হয় জঙ্গি মাহি ওরফে মহম্মদ আফতাব খানকে। বুধবার তাকে আদালতে তোলা হয়। আদালত তাকে ১৪ দিন পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেয়।

এবিটি’র লক্ষ্য কী ছিল, তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে তদন্তকারী অফিসারদের কাছে। ধৃত জঙ্গি মাহি ওরফে মহম্মদ আফতাব খানের কাছ থেকে এরাজ্যের ম্যাপ সহ বেশ কিছু নথি মিলেছে। যা দেখে বোঝা যাচ্ছে, বড়সড় লক্ষ্য নিয়েই এগচ্ছিল তারা। সেই লক্ষ্যেই মাহি শিলিগুড়ি গিয়েছিল। যাতে উত্তরবঙ্গের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় সংগঠন তৈরি করা যায়। যেহেতু উত্তরবঙ্গ দিয়ে নেপালেও পালিয়ে যাওয়া যায়, তাই ওই এলাকাকে বেছে নিয়েছিল তারা। বাংলাদেশে জেএমবি এখন পুরোপুরি কোণঠাসা। খাগড়াগড় বিস্ফোরণকাণ্ডের পর জানা যায়, বৃহত্তর বাংলা গঠনের জন্য তারা তৎপরতা চালাচ্ছে। সীমান্ত লাগোয়া বিভিন্ন জেলা ছিল টার্গেট। কিন্তু সংগঠন ভেঙে যাওয়ায় তাদের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। সেই দায়িত্বই কাঁধে তুলে নিয়েছিল বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন এবিটি। জেএমবি’র সঙ্গে তাদের বহু পুরনো যোগাযোগ। জেএমবি’র সেই নকশায় সামান্য রদবদল ঘটিয়ে কাজ শুরু করেছিল এবিটি। তাই এবিটি’র একাধিক সদস্যকে ভারতে পাঠানো হয়। ধৃত জঙ্গিদের জেরা করে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশ লাগোয়া সীমান্ত এলাকা নিয়েই বৃহত্তর বাংলা গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছিল তারা। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত মায়ানমারের কিছু অংশকে তারা বৃহত্তর বাংলার নকশায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল। যাতে এই এলাকায় তাদের অবাধ গতিবিধি থাকে। সেই কারণেই রোহিঙ্গাদের দিয়েই স্লিপার সেলের কাজ করানো হচ্ছিল বলে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে খবর। জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশ লাগোয়া দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের সীমান্ত এলাকায় তারা ফ্রি করিডর তৈরি করার কাজে নেমেছিল। তাদের কাছ থেকে এই সমস্ত এলাকার ম্যাপও পাওয়া গিয়েছে। তাতে বেশ কিছু এলাকাকে মার্ক করা হয়েছে।

নেপাল পালতে গিয়ে গ্রেপ্তার আনসারুল্লা বাংলা টিমের জঙ্গি উমর ফারুক

সীমান্ত পার করে নেপাল পালাতে গিয়ে এসটিএফের জালে ধরা পড়ল আনসারুল্লা বাংলা টিমের আরও এক জঙ্গি মাহি ওরফে উমর ফারুক ওরফে মহম্মদ আফতাব খান৷ সংগঠনের বিস্ফোরক উইংয়ের সদস্য মাহির খোঁজ চলছে, ছবি প্রকাশ করে আগেই জানিয়েছিল লালবাজার৷ তার নামে পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল কলকাতা পুলিশ৷ সূত্রের খবর, বাংলাদেশি ওই জঙ্গি বাংলা-নেপাল সীমান্ত দিয়ে পালানোর ছক কষছে, এই মর্মে খবর পেয়ে গতকাল ২৮শে নভেম্বর, মঙ্গলবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ আজ বুধবার তাকে ব্যাঙ্কশাল আদালতে তোলা হবে৷ এই নিয়ে সংগঠনের তিন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করল এসটিএফ৷ এ ছাড়াও এসটিএফের জালে ধরা পড়েছে এক অস্ত্রপাচারকারী ও জঙ্গিদের সীমান্ত পাচারকারী এক দালালও৷

আনসারুল্লা বাংলা টিমকে টাকা যোগাচ্ছে এরাজ্যের মুসলিম ব্যবসায়ীদের একাংশ

আল-কায়েদার শাখা সংগঠন আনসারুল্লা বাংলা টিম (এবিটি)-এর সংগঠনকে টাকা দিয়ে সাহায্য করছে এরাজ্যের কয়েকজন মুসলিম ব্যবসায়ী। ব্যবসার কাজে এদের বাংলাদেশে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। বিভিন্ন সামগ্রীর আড়ালে জঙ্গিদের কাছে টাকা পাঠানো হচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের হাতে তথ্য আসতে শুরু করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এবিটির শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে এসে এখানকার স্লিপার সেলের সদস্যদের হাতে টাকা তুলে দেওয়া হয়েছে বলেও খবর। এই ব্যবসায়ীদের কয়েকজনকে চিহ্নিত করা গিয়েছে। এরা এবিটির প্রতি শুধু সহানুভূতিশীল নন, সংগঠনের বড় নেতাদের সঙ্গে তাঁদের রীতিমতো যোগাযোগ রয়েছে। এই ব্যবসায়ীদের গতিবিধির উপর নজরদারি শুরু করেছেন আধিকারিকরা।

কলকাতা তথা রাজ্যে এবিটির তহবিলের উৎস কী, তা খোঁজার চেষ্টা করছেন তদন্তকারী অফিসাররা। টাকার সাপ্লাই লাইন কেটে দেওয়া গেলে জেহাদি কার্যকলাপ যে অনেকটাই কমিয়ে ফেলা যাবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তাঁরা। এর তথ্য খুঁজতেই ধৃত জঙ্গি তনবীর ও রিয়াজুলকে দীর্ঘ জেরা করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে টাকা তাদের কাছে বিভিন্ন উপায়ে আসছে। এক্ষেত্রে হাওলা ব্যবসায়ীরা যেমন রয়েছে, তেমনি অন্য ব্যবসায়ীরাও তাদের সাহায্য করছে। সাধারণ ব্যবসায়ীদের যে অংশ এবিটিকে সাহায্য করছে বলে অভিযোগ, তাদের বেশিরভাগ ট্রান্সপোর্ট এবং কাপড়ের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এই ব্যবসার সূত্রেই তাঁদের বাংলাদেশে যেতে হয় প্রায়ই। এর বাইরেও গোরু পাচারকারী ও জাল নোট ব্যবসায়ীদেরও সাহায্য পাচ্ছে এবিটি। এই দুই ধরনের ব্যবসায়ীদের টার্গেট করার পিছনে নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা যাচ্ছে, এবিটির সদস্যরা এখান থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, রাসায়নিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামগ্রী পাঠানোর ক্ষেত্রে তাদের পরিচিত পরিবহণ ব্যবসায়ীদের সাহায্য পাচ্ছে। যাতে পুলিশে খবর না পৌঁছয়। অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে লরিতে করে চলে যাচ্ছে এই সব জিনিসও। সীমান্তে চেকিংয়েও তা ধরা পড়ছে না। সূত্রের খবর, এবিটিকে সাহায্য করার জন্য তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল বেশ কিছু ব্যক্তি সীমান্তে সম্প্রতি পরিবহণ ব্যবসা খুলে বসেছে। যাতে তাদের ‘জিনিস’ আনা নেওয়ার ক্ষেত্রে এই জঙ্গি সংগঠনের সুবিধা হয়। কাপড়ের সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে আসছে টাকা। যে টাকা এই ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিরা পৌঁছে দিচ্ছেন জঙ্গিদের ডেরায়। এই কায়দায় গত কয়েকমাসে মোটা টাকা এরাজ্যে এসেছে বলে খবর। শুধু তাই নয়, গোয়েন্দাদের কাছে খবর, এখানে সংগঠন যাতে ভালোভাবে চলে, সেজন্য রাজ্যের বেশ কিছু ব্যবসায়ী তাদের তহবিলে নিয়মিত টাকা দিচ্ছে। ভিন রাজ্যের কয়েকজন ব্যবসায়ীও টাকা জোগাচ্ছে বলে খবর। জঙ্গিদের বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত ও থাকাখাওয়ার খরচ এই ব্যবসায়ীরাই বহন করছেন। তাঁদের পরিচিত কোনও হোটেলে এবিটির সদস্যদের রাখা হচ্ছে। যাতে পরিচয়পত্র থেকে শুরু করে অন্যান্য জিনিস যাচাই করা না হয়। এই ব্যবসায়ীরা এবিটির জন্য বিভিন্ন জায়গায় চাঁদার মাধ্যমে টাকা তুলছেন বলে গোয়েন্দারা জানতে পারছেন। এই ব্যবসায়ীদের নিয়েই এখন কাটাছেঁড়ার কাজ শুরু হয়েছে। কয়েকজনের ভূমিকা রীতিমতো সন্দেহজনক মনে হয়েছে অফিসারদের কাছে। তাদের প্রয়োজনে জেরা করার জন্য ডাকা হতে পারে বলে খবর।

এরাজ্যে আনসারুল্লা বাংলা টিমের অস্ত্র ভান্ডারের খোঁজে গোয়েন্দারা

এ রাজ্যে আনসারুল্লা বাংলা টিমের (এবিটি) আগ্নেয়াস্ত্র ও কার্তুজের মজুত ভাণ্ডারের খোঁজ করছেন এসটিএফের গোয়েন্দারা। বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র যে এখানে মজুত করে রাখা রয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তাঁরা। জঙ্গি যোগে ধৃত মনোতোষের বাড়ি থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও কার্তুজ উদ্ধারের পর সেই সম্ভাবনা আরও দৃঢ় হয়েছে। এগুলি এ রাজ্যের এবিটির হয়ে কাজ করা এক জঙ্গির কাছে যাওয়ার কথা ছিল বলে খবর। তাকে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত করে ফেলেছেন গোয়েন্দারা।

গত শনিবার বসিরহাটে মনোতোষের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র ও কার্তুজ উদ্ধার করেন এসটিএফের অফিসাররা। উদ্ধার হওয়া কার্তুজগুলি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রের। তাঁদের অনুমান, নাইন এম এম পিস্তল ছাড়াও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র মজুত করে রেখেছে এবিটি’র জঙ্গিরা। শুধু মনোতোষই নয়, আরও বেশ কয়েকজন আর্মস ডিলারের নাম অফিসারদের কাছে আসতে শুরু করেছে। এরা এবিটি’র জঙ্গিদের আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ করছে বলে খবর। এরাও বিভিন্নভাবে সংগঠনের জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। তাদের মাধ্যমে জঙ্গিরা পরিচয়পত্রও পাচ্ছে। বিভিন্ন জেলা থেকেই এইসব আগ্নেয়াস্ত্র এবিটি’র জঙ্গিরা কিনছে।

কিন্তু এত বেশি সংখ্যায় আগ্নেয়াস্ত্র কেনার উদ্দেশ্য কী? গোয়েন্দাদের মতে, আসলে বাংলাদেশে এবিটি এখন যথেষ্ট কোণঠাসা। সেদেশের পুলিশের তল্লাশিতে ডেরা ছেড়ে পালিয়েছে একাধিক জঙ্গি। এদের অধিকাংশই ব্লগার খুনে অভিযুক্ত। এবিটি’র জঙ্গিদের একটা বড় অংশ সীমান্ত পেরিয়ে এ দেশে চলে এসেছে। তারা রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এমনকী অন্য রাজ্যেও চলে গিয়েছে। সেখানে ঠিকা শ্রমিক বা রাজমিস্ত্রির কাজ নিয়েছে। আড়ালে চালিয়ে যাচ্ছে জেহাদি কার্যকলাপ। জঙ্গিরা ডেরা থেকে পালানোর সময় যে সমস্ত অস্ত্র ফেলে গিয়েছে, তার বেশিরভাগই বাংলাদেশের পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছে। এ রাজ্যে ঘাঁটি তৈরির পর তাদের আগ্নেয়াস্ত্র ও কার্তুজের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন জেলায় আগ্নেয়াস্ত্রের চোরাকারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে তারা। তাদের থেকে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র কিনেছে তারা। গোয়েন্দাদের দাবি, কয়েক মাসে লক্ষাধিক টাকার আগ্নেয়াস্ত্র কেনা হয়েছে। এবিটি তাদের সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য একাধিক জেলায় প্রশিক্ষণ শিবির খুলেছে। তাদের আগ্নেয়াস্ত্র প্রয়োজন। তাই বেশি মাত্রায় আগ্নেয়াস্ত্র এবং কার্তুজ মজুত করা শুরু করেছে তারা। উন্নত মানের বন্দুক বা রাইফেল ব্লগার খুনে ব্যবহার করা হবে। আরও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য বা নিজেদের কাজে ব্যবহার করা হবে। গোয়েন্দাদের কাছে খবর, উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ মিলিয়ে অন্তত পাঁচ থেকে ছ’টি জায়গায় তারা আগ্নেয়াস্ত্র ও কার্তুজের মজুত ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। এর খোঁজে গত শনিবার রাতে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশিও চালান আধিকারিকরা। মনোতোষের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র এবিটি’র যে সদস্যের কাছে যাওয়ার কথা ছিল, তার নাম হাতে এসেছে গোয়েন্দাদের। ওই জঙ্গিও এখানে লুকিয়ে রয়েছে বলে খবর। তার সঙ্গেই আরও বেশকয়েকজন লুকিয়ে রয়েছে। এরা বাংলাদেশে ব্লগার খুনে অভিযুক্ত। গোয়েন্দা অফিসাররা তাদের ধরতে মরিয়া।

মহিলাদের নিয়ে আলাদা বাহিনী গড়ার জন্যে এরাজ্যে একাধিক বিয়ে করার পরিকল্পনা করেছিল জিহাদিরা

মহিলাদের নিয়ে এ রাজ্যে আলাদা বাহিনী তৈরির চেষ্টা করছিল জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লা বাংলা টিম (এবিটি)। সেই কারণেই এর সদস্যরা একাধিক মহিলাকে বিয়ে করেছে। বাংলাদেশ ছাড়াও এ রাজ্যের মেয়েরা ছিল তাদের অন্যতম টার্গেট। মহিলা মডিউলের কাজকর্ম যাতে বাইরে না আসে, সেজন্য পরিবারের লোকেদের নিয়েই তা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। ধৃত জঙ্গিদের জেরা করে এমনই তথ্য পেয়েছেন এসটিএফের অফিসাররা। পাশাপাশি এ রাজ্যের বেশকয়েকটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা অনুন্নত এলাকায় সাহায্যের নাম করে এবিটি’র হয়ে প্রচার শুরু করেছিল বলে জানা গিয়েছে। ওই সংস্থাগুলির সঙ্গে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের যোগ মিলেছে। প্রচার ছাড়াও এই এনজিওগুলির মাধ্যমে টাকাপয়সা জঙ্গিদের হাতে পৌঁছচ্ছিল বলে খবর।

এসটিএফ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত জঙ্গি তনবীর ও রিয়াজুল জেরায় জানিয়েছে, অন্য জঙ্গি সংগঠনগুলির মতো তাদের মহিলা স্কোয়াড নেই। এরফলে কিছু কিছু জায়গায় অপারেশন চালাতে গিয়ে তাদের সমস্যায় পড়তে হয়েছে। সেই কারণেই সংগঠনের তরফে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এবার মহিলা স্কোয়াড গড়ে তোলা হবে। যাতে সাধারণ মহিলার বেশ ধরে ঢুকে যে কোনও জায়গায় সহজেই হামলা চালানো যায়। সেইমতো তার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল।

বাংলাদেশ থেকে সংগঠনের মাথা মাসুল নির্দেশ পাঠায়, এপার বাংলার বিভিন্ন জায়গায় কমবয়সি মেয়েদের বাছতে হবে নারী বাহিনী তৈরির উদ্দেশ্যে। সেই কারণেই এবিটি’র সদস্যরা একাধিক জায়গায় ডেরা গড়ে তুলবে। প্রতিটি জায়গায় তারা বিভিন্ন নামে থাকবে। আর্থিক দিক থেকে অসচ্ছল মহিলাদেরই বাছা হয় এর জন্য। যাতে এবিটি’র সদস্যরা সহজেই তাদের বিয়ে করতে পারে। পাশাপাশি তাদের বাংলাদেশের স্ত্রীদেরও আনা হয় এখানে। তবে তাদের সম্পূর্ণ আলাদাভাবে রাখা হয়। এরপর মহিলাদের নিয়ে একাধিক স্লিপার সেল তৈরি করা হত। এক দলকে ওপার বাংলায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক তৈরির উদ্দেশ্যে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। অন্য দলকে বিস্ফোরক তৈরি ও আগ্নেয়াস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছিল। এদের মূলত অপারেশনাল স্কোয়াডে নিয়োগ করা হত। এছাড়াও জেহাদি ভাবধারা প্রচারের জন্য আলাদা মহিলা বাহিনী গড়ে তোলা হত। একইসঙ্গে এ রাজ্যের মহিলাদের বিয়ে করে তাদের আধার কার্ড ও ভোটার কার্ড ব্যবহার করাও ছিল এবিটি’র উদ্দেশ্য। যাতে ওই পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সহজে যে কোনও জায়গায় বাড়ি ভাড়া নেওয়া থেকে শুরু করে পাসপোর্ট তৈরি করে ফেলা যায়। জোগাড় করা যায় ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী কোনও স্কোয়াড কাজ শুরু করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে গ্রেনেড তৈরির কারখানা গড়ার পরিকল্পনা ছিল আনসারুল্লা বাংলা টিমের

বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের নিয়ে রাজ্যে সংগঠন বাড়াচ্ছিল আনসরুল্লা বাংলা টিম (এবিটি)। তাদের নিয়েই গ্রেনেড তৈরির কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল ধৃত জঙ্গি সামসেদ মিঞা ওরফে তনবীরের। জেএমবি’র কায়দাতেই যাতে জঙ্গিদের কাছে গ্রেনেড পৌঁছে দেওয়া যায়। এবিটির মূল মাথার নির্দেশে এরাজ্যে ঢোকা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছিল তনবীর ও মনোতোষ। এমনই তথ্য হাতে এসেছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের। একইসঙ্গে কলকাতায় তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল এমন কয়েকজনের খোঁজও মিলেছে বলে জানা গিয়েছে। যারা নানাভাবে সাহায্য করছিল। পাশাপাশি এরাজ্য সহ গোটা দেশে এখনও এবিটি’র ২৫ জন সদস্য লুকিয়ে রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তারা গোপনে সংগঠনের কাজ চালাচ্ছে।
আনসারুল্লার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের যোগসূত্র ক্রমেই প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গারা পালিয়ে এদেশে আসতে শুরু করেছে। এদেরই টার্গেট করেছে এবিটি। তনবীর জানিয়েছে, সেদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়। সংগঠনের নির্দেশমতো কাজ শুরু করার পর তাদের কোথায় রাখা হবে, তার ব্যবস্থা শুরু করে। সেজন্য বসিরহাট, বনগাঁ, দমদম, আগরপাড়া সহ আরও বেশ কিছু এলাকায় বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়। তাদের নিয়ে আসার জন্য এবিটি’র যে সমস্ত সদস্যের নৌকা রয়েছে, সেগুলি নেওয়া হয়। গোয়েন্দাদের কাছে খবর, অন্তত একশোজন রোহিঙ্গাকে তারা বসিরহাট ও বনগাঁ দিয়ে নিয়ে এসেছে। একাধিক নৌকায় করে রোহিঙ্গারা যেহেতু এদেশে এসেছে, তাই সংখ্যাটা আরও বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। তদন্তকারী অফিসাররা জানতে পেরেছেন, তাদের সীমান্ত থেকে নিয়ে আসে মনোতোষ। প্রথম কয়েকদিন তারা তার ডেরাতেই কাটায়। এরপর তনবীর তাদের নিয়ে গিয়ে উত্তর ২৪ পরগনার কয়েকটি গোপন ডেরায় রেখে আসে। যে জায়গাগুলির নাম ইতিমধ্যেই জেনেছেন আধিকারিকরা।
কিন্তু কী কারণে রোহিঙ্গাদের সাহায্য করছিল এবিটি’র সদস্যরা? কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সূত্রে খবর, আসলে অনেক বড় লক্ষ্য নিয়ে এগচ্ছিল বাংলাদেশের এই জঙ্গি সংগঠনটি। অসহায় রোহিঙ্গাদের কাজে লাগানো হত গ্রেনেডের মতো বিস্ফোরক তৈরির কাজে। এজন্য তাদের মগজ ধোলাই শুরু হয়ে যায়। তনবীর তাদের বিস্ফোরক তৈরি শেখানোর দায়িত্ব নেয়। কয়েকটি ব্যাচে ভাগ করে প্রশিক্ষণও শুরু হয়েছিল বলে খবর। আসলে এবিটি চাইছিল, এরাজ্যে গ্রেনেড থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিস্ফোরক তৈরির কারখানা খুলতে। এই কাজের জন্য এমন লোকের প্রয়োজন ছিল, যাদের সহজেই মগজ ধোলাই করা যাবে এবং তাদের লাইফস্টাইল দেখে কারও যেন সন্দেহ না হয়। একইসঙ্গে তাদের ভাষার সঙ্গে মিল রয়েছে এমন ভাষাভাষী মানুষও প্রয়োজন। সেই কারণেই অত্যন্ত কৌশলেই রোহিঙ্গাদের বাছা হয়েছিল। পরিকল্পনা মতো তাদের জন্য বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়। ভাড়া নিতে সাহায্য করে এবিটি’র প্রতি সহানুভূতিশীল কয়েকজন ব্যক্তি। এদের মধ্যে কয়েকজন আবার ব্যবসায়ী। যাদের সঙ্গে তনবীরের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। বাংলাদেশ থেকে এবিটি’র লোকজন এলে সেই বাড়িতেই এসে উঠত। এমনকী গোপন বৈঠকও সেখানে হত। কয়েকটি বাড়ি ভাড়া আবার সংগঠনের প্রতি সহানুভূতিশীল সেই ব্যক্তিদের নামেই নেওয়া হয় বলে জানা যাচ্ছে। ভাড়া বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরক তৈরির জন্য ল্যাব তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছিল তনবীর। ঠিক হয়েছিল, প্রতিটি কারখানায় যাবে সে। মূল নকশা থেকে শুরু করে সমস্ত কিছু দেখিয়ে দেবে। এদেশে আসার পর রোহিঙ্গাদের যাতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কোনও অসুবিধা না হয়, সেজন্য তাদের পরিচয়পত্র থেকে শুরু করে পাসপোর্ট তৈরির কাজ শুরু হয়। এজন্য সহানুভূতিশীল ব্যক্তিদের সাহায্য নেওয়া হচ্ছিল। সম্প্রতি হায়দ্রাবাদ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া আব্দুল খালেক নামে এক ব্যবসায়ী তাদের পাসপোর্ট তৈরিতে সাহায্য করছিল বলে খবর। এই বিষয়েই বৃহস্পতিবার হায়দ্রাবাদ পুলিশের একটি টিম ধৃত তিন জঙ্গিকেই দীর্ঘক্ষণ জেরা করে। রোহিঙ্গা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের নাম জড়িয়ে পড়ায় এনআইএ’ও তাদের জেরা শুরু করেছে।

নিষিদ্ধ ‘আনসার আল ইসলাম’ আসলে ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’-এর আর এক নাম

রাতারাতি নিজেদের দলের নামটাই বদলে ফেলেছিল ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’ (এবিটি)। বাংলাদেশে ২০১৫ সালের মে মাসে ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’ নিষিদ্ধ হওয়ার পর এই জঙ্গিদলের সদস্যরাই ‘আনসার আল ইসলাম’ নামে সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম শুরু করেছিল। নব্য জেমবি জঙ্গি তামিম চৌধুরির নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়লেও সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত জঙ্গি মেজর জিয়ার নেটওয়ার্ক এখনও অক্ষত। তামিম ও জিয়ার নেটওয়ার্ক ভিন্ন হলেও তাদের আদর্শ অভিন্ন। বাংলাদেশে একাধিক ব্লগার হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে জঙ্গি সংগঠন ‘আনসার আল ইসলাম’-কেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় চলতি বছরের ৫ মার্চ।

বাংলাদেশ পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট সূত্রে জানা গিয়েছে, এক সময় ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ ছিল। তারা অনলাইনে প্রচার চালাত। এই ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’ই পরে ‘আনসার আল ইসলাম’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। যারা বাংলা টিমের ব্যানারে কাজ করত, তারা ‘আনসার আল ইসলাম’-এ কাজ করা শুরু করে। অতি গোপনে এরা জঙ্গি কাজকর্ম পরিচালনা করে। বিভিন্ন যোগাযোগ স্থাপন করে এবং নতুন কর্মী রিক্রুট করে। এরপর সদস্যদের প্রশিক্ষণও হয় গোপনে। এরপর কর্মীরা কেউ সামরিক দায়িত্ব নেয়, কেউ যোগাযোগ, কেউ অর্থের জোগান এবং কর্মীদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে। পুরো কাজটাই হয় গোপনে। ফলে শুধুমাত্র নিষিদ্ধ করে এদের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যায়নি। ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেনাবাহিনীতে ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার পরিকল্পনাকারী মেজর জিয়াউল হক এই সংগঠনের অন্যতম চাঁই। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদা নেটওয়ার্কের ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ ‘আনসার আল ইসলাম’ নিজেদেরকে ওই সংগঠনের বাংলাদেশ শাখা হিসেবে দাবি করে।

ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট সূত্র বলছে, ২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে হত্যার পর প্রচারের আলোয় আসে ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’। এরপর একাধিক ব্লগার হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উঠে আসে ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’-এর নাম। এই সংগঠনের শীর্ষপদের নাম সমন্বয়ক। এর তিনটি বিভাগ রয়েছে। তাদের প্রথমটি হল দাওয়া বিভাগ। এই বিভাগে লজিস্টিক ও রিক্রুটমেন্ট দেখা হয়। দ্বিতীয়টি হল আসকারি বিভাগ। সেখানে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তৃতীয়টি হল গণমাধ্যম শাখা। এটি আইটি এক্সপার্টরা পরিচালনা করে থাকে। সমন্বয়কের কাজ এই তিনটি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় করা। এছাড়া ‘অপারেশনের’ জন্য আরও দুটি বিভাগ রয়েছে। এগুলি হল মাশুল এবং মামুর। কোনও অপারেশন পরিকল্পনা ও পরিচালনার কাজটি দেখে মাশুল বিভাগ। আর অপারেশনে যারা অংশগ্রহণ করে সেই সদস্যরা মামুর বিভাগের অধীনে থাকে। কোনও টার্গেটের ওপর হামলা চালানোর আগে এই সংগঠনের নেতা-কর্মীরা নতুন একটি ‘সেফ হাউসে’ ওঠে। জঙ্গিদের ভাষায় এই বাড়িটিকে ‘মার্কাজ’ বলা হয়ে থাকে। মাসুলের দায়িত্বে থাকা জঙ্গিরা এই মার্কাজ ভাড়া নেওয়া থেকে শুরু করে অপারেশনের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে নিও জেএমবির একাধিক হামলার ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তোড়জোড় শুরু হলে কিছুটা চুপসে যায় ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’ ওরফে ‘আনসার আল ইসলাম’। তবে ভিতরে ভিতরে তারা হামলার জন্য সংগঠিত হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু মেজর জিয়া কোথায়? ‘আনসার আল ইসলাম’-এর নেতৃত্বে মেজর জিয়া সরাসরি অন্তত ৯টি টার্গেট কিলিংয়ের সঙ্গে জড়িত বলে ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের দাবি। এছাড়াও অন্তত ৩০টি টার্গেট কিলিং তার পরিকল্পনায় হয়েছে। ২০১৩-১৫ সালের মধ্যে পাঁচজন ব্লগার, একজন প্রকাশক ও সমকামীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা দু’জনকে হত্যা করেছে ‘এবিটি’। এসব ঘটনার তদন্ত শেষে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উঠে এসেছে মেজর জিয়ার নাম। জিয়াউল হক জিয়াকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ২০ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু মেজর জিয়াকে নিয়ে রহস্য বেড়েই চলেছে।

বাংলাদেশের মতো পশ্চিমবঙ্গেও ব্লগার খুনের পরিকল্পনা ছিল ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’-এর

বাংলাদেশের কায়দাতেই দেশের কয়েকজন ব্লগারকে খুনের পরিকল্পনা করেছিল কলকাতা থেকে ধৃত ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’-এর সদস্য (এবিটি) সামসেদ মিঞা ওরফে তনবীর। তাদের হিট লিস্টে রয়েছেন এরাজ্যেরও কয়েকজন ব্লগ লিখিয়ে। যাঁদের গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখা শুরু করেছিল এই জঙ্গি। তাঁরা কারা, এ সম্পর্কে কিছু তথ্য হাতে পেয়েছেন গোয়েন্দারা। তাঁরা জেনেছেন, এই লক্ষ্যেই আগ্নেয়াস্ত্র কেনা শুরু করেছিল সে। ব্লগারদের ‘টার্গেট’ করা ছাড়াও কলকাতায় জঙ্গি ডেরা বানানোর জন্যও গোপনে কাজ শুরু করেছিল তনবীর। কলকাতায় পাকাপাকিভাবে ঘাঁটি গড়ার জন্য বাংলাদেশের আনসারুল্লা বাংলা টিমের মূল মাথা জিয়ার কাছ থেকে নির্দেশ পেয়েছিল সে।

গোয়েন্দারা জেনেছেন, বাংলাদেশে ২০১১ সালে আধা-সেনা বিদ্রোহের মাথা মেজর জিয়াই তনবীরের দীক্ষাগুরু। এই মেজরই ‘এবিটি’ এবং ‘আনসারুল ইসলাম’-এর মাথায় বসে রয়েছে। সীমান্তের ওপারে থাকার সময় তনবীরের মগজ ধোলাই করে তারই কলেজের এক সিনিয়র। সে আবার ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’-এর সদস্য। তার কথাতেই জেহাদি ভাবধারায় উদ্বুব্ধ হয় তনবীর। এরপর ওই সিনিয়র দাদাই তাকে জিয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। মেজর তাকে জেহাদি শিক্ষার পাঠ থেকে শুরু করে বিস্ফোরক তৈরি করা শেখায়। প্রশিক্ষণপর্ব শেষে জঙ্গি সংগঠন ‘এবিটি’-এর হয়ে কাজ শুরু করে সে। বাংলাদেশে ব্লগার হত্যার ঘটনায় নাম জড়ানোর পর এদেশে পালিয়ে আসে তনবীর।

জিজ্ঞাসাবাদের সময় ধৃত জানিয়েছে, এক দালাল মারফত সে সীমান্ত পেরিয়ে এদেশে ঢোকে। ওই দালালই তাকে হায়দ্রাবাদের একটি ফ্যাক্টরিতে কাজের বন্দোবস্ত করে দেয়। কিন্তু ওই কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সে চলে যায় কর্ণাটকের বেলগাঁওতে। সেখানে ভুয়ো আধার কার্ড তৈরি করে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলে। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর ফের ফিরে যায় হায়দ্রাবাদে। পরে পুনে শহরে রাজমিস্ত্রি হিসেবে কাজ শুরু করে। এর আড়ালেই চলে তার জেহাদি কার্যকলাপ। সেখানে থাকাকালীনই তার কাছে নির্দেশ আসে, কলকাতায় সংগঠন বাড়ানোর পাশাপাশি ব্লগারদের চিহ্নিত করতে হবে। বলা হয়, বসিরহাটের বাসিন্দা মনোতোষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তার সঙ্গে বাংলাদেশের ‘এবিটি’-এর একাধিক সদস্যের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। সে নিজেও ওই জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্য। সেইমতো পুনে থেকে রাঁচি হয়ে বসিরহাটে আসে তনবীর ও রিয়াজুল। তার সাহায্য নিয়েই কলকাতায় পাকাপাকিভাবে থেকে সংগঠনের মডিউল তৈরির কাজ শুরু করে তনবীর। এর জন্য ছেলে জোগাড় করে জেহাদি প্রশিক্ষণও শুরু করে সে। পাশাপাশি এরাজ্যের কোন কোন ব্লগার বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল, সেই তথ্য জোগাড় করে ফেলে সে। কী কায়দায় তাঁদের খুন করা হবে, তার প্রস্তুতিও সেরে ফেলা হয়েছিল।

গোয়েন্দারা জেনেছেন, তনবীরকে টাকার জোগান দিয়েছে জিয়াই। বস্ত্র ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে হাওলা মারফত টাকা আসত তার কাছে। এমন কয়েকজন ব্যবসায়ীকে চিহ্নিতও করা গিয়েছে। সেই টাকা জমা পড়েছিল তনবীরের অ্যাকাউন্টে। এখনও পর্যন্ত তার চারটি অ্যাকাউন্টের হদিশ পাওয়া গিয়েছে। যেখানে বড় অঙ্কের টাকা জমা পড়েছিল। ওই টাকাতেই কেনা হয়েছিল আগ্নেয়াস্ত্র। জানা যাচ্ছে, আগ্নেয়াস্ত্র কেনার পর তারা তা বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। মনোতোষের মাধ্যমে গত ছ’মাসে পাঁচটি আগ্নেয়াস্ত্র পৌঁছেছে আনসারুল্লা বাংলা টিমের হাতে। আর কিছু আগ্নেয়াস্ত্র তনবীর নিজের কাছে রেখেছিল অপারেশনের জন্য।