গো-হত্যা নিয়ে কমিউনিস্টদের ভণ্ডামি

  • দেবাশীষ লাহা 
কম্যুনিস্ট স্বর্গরাজ্য কিউবাতে ১৯৭৯ সাল থেকে গোহত্যা তথা গোমাংস ভক্ষণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। Article ২৮২ এবং ২৪১ এই নিষেধ নথিভুক্ত হয়েছে। Decree no ২৫৫ তে গোহত্যাকে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কেবল মাংস ভক্ষণ নয়,  গরু কেনা বেচা বা লেনদেন পর্যন্ত নিষিদ্ধ। গৃহস্থ কেবল দুধ দোয়াতে পারেন। অন্য কাজে লাগাতে পারেন। আইন ঠিকঠাক মানা হচ্ছে কিনা তা দ্যাখার জন্য নিয়মিত অনুসন্ধান ও গরু গণনা হয়। গোমাংস নিয়ে ধরা পড়লে দশ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। এতে কারও ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত লাগছে কিনা জানা নেই। আর লাগলেও কিছু করার নেই। খাদ্যের স্বাধীনতা,  ধর্ম পালনের স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা ইত্যাদি নিয়ে কোনো আন্দোলনের কথাও শোনা যায় না। বিফ পার্টিও হয় না। দেশটা যে কিউবা। একটিই দল। কম্যুনিস্ট পার্টি। সে-ই ভাগ্যবিধাতা।  আর কোন রাজনৈতিক দল সেখানে নেই। থাকার প্রশ্নই নেই। কারণ সেটা বেআইনি। আর তাই নির্বাচনের ঝামেলাও নেই। পান থেকে চুন খসলে যে ফেসবুকে জানাবেন, প্রতিবাদ করবেন, তারও উপায় নেই। মাসের মধ্যে একদিন ইন্টারনেট পেলে আপনার সৌভাগ্য। নেতা টেতা হলে অবশ্য ভিন্ন কথা।
যাচ্চলে!  এসব কি বলছি!  এ যে মহাপাপ!  চে গুয়েভরা থুড়ি গুয়েভারা, কাস্ত্রোর দেশ!  অর্থকরী দৃষ্টিভঙ্গিতে গোহত্যা নিষিদ্ধ হতেই পারে, সে মহান ব্যাপার। কিন্তু বৃহৎ ভাবাবেগে আঘাত লাগবে বলে গোহত্যা বন্ধ?  নৈব চ নৈব চ! শুধু কি তাই?  যে কোন সভ্য দেশে প্রাণিহত্যার ক্ষেত্রেও বিবিধ বিধিনিষেধ আছে৷ যেমন stunned করে হত্যা, ধর্মীয় হত্যার আগে অনুমতি নেওয়া,  ভেটেনারি সার্জনের বাধ্যতামূলক উপস্থিতি ইত্যাদি ইত্যাদি। ও হরি তবে তো আবার হালাল হবেনা! ভাবাবেগে আঘাত লাগবে।   আর তাই দমদম এয়ারপোর্টে একটি বেআইনি মসজিদটি নিছক ভাবাবেগের কারণেই ভাঙা তো দূরের কথা, বাবা বাছা করে অন্যত্র সরানো পর্যন্ত যাচ্ছে না। হাজার হাজার কোটি টাকা অনুমোদিত হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু নতুন রানওয়ে তথা বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কাজটি আটকে আছে।
কী বললেন?  আপনি আধুনিক ভারত নির্মাণের পক্ষে?  তাই ধর্ম নির্ভর খাদ্যাখাদ্য বিচার, কুসংস্কার ইত্যাদি থেকে বেরিয়ে আসতে চান?  খাদ্য স্বাধীনতার পূজারি?  বাহ বেশ!  তা কমরেড কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষকেই “সভ্য, আধুনিক” বানানোর টেণ্ডার নিলে যে আপনার জেণ্ডার চেঞ্জ হয়ে যাওয়ার আশংকা আছে।  নিউজিল্যান্ডের হামলাটি কেন হল বলুন তো?  আধুনিক আইন কানুন সবার জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে মাথায় তুলে রাখলে পালটা প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য। তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম আপনি প্রকৃতই ধর্মনিরপেক্ষ।  আধুনিক জীবন যাপনে বিশ্বাস রাখেন। কথায় কথায় প্রথম বিশ্বের উদাহরণ দেন। কটি ইউরোপীয় রাষ্ট্রে প্রকাশ্যে হিজাব পরা, কোরবানির অনুশীলন নিষিদ্ধ হয়েছে জানেন?  কোন দেশে কটি মসজিদ, কেন, কোন পরিপ্রেক্ষিতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে খবর রাখেন?  মসজিদ, মাদ্রাসায় যাতে বিদেশী টাকা না ঢুকতে পারে সেই উদ্দেশ্যে কোন কোন দেশ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে জানেন কি?  হা হা হা!  আপনি যদি ধর্মনিরপেক্ষ হন, তবে ছাগলও মঙ্গলগ্রহের জীব।   ধর্মের অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে ভেবে আপনি অভিন্ন দেওয়ানি বিধির  প্রস্তাবে হেঁচকি তোলেন, রাস্তা আটকে নামাজ পড়লে সম্প্রীতি আওড়ান, “সুশিক্ষিততম” রাজ্যটিতেও বাল বিবাহের অনুশীলনে কাঁড়ি কাঁড়ি ছানা প্রসব হলে মুখে কুলুপ আঁটেন!  কেরালা মুর্শিদাবাদ, কোলন, বার্মিংহামে যে কোনো ফারাক নেই বেমালুম চেপে যান!  আর সেই আপনিই গোরু খাওয়ার স্বাধীনতা আছে বলে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তোলেন!  হে মহান বামাবতার!  কেবল সংখ্যালঘুদিগেরই কি ধর্মীয় অনুভূতি আছে?  সংখ্যাগুরুরা গরু পূজা করিয়া থাকে বলিয়াই কেবল পুচ্ছ নাচাইয়া সম্মতি জ্ঞাপন করিবে?  ভরতের জন্মভূমিটি অদ্যপি কিউবা হইয়া ওঠে নাই, সুদূর ভবিষ্যতেও তাহা সম্ভব হইবে না, ইহা নরওয়ে সুইডেনও নহে।।এদেশের সিংহভাগ মানুষ অদ্যপি হিন্দু। ভাবাবেগ তথা ধর্মীয় অনুভূতি কেবল মুসলমানের সম্পত্তি নহে, হিন্দুদিগেরও তাহাতে সমান অধিকার। কবে কোন দেবতা গরু/ ষণ্ড ভক্ষণ করিয়াছিল তাহার “শাস্ত্র নির্ভর” ব্যাখ্যা প্রদান করিয়া এই হিন্দু ভাবাবেগকে দূরীভূত করা যাইবেনা। যেরূপ, দাড়ি, বোরখা, হিজাব, আকিদা ইত্যাদি লইয়াও ইসলামিক শাস্ত্রে অজস্র পরস্পর বিরোধী ব্যাখ্যা এবং বিশ্বাস বিদ্যমান।  শিয়া সুন্নী আহমেদিয়ার বিভেদ এবং বিভাজন এখন দিবালাকের ন্যায় পরিস্ফুট।  আপনি আমি কতটা মুক্তমনা, গোরু ভক্ষণ করি কি করিনা, তাহা অপেক্ষা অনেক বড় প্রশ্ন এদেশের সিংহভাগ মানুষ কোন ইচ্ছাটি পোষণ করেন। সংখ্যালঘুর ধার্মিক অনুভূতিকে সম্মান জানাইলে সংখ্যাগুরুর আবেগটিকেও শিরোধার্য করিতে হইবে। ইহাই বিজ্ঞান, ইহাই গণতন্ত্র।  খাদ্যনীতি অর্থনীতির দোহাই দিয়া যতই ইহার অন্যথা ঘটিবে গরুটি ততই লেজের ব্যবহার কমাইয়া শিং নির্ভর হইয়া পড়িবে।  তাহারই সূত্রপাত হইয়াছে।  প্রকৃতিদেবী কেন তাহাকে এক জোড়া শিং প্রদান করিয়াছে,নিরীহ চতুষ্পদটি উপলব্ধি করিয়াছে।  অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসেবেই এই গোঁতানোর কার্যক্রম।  অতএব হে বামাবতার, পশ্চাৎ দেশটি সামলাইয়া রাখুন।
Advertisements

বলিউডের ইসলামীকরণ

  • – অমিত মালী 

 

ভারতবর্ষের হিন্দি সিনেমা বলিউড নামে পরিচিত, যা এতদিন ভারতবর্ষের সাধারণ থেকে ধনী এলিট শ্রেণীর জনগণকে আনন্দ দিয়ে এসেছে। সত্যিই আজকের দিনে বলিউড একটি শক্তিশালী  মাধ্যম। কিন্তু দীর্ঘ বছর ধরে বলিউড ভারতের হিন্দুদের পিছনে যে বাঁশ দিয়ে আসছে  এবং তা আমাদের হিন্দুদের অজান্তে,অনেকের প্রতিভা থাকা সত্বেও হিন্দুদেরকে বঞ্চনা করা হয়েছে, অনেক হিন্দু অভিনেতা ও অভিনেত্রী ও গায়িকা মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে,হিন্দি সিনেমার গানের মধ্য দিয়ে উর্দু ভাষা ও ”আল্লা”  শব্দটিকে ভারতের সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়েছে, সেটাই এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়।

হিন্দি সিনেমার কথা যখনই আলোচনা করা হয়- তা সে খবরের কাগজ বা টিভি চ্যানেল হোক, প্রথম যে কথাটা উঠে আসে ( এটা  মাঝে মাঝে হেডলাইনও হয়) যে বলিউড শাসন করছে তিন খান। তিন খান বলতে শাহরুখ খান, সলমান খান এবং আমির খান। এই তিন খান দীর্ঘ বছরে তাদের সিনেমার মধ্য দিয়ে ভারতের মানুষের মধ্যে মুসলিম ধারা ও তাদের সংস্কৃতি, মুসলিমদের পক্ষে এবং হিন্দুদের বিশাল ক্ষতি করে এসেছে এবং এখনো পুরো মাত্রাতে করছে। এরা  ছাড়াও বলিউডের বেশ কয়েকজন প্রযোজক যারা সিনেমা তৈরিতে টাকা দেয় যেমন মহেশ ভাট( নাম হিন্দুর মতো হলেও একজন মুসলিম), সাজিদ নাদিদওয়ালা প্রভৃতি। এছাড়া সংগীত পরিচালক সেলিম মার্চেন্ট ও তার ভাই সুলেমান মার্চেন্ট, আনিস বাজমি,লাকি আলী,অনু মালিক ও আরো অনেকে।

প্রথমে এই তিন খানের কোথায় আসা যাক। তিন খানের সবাই হলো এক একটা ”লাভ জিহাদি”  এবং এরা  ভারতের লক্ষ্য লক্ষ্য লাভ জিহাদির কাছে একটি প্রেরণা এবং তারা নিঃসন্দেহে এদেরকে অনুসরণ করে।শাহরুখ খান গৌরীকে বিয়ে করে তাকে মুসলমান বানিয়ে দিয়েছে এবং তার ছেলে মেয়ে সকলে মুসলিম হয়েছে। মুখে হাজারবার আমি মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়নি বললেও,আমি বাড়িতে হিন্দুধর্ম মেনে চললেও, গৌরী খান তার তিন ছেলেমেয়ের একজনের নামও হিন্দু নাম দিতে পারেনি। তারপর শাহরুখ খান তার অভিনীত সিনেমার মধ্য দিয়ে মুসলিম চরিত্রগুলিকে বড়ো করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। একটি সিনেমা হলো ”মাই নেম ইজ খান”। সলমন খানও লাভ জিহাদের চেষ্টা চালিয়ে এসেছিলো দীর্ঘদিন থেকে। প্রথমে ঐশ্চর্যা রাই, তারপর সোনাক্ষী সিনহা। কিন্তু কোনোটিই সফল হয়নি। তারপর সলমন খান মুসলিম উম্মাহ-কে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করলো তার ‘সুলতান’ সিনেমায়। তিনি এই সিনেমায় দেখালেন যে এক মুসলিম কুস্তিগীর হরিয়ানা থেকে  বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু বাস্তবে কি দেখা যায় ?  আজও পর্যন্ত হরিয়ানা থেকে একজনও মুসলিম কুস্তিগীর  আসেনি। কারণ সবাই জানে ভারতের মুসলিমরা মাওলানা-মৌলবী বা কাজী হয়, কুস্তিগীর নয়।

তবে একটি ধারণা দীর্ঘদিন ধরে কারওর অজানা নেই যে বলিউডে মুসলমান ডন দাউদ ইব্রাহিম-এর টাকা ঘুরপথে ব্যবহার করা হয়। আর সেই টাকাতে এতবছর বলিউডের ইসলামীকরণ হয়ে চলেছে ; যদিও ED অনেক তদন্ত করে তার কোনো হদিস পায়নি। দাউদের বোন হাসিনা পার্কার-যে দাউদের অনুপস্থিতিতে মাফিয়া রাজত্ব চালিয়ে গিয়েছে, তাঁর নামে সিনেমা বানানো হলো এবং হাসিনা পার্কারকে নির্দোষ হিসেবে দেখানোহলো। বলিউডের প্রযোজকদের মধ্যে ইসলামিক মানসিকতা ও  পাকিস্তানের প্রতি  ভালোবাসা অতিরিক্ত বেশি।বলিউডের প্রথম সারির প্রযোজকদের মধ্যে মহেশ ভাট ও সাজিদ-ওয়াজিদ নাদিদওয়ালা বিখ্যাত মহেশ ভাট নিজে পূজা বেদিকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করেছে। তারপর নিজের ভাগ্নে ইমরান হাশমিকে সিনেমাতে নামিয়েছে। ইমরান হাশমি  কিছুটা জোকার-এর মতো দেখতে। একের পর এক ছবিতে তাকে সুযোগ  দেওয়া হয়েছে মহেশ ভাট -এর প্রযোজনায়।পর পর বেশ কয়কটি ছবি ফ্লপ করলেও পরে আবার সে মহেশ ভাট-এর প্রযোজনাতে সিনেমাতে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছে একসময় ছবি হিট করানোর জন্যে  ছবিগুলিতে অতিরিক্ত সেক্স ঢোকানো হয়। সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো এই যে তার প্রতিটা সিনেমার বিপরীতে হিন্দু নায়িকা। ভাবটা এইরকম যে আমরা আমাদের মেয়েকে ঢেঁকে রাখবো, কিন্তু হিন্দু মেয়েদের  সেক্স-এর অভিনয় করাবো। তাতে সিনেমাগুলি বেশ কিছুদিন চললেও বেশিদিন টেকেনি।কিন্তু হিন্দু অভিনেতা রণবীর সিং-এর একের পর এক সিনেমা ‘ব্যান্ড বাজা বারাত”, ”লেডিস ভার্সাস রিকিবহল”, ”গুণ্ডে”, ”বাজিরাও মাস্তানি”, ”পদ্মাবত” আরো বেশ কয়েকটি সিনেমা সুপারহিট করলেও মহেশ ভাট-এর ব্যানারে সিনেমা করার সুযোগ পাননি। একটা ছবি করার জন্য যে রণবীর সিং-এর মত প্রতিভাবান অভিনেতাকে অপেক্ষা করতে হয় কখন হিন্দু প্রযোজক-পরিচালক রামগোপাল বর্মা বা সঞ্জয় লীলা বনশালীর কাছ থেকে অভিনয়ের ডাক আসবে।তারপরতো মহেশ ভাট এখন তার মেয়ে আলিয়া ভাটকে, 

যার মুখে এখনো বাচ্চা মেয়ের ভাব এখনও কাটেনি, সিনেমাতে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে ব্যাস্ত । পিতার দয়ায় হিন্দু অভিনেত্রী শাসিত বলিউডে সে  দ্রুত উঠে আসছে উপরের দিকে । যদিও ইমরান হাশমিকে ফিরিয়ে আনার একটা চেষ্টা ”আজহার (২০১৬)” সিনেমা দিয়ে করা হয়েছিল। এখানে সেই মুসলিম উম্মাহ-কে তুলে ধরাই  প্রধান উদ্দেশ্য। সিনেমাতে দেখানো হল সংগীতা বিজলানিকে বিয়ে করা, ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা, আজহার উদ্দিন  জাতীয় নায়ক-   এটা ভারতের জনগণকে মনে করিয়ে দেওয়া ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু হাজার চেষ্টা সত্বেও, সিনেমাটা চলেনি একদম। এখানে মহেশ ভাট-এর প্রযোজনাতে হায়দার(২০১৪) সিনেমার কথা না বললেই নয়। এই সিনেমাতে কাশ্মীরের মুসলিমদের ওপর ভারতীয় সেনার অত্যাচার, তার ফলে এক কাশ্মীরি মুসলিম যুবকের পাগল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি দেখানো হলো। পরিষ্কার ভাবে ভারতের সাধারণ  কাছে আমাদের দেশের গর্ব সেনাবাহিনীকে ছোট করে দেখানো হল। এই সিনেমাতে একটি দৃশ্য দেখানো হয়েছিল যা হিন্দু ধর্মের অপমান। এই সিনেমার একটি দৃশ্যে কাশ্মীরের সূর্য মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ  দেখানো হয়েছিল। ওই দৃশ্যে পাগল হায়দার মন্দির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসার সময় বলছে যে ওখানে নাকি শয়তানের বাস, ওখানে আগুন জ্বলছে, ওই শয়তান তার বাবাকে লুকিয়ে রেখেছে। পাগল হলেও কি হবে , মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে একজন জিহাদির মতো।  তারপর মহেশ ভাট ক্রমাগত প্রচার চালিয়ে আসছেন যে কাশ্মীরে ভারতীয় সেনা ওখানকার স্থানীয় মুসলমানের ওপর অত্যাচার করছে, সাধারণ জনগণের মানবধিকার হরণ করছে। কিন্তু একজন সেনাও যে মানুষ এবং তারও যে মানবধিকার আছে সেটা ভুলে গেছেন মৌলবাদী মানসিকতার চাপে। বলিউডের আর এক অভিনেতা হৃত্তিক রোশনের কথা ভাবলে হিন্দুদের বঞ্চনার কথা আমার চোখের সামনে জলের মতো পরিষ্কার হয়। একজন অভিনেতা হওয়ার সব গুন তার মধ্যে থাকা সত্বেও  নতুন ছবি করতে হলে  পিতা  রাকেশ রোশনের প্রযোজনার ওপর নির্ভর করতে হয়। একজন আদর্শ অভিনেতা হবার সব গুন যেমন লম্বা, সুঠাম শরীর, অভিনয়ের দক্ষতা থাকা সত্বেও বলিউডের পাকিস্তান প্রেমী প্রযোজকদের নজর কোনোদিন এর ওপর পড়েনি। ”ধূম ২”  সুপারহিট হলেও কোনো এক অজানা কারণে ”ধুম ৩” থেকে বাদ পড়তে হয়। তার বদলে ধূম ৩ তে আমির  খানকে নেওয়া হলো। পুরো ছবিতে আমির খানকে একবারের জন্যেও নায়ক বলে মনে হয়নি-যেন একজন জোকার। কারণ নায়িকা ক্যাটরিনা কাইফ অনেক লম্বা আমির খানের থেকে, তাই পুরো সিনেমাতে একবারের জন্যেও দুজনের একটিও ক্লোজ সিন্ দেখানো হয়নি। তারপর অনেক অপেক্ষা করার পর তার পিতার  প্রযোজনাতে হৃতিক রোশন ”ক্রিস ২” সিনেমাতে অভিনয় করলেন। সিনেমা হিট করলো, কিন্তু তা সত্বেও পাকিস্তান প্রেমী কোনো প্রযোজকের কাছ থেকে নতুন সিনেমা করার ডাক পেলেন না। এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে শুধুমাত্র হিন্দু  হবার কারণে ঋত্বিক রোশনের প্রতি এই বঞ্চনা। তাছাড়া ঋত্বিক রোশন বলিউডের একমাত্র অভিনেতা যে একজন মুসলিম সুজান খানকে হিন্দু ধর্মমতে বিয়ে করেছে। তাই তাঁর ওপর ক্ষোভ থাকাই স্বাভাবিক। কারণ এই প্রযোজকেরা প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত হিন্দু অভিনেতাকে বাদ দিয়ে সইফ আলী খান-এর মতো ফ্লপ অভিনেতা, আরশাদ ওয়ারসি-এর মতো আনকোরা অভিনেতা, পাকিস্তান-এর অভিনেতা ফাওয়াদ খান, আলী জাফরকে নিয়ে একের পর এক সিনেমাতে অভিনয় করিয়েছেন। পুরো দুই  বছর অপেক্ষা করার পর ২০১৭তে পিতার প্রযোজনাতে ”কাবিল” ছবিতে একজন অন্ধ ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করলেন। কিন্তু ঠিক একই দিনে আর মুসলিম শাহরুখ খানের ”রইস ” মুক্তি পেলো। এই সিনেমাতে শাহরুখ খান একজন মুসলিম ডন-এর ভূমিকায় অভিনয় করলেন, যে ডন অনেক হিন্দু ব্যবসায়ীদের ঠেকে তোলাবাজি করে,হিন্দু ডনকে খুন করে সে তার রাজ্ কায়েম করে। পুরো দেশের মানুষের মধ্যে এই ধারণাকে জোরদার করা হলো যে মুসলিমরা শুধু ডন হয়। শাহরুখ খান এই সিনেমাতে তার জন্যে ভারতে একটাও নায়িকা পেলেন না, পাকিস্তান থেকে মাহিরা খানকে নিয়ে এসে অভিনয় করালেন। এটা একটা চেষ্টা বলিউডের হিন্দু নায়িকাদের প্রাধান্য কমানোর।  সবথেকে যে ব্যাপার তা অবাক করে যে বেশ কয়েকবছর শাহরুখ খান মুসলিম চরিত্রে অভিনয় করছেন। তিনি ”মাই নেম ইজ খান” সিনেমাতে দেখালেন মুসলিমরা কত হেনস্তার শিকার হয়। এর দ্বারা তিনি মুসলিম জনমানসে মুসলিম ‘উম্মাহ’ জাগিয়ে তোলার  কাজ করলেন। অনেক লেখালেখি ও প্রচার সত্বেও এই সিনেমা ফ্লপ করল। কিন্তু ঋত্বিক রোশনের কাবিল সিনেমা কিন্তু সুপারহিট হলো।

লিউডে হিন্দু অভিনেত্রীদের প্রাধান্য  বরাবর। রানী মুখার্জী, মাধুরী দীক্ষিত, কাজল, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, দীপিকা পাডুকোন, ঐশ্চর্য রাই,বিদ্যা বালান , কঙ্গনা রানাউত, অনুষ্কা শর্মা দীর্ঘদিন ধরে রাজ্ করছেন।  কিন্তু এখানেও হিন্দু প্রাধান্য কমানোর চেষ্টা চলছে জোর কদমে। এক্ষেত্রে পাকিস্তান প্রেমী  অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালক নিজেদের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। এদের মধ্যে শাহরুখ খান এক নম্বরে রয়েছেন। তিনি নিয়ে এলেন হুমা  কুরেশি ও মাহিরা খানকে। এই মাহিরা খান যিনি ‘রইস’ সিনেমায় অভিনয় করলেন শাহরুখ খানের সঙ্গে।  সাজিদ নাদিদওয়ালা নিয়ে এলেন মওরা হুসেনকে,মহেশ ভাট নিয়ে এলেন বিনা মালিক, নার্গিস ফকরিকে। সলমন খান নিয়ে এলেন ক্যাটরিনা কাইফকে, কারণ জোহর  নিয়ে এলেন শ্রীলংকা থেকে খ্রিস্টান জ্যাকলিন ফার্নার্ন্ডেজকে। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে কোনোরকম মডেলিং ব্যাকগ্রাউন্ড  না থাকা  সত্বেও একের পর এক সিনেমাতে এরা অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে চলেছে। বোঝা  যায় এক্ষেত্রে পরিকল্পিত ভাবে পাকিস্তান থেকে অভিনেত্রিদের এনে হিন্দু প্রাধান্য  কমানোর জোর চেষ্টা চলছে।

বলিউডে হিন্দু গায়কদের প্রাধান্য দীর্ঘদিন। কিন্তু সেখানেও হিন্দুদের বঞ্চনা করা হয়েছে এবং এখনো করা হচ্ছে পাকিস্তান প্রেমী প্রযোজক ও পরিচালকদের  দ্বারা।পাকিস্তান থেকে আতিফ আসলাম, শাফাকাত আমানত আলী, রাহাত ফতে আলী খান, মুস্তাফা জাহিদ, মুহাম্মদ ইরফানদের দিয়ে একের পর এক ছবিতে গান গাওয়ানো হয়েছে।  নামকরা হিন্দু গায়করা যেমন-হিমাচল প্রদেশের মোহিত চৌহান, আসামের জুবিন গর্গ, উত্তর প্রদেশের অংকিত তিওয়ারি -এর মতো গায়কদের বঞ্চনা করা হয়েছে।মোহিত চৌহান ” রকস্টার” ছবিতে গানের জন্যে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন , তাকে আর নতুন করে ডাকা হয়নি। ”মার্ডার ২” সিনেমার গায়ক হরষিত সাক্সেনা, যার গান ‘হাল-এ -দিল’ কয়েক কোটি ডাউনলোড হয়েছিল; এইরকম একজন প্রতিভাবান গায়ক কিন্তু আর গান গাওয়ার সুযোগ পাননি। তার বদলে পাকিস্তান থেকে আসা এই সমস্ত গায়করা একের পর ছবিতে গান গেয়ে চলেছেন।   শুধুমাত্র অরিজিৎ সিং মারাত্বক প্রতিভাবান ও  জনপ্রিয়, তাই তিনি টিকে গিয়েছেন।  কারণ সিনেমা হিট করানোর জন্যে অরিজিৎ সিংকে দরকার।   অন্যদিকে আরমান মালিক, জাভেদ আলি  এরা গান গেয়ে চলেছে।জনপ্রিয় গায়ক শানও অনেকদিন কোন ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ পাননি, যদিও পাকিস্তান থেকে আমদানি করা গায়করা গান গেয়ে চলেছেন একের পর এক ছবিতে। আর এক জনপ্রিয় গায়ক সোনু নিগম, যাকে বাদ পড়তে হয়েছে বলিউডের পাকিস্তান প্রেমের জন্যে। তবে কিছুদিন আগে তিনি বিরক্তিকর মসজিদের আজান নিয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন, তারপরে তিনি আর কোনো ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ পাবেন কিনা, সেটাই সন্দেহ।   সুনিধি চৌহান-এর মতো গায়িকা প্রযোজক আনিস বাজমিকে বিয়ে করলো, যদিও এখন ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে তাদের। কিন্তু ”মুন্নি বদনাম”-এর গায়িকা মমতা শর্মা নিজে বদনাম হয়ে গেলো। সে বিয়ে করলো তার সেক্রেটারি আশরাফ আলীকে আর ধর্মান্তরিত হলো ইসলাম ধর্মে, নতুন নাম হলো আসমা আলী। যদিও এই নতুন নামে সে খুব একটা বিখ্যাত নয়। তারপর বলিউডের গানের ভাষা যথেষ্ট জিহাদি টাইপ। যত দিন যাচ্ছে গানের মধ্যে প্রচুর উর্দু ভাষার ব্যবহার, ‘আল্লাহ’, ‘খুদা’, ‘রব’ ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার মারাত্বক হারে বেড়ে চলছে। এইসব হচ্ছে গীতিকার (গান লেখক ) ইরশাদ কামিল, কুমার, এলাহাবাদের অমিতাভ ভট্টাচার্য, সেলিম -সুলেমান -দের জন্যে। সিনেমার একজন হিন্দু চরিত্র গানের মধ্যে বলছে ”তওবা কেয়ামত হো গায়ি , আল্লাহ মাফ ক্যারো”, ‘মওলা’, ‘ইবাদত’, ইত্যাদি শব্দ। ”ফ্যাশন” সিনেমাতে একটি গান শুরু হচ্ছে ”শুকরান আলা -আলী হামদুলিল্লাহ” দিয়ে -যার দায়িত্বে ছিলেন সঙ্গীত  পরিচালক সেলিম -সুলেমান। ”রেস” সিনেমাতে হিন্দু চরিত্রের মুখে গান শুরু হচ্ছে ”আল্লাহ দুহাই হে”। শাহরুখ খান আর আলিয়া ভাট-এর নতুন ছবি ‘ডিয়ার জিন্দেগী’-তে একটি গানের লাইন হল  ”মেরে মহল্লা মে ঈদ যো  লায়া হে”।  আর এইসব গান কোটি কোটি হিন্দু যুবক-যুবতী শুনছে প্রতিনিয়ত। আর ধীরে এইসব তাদের মনের ভাষা ও মুখের ভাষাতে পরিণত হচ্ছে।  ইসলাম  নামক জিনিসটি তাদের কাছে সহজ ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। এর ভবিষ্যৎ ক্ষতি খুব মারাত্বক।

দীর্ঘ বছর ধরে বলিউড ইসলামী ধর্মান্তকরণের আখড়া হয়ে আছে। বর্তমানেও তার পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। নাসিরুদ্দিন শাহ নিকাহ করল রত্না পাঠক-কে আর জন্ম দিলো এক মুসলমানের, যার নাম ইমরান খান। ইমরান খান আবার নিকাহ করল দিল্লীর অবন্তিকা শেঠকে। নাসিরুদ্দিন-এর ভাগ্নে আমির খান আবার ডাবল সেঞ্চুরির মালিক। প্রথমে নিকাহ করল রিনা দত্তকে ; জন্ম দিলো দুই মুসলমানের- জুনেদ আর ইরা। যেসময় আমির খানের হাতে কাজ ছিল না, ট্রাভেল এজেন্সির মালিক রিনা দত্ত প্রযোজনা করেছিলেন ”লাগান” ছবিটির। এই ছবিটি আমির খানের জায়গা বলিউডে অনেক শক্ত করে তোলে। কিন্তু কোনো মুসলমান যেরকম উপকার মনে রাখে না, উল্টে তার ক্ষতি করে, আমির খানও তার ব্যতিক্রম নয়। ”লাগান”-এর সহপরিচালক কিরণ রাও-এর সঙ্গে প্রেম করলেন এবং কয়েক মাসের মধ্যে রিনা দত্তকে তালাক দিয়ে কিরণ রাওকে নিকাহ করলেন। মুসলমান কিরণ রাও জন্ম দিলেন আর এক মুসলমান আজাদ-এর। শাহরুখ খান নিকাহ করল গৌরিকে আর জন্ম দিল তিনটে মুসলমানের-আরিয়ান, ,সারা আর আবরামের। আর এক অভিনেত্রী অমৃতা  সিংহ , ২৫বছর বয়সে  আর ধৈর্য ধরল না , নিকাহ করল ১৯ বছরের সইফ আলি খানকে। তারপর জন্ম দিল দুটো মুসলমানের -ইব্রাহিম আলী খান আর সারা আলী খানের। তারপর তালাক দিল একদম সাচ্চা মুসলমানের  মত। তারপর তার মন গিয়ে পড়লো করিনা কাপুর-এর। তারপর নিকাহ করলো তাকে -জন্ম দিলো আর একটা মুসলমানের , তৈমুর আলি খানের। ফারহান আখতার নিকাহ করল অধুনাকে ,তারপর তাকে বাদ দিয়ে এখন আবার নতুন শিকার শ্রদ্ধা কাপুর -এর পিছনে। যদিও  শক্তি কাপুর-এর কড়া মনোভাবের জন্যে এ যাত্রায় বেঁচে গেলো একটি হিন্দু মেয়ে।

 বর্তমান ভারতে এক মারাত্বক বিপজ্জনক হাওয়া বইতে শুরু করেছে। তার ফল বলিউডের সিনেমাগুলিতে বিগত কয়েকবছর  ধরে দেখা যাচ্ছে। আমির খানের একটা ভারত বিরোধী মন্তব্য তার অনেক ক্ষতি যেমন সিনেমা ফ্লপ হওয়া, স্ন্যাপডিল-এর ব্র্যান্ড এম্বাসেডর থেকে বাদ পড়া এইসব হয়েছিল।ঠেলায় পড়ে করণ জোহরকে লিখিত দিতে হয়েছে যে তিনি তার সিনেমাতে আর কোনোদিন পাকিস্তানী অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে কাজ করবেন না। কোনো সিনেমাতে পাকিস্তানী বা মুসলিম ভাব থাকলে তা এখন আর ঠিকমতো চলছে না সিনেমা হলগুলিতে বা লোকেরাও দেখতেও চাইছে না। তাছাড়া সিনেমা হল ভাঙচুর করছে হিন্দু জনতা।  তাইতো মুসলিম মুসলিম ভাব ছবি ”রইস” ফ্লপ করলেও ”বাহুবলি ২” মারাত্বক ব্যবসা করেছে। প্রতি সিনেমাতে কম করে একটা গনেশ পুজোর দৃশ্য বা হনুমান পুজোর দৃশ্য রাখা এখন কমন ব্যাপার দাঁড়িয়েছে। একের পর এক হিন্দু অভিনেতা যেমন-রণবীর সিং, বরুন ধাওয়ান, মনোজ  বাজপেয়ী, রাজকুমার রাও, অর্জুন কাপুর, সুশান্ত সিং রাজপূত-দের মতো হিন্দু অভিনেতারা দ্রুত গতিতে উঠে আসছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে একই সঙ্গে সিনেমা মুক্তি পেলেও তিন খানকে এরা ছাপিয়ে যাচ্ছে, এটাই আশার আলো।

অবিভক্ত বাংলার মুসলমান উদ্বাস্তু হয়নি কেন ?রাজর্ষি বন্দোপাধ্যায়

IMG-20190204-WA0004গোদা বাংলায় কিছু সত্য না লিখলে, বাঙালির পক্ষে তা অনুধাবন করা কষ্টসাধ্য হয়। আদতে, বাঙালি একটি নির্লজ্জ্ব, ইতিহাস বিস্মৃত জাতি, মানতে কষ্ট হলেও এটাই সত্য। তাই বারেবারে ইতিহাস ঘেঁটে, তাদের সামনে তুলে ধরতে হয় এই আশায় যে, কোনোদিন হয়তো বাঙালির সম্বিত ফিরবে, সে প্রকৃত ইতিহাসকে মর্যাদা দিয়ে ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নেবে।
গান্ধী বলেছিলো :”আমার মৃতদেহের উপর দিয়ে দেশভাগ হবে”, আর জিন্নাহ বলেছিলো :’আমি পোকায় কাটা পাকিস্তান চাই না।” বস্তুত, অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই দুই কুলাঙ্গারের কোনো অবদানই নেই। একপা এগিয়ে বলতে হয়, অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যে কজন হাতেগোনা মুসলমানের নাম ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া যায়, তাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল ভারতে ব্রিটিশ শাসন হঠিয়ে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা।
ইসলামী জীবন বিধানের পূর্ণাঙ্গ কিতাব কোরানে নির্দেশিত দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা জিন্নাহ ও তার অনুসারী মুসলিম লীগের টাউটরা জেলও খাটনি, দ্বীপান্তরেও যায়নি, গুলি-লাঠিও খায়নি ! স্রেফ হিন্দু নিধনের মাধ্যমে আর ‘ মু মে বিড়ি হাত মে পান. লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ করে একটি মোটামুটি বিশাল রাজত্ব পেয়ে গিয়েছিলো ! (এখন সেটিও দ্বিখণ্ডিত-ইতিহাসের প্রতিশোধ !) । বাঙালি হিন্দুর জীবনে এই স্বাধীনতা এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ! ১৯৪৬ সাল থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দুই বাংলাতেই শুরু হয়েছিল, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববঙ্গে হয়েছিল একতরফা পরিকল্পিত হিন্দু নিধন ও বিতাড়ন । পশ্চিমবাংলার সাম্প্রদায়িক হানাহানি মূলত শুরু হয় বসবাসকারী অবাঙালি মুসলমানদের উস্কানিতে । শুরুটা তারাই করেছিল । পরবর্তীতে, জোরদার প্রতিরোধ ও পাল্টা জিঘাংসায় পশ্চিমবাংলার এই অবাঙালি মুসলমানেরা পূর্ববঙ্গে পালিয়ে যায় । এদের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ২৫-৩০ হাজার । এছাড়াও সাম্প্রদায়িক হানাহানি শুরু হলে পশ্চিমবাংলার সীমান্ত জেলাগুলো থেকেও কিছু সংখ্যক বাঙালি মুসলমান জমি-সম্পত্তি বিনিময়ের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায় । এদের সংখ্যা প্রায় আনুমানিক ৪০ হাজার ছিল । ভারত সরকারের অনুরোধে পরবর্তীতে এদের প্রায় ২০ হাজার ফেরৎ আসে । পশ্চিমবঙ্গ ত্যাগী মুসলমানের সংখ্যা এত কম হওয়ার পেছনে যে কারণগুলো কাজ করেছে, সেগুলো হলো :
১.ভারত সরকারের সার্বিক ধর্ম নিরপেক্ষ কাঠামো ধরে রাখা ।
২.পশ্চিমবাংলার মুসলমানদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা ।
৩. পূর্ব বাংলার সামাজিক পরিস্থিতিতে পশ্চিমবাংলার মুসলমানদের মানিয়ে নিতে না পারা ।
৪. সেই সময়ে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতির অভাব ।
একতরফা সাম্প্রদায়িক বাঙালি হিন্দু নিধনযজ্ঞে, পূর্ববঙ্গে সংখ্যালঘুর টেঁকা দায় হবে, এটাই স্বাভাবিক ছিল, আর হয়েও ছিল তাই । বাংলা ভাগের সময় পূর্ববঙ্গে ১.২০ কোটি সংখ্যালঘু হিন্দু জিম্মি ছিল । পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমান দ্বিজাতিতত্ত্বকে ১০০% আঁকড়ে ধরে এদের যেন তেন প্রকারে নির্মূল করতে, ভূমিহীন করতে, উঠেপড়ে লেগেছিল ! ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববঙ্গ থেকে ৬০-৭০ লক্ষ সংখ্যালঘু হিন্দু বিতাড়িত করা হয়েছে । অগণিত সংখ্যালঘু হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছে, মাত্রাহীন হিন্দু নারী ধর্ষিতা হয়েছে এবং পরিশেষে অগুনতি জীবন বাঁচাতে ধর্মান্তরিত হয়েছে । ১৯৪৭ থেকে প্রথম ১০ বছরে ৪১.১৭ সংখ্যালঘু হিন্দু নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়। সুপরিকল্পিত উপায়ে সংখ্যালঘু হিন্দুকে নিশ্চিহ্ন করতে যা যা করা দরকার সকল প্রক্রিয়া রাষ্ট্রের মদতে  হয়েছে যেমন, লুট,ধর্ষণ,ডাকাতি, মিথ্যে মামলা, চাকরি ক্ষেত্রে অযথা হেনস্থা, বঞ্চনা ইত্যাদি । এমনকি ‘৭১ এ স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পরেও আজও পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলেই আসছে ! বাঙালি হিন্দুই তাই বঙ্গভঙ্গের একতরফা উদ্বাস্তু, আর এর প্রধান কারণগুলো হলো :
১.দ্বিজাতিতত্ত্ব নামক ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগকে পূর্ববঙ্গের মুসলমান ১০০% প্রত্যক্ষ সমর্থন দিয়েছিল।
২.ইসলামী নিয়ম মেনে ভূখণ্ডকে অমুসলিমহীন করা ।
৩.পশ্চিমবাংলার সেকুলাঙ্গারদের না না অছিলায় এই জঘন্য নীতিকে ডিফেন্ড করা ।
৪.পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের বেক্তি স্বার্থের জন্য ঐক্যের অভাব ।
কথাগুলো রূঢ় জানি, আর এও জানি যে, অনেকেই পড়ে মনে মনে গাল দেন। দিন, আপত্তি নেই, তবু যদি আপনা.দের সম্বিৎ ফেরে.

দ্যাশের বাড়ি :- অনির্বান দাশগুপ্ত।

hindu refugeeছোট বেলায় দেখতাম ‘দ্যাশের বাড়ি’ র কথা উঠলেই বাবার মুখটা কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠত। পরিষ্কার বুঝতে পারতাম ঐ মূহুর্তে বাবার চোখের সামনে একে একে ভেসে ওঠছে শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত পুকুর ঘাট, কাঁচা মিঠা আম গাছটা, ধবলী নামের সাদা গরুটা, পাট ক্ষেত, শ্যামগ্রাম খাল, শ্যামগ্রাম স্কুল থেকে কৈশোরের নরসিংদী শাঠিপাড়া স্কুল হয়ে যৌবনের কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ। কিন্তু অনেক খুঁটিয়ে লক্ষ্য করেও বাবার মুখে কোনদিন জন্মভূমি বা দেশত্যাগজনিত রাগ, ক্ষোভ বা এমনকি দুঃখের অভিব্যক্তিও ফুটে উঠতে দেখি নি। এটাই আমার কাছে খুব অবাক লাগত। এভাবে সাত পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে একবস্ত্রে সব ফেলে চলে আসতে হল, শিকড় থেকে উপড়ে ছুঁড়ে ফেলা হল, অথচ কোন ক্ষোভ নেই, অভিযোগ নেই। এখন আর বাবাকে সেভাবে ‘দ্যাশের বাড়ি’ র কথা বলতে শুনি না। যে বাবাকে গর্বভরে ‘দ্যাশের বাড়ি’ র কথা বলতে শুনেছি, যে ‘দ্যাশের বাড়ি’ র কথা উঠলে বাবার চোখ চকচক করে উঠত, নস্টালজিক হয়ে উঠত, সেই গর্বের ‘দ্যাশে’ ফেরার স্বপ্ন কেন দেখে না আমাদের বাবারা? কেন তারা ফেলে আসা ভিটেমাটিতে  যাবার ইচ্ছেপোষণ করে না ?আমার বাবা উদাহরণ মাত্র, পুরো জাতি হিসেবেই হিন্দু বাঙালির মনস্তত্ত্বটাই এরকম অদ্ভুত। সবটাই যেন ভবিতব্য, হাসিমুখে মেনে নিতে হবে, আবারো, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। যেন জন্মলগ্ন থেকেই হিন্দু বাঙালির কপালে লেবেল সেঁটে দেওয়া হয়েছে ‘উদ্বাস্তু’।
আমরা তো জানি না ছেচল্লিশের’ দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং ‘এবং নোয়াখালী কি, চৌষট্টির খুলনা বা একাত্তরের পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গের হিন্দু নিধন যজ্ঞ কি। আমরা তো জানি না কিভাবে বাবার সামনে মেয়েকে, ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণ করে যৌনাঙ্গে বেয়নেট দিয়ে, বল্লম বা তলোয়ার দিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়েছে। আমরা তো জানি না কিভাবে ‘গণিমতের মাল ‘হিসেবে অগণিত নারীকে তুলে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করেছে হায়েনার দল। আমাদের জানা নেই কত বাবা তার আদরের মেয়েকে নিজের হাতে খুন করেছে ঐ নোংরা হাতগুলির অত্যাচার থেকে বাঁচাতে। আমরা জানি না কিভাবে ছোট্ট শিশুদের আছাড় মেরে বা বাড়িতে আগুন লাগিয়ে সেই আগুনে ছুঁড়ে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের জানতে দেওয়া হয় নি। না আমাদের পাঠ্য বইয়ের বিকৃত গেলানো ইতিহাস থেকে জানতে পেরেছি, না আমাদের পারিপার্শ্বিক শিখিয়েছে, না আমাদের আগের প্রজন্ম বলেছে। অথচ আমাদের আগের প্রজন্মের প্রত্যেকটা লোক এই একই বা এর চেয়েও বেশি নিদারুণ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জীবন পার করে এসেছেন।
   মাঝে মাঝে মনে হয়, পারিবারিক ভাবে আমাদের জমিজমা , ধন সম্পদ ফেলে আসা ছাড়া আর তো বিশেষ কোন ক্ষতি হয় নি, আমাদের বংশের কারোর সম্মানহানীও হয় নি।  মোটামুটি ভালোই আছি। তার জন্যই কি স্বভাব স্বার্থপর বাঙালি হিসেবে আমাদের এই নির্লিপ্ততা, উদাসীনতা? কিন্তু ওপারে যাদের হত্যা করা হয়েছিল, ধর্ষন করা হয়েছিল বা ওদেশে এখন যাদের অত্যাচার করা হচ্ছে, এই পারে আসার পর যে সম্পন্ন পরিবারগুলি আজ পথের ভিখারীতে পরিনত হয়েছে, যে সম্ভ্রান্ত ভদ্র ঘরের মেয়েদের ঠাঁই হয়েছে যৌন পল্লীতে, তাঁরা বুঝি আমার কেউ না?
পাঞ্জাবীদের কথাই ধরুন…
আমাদের মত এত ধাপে ধাপে না হলেও ওদেরও তো মোটামুটি সেই একই অভিজ্ঞতা। কিন্তু ওদের সামনে আর উদ্বাস্তু হওয়ার হাতছানি নেই। কারন কি জানেন? এদের ছোট থেকেই সেই ইতিহাসের সংগে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, সে যতোই নৃশংস হোক। গুরুদ্বারে গেলে দেখবেন, সেই নৃশংস ইতিহাস চিত্রকলা বা ভাস্কর্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা আছে। আর আমাদের ধর্মীয় স্থান গুলিতে কি শেখানো হয়? সঠিক ইতিহাস আমাদের জানানো হয় নি বলেই শত্রু মিত্র বোধটাই আজও আমাদের গড়ে উঠল না, শত্রু চিনতে ভুল করেছি আমরা বারবার। এতভাবে অত্যাচারিত হবার পরও অত্যাচারীদের আমরা ভাই বলছি। জানি না, তারা যে আড়ালে ছুরিতে শান দিয়েই যাচ্ছে , সুযোগ এলেই আবার বুকে বসিয়ে দেবে, দিচ্ছেও। মানুষ তো ইতিহাস থেকেই শিক্ষা নেয়, আছাড় খেয়েই মাটি চেনে। আমরা সেই শিক্ষা নিই নি বলেই একবার উদ্বাস্তু হয়ে আসার পর আবার উদ্বাস্তু হওয়াই আমাদের ভবিতব্য।
এবার তাকান  ইহুদীদের দিকে…
আঠারশো বছর ধরে জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে শিকড় হীন কচুরিপানার মত বিচ্ছিন্নভাবে জায়গায় জায়গায় ভাসতে ভাসতে শেষ পর্যন্ত কিন্তু মাতৃভূমি পুনরুদ্ধার করতে পারল। কারণ তাদের মধ্যে ছিল সেই জেদ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম সযত্নে সেই স্বপ্নের বীজ রোপণ করে গেছেন পরবর্তী প্রজন্মতে, মর্মে প্রোথিত করে গেছেন সেই বীজ মন্ত্র – ‘ফিরতে হবে, ফিরতে হবে Next year to Jerusalem -পরের  জেরুজালেমে ফিরে যাবো ‘। দুজন ইহুদীর মধ্যে দেখা হলে প্রথম সম্ভাষণই ছিল’ আবার দেখা হবে জেরুজালেমে ‘। এই জেরুজালেম হল ইসরায়েল এর’ শাশ্বত রাজধানী’, অর্থাৎ যতদিন একজন ইহুদীও জীবিত থাকবে, এই পবিত্র ভূমি থাকবে এদের রাজধানী। আর আমরা,পূর্ববঙ্গ থেকে পালিয়ে আসা বাঙালি হিন্দুরা কি চিরকাল শিকড়হীন কচুরিপানা হয়ে ভাসতেই থাকব, শেকড়ে ফেরা হবে না কোনদিন ?

হালাল না ঝটকা: বিজ্ঞান কি বলে?

মানুষের খাদ্য সরবরাহের জন্য পশুনিধনকে আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করার প্রয়াস সমস্ত পৃথিবীতেই প্রচলিত। এর কারণ মূলত দ্বিবিধ। প্রথমতঃ পশুনিধন প্রক্রিয়াটিকে যতটা সম্ভব মানবিক (humane) দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে করা,  দ্বিতীয়তঃ, পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন এবং দূষণমুক্ত রাখা। যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হল, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র [1, 2], বৃটেন [3] এবং ভারতের [4] মত গণতান্ত্রিক দেশসমেত বহু দেশে এই আইন থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় রীতিসম্মত পশুহত্যা পদ্ধতিকে এই আইনের আওতা থেকে বাদ দেওয়া হয়ে থাকে। ধর্মমতের কারণে পশুহত্যার পদ্ধতিকে মানবিকতার আওতা থেকে বাদ দেওয়া পশুকল্যাণের ভীষণভাবে পরিপন্থী। ষ্টেট অফ গ্লোবাল ইসলামিক ইকোনমী নামক সংস্থার মোতাবেক [5], বিশ্বব্যাপী ‘হালাল’  শংসায়িত  (certified)  সামগ্রীর বাৎসরিক বাজার মূল্য ২.১ লক্ষ কোটি ডলারেরও অধিক। স্পষ্টতঃই পাঠক বুঝতে পারছেন যে হালালের বিস্তৃতি এবং তাদের শক্তি, যার কারণে আইনকেও তাদের দিকে চক্ষু মুদিত করে চলতে হয়। অবশ্য আইনী দুনিয়াতেও এই বিতর্ক চলছে যে চক্ষু মুদ্রিত করে থাকাটা যথোপযুক্ত [6, 7] কিনা।

পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রচলিত ধর্মীয় রীতিসম্মত পশুহত্যার পদ্ধতি অন্যতম হল এই হালাল এবং কোশার (kosher)। দুটিই মূলতঃ একই পদ্ধতি কিন্তু ইহুদীরা বলে কোশার আর মুসলমানেরা বলে হালাল। শিখ এবং হিন্দু, এই দুই ভারতীয় ধর্মমতের অনুসারীরা পরম্পরাগত ভাবে যে পদ্ধতিটি পালন করে তাকে বলে ঝটকা। প্রায় ২০ কোটি মুসলমানের বাসভূমি ভারতে প্রচুর পরিমাণে পশুকে সারা বছর জুড়ে তো বটেই, বিশেষতঃ বকরী-ঈদের সময়, হালাল করে বধ করা হয়। বলা হয় যে কেবল সম্পূর্ণরূপে সুস্থ পশুকেই ধর্মমত মোতাবেক হত্যা করা বিধেয়।

কোশার বা হালালের সময়, একটি ধারালো ছুরিকে প্রাণীটির গলায় (ventral neck) একটি খোঁচাতেই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। তারপর ছুরিটিকে না তুলে বারবার প্রবেশ করানো হয় যাতে শ্বাসনালী, খাদ্যনালী, মস্তকে রক্তসংবহনকারী স্কন্ধদেশের ধমনী (carotid arteries), স্কন্দদেশের শিরা (jugular vein) এবং ভেগাস স্নায়ু খণ্ডিত [8] হয়। এতে শরীর থেকে রক্ত নির্গত হতে থাকে এবং প্রাণীটি পরিণামে প্রাণ হারায়। এই পদ্ধতিকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বলে ventral neck incision (VNI)। এতে মেরুদণ্ডের স্নায়ুতন্ত্র প্রাণীটির মৃত্যু হওয়া পর্যন্ত অক্ষত থাকে।

অপরপক্ষে ঝটকা পদ্ধতিতে হত্যার সময়, ঘাড়ের পিছনের দিকে (dorsal neck) কর্তন করা হয় যাতে মস্তকের খুলিকে মেরুদণ্ডের সুষুম্নাকাণ্ড (spinal cord) থেকে নিমেষে পৃথক করা হয়। কেবল ঘাড়ের কর্তন (cervical dislocation)-ই নয়, বরং এক আঘাতে মস্তকের শরীর থেকে বিখণ্ডিতকরণ এর উদ্দেশ্য। তাই এই পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয় অপেক্ষাকৃত ভারী এবং ধারালো অস্ত্র।

আমরা বর্তমান বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের আলোকে এই দুই পদ্ধতিকে তুলনা করে দেখব, কোন পদ্ধতি বেশি মানবিক এবং পশু কল্যাণের নিরিখে বেশি নীতিসম্মত।

ক) সাধারণভাবে আমাদের শরীরের, আরও সঠিকভাবে বললে সোমাটিক কোষগুলি থেকে কোন অনুভূতি কিছু বিশেষ প্রোটিন (বৈজ্ঞানিক পরিভাষায়, cognate receptor proteins) লাভ করে যারা সেই অনুভূতিকে স্নায়ুর মাধ্যমে প্রেরণ করে। স্নায়ু আসলে কিছু নিউরোণ কোষের সমষ্টি মাত্র। স্নায়ু অনুভূতিকে মেরুদণ্ডের সুষুম্নাকাণ্ডের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রেরণ করে। মস্তিষ্ক এই অনুভূতির প্রতিক্রিয়া হিসাবে আপন বার্তা সেই সুষুম্নাকাণ্ডের নিউরোণের মাধ্যমেই প্রেরণ করে মাংসপেশীগুলিতে (effector muscles)। মাংসপেশীগুলি মস্তিষ্ক প্রেরিত বার্তাকে ক্রিয়াতে রূপ দেয়। হালালের সময় বার্তাপ্রেরণের স্নায়ু নির্দেশিত সুষুম্নাকাণ্ডের মধ্যস্থ এই পথটিকে কোন ভাবেই ব্যাহত করা হয় না। পক্ষান্তরে ঝটকার সময় এই পথটিকে নিমেষের মধ্যে ছিন্ন করা হয়। ফলে ঝটকার সময় বলিপ্রদত্ত প্রাণীটির ব্যথার অনুভূতি সেই মুহূর্তেই হারিয়ে যায়। কিন্তু হালালের সময় এই ব্যথার অনুভূতি হালালপ্রদত্ত প্রাণীটির মস্তিষ্কে নিরবিচ্ছিন্ন প্রাণীটির মরণাবধি পৌঁছতে থাকে।

খ) ব্যথা পরিমাপের এক স্বীকৃত পদ্ধতি হল ইইজি বা ইলেক্ট্রো এনসেফ্যালোগ্রাম। এই যন্ত্রটি মস্তিষ্কের নিউরোণের বৈদ্যুতিক বার্তাকে পরিমাপ করে। গরু বা ভেড়ার মত শান্ত প্রাণীরা তাদের যন্ত্রণার অনুভূতিকে বাইরে সবসময় প্রকাশ করে না। কিন্তু ইইজি পদ্ধতিতে তাদের ব্যথা স্পষ্টতই প্রকাশ পায়। বৈজ্ঞানিকরা দেখিয়েছেন [9] যে ঝটকা পদ্ধতিতে প্রাণীবধ করলে শিরশ্ছেদের ৫ থেকে ১০ সেকেণ্ডের মধ্যেই মস্তিষ্কের (cerebral cortex) কার্য বন্ধ হয়।

ফরাসী পর্যবেক্ষকেরা অন্যদিকে দেখেছেন [10, 11], হালালের সময় অনুসৃত পদ্ধতিতে (VNI) বধ্য প্রাণীটি ৬০ সেকেণ্ড পর্যন্ত তো বটেই, অনেক সময় বহু মিনিটও ব্যথা অনুভব করে। কখনও কখনও কর্তন সফল না হলে প্রাণীটি অবর্ণনীয় যন্ত্রণা [12] অনুভব করে। এর কারণ  সুষুম্নাকাণ্ডের স্নায়ুপথ আর  মস্তিষ্কে রক্তসরবরাহকারী  কশেরুকার ধমনীগুলি (vertebral arteries) হালাল করার সময় অক্ষত [13] থাকে। অপরপক্ষে, ঝটকা পদ্ধতিতে বধের সময় স্নায়ু এবং রক্তপরিবাহী নালীগুলি নিমিষে বিচ্ছিন্ন [11] হয়। ফলে মস্তিষ্কে অক্সিজেন যেতে পারে না এবং শিরশ্ছেদের প্রায় পরমূহূর্তেই প্রাণীটি সংজ্ঞা হারায়।

অষ্ট্রেলিয়ান এবং বৃটিশ গবেষকগোষ্ঠীগুলির গবেষণায় [15–19] প্রমাণিত যে হালালের সময় যে VNI পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয় তাতে প্রাণীটি ভীষণ বেদনায় (noxious stimulation) বিদীর্ণ [14] হয়।

গ) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেশিরভাগ পশু কল্যাণ নিবন্ধনকারী সংস্থা এক ঝটকায় গরু, শূকর এবং অন্যান্য গবাদি পশুকে বধ করতে নির্দেশ [1] দেয়। তারা এর সাথে আরও একটি সহায়ক পদ্ধতিকে  প্রাণীবধের উপযুক্ত মনে করে থাকে। এই দ্বিতীয় ব্যবস্থাতে stunning  (এক দ্রুত যান্ত্রিক বা বৈদ্যুতিক পদ্ধতি যাতে সংজ্ঞা আশু লুপ্ত হয়) নামক পদ্ধতিতে [20] সংজ্ঞালোপের ব্যবস্থা করা হয় এবং তারপর প্রাণীটিকে বধ করা হয়। গবেষণাগারে দেখা গেছে যে শিরশ্ছেদের মাধ্যমে ইউথ্যানাশিয়াতে (নীতিসম্মত প্রাণীবধ) ইঁদুর জাতীয় প্রাণীরা [21] দ্রুত ব্যথাহীন ভাবে সংজ্ঞালুপ্ত হয়ে প্রাণ হারায়। এ ডব্লু এ (Animal Welfare Act) এবং পি এইচ এস (Public Health Service) মনে করে সুষুম্নাকাণ্ডের কর্তন সহ শিরশ্ছেদ এবং সংজ্ঞালুপ্ত করে শিরশ্ছেদ কোন প্রাণীকে বধ করার প্রকৃষ্ট নৈতিক এবং বৈজ্ঞানিক উপায়। একমাত্র গ্যাস [22] দিয়ে সংজ্ঞালোপের পরেই কেবল VNI বা হালালে অনুসৃত পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। গবেষণাগারের প্রাণীদের জন্য সমস্ত পৃথিবীর বিজ্ঞানীকুল এই নিয়মগুলি মেনে চলে।

ঘ) বিভিন্ন গবেষক গোষ্ঠীরা বারংবার প্রমাণ করেছেন যে কোশার বা হালাল পদ্ধতিতে প্রাণীবধের সময় প্রাণীগুলি ভীষণ বেদনা বা স্নায়ুমণ্ডলীর ধকল (stress) অনুভব করে। গরু-ষাঁড়, ছাগল ইত্যাদি প্রাণীর ক্ষেত্রে এর ফলে তিনটি ষ্ট্রেস হরমোন (stress hormones), যথা  কর্টিসোল (cortisol), নর-এড্রিনালিন (nor-adrenaline) এবং ডোপামাইন (dopamine) ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত [23–25] হয়। কারণটি খুবই সরল, এই তিনটি হরমোন সমেত আমাদের বেশির ভাগ হরমোনের নিঃসরণই মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অঞ্চলের  দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আমেরিকান বৈজ্ঞানিক টেম্পল গ্র্যাণ্ডিন দেখিয়েছেন [26–27] যে প্রাণীদের সংজ্ঞাশূন্য করে (stunning) হত্যা না করলে রক্তে কর্টিসোলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং তাতে মাংসপেশীর তাপমাত্রাও বাড়ে। সাধারণত স্নায়বিকধকলের কারণে এড্রিনালিন হরমোনের পরিমিত ক্ষরণে মাংসপেশীর গ্লাইকোজেন ল্যাকটিক অ্যাসিডে পরিণত হয়। ফলে মাংসের পিএইচ কমে (অর্থাৎ  মাংস অম্লভাবাপন্ন হয়)। তার ফলে মাংস যে কেবল গোলাপী এবং নরম থাকে তাই নয়, উপরন্তু মাংসে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি পায় না।

অপরপক্ষে প্রাণীটিকে যন্ত্রণাদায়ক পদ্ধতিতে হত্যা করলে স্নায়ুর ধকল বাড়ে। ফলে এড্রিনালিন হরমোনেরই অতিরিক্ত ক্ষরণে মাংসপেশীর গ্লাইকোজেন শীঘ্রই নিঃশেষিত হয়। ফলে মাংস যথন বিক্রীত হয় ততক্ষণে তাতে কোন আর ল্যাকটিক অ্যাসিড অবশিষ্ট থাকে না। ফলে মাংসের পিএইচ বাড়ে এবং ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার বাড়বাড়ন্ত হয়। মাংস হয় [28] শুষ্ক, গাঢ় এবং শক্ত। এড্রিনালিন ছাড়া বাকী সব ষ্ট্রেস হরমোনগুলি রাসায়নিক ভাবে দেখলে ষ্টেরোয়েড মাত্র। তাই তারা কোষের ঝিল্লিকে ভেদ করে ডিএনএর সঙ্গে জুড়ে কোষের স্থায়ী  পরিবর্তন [29–30] সাধন করে। মৃত প্রাণীর শরীর থেকে রক্ত সরিয়ে দিলেও প্রভাব বজায় থাকে। গবেষকরা ভেড়ার মাংসের ক্ষেত্রে [31] দেখেছেন যে ষ্ট্রেস হরমোনগুলিকে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করালে মাংসের গড়ন এবং স্বাদ বিনষ্ট হয়। আমেরিকার ন্যাশানাল ইনষ্টিটিউট এফ মেণ্টাল হেল্থের গবেষণায় এনাস্থিসিয়া ছাড়াই [32] ইঁদুরের শিরশ্ছেদ (ঝটকা) করলেও রক্তে এই হরমোনগুলোর পরিমাণ সবসময় কমই থেকে যায়। এর কারণ বোধহয় এটাই যে ঝটকার সময় সাধারণ স্নায়বিক ধকলের অনুভূতি অত্যল্প হয়।

ভারতে প্রাণীহত্যার নিষিদ্ধকরণের আইন কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলি ছাড়া সব জায়গাতেই আছে। আইন অনুসারে বধের আগে প্রাণীকে সংজ্ঞাবিহীন করা (stunning) আমাদের দেশের কসাইখানাগুলির অবশ্য পালনীয়  (২০০১ সালের স্লটারহাউস আইনের (slaughterhouse Act) ৬নং ধারা)। কোন প্রাণীকে অন্য কোন প্রাণীর সামনে হত্যা করাও নিষিদ্ধ যাতে প্রাণীদের মধ্যে ষ্ট্রেসের আধিক্য না হয়। ২০১১ সালের Food Safety and Standard Regulations আইনের ৪.১ ধারার ৪(ক) উপধারা মোতাবেকও [33] বধের আগে প্রাণীকে সংজ্ঞাবিহীন করা অবশ্য পালনীয়।

বাস্তব অবশ্য অন্য কথাই বলে। পেটার (PETA  অর্থাৎ People for the Ethical Treatment of Animals)  প্রকাশিত রিপোর্ট অনুসারে  ভারতের কসাইখানাগুলি প্রাণীদের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরতার দায়ে অভিযুক্ত। কসাইখানার কর্মীরা ভোঁতা ছুরি দিয়ে প্রাণীদের হালাল করে রক্তপাতের মাধ্যমে  হত্যা করে। প্রাণীদের চামড়া জীবন্ত অবস্থাতেই [34] ছাড়ানো হয় এবং জীবন্ত অবস্থায় তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও বিচ্ছিন্ন করা হয়।

ওয়েষ্ট বেঙ্গল এলিম্যাল স্লটার এক্ট ১৯৫০ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী প্রাণীহত্যার ক্ষেত্রে যে নিয়মগত শিথিলতা দেয়, তাকে সুপ্রীম কোর্ট বেআইনী বলে ঘোষণা [4, 2] করেছে। ২০১৭ সালে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট রাজ্য সরকারগুলিকে বেআইনী কসাইখানা বন্ধ  করতে আদেশ দিয়েছে। কোর্ট আরও বলেছে পশুদের প্রতি ব্যবহারের উপর নজর রাখতে উপযুক্ত সংস্থা গড়তে হবে যারা মাংস এবং চামড়ার জন্য যেসব প্রাণীহত্যা করা হয়, তাদের উপর নৈতিক আচরণকে নজরে রাখবে। কোর্ট আরও বলেছে [35] যে ভারতীয় সংবিধান ভারতীয় নাগরিকদের প্রাণীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করতে বলে। এর জন্য রাজ্যগুলিকে যত্নশীল হতে হবে।

দুনিয়াব্যাপী ধীরে ধীরে আইন যত্নশীল হচ্ছে যাতে হালাল-কোশার ইত্যাদি ধর্মমত মোতাবেক বধের নামে প্রাণীদের দুর্দশা বর্ধিত না হয়। প্রাণীকে সংজ্ঞাশূন্য না করে হালাল করা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে, যেমন ডেনমার্ক, নেদারল্যাণ্ড, সুইডেন, সুইজারল্যাণ্ড এবং লাক্সেমবার্গে [36, 37] নিষিদ্ধ। ইহুদী এবং মুসলমান ধর্মমতের প্রবক্তাদের বক্তব্য ছিল যে সংজ্ঞাশূন্য করে প্রাণীহত্যা করলে প্রাণীদের মস্তিষ্ক আঘাত প্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ সে আর সুস্থ থাকে না। ফলে সেই প্রাণী আর হালাল বা কোশারের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। এই বক্তব্যকে আজ বহু দেশ খারিজ করে দিচ্ছে। ২০১৫ থেকে হালালের পূর্বে সংজ্ঞাশূন্য করা বৃটেনে চালু হয়েছে যদিও পূর্ণ সাফল্য হয়তো এখনও আসে নি। কিছু আন্তর্জাতিক হালাল শংসাপত্র প্রদানকারী সংস্থা এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে মেনে নিয়েছে। কিন্তু অধিকাংশই তা মানে নি [38] যেমন সংযুক্ত আরব আমীরশাহী, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ইন্দোনেশিয়ার বেশির ভাগ হালাল মাংস আমদানিকারী সংস্থা। তাই দেখা যাচ্ছে আজও ধর্মমতই প্রাণীদের ভাগ্য নির্ধারণ করছে, বৈজ্ঞানিক যুক্তি নয়। যেহেতু এই ধর্মমতে বিশ্বাসীরা লক্ষ কোটি ডলারের ব্যবসা প্রদান করে, তাই পশুদের কল্যাণ অনায়াসেই লঙ্ঘিত হচ্ছে। কিন্তু ধর্মমত বা অর্থনীতি নয়, পশুকল্যাণের ক্ষেত্রে মানবতাবাদ এবং বিজ্ঞানেরই শেষ কথা বলা উচিত।

সৌজন্যে : http://Bangodesh.com

শবরীমালা আন্দোলন নারী অধিকারের জন্য নয়, হিন্দু শক্তিকে ধ্বংস করার জন্য : দেবতনু ভট্টাচার্য

save sabarimalaশবরীমালা মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশের অধিকারের পক্ষে যারা আন্দোলন করছেন, নারীদের সমানাধিকার তাদের লক্ষ্য নয়। হিন্দুর শ্রদ্ধার কেন্দ্রগুলোকে আঘাত করে হিন্দুর আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দেওয়ার পুরনো খেলারই একটা নতুন ইনিংস এই শবরীমালাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে। মহিলারা মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবেন না-এরকম কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম হিন্দু ধর্মে নেই। বরং মন্দিরে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের উপস্থিতিই সর্বত্র বেশি পরিমাণে দেখা যায়। সুতরাং ধর্মাচরণের অধিকারের প্রশ্নে মহিলাদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ কোনোভাবেই ধোপে টেকে না।
আচ্ছা মনে করুন, আজ সকাল সকাল সমস্ত গার্লস স্কুলের সামনে যদি ছেলেরা আন্দোলন শুরু করে, আমাদের প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে, আপনি এটাকে কোন দৃষ্টিতে দেখবেন? একটা গার্লস স্কুলে ছেলেদের প্রবেশের অধিকার না দেওয়ার অর্থ কি ছেলেদের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়া? ছেলেদের জন্য অথবা কো-এডুকেশন অনেক স্কুল আছে ভাই। শিক্ষাগ্রহণের সদিচ্ছা থাকলে সেখানে যাও। কিন্তু কেউ যদি জেদ ধরে বসে থাকে যে, আমাকে এই গার্লস স্কুলেই ঢুকতে দিতে হবে – তাহলে বুঝতে হবে যে শিক্ষাগ্রহণ বাদে তার অন্য কোথাও মতলব লুকিয়ে আছে এই জেদের পিছনে। বিশেষত এই ব্যক্তি যদি ছাত্র কিংবা ছাত্রী, শিক্ষক অথবা অশিক্ষক কর্মচারী অথবা ছাত্রের অভিভাবক – কোনভাবেই শিক্ষাক্ষেত্রের সাথে সম্পর্কিত না হন, শুধুমাত্র পুরুষ বলেই ছাত্রদের অধিকার রক্ষার তাগিদে তিনি গার্লস স্কুলে প্রবেশাধিকার চান, তাহলে তার এই উদ্যোগের পিছনে যে কোনো দূরভিসন্ধি আছে একথা ভাবা কি অযৌক্তিক হবে? মনে করুন বারুইপুর স্টেশনে ট্রেনের পুরুষ যাত্রীদের আন্দোলন চলছে – নারী পুরুষে বিভেদ করা মানছি না মানবো না। মহিলা কামরায় পুরুষদের প্রবেশাধিকার দিতে হবে। কি বলবেন? অনেকে হয়তো বলবেন, এগুলোতো সরকারের তৈরি করা ব্যবস্থা! আচ্ছা, কলকাতারই অনেক গগনচুম্বি বিল্ডিংয়ের মেইন গেটে লেখা থাকতে দেখেছি – সেলসম্যানদের প্রবেশ নিষেধ। কিংবা ভিক্ষুকদের প্রবেশ নিষেধ। সেলসম্যান কিংবা ভিক্ষুকদের আন্দোলন শুরু হলে কি বলবেন? তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হলে আদালতই বা কি রায় দেবে? এই ব্যবস্থা তো নিশ্চই সরকারের তৈরি নয়!
আমাদের দেশে সর্বসাধারণের জন্য আইনের পাশাপাশি মুসলমানদের জন্য মুসলিম পারসোনাল ল আছে. সেখানে মাত্র ১৫ বছর বয়সে একজন মুসলিম বালিকার বিয়ে দেওয়াকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। মহিলাদের অধিকার নিয়ে যারা লড়াই করছেন, তারা এই বিষয়ে সোচ্চার হচ্ছেন না কেন? ১৫ বছর বয়সী মুসলিম নাবালিকাদের অধিকার নেই ১৮ বছর বয়সে সাবালিকা হয়ে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার? এর চাইতে শবরীমালায় প্রবেশাধিকারটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ! পাশাপাশি সুপ্রীম কোর্টের ক্ষমতা আছে সেই ১৫ বছরের সেই মুসলিম নাবালিকাকে ন্যায়বিচার দেওয়ার? ক্ষমতা আছে, সাবালিকা হওয়ার আগে কেউ সেই মেয়েটির বিয়ে দিতে পারবে না –এই রায় দেওয়ার? কিন্তু শবরীমালা মন্দিরে মহিলারা কেন প্রবেশ করতে পারছে না, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট যারপরনায় চিন্তিত! অযোধ্যায় রামমন্দিরের পক্ষে সমস্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও একটার পর একটা ডেট পড়ে চলেছে, এক্ষেত্রে গোটা হিন্দু সমাজের জন্য Justice delayed is justice denied হচ্ছে না? অথচ শবরীমালায় সুপ্রিম কোর্ট অতি সক্রিয়! শবরীমালা মন্দিরে প্রবেশাধিকারের বিষয়টা আয়াপ্পার ভক্তদের সিদ্ধান্ত, পরম্পরাগতভাবে এই নিয়ম পালিত হয়ে এসেছে। আজকে এটা কাস্টমারী ল’য়ে পরিণত হয়েছে। এই আইন যদি পরিবর্তন করতে হয়, তার আবেদন আয়াপ্পার ভক্তদের মধ্য থেকে উঠে আসতে হবে, কোনো রেহানা ফতেমা কিংবা কোনো মেরী সুইটির আবেদনের ভিত্তিতে এই আইনের পুনর্বিবেচনা হতে পারে না।
আশ্চর্যের বিষয়, বোরখা পরে মুসলমান মহিলারা, যাদের বোরখা সরিয়ে খোলা বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার অধিকার তাদের নিজেদের ধর্ম তাদের দেয় না, তারা শবরীমালায় আয়াপ্পাভক্ত মহিলাদের অধিকার রক্ষায় মানব বন্ধন তৈরি করে আন্দোলন করছে। মোটের উপর কেরালায় রাজ্য সরকারের সহায়তায় কম্যুনিষ্ট-খ্রীস্টান-মুসলিম লবি একজোট হয়ে হিন্দু সমাজকে ধ্বংস করার খেলায় মেতে উঠেছে, শবরীমালা যার একটা উপলক্ষ্য মাত্র। এই পরিস্থিতিতে সারা ভারতের হিন্দু শক্তিকে কেরলের হিন্দুর পাশে দাঁড়াতে হবে। হিন্দুরা এই অন্যায় সহ্য করবে না। কেরলের আন্দোলন শুধুমাত্র কেরলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কেরল সরকারের এই হিন্দু বিরোধী ভূমিকা অবিলম্বে বন্ধ না হলে সারা ভারতসহ পশ্চিমবঙ্গেও তার তীব্র প্রতিক্রিয়া হবে। কেরল সরকারের বহু প্রতিষ্ঠান ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কেরল থেকে নিয়ন্ত্রিত বহু চার্চ সারা ভারতে ছড়িয়ে আছে। শবরীমালার প্রতিক্রিয়ায় সেগুলো জনরোষের শিকার হওয়ার সম্ভাবনাকে মোটেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

রোহিঙ্গা মুসলিম ও ভারতের নিরাপত্তা

শ্রী রজত রায়

যে কোন এলাকা যদি প্রাকৃতিক বিপ‍র্যয় বা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে আক্রান্ত হয় বা সেখানকার মানুষ যদি স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রতিবেশী এলাকার বাসিন্দাদের রোষের কারনে এলাকা থেকে উৎখাত হয়, তবে তারা পাশের বা সামান্য  কিছুটা দূর এলাকায় আশ্রয় নেয়। যদি আলিপুরদুয়ারের কোন এলাকায় এই ধরনের ঘটনা ঘটে তবে তারা জলপাইগুড়ি না হলে খুব বেশী হলে মালদায় আশ্রয় নেবার চেষ্টা করবে। কিন্তু যদি তারা হুগলি বা বর্ধমানে চলে আসে তবে ব্যাপারটা একটু অস্বাভাবিক।তবে বুঝতে হবে ওখানে ওদের আশ্রয়দাতা কেউ আছে অথবা অন্য কোন সন্দেহজনক বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত। মায়ানমার বা বার্মা ভারতের উত্তর পূর্ব সীমান্তে। ওদের লাগোয়া ভারতের রাজ্য আসাম।অথচ ওখান থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা মুসলমানরা আসাম,তারপর পশ্চিম বাংলা, তারপর বিহার, তারপর উত্তরপ্রদেশ, এমনকি পাঞ্জাব অতিক্রম করে , পাচটি রাজ্য, ২৩০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে জম্মু কাশ্মীর রাজ্যে গিয়ে কিভাবে উঠলো? ওদের আশ্রয়দাতা কারা? মূল উদ্দেশ্য কি? ভারতে সবচাইতে বেশী রোহিঙ্গা আছে জম্মুতে। রোহিঙ্গাদের মূল শিকড় বর্তমান বাংলাদেশে। কাশ্মীরের সঙ্গে ওদের ভাষাগত , সংস্কৃতিগত,খাদ্যাভ্যাসগত কোন মিল নেই। অথচ ২০১২ থেকে, রাখাইন প্রদেশের বুদ্ধিষ্টদের এবং প্রশাসনের আক্রোশের(যেটা শুরু হয়েছিলো রোহিঙ্গাদের দ্বারা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী এক মহিলার গনধর্ষন এবং হত্যার পর থেকে)কারনে উৎখাত হওয়া রোহিঙ্গারা জম্মু কাশ্মীর রাজ্যে গিয়ে আস্তানা গাড়লো। ওদের মধ্যে অনেকের আধার কার্ড, ভোটার কার্ড হয়ে গেলো। এটা জম্মুর হিন্দুদের উপর ভবিষ্যত আক্রমনের পরিকল্পনার অঙ্গ নয়তো?
            বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ওদের ভারতে আশ্রয় দিতে রাজী নয়।স্বরাষ্ট্র দফতরের মতে ওরা দেশের নিরাপত্তার পক্ষে বিপদজনক।তার বিরুদ্ধে কপিল সিব্বাল, প্রশান্তভূষন, কলিন গঞ্জালভেসদের কোর্টৈ সওয়াল, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিবাদ।মুসলিম নেতা এবং সাংসদ  আসাউদ্দিন ওয়াইশির বক্তব্য,ভারতবাসী যদি তসলিমা নাসরিনকে বোন বলে গ্ৰহন করতে পারে  তবে রোহিঙ্গাদের ভাই বলে কেন গ্ৰহন করবে না? বুঝুন, তুলনার নমুনা এবং ধৃষ্টতা! কয়েকটি মুসলিম সংগঠনের নেতা এবং কিছু রোহিঙ্গা সমর্থক রাজনীতিবিদ ও কয়েকজন মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি ভারতীয় ধারার পরিপন্থী। বসুধৈব কুটুম্বকম্, অতিথিদেবো ভব, আমাদের দেশের সংস্কৃতি। যাক্, যারা ভারতের সংস্কৃতির মধ্যে ভালো কিছুই দেখে না, তারা অন্তত রোহিঙ্গা মুসলিমদের স্বার্থে ভারতীয় ধারার প্রশংসা তো করেছে।অথচ নারকীয় অত্যাচারের মুখে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া হিন্দুদের সময় এই মানবতাবাদীরা কোথায় থাকে?
         রোহিঙ্গা মুসলমানরা কেমন নিরীহ প্রকৃতির তার একটা উদাহরন দেখুন। The Gurdian, Amnesty International News, B B C news এর রিপোর্ট অনুযায়ী গতবছরের ২৬ আগস্ট রোহিঙ্গাদের একটা উগ্ৰপন্থী সংগঠন ARSA(Arakan Rohingya Salvation Army) রাখাইন প্রদেশের উত্তর সীমান্তে Maung daw শহরের লাগোয়া Ab Naik Kha Maung Sei এবং Ye Baik Khan গ্ৰামে হিন্দুদের উপর ছুরি, তরোয়াল, গাইতি, লোহার রড নিয়ে প্রানঘাতি হামলা চালায়। তাদেরকে হিন্দু থেকে মুসলিম  হতে বলে ।যারা স্বীকৃত হয়েছিলো তাদের প্রানভিক্ষা দেওয়া হয়। ইসলাম কবুল করতে অস্বীকৃত হওয়া পরিবারগুলিকে কুপিয়ে পিটিয়ে খুন করা হয়।মোট ৯৯ জন হিন্দুকে নারকীয় বর্বরতায় হত্যা করা হয়।যার মধ্যে ১৪ বছরের কম বয়সের ৮ টি বাচ্চা ছিলো। কয়েক ডজন প্রত্যক্ষদর্শী এবং ইসলাম কবুল করে,  ভাগ্যক্রমে রক্ষা পাওয়া ঐ হতভাগ্য পরিবারগুলির জীবিত সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার পর, এবং চারটি গনকবরের মৃতদেহগুলির ছবির ফরেনসিক প্যাথোলজিস্টদের বিশ্লেষনের পর Amnesty International ঐ হত্যাকান্ডের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনে। একটি ১৮ বছরের মেয়ে সাক্ষ‍্য দেয় যে তার বাবা, কাকা, ভাইকে একসঙ্গে খুন করা হয়েছিলো।এই রোহিঙ্গাদের  আশ্রয় দেবার জন্যে কংগ্ৰেস, আম আদমি পার্টি, তৃনমূল কংগ্ৰেস, বামপন্থীদের কি ব্যাকুলতা! যদি এরা কেন্দ্রে সরকার তৈরী করতে পারে , তবে ভারতবর্ষে উগ্ৰপন্থীদের একটা নতুন ফ্রন্ট খোলার রাস্তা পরিষ্কার হবে।দেশ গোল্লায় যাক। মুসলিম ভোট পক্ষে আসলেই হলো।  ভি পি মেনন বলেছিলেন, No nation can afford to be said generous at the cost of its own integrity. কোন জাতি তার অখন্ডতার বিনিময়ে উদার হতে পারে না। আমাদের দেশের রোহিঙ্গাপ্রেমিরা দেশের নিরাপত্তাকে জলাঞ্জলি দিয়ে উদার, না উদার নয়,ভোটের লোভে উদারতার নাটক মঞ্চস্থ করছেন।  অথচ ১৯৮৯ এর শেষদিক থেকে ১৯৯০ এর প্রথমদিক পর্যন্ত প্রায় ১৫৬০০০ কাশ্মীরি পন্ডিতকে আমানুল্লার নেতৃত্বাধীন জে কে এল এফ(জম্মু কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট)  কাশ্মীর উপত্যকা থেকে উৎখাত করেছে। খুন, ধর্ষন,লুন্ঠনের মাধ্যমে উৎখাত হওয়া ঐ মানুষগুলো আজো নিজভূমে পরবাসী হয়ে ভিখিরির জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলার দরজা খোলা , এই আমন্ত্রন জানানো মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী কোনদিন কি একজন কাশ্মীরি হিন্দু পন্ডিতকে নিজের রাজ্যে থাকার আমন্ত্রন করেছেন? রোহিঙ্গা মুসলমানদের ক্ষেত্রে এত মানবিক মমতা ব্যানার্জী, কপিল সিব্বাল, অরবিন্দ কেজরিওয়ালরা কাশ্মীরি পন্ডিতদের ক্ষেত্রে এত অমানবিক কেন? ওরা মুসলমান আর এরা হিন্দু বলে? এই প্রশ্নই বর্তমানে হিন্দুদের ভাবার সময় এসেছে। (সমাপ্ত)
(বিঃ দ্রঃ- মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। )

রোহিঙ্গা মুসলিম ও ভারতের নিরাপত্তা

শ্রী রজত রায়। 

মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমের বাস ছিলো। এক দশকের মধ্যে প্রায় ৬২৫০০০ সেখান থেকে সীমানা অতিক্রম করে বিভিন্ন দেশে আশ্রয়ের সন্ধানে যাত্রা শুরু করে।বাংলাদেশে তাদের মূল বলে সেখানেই প্রথমে প্রবেশ করে।কিন্তু কিছুদিন পর বাংলাদেশ সরকার ঘোষনা করে যে তারা আর নতুন করে কোন রোহিঙ্গাকে তাদের দেশে আশ্রয় দেবে না। হঠাৎ করে একদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ লক্ষ‍্য করলো যে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান নৌকায় করে সমুদ্রে আশ্রয়ের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের প্রথম লক্ষ‍্য ছিলো থাইল্যান্ড।কিন্তু সেখানকার উপকূলরক্ষী বাহিনী বা নেভি তাদের ঢুকতেই দেয় নি। মুসলমান দেশ তাদের আশ্রয় দেবে এই ধারনায় তারা মালয়েশিয়ায় যায়। সেখানকার সরকার তাদের সীমানাতেই ঢুকতে দেয় নি। এরপর তাদের লক্ষ‍্যস্থল হলো পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া। কিন্তু সেখানকার  উপকূলরক্ষী বাহিনীও তাদের সেই দেশের সীমানা স্পর্শ করার অনুমতি দেয় নি। সমুদ্রে আটকে পড়া কিছু মানুষকে ইন্দোনেশিয়ান জেলেরা উদ্ধার করেছিলো। সেখানকার সরকার জেলেদের সাবধানকরে দেয় যেন আর কোন রোহিঙ্গা মুসলিমকে তারা উদ্ধার না করে।মুসলমান দেশগুলো বিপদগ্ৰস্ত মুসলমানদের আশ্রয় দেয় নি।যারা বলেন যে মুসলমানরা একে অপরকে বিপদের সময় পাশে থাকে, ওদের দারুন একতা,ওদের থেকে একতা শিখতে হয়, তাদের ভ্রান্ত ধারনা দূর করার জন্যে এই উদাহরনই আশা করি যথেষ্ট।কোন মুসলমান দেশ শিশু ,বৃদ্ধ, মহিলাদের পর্যন্ত(সবাই মুসলমান) আশ্রয় দেয় নি। নৌকায় করে  অবিশ্রাম সমুদ্রযাত্রার কারনে ওদের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকরা ‘boat people’ বলে অভিহিত করতো। সবদিকের দরজা বন্ধ দেখে ওরা ভারতকে লক্ষ‍্য হিসেবে বেছে নিলো। পৃথিবীতে ধর্মশালা তো একটাই। বর্তমানে প্রায় ৪০০০০ রোহিঙ্গা মুসলিম ভারতে আছে ।২০১৫ তে ছিলো ১০৫০০ , দুবছরের কিছু বেশী সময়ে সংখ্যা চারগুন বেড়ে গেলো। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা এবং বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন সরকারের উপর প্রবল চাপ শুরু করলো যে এদের ভারত থেকে বিতাড়িত করা চলবে না। কেন্দ্রীয় সরকার এদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এবং জাতীয় নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক বলে ঘোষনা করেছে বলে তারা কেন্দ্রীয় সরকারকে মানবতাবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছে। দুজন রোহিঙ্গা মুসলমান মহম্মদ সলিমুল্লা এবং মহম্মদ শাকিব(কিছু রোহিঙ্গা মুসলমান ২০১২ তে ভারতে এসে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড সব করে নিয়েছিলো। তারা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে কোর্টে মামলা করার অধিকারী হয়ে গিয়েছে।)সুপ্রিম কোর্টে রোহিঙ্গাদের এদেশে থাকতে দেবার দাবীতে মামলা করেছে। ওদের পক্ষে উকিল হিসেবে দাড়িয়েছে  ফলি নরিম্যান, প্রশান্তভূষন, কপিল সিব্বাল,রাজীব ধাওয়ান, অশ্বিনীকুমার,কলিন গঞ্জালভেসের মতো প্রখ্যাত আইনজীবিরা। বুঝুন অবস্থাটা। কোন মুসলমান দেশ যাদের দেশে ঢুকতেই দিলো না সেই রোহিঙ্গা মুসলমানদের ভারতে স্থায়ীভাবে থাকতে দেবার জন্যে কিছু মানুষ এবং কিছু রাজনৈতিক দলের কি প্রাণপন প্রচেষ্টা। দেশের নিরাপত্তা এদের কাছে কোন অর্থই রাখে না। যদি এরা সরকার তৈরী করতে পারে তাহলে রোহিঙ্গা মুসলিমরা এদেশের নাগরিক হবার ঢালাও অধিকার পেয়ে যাবে। আমাদের রাষ্ট্রের সুরক্ষা চ্যালেঞ্জের মুখে এসে দাড়িয়ে পরবে। বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ হিন্দুর চরম নিপীড়নে যারা কোনদিন একবিন্দু চোখের জল ফেলে নি, তারা রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুঃখে কেদে ভাসিয়ে দিচ্ছে। এই মানসিকতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য এই দেশ ৯০০ বছর পরাধীন ছিলো। আবার কিন্তু অশনি সংকেত দেখা দিচ্ছে। সাধু সাবধান !(চলবে)

রোহিঙ্গা মুসলিম ও ভারতের নিরাপত্তা

শ্রী রজত রায় 

 অনেকের মুখে বলতে শুনেছি হিন্দুদের মধ্যে একতার খুব অভাব।একজনের বিপদে আরেকজন পাশে থাকে না। অন্যদিকে মুসলমানরা সবাই এক। একসঙ্গে নমাজ পড়ে।একসঙ্গে খায়। গোটা বিশ্বের মুসলমানরা নিজেদের এক ভাবে। আল্লা হো আকবর বললে সবাই এক সারিতে চলে আসে। একজনের বিপদে আরেকজন ঝাপিয়ে পড়ে।  এগুলি যদি সত্যি হয়, তবে রোহিঙ্গা মুসলমানদের এই দুর্দশা কেন? মায়ানমার সেনাবাহিনী এবং সেখানকার স্থানীয় বৌদ্ধদের সাড়াশি উৎপীড়নে উৎখাত রোহিঙ্গা মুসলমানদের পৃথিবীর কোন মুসলমান দেশ আশ্রয় দিচ্ছে না কেন? ওদের মুসলিম সৌভাতৃত্বের বাণী কোথায় গেলো? একমাত্র বাংলাদেশ, যেটা রাখাইন প্রদেশের(আরাকান, শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে নামটা খুব পাওয়া যায়) উত্তর সীমান্তে ওদের বাসস্থানের একদম লাগোয়া, সেই দেশে ওরা আপনাআপনি ঢুকে পড়েছে। এছাড়া পৃথিবীর বহু মুসলিম দেশে আশ্রয়প্রার্থী হতে চাইলেও কেউ তাদের  আশ্রয় দিতে রাজী নয়।সবাই সীমান্ত থেকেই ওদের বিদায় করে দিচ্ছে। মুসলমান একতার, ভ্রাতৃত্ববোধের আদর্শের চিহ্নমাত্রও তো নেই।
           ২০১৪ এর এমেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর রিপোর্ট  ‘Left Out In The Cold’  অনুযায়ী Gulf Cooperation Council  যার মধ্যে সৌদি আরব, কাতার ,বাহরিন, কুয়েত,সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মতো সব মুসলমান রাষ্ট্র আছে , তারা মুসলমান রাষ্ট্র সিরিয়ার একজন নির্যাতিত মুসলমানকেও আশ্রয় দেয় নি। একতা আর সৌভাতৃত্ব বোধ ভোজবাজীর মতো উধাও হয়ে গেলো কেন?
          এক চিত্র রাখাইন থেকে পালানো মুসলমানদের ক্ষেত্রেও। ১৯৮২ র ‘বার্মিজ সিটিজেনশিপ ল’ অনুযায়ী যদি কারো পূর্বপুরুষ ১৮২৩ সালের পূর্বে ঐ দেশের বাসিন্দা না হয়ে থাকে তবে সে ঐ দেশের নাগরিক বলে গন্য হবে না। তারা Resident Foreigners হিসেবে গন্য হবে।এমনকি তাদের মা বাবার একজন সে দেশের নাগরিক হলেও না। সামরিক শাসন থেকে মুক্তি পেয়ে ২০১৫ সালে দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হবার পরেও সেই সরকার ওদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করে। ২০১২ সালে এক বৌদ্ধমতাবলম্বী মহিলা রোহিঙ্গাদের দ্বারা গনধর্ষিতা এবং খুন হয়।তারপর স্থানীয় বৌদ্ধদের আক্রোশের মুখে ওদের পলায়ন শুরু হয়। এবার ২৫ শে আগস্ট রোহিঙ্গারা মায়ানমার সেনার একটা ক্যাম্প আক্রমন করে এবং সেইসঙ্গে ১২ জনকে হত্যা করে। তারপর থেকে মায়ানমার সেনাবাহিনী ওদের এলাকা তছনছ শুরু করে ।শুরু হয় গনপলায়ন। পৃথিবীতে এতগুলি মুসলিম দেশ আছে। অনেকগুলি পেট্রোলিয়ামের পয়সায় যথেষ্ট ধনী দেশ। সবাই কয়েকহাজার করে আশ্রয় দিলেই রোহিঙ্গা মুসলিমদের পুনর্বাসন হয়ে যায়?কিন্তু কেউ স্বেচ্ছায় ওদের একজনকেও নিতে রাজী হচ্ছে না কেন? ভারতবর্ষের যে রাজনীতিবিদরা রোহিঙ্গাদের আমাদের দেশে আশ্রয় দেবার ওকালতি করছেন, মানবিকতার দোহাই দিচ্ছেন, বলছেন , আমার রাজ্যের দরজা রোহিঙ্গা মুসলিমদের জন্য খোলা, তাদের মনে কি এই প্রশ্নটা আসছে না যে আরব, কাতার, লিবিয়া, বাহরিন এর মতো মুসলিম রাষ্ট্রগুলি কেন ওদের আশ্রয় দিচ্ছে না? ভারতে ওদের আশ্রয় দেবার ওকালতি কোন স্বার্থে? যে মানবিকতার দোহাই দেওয়া হচ্ছে, বাংলাদেশ, পাকিস্থানে হিন্দুর প্রতি নির্মম অত্যাচারের সময় এই মানবিকতা কোথায় থাকে? তখন নীরবতা কেন? রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুঃখে কাতর আর পাকিস্তান, বাংলাদেশের হিন্দুদের দুঃখে উদাসীন , এর নাম কি মানবতা?ধর্মনিরপেক্ষতা?(চলবে )

বড় দেরি করে ফেলছি আমরা।

                                                                      -শ্রী রজত রায়।
      দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ তখন সমাপ্তির পথে। রাশিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান আর পরিবেশ এবং সেইসঙ্গে  লাল ফৌজের দ্বারা  মার্শাল স্ট‍্যালিনের পোড়ামাটির নীতির সফল প্রয়োগ হিটলালের বিখ্যাত Sixth Army-এর  ধ্বংস  নিশ্চিত করল। পাল্টা আক্রমনে লাল ফৌজ জার্মানির একের পর এক ভূখন্ড দখল করে রাজধানীর দিকে আগুয়ান। জাপানের প্রতিরোধ নিঃশেষিত। কিন্তু যে মারনাস্ত্র আমেরিকা তৈরী করেছে তার প্রয়োগ না ক‍রলে  তো মারনক্ষমতা বোঝা যাবে না। ১৯৪৫ এর ৬ আগস্ট আর ৯ আগস্ট  হিরোসিমা আর নাগাসাকিতে ফেলা হল ‘The Little Boy’ আর ‘The Fat Man’ পরমানু বোমা। ধ্বংসস্তুপের শহর হিরোসিমাতে এক আমেরিকান সেনা অফিসার কথা বলছিলেন সাংবাদিকদের সঙ্গে। সব প্রশ্নের খোলামেলা জবাব দিচ্ছিলেন। জেনারেল ম্যাকআর্থার‌। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মিত্রবাহিনীর জয়ের প্রধান স্থপতি। যুদ্ধে পরাজয়ের কারন উল্লেখ করার সময় ঐ জেনারেল সবসময় বলতেন, আমি দুটো মাত্র শব্দে যুদ্ধে পরাজয়ের কারনকে ব্যাখ্যা করতে পারি-  ”I can explain the cause of defeat only in two wards, ” too late” অর্থাৎ  বড় দেরী। বন্ধু বা শত্রূ  চিনতে দেরী, সিদ্ধান্ত নিতে দেরী, বিপদসংকেত অনুধাবন করতে দেরী। যদি বাংলার হিন্দুসমাজ বিপদের অশনি সংকেত বুঝতে দেরী করে তবে অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে পরাজয় অবশ্যম্ভাবি।তার থেকেও বড় কথা, বাঙ্গালী হিন্দু বিপদটা কি সেটা বুঝেও না বোঝার ভান করে এড়িয়ে যায় অথবা বিজ্ঞতার মুখোশের আড়ালে নিজের অজ্ঞতাকে লুকিয়ে রাখে অথবা উটপাখির মত বালিতে মুখ গুজে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে‌।
     কয়েকদিন পূর্বে মধ্য কলকাতার রাজপথ কাপিয়ে একটা মিছিল হয়েছে।উদ্যোক্তা All Bengal Minority Youth Federation. ওই সংগঠনের সাধারন সম্পাদক মহম্মদ কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে টিপু সুলতান মসজিদের সামনে থেকে শুরু হওয়া ঐ মিছিলটা কি এমনি আর পাচটা মিছিলের মতো ছিল? মিছিলটা কি পুলিশের অনুমতি নিয়ে হয়েছিলো? মিছিলের সুর কি তারে বাধা ছিলো? মিছিলের দাবীগুলির মধ্যে কি ভবিষ্যৎ বিপদের ঘন্টাধ্বনির সুস্পস্ট শব্দ শোনা যাচ্ছিলো না?
        দাবী ছিলো ইমাম ভাতা বৃদ্ধি করতে হবে। শুধু এইটুকু হলে একটা কথা ছিলো। কিন্তু মিছিলকারীদের বক্তব্য ছিলো, শারদীয়া উৎসব উদযাপনে অনুদান দিলে আমাদের ইমামভাতাও বৃদ্ধি করতে হবে। কি অকল্পনীয় স্পর্ধা। যদি বাংলাদেশে মুসলমানদের অনুষ্ঠানের  জন্য  সরকারী অনুদানের প্রশ্নে হিন্দুরা তাদেরও অনুষ্ঠানে অনুদান বা পুরোহিতদের অনুদানের দাবীতে মিছিল করতো , তাহলে সেই মিছিলকারীরা অক্ষত অবস্থায় বাড়ী ফিরতে পারতো কি? জানি, অনেকে বলবেন ওটা ইশ্লামিক রাষ্ট্র, আর আমাদেরটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। কিন্তু প্রশ্নটা রাষ্ট্রব্যবস্থার চারিত্রিক কাঠামোকে কেন্দ্র করে নয়। দাবীটার মধ্যে সমাজের বৃহত্তর অংশকে চ্যালেঞ্জ জানাবার প্রতিস্পর্ধার স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ কি যথেষ্ট উদ্বেগছনক নয়? এরপরের দাবী আরো মারাত্মক। মুসলিম পুলিশ কমিশনার চাই এবং পুলিশে মুসলিম সংখ্যাবৃদ্ধি চাই। এটা আমাদের গনতান্ত্রিক পরিকাঠামো এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা। এই দাবীর পিছনে কারন কি? বর্তমান পুলিশি ব্যবস্থায় কলকাতা মহানগরীতে মুসলিমরা কি অসুরক্ষিত?এমন কোনও ঘটনা কেউ কি শুনেছেন? তাহলে এই দাবী কি উদ্দেশ্যে? অন্য সব দপ্তর বাদ দিয়ে পুলিশ বিভাগ কেন? এটা কি কোন অনেক অনেক বড় পরিকল্পনার অঙ্গ? যদি কলকাতা পুলিশে মুসলমান সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার মুসলমান হয় ,তবে কলকাতায় ওরা কোন গোপন পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করবে? ১৯৪৬ এর কোলকাতা দাঙ্গার ইতিহাস কি ওরা মনে মনে লালন পালন করে?
         আশ্চর্যজনকভাবে রাজনৈতিক দলগুলি এ বিষয়ে নীরব। মনে হচ্ছে মৌনব্রত পালন করছে। সুবোধ বিকাশরা গলা জড়াজড়ি করে ক্যামেরার সামনে গোরুর মাংস খেতে পারে, অথচ হাত ধরাধরি করে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারে না। এই ঘটনাকে উপেক্ষা করলে ভয়াবহ ভবিষ্যতকে আমন্ত্রন করা হবে।বিনা অনুমতিতে মিছিল এবং সেই মিছিল থেকে চরম সাম্প্রদায়িক দাবী। পুলিশ উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে সঠিক ধারায় মামলা রুজু করেছে কি ? কোন অদৃশ্য অঙ্গুলিহেলনে পুলিশ কড়া ব্যবস্থা নিতে ভয় পাচ্ছে সে মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। মুসলমান সমাজের অগ্ৰগন্য ব্যক্তিত্বদের প্রকাশ্যে ঘোষনা করা দরকার  ঐ বেআইনী , অসাংবিধানিক দাবীগুলির সঙ্গে আমরা সহমত পোষন করি না।ওগুলি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দাবী। তবে তো সত্যিকারের ভারতীয় নাগরিকত্বের পরিচয় দেওয়া হবে। ঐ দাবীগুলির পিছনে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির মদত নেই তো?নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলা। নিজেরা হাত গুটিয়ে অপরের ভরসায় থাকলে ভগবানও  রক্ষা করবেন না। ঐ জেনারেল ম্যাকআর্থারের  তত্ত্ব অনুযায়ী বড় দেরী হলে বড় পরাজয়।স্বামীজী বলতেন, আহাম্মকের কথা মানুষ শোনে না , তো ভগবান কি শুনবেন। সেই বিপদ বুঝে উঠতে বড্ড দেরি করে ফেলছি আমরা। আর এইভাবে ভবিষ্যত ভারতের কাছে আমরা নিজেদের যেন আহাম্মক বলে প্রমানিত না করি

দোল পূর্ণিমা বা হোলি উৎসব

পুণ্যভূমি ভারতের সভ্যতা খুব প্রাচীন। সেই মতো সংস্কৃতি, আচার-উপাচার এবং উৎসবও খুব প্রাচীন। আমরা ভারতের হিন্দুরাও সেইসব সংস্কারের সঙ্গে পরিচিত প্রাচীন কাল থেকেই। এই সংস্কার এবং উৎসবের আবেগ প্রাচীন কাল থেকে আমাদের রক্তে প্রবহমান। এই উৎসব শুধুমাত্র হিন্দুর একান্ত নিজেদের।  তবে বর্তমান ভারতে  কিছু কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুধুমাত্র সেই সব ধর্মের অনুসারীরাই পালন করে। অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরা দেখতে পারে বা ইচ্ছা করলে সেই অনুষ্ঠানের আনন্দ ভাগ করে নিতে পারে। হোলি উৎসব তার মধ্যে একটি। হোলি উৎসবে সাধারণত রঙ বা আবির(এক ধরনের গুড়ো রং) নিয়ে একে অন্যের গাঁয়ে দিয়ে দেয়া হয়। ব্যপারটা অনেকটা রঙ দিয়ে খেলা আর কি।
স্কন্দপুরাণ গ্রন্থের ফাল্গুনমাহাত্ম্য গ্রন্থাংশে হোলিকা ও প্রহ্লাদের উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে। হোলিকা ছিলেন মহর্ষি কশ্যপ ও তাঁর পত্নী দিতির পুত্র হিরণ্যকশিপুর ভগিনী। ব্রহ্মার বরে হিরণ্যকশিপু দেব ও মানব বিজয়ী হয়ে দেবতাদের অবজ্ঞা করতে শুরু করেন। ভক্ত প্রহ্লাদ অসুর বংশে জন্ম নিয়েও পরম ধার্মিক ছিলেন। তাঁকে যখন বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও হত্যা করা যাচ্ছিল না তখন হিরণ্যকিশপুর বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ হোলিকা এই বর পেয়েছিল যে আগুনে তার কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু অন্যায় কাজে শক্তি প্রয়োগ করায় হোলিকা প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করলে বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ অগ্নিকুণ্ড থেকেও অক্ষত থেকে যায় আর ক্ষমতার অপব্যবহারে হোলিকার বর নষ্ট হয়ে যায় এবং হোলিকা পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যায়, এই থেকেই হোলি কথাটির উৎপত্তি।
অন্যদিক বসন্তের পূর্ণিমার এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেশি নামক অসুরকে বধ করেন। কোথাও কোথাও অরিষ্টাসুর নামক অসুর বধের কথাও আছে। অন্যায়কারী, অত্যাচারী এই অসুরকে বধ করার পর সকলে আনন্দ করে। এই অন্যায় শক্তিকে ধ্বংসের আনন্দ মহাআনন্দে পরিণত হয়। দোলযাত্রা বা হোলি উৎসব সংক্রান্ত পৌরাণিক উপাখ্যান ও লোককথাগুলি মূলত দুই প্রকার: প্রথমটি দোলযাত্রার পূর্বদিন পালিত বহ্ন্যুৎসব হোলিকাদহন বা নেড়াপোড়া সংক্রান্ত, এবং দ্বিতীয়টি রাধা ও কৃষ্ণের দোললীলা বা ফাগুখেলা কেন্দ্রিক কাহিনী
শ্রী রাধা ও অন্যান্য গোপীগণের সঙ্গে দোল খেলছেন শ্রী কৃষ্ণ :-
বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাল্গুনী পূর্ণিমা বা দোলপূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির বা গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীগণের সহিত রং খেলায় মেতেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি হয়। দোলযাত্রার দিন সকালে তাই রাধা ও কৃষ্ণের বিগ্রহ আবির ও গুলালে স্নাত করে দোলায় চড়িয়ে কীর্তনগান সহকারে শোভাযাত্রায় বের করা হয়। এরপর ভক্তেরা আবির ও গুলাল নিয়ে পরস্পর রং খেলেন। দোল উৎসবের অনুষঙ্গে ফাল্গুনী পূর্ণিমাকে দোলপূর্ণিমা বলা হয়। আবার এই পূর্ণিমা তিথিতেই চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম বলে একে গৌরপূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়।
অঞ্চল ভেদে হোলি বা দোল উদযাপনের ভিন্ন ব্যাখ্যা কিংবা এর সঙ্গে সংপৃক্ত লোককথার ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু উদযাপনের রীতি এক ।বাংলায় আমরা বলি ‘দোলযাত্রা’ আর পশ্চিম ও মধ্যভারতে ‘হোলি’,। রঙ উৎসবের আগের দিন ‘হোলিকা দহন’ হয় অত্যন্ত ধুমধাম করে । শুকনো গাছের ডাল, কাঠ ইত্যাদি দাহ্যবস্তু অনেক আগে থেকে সংগ্রহ করে সু-উচ্চ একটা  থাম বানিয়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করে ‘হোলিকা দহন’ হয় । পরের দিন রঙ খেলা । বাংলাতেও দোলের আগের দিন এইরকম হয় যদিও তার ব্যাপকতা কম।
দোলযাত্রা উৎসবের একটি ধর্মনিরপেক্ষ দিকও রয়েছে। এই দিন সকাল থেকেই নারীপুরুষ নির্বিশেষে আবির, গুলাল ও বিভিন্ন প্রকার রং নিয়ে খেলায় মত্ত হয়। শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালনের রীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই চলে আসছে। দোলের পূর্বদিন খড়, কাঠ, বাঁশ ইত্যাদি জ্বালিয়ে এক বিশেষ বহ্ন্যুৎসবের আয়োজন করা হয
বাঙালির হোলি বা দোলযাত্রা যেহেতু উৎসবটি রং নিয়েই তাই কিশোর এবং তরুণদের মধ্যে রঙের প্যাকেট একটি উল্লেখযোগ্য উপহার। এই উৎসবের তাৎপর্য একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সবচেয়ে ভালো উপায় পছন্দের মানুষকে মিষ্টি মুখ করানো। হিন্দু ধর্মের কোনো কোনো গোত্র এই দিনে বিবাহিত মেয়েকে এবং মেয়ের জামাইকে নতুন কাপড় উপহার দেয়। হোলির আগের দিন শ্রীকৃষ্ণের পূজা করা হয়। তখন শুকনো রং ছিটানো হয়।
কেউ কেউ হোলি না খেললেও জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অথবা বাড়ির ছাদে উঠে উপভোগ করেন হোলি খেলা। অনেকে বিশ্বাস করে এই রঙ খেলার মাধ্যমে নিজেদের সব অহংকার, ক্রোধ যেন  শেষ হয়ে যায় এবং সকলে মিলেমিশে উপভোগ করে এই হোলি উৎসব বা দোল পূর্ণিমা।

হিন্দু সংস্কৃতি কি ব্রাহ্মণ্যবাদী ?

আজকাল খুব একটা কথার প্রচলন হয়েছে – “দলিত সমাজ” অত্যাচারিত, ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দ্বারা অত্যাচারিত ! এবং এই অত্যাচারের ফলেই নাকি বহু নিম্ন বর্ণের হিন্দু ধর্মান্তরিত হয়েছেন – বলা ভালো মুসলিম হয়েছেন, খ্রিস্টান হয়েছেন – সেই বহুকাল আগে থেকে ! হিন্দু সমাজ বা হিন্দু সংস্কৃতি – নাকি ব্রাহ্মণ্যবাদী !!

একটু আদিকাল থেকে দেখে আসা যাক :-
শ্রুতি থেকে বেদ যখন লিপিবদ্ধ হয় – যিনি লিপিবদ্ধ করেন – সেই ব্যাসদেব, তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! ব্রাহ্মণ যখন পৈতা ধারন করেন – তাঁকে যে “গায়ত্রী” মন্ত্র জপ্ করতে হয় বা পাঠ করতে হয় – [“ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ
তৎ সবিতুর্বরেণ্যং
ভর্গো দেবস্য ধীমহি
ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ।”] , সেই গায়ত্রী মন্ত্রের যিনি দ্রষ্টা – মহর্ষি বিশ্বামিত্র – তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! দেবতারা যাঁর সাহায্যে – স্বর্গ পুনর্দ্ধার করেন এবং যাঁর আত্মত্যাগ জগৎ স্বরণীয়, সেই দধিচি মুনি – শূদ্র ছিলেন – ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! যাঁকে দক্ষিণ ভারতের উদ্ধারকর্তা বলা হয় – সেই অগস্ত্যা মুনি – শূদ্র ছিলেন, ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! এরপরেও হিন্দু সংস্কৃতি ব্রাহ্মণ্যবাদী ?

ত্রেতা যুগে রচিত রামায়ণ – যিনি রচনা করলেন – মহাঋষি বাল্মীকি, ব্রাহ্মণ ছিলেন না(আজও দেখুন – উত্তর প্রদেশের বাল্মীকি যাঁরা, তাঁরা এস.সি.)! রামায়ণে সব থেকে শ্রদ্ধেয় চরিত্র – রাম, ক্ষত্রিয় ছিলেন – ব্রাহ্মণ নয় ! শ্রীরামের যুদ্ধ যাঁর বিরূদ্ধে – তিনি রাবণ, রাবণ ব্রাহ্মণ ছিলেন ! এরপরেও হিন্দু সংস্কৃতি – ব্রাহ্মণ্যবাদী ?

মহাভারতে তিন নীতির যুদ্ধ ! ধর্মনীতি, রাজনীতি এবং কূটনীতি ! ধর্মনীতি যিনি ধারন করে আছেন তিনি শ্রীকৃষ্ণ ! রাজনীতি যিনি ধারন করে আছেন – তিনি মহামতি বিদুর ! আর কূটনীতির ধারক – শকুনি ! ভারতীয় সভ্যতার প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রধানমন্ত্রী যাঁকে বলা হয় – সেই মহামতি বিদুর – ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! মহাভারত যুগে শ্রীকৃষ্ণের পর যিনি সব থেকে জ্ঞানী ব্যক্তি – সেই মহামতি বিদুর শূদ্র ছিলেন – ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! এরপরেও হিন্দু সংস্কৃতি ব্রাহ্মণ্যবাদী ?

প্রাচীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ তিন রাজবংশ – নন্দ বংশ (শূদ্র), মৌর্যবংশ(শূদ্র) এবং গুপ্ত বংশ(বৈশ্য) ! এঁরা কেউ ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! এরপরেও যাঁদের রাজত্বের বিস্তৃতি, প্রায় মোগলদের রাজত্বের সমান বিস্তৃতি ছিলো – সেই পালবংশও ব্রাহ্মণ ছিলো না ! এমন কি সেন বংশও ব্রাহ্মণ ছিলো না ! তাহলে কখন ব্রাহ্মণ্যবাদীরা অব্রাহ্মণদের উপর অত্যাচার করেছিলো বলতে পারেন ? যখন প্রাচীন সব গল্পই দেখা যায়, দরিদ্র ব্রাহ্মণ – ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে প্রতিদিন ভিক্ষা করতে বের হচ্ছেন, ঘরে ব্রাহ্মণপত্নী পথ চেয়ে আছেন – কখন ব্রাহ্মণ ফিরবেন, ভিক্ষা নিয়ে – তারপর রান্না হবে – সেই ব্রাহ্মণগণ অত্যাচারী ছিলো ?

আধুনিক যুগের ভারতের দিকপুরুষ – যিনি ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ শ্রী রামকৃষ্ণের শিষ্য এবং যিনি রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা করেন, সেই স্বামী বিবেকানন্দ ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! ভারত সেবাশ্রম সংঘের প্রতিষ্ঠাতা প্রণবানন্দ মহারাজ – ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! আজ সারা বিশ্বে শ্রীকৃষ্ণ নাম মাহাত্ম্য বিতরণ, মন্দির প্রতিষ্ঠা হচ্ছে- যেই সংঘঠনের মাধ্যেমে – সেই “ইসকন” এর প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল প্রভুপাদ – ব্রাহ্মণ ছিলেন না ! তাহলে বলতে পারেন – কোথায় এই সংস্কৃতি ব্রাহ্মণ্যবাদী ????

হ্যাঁ এঁরা সকলেই – নিজ কর্ম গুনে ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ, এবং কর্ম দ্বারাই ব্রাহ্মণ ! গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন – “চাতুর্বণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ”। তিনি গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে চারিবর্ণের সৃষ্টি করেছেন ! চারজাতি নয় !

আমাদের সংস্কৃতি কখনো কারও মাঝে বিভেদ রাখেনি ! নাহ্ – ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র – কারো মাঝে না ! ব্রাহ্মণশ্রেষ্ঠ শংকরাচার্য যেমন – মেথর কে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে পিছপা হননি, তেমননি – আমাদের সংস্কৃতি – পিছপা হয়নি শূদ্র থেকে ব্রাহ্মণকে সন্মান জানাতে ! আমাদের সংস্কৃতি – ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ শংকরাচার্য, রামকৃষ্ণ দেব, চৈতন্য মহাপ্রভু, সবাই কে সন্মান দিয়েছে – তাঁদের কৃতকর্মের জন্য !

তবে কি – সেই সমাজে বা এই সমাজে বিভেদ ছিলো না – অত্যাচার ছিলো না ? অবশ্যই ছিলো – সেটা ধনী দরিদ্রের বিভেদ, দরিদ্রের উপর ধনীর অত্যাচার ! তাহলে – কেনোই বলা হয় – উচ্চজাতির প্রতি নিম্নজাতির অত্যাচার ছিলো ? কারণ – হাজার বছর পূর্বে সৃষ্টি হওয়া একটি চক্রান্ত যা আড়াইশত বছর পূর্বে আরও জোরদার হয় এবং এই হিন্দু সমাজ কে ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য যা – আজও সমান তালে চলছে ! না হলে বলুন তো প্রায় দূ’কোটি “মতুয়া” সম্প্রদায় কেনো ইসলামিক পূর্ব-পাকিস্থান বা ইসলাম প্রধান বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে এসে – ভারতে আশ্রয় নিতে হয় ? যদি- উচ্চবর্ণের অত্যাচারে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা মুসলিম হয়ে থাকে ? আজও কেনো বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসতে হয় –  প্রধানতঃ নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ! বাংলাদেশ সংলগ্ন বর্ডার সাইট গুলি লক্ষ্য করুন – দেখবেন, বেশীর ভাগই তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দু ! কেনো – তাঁরা আজও মুসলিম নয় ? কারণ – যা আমাদের ইতিহাস পাল্টে গুলে খাওয়ানো হচ্ছে – তা ভুল ইতিহাস ! উল্লেখ করা যেতে পারে – পূর্ব পাকিস্থানের মন্ত্রী – যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের কথা ! “দলিত-মুসলিম ঐক্য” স্লোগানের মহান প্রাণ পুরুষ – পাকিস্তান রাষ্ট্রের আইন মন্ত্রী হয়েছিলেন, কিন্তু হায় – তাঁকেও রাতের অন্ধকারে পালিয়ে আসতে হয়েছিলো হিন্দু অধ্যুষিত ভারতেই, তিনি ক্ষমা পাননি – নিম্ন বর্ণের হিন্দু হলেও !

কোন সমাজ – ব্রাহ্মণ্যবাদী ছিলো ? কিভাবে ছিলো ? যেখানে হিন্দুদের সাতটি গোত্রই চতুর্বর্ণে দেখা যায় ! যেমন – ভরদ্বাজ গোত্র, ব্রাক্ষণের যেমন আছে তেমনি শূদ্রদেরও আছে ! কাশ্যপ গোত্র – ব্রাক্ষণ থেকে শূদ্র সবার মধ্যে আছে ! এতেই কি প্রমাণ হয় না – হিন্দুরা সাম্য ? হ্যাঁ হিন্দুরা অবশ্যই সাম্যবাদী I কারন এই সংস্কৃতিই জগতের সকলের মঙ্গলার্থে এবং কোন ভেদ না করে – স্বগর্বে ঘোষনা করতে পারে – “ওম্ সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ, সর্বে ভদ্রাণি পশ্যন্তু, মা কশ্চিতদুখভাগভবেত। ওম্ শান্তি শান্তি শান্তি।”

প্রাচীন তিনটি উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র, তক্ষশিলা – নালন্দা – কাশী তে দেখুন তো ক’জন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ছিলেন আর ক’জন অব্রাহ্মণ পণ্ডিত ! তারপরেও এই সংস্কৃতি নাকি – ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি ????

সর্বশেষ উদাহরণ :- দলিত সম্প্রদায়ের – রামজি মালোজী শাকপাল ও ভীমারাই’র চৌদ্দতম তথা কনিষ্ঠ পুত্র ভীমরাও কে যিনি পুত্ররূপে “ভীমরাও অাম্বেদকর” নামে সারা পৃথিবী কে চিনিয়েছেন – তিনি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের “মহাদেব আম্বেদকর” (লক্ষ্য রাখুন – আম্বেদকর পদবীটি মারাঠি ব্রাহ্মণ পদবী) এবং যিনি – বাবাসাহেব ডঃ ভীমরাও রামজী আম্বেদকর কে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছিলেন – তিনি বরদা’র মহারাজা – শাহজী রাও একজন ব্রাহ্মণ !

হিন্দু সংস্কৃতি কে ভাঙতে যাঁরা তখন থেকে এখন একই ভাবে চক্রান্ত করে গেছেন – তাদের কে উপযুক্ত জবাব দেওয়ার সময় এখনই ! কারণ আপনিও আপনার কর্মগুনে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র, জন্মগত নয় I

“ব্রাহ্মণ আমার ভাই – চন্ডাল আমার ভাই – সবার শরীরে মানুষেরই রক্ত !” – (স্বামী বিবেকানন্দ)l

(শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ডঃ সরূপ প্রসাদ ঘোষ মহাশয়ের বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে, এই লেখাটি লিখেছেন – বাদল চন্দ্র সাহা ) !

বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম

ভারতে ইসলামের বীজ সুদৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয় ৭১২ সালে। সেই সাম্রাজ্যবাদী ইসলামের অশুভ ছায়া আমাদের এই বঙ্গদেশকে স্পর্শ্ব করলো তার ৫০০ বছর পরে, অর্থাত ১২০৬ সালে। তার পর থেকে আজ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে চলেছে সেই অসুর শক্তির সাথে সংগ্রাম। রাজশাহী-দিনাজপুরের রাজা গণেশ, বিক্রমপুরের চাঁদ রায় এবং কেদার রায়, যশোরের প্রতাপাদিত্য, বিষ্ণুপুরের বীর হাম্বীর, বেড়াচাঁপার রাজা চন্দ্রকেতু ও তার দুই সেনাপতি হামা আর দামা, বালিয়া বাসন্তীর বাগ্দী রাজাদের মত অসংখ্য বাঙালি বীর এই অসুর সাম্রাজ্যবাদের সামনে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। আজও সেই লড়াইয়ে বাঙালি পিছিয়ে নেই।

এই সংগ্রাম কেন?
১৪০০ বছর আগে জন্ম নেওয়া ইসলাম নামক একটি মতবাদ পৃথিবীকে দুভাগে ভাগ করেছে। শুধু ভাগ করেই শেষ নয়, সেই মতবাদে যারা বিশ্বাস করেন না, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এই অবিশ্বাসীদেরকে তীব্র ঘৃণা করতে শিখিয়েছে। তাদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি, ধর্ম – সবকিছু ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়েছে। আমরা সারা পৃথিবীর মানুষকে বসুধৈব কুটুম্বকম মনে করি, অথচ তারা আমাদেরকে কাফের-মুশরিক-বুতপরস্ত বলে ঘৃণা করে। তারা আমাদের এই মাটিকে দারুল ইসলামে পরিণত করতে চায়। তারা বাংলার বারো মাসে তেরো পার্বণকে ধ্বংস করে আমাদের উপরে আরবের মরু সংস্কৃতিকে জোর করে চাপিয়ে দিতে চায়। ওরা পারস্য, মিশর, আফগানিস্তান, পাকিস্তানের পাঞ্জাব, বালুচিস্তান, সিন্ধ – সব জায়গার মূল সভ্যতাকে এবং তাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করেছে। আমাদের বাংলার তিনভাগের দুভাগ মাটি ছিনিয়ে নিয়ে বাংলাদেশ করেছে। সেখান থেকে বাঙালিকে তাড়িয়েছে, গণহত্যা করেছে, বাঙালি মেয়েদের নৃশংসভাবে ধর্ষণ করেছে। বাঙালির দুর্গাঠাকুরের মূর্তি ভেঙেছে, কালীঠাকুরের মূর্তি ভেঙেছে, রামকৃষ্ণ মিশনে হামলা করেছে। সতসঙ্গ-ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ-রামঠাকুরের অশ্রমসহ কোনও বাঙালি প্রতিষ্ঠানই এই জেহাদী আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পায়নি। শুধু ওপার বাংলা কেন, এপারের দেগঙ্গা, নলিয়াখালি, ধানতলা, ধুলাগড়, বাদুড়িয়া-বসিরহাট, তেহট্ট, কালিয়াচক, চোপড়া, রায়গঞ্জ – সর্বত্র কি আমরা একই চিত্র দেখতে পাই নি! সুতরাং ইতিহাস বলছে, আমরা শান্তি চাইলেই শান্তি আসবে না। কারণ অশান্তির বীজ তাদের মতবাদের মধ্যেই নিহিত আছে। আমাদের চাওয়া অথবা না চাওয়ার কোনও মূল্য নেই।
১৯৪৭ এ এই ভারতের মাটি গেছে – এই সত্যের চেয়েও বড় সত্য হল আমাদের এই বাংলার তিনভাগের দুভাগ মাটি চলে গেছে। হিন্দু উদ্বাস্তু হয়েছে – কিন্তু তার চাইতে বড় সত্য হল, বাঙালি উদ্বাস্তু হয়েছে, বাঙালি নিধনযজ্ঞ হয়েছে, বাঙালি মা-বোনদের ধর্ষণ করা হয়েছে। ওপারে বাঙালির শিবরাত্রি, চড়কপূজা, নবান্ন, পৌষ পার্বন, কালীপূজা, দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা, অরন্ধন, রান্নাপূজো, রাসমেলা, নাম সংকীর্তনের সংস্কৃতি ধ্বংস হয়েছে। আর এপারে বাঙালির দুর্গাপূজা রূপান্তরিত হয়েছে শারদোৎসবে, রবিঠাকুর হয়েছেন বুর্জোয়া কবি, নেতাজী হয়েছেন তোজোর কুকুর। বাঙালির মেরুদন্ড ভাঙার এই কাজ ওপারে করে চলেছে জেহাদী মুসলমানেরা, আর এপারে করে চলেছে তাদের দোসর বাংলার সেকু-মাকুরা।

উপায় কি?
এই পরিস্থিতিতে আমাদের সামনে তিনটে অপশন আছে – ১)বাংলার মাটি ছেড়ে পালাও, ২) আত্মসমর্পণ করো আর মরু সংস্কৃতিকে কবুল করো, ৩) ইসলামিক জেহাদের বিরুদ্ধে অস্তিত্বরক্ষার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো। এই লড়াই মারাঠা লড়েছে, রাজপুতানা লড়েছে, বিজয়নগর লড়েছে, পাঞ্জাব লড়েছে, বুন্দেলখন্ড লড়েছে। তারা সবাই নিজেদের দমে লড়েছে এবং জিতেছে। সারা দেশ কবে একতাবদ্ধ হয়ে লড়াই করতে নামবে-তারজন্য কেউই অপেক্ষা করে বসে থাকেনি। এই লড়াইয়ে বাঙালিও পিছিয়ে থাকেনি, তার উল্লেখ আমি আগেই করেছি। আমরা, বাঙালিরা সেই সংগ্রামী যোদ্ধাদের উত্তরসূরী। আজ দ্বিতীয় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সমুপস্থিত। গোটা বিশ্বে আজ ইসলামিক উম্মা একদিকে এবং সভ্য মানবসমাজ অন্যদিকে। এই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বাঙালির দায়িত্ব বাংলাকে এবং বাঙালিয়তাকে রক্ষা করা। এই বাংলাই আজ আমাদের ওয়ার ফ্রন্ট বা যুদ্ধক্ষেত্র।

আমরা কি প্রস্তুত?

রাজনৈতিক ইসলাম – একটি সর্বগ্রাসী মতবাদ (পর্ব – ২)

ড: বিল ওয়ার্নার

অনুবাদ : অমিত মালী।

গতকালের পর :-
সবশেষে রাজনৈতিক ইসলাম অন্য ধর্মের অস্তিত্বকেও অস্বীকার করে, অন্যধর্মের বিরোধিতা করে। কোরান মুসলিমদেরকে এই শিক্ষাই দিয়ে আসছে। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। কোরানের সূরা ২, আয়াত ১৯৩ তে বলা হয়েছে – কাফিরদের বিরুদ্ধে ততক্ষন যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না পর্যন্ত আল্লাহ-এর সর্বময় কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। আবার হাদিসে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। মুসলিম হাদিসের ১নম্বর হাদিস এবং ৩১ নম্বর হাদিসে মহম্মদ বলছেন যে ”আমাকে মানবসভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে, যতক্ষণ না পর্যন্ত সবাই স্বীকার করে যে এই পৃথিবীতে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং যেন স্বীকার করে নেয় যে একমাত্র আমিই আল্লাহ-এর নবী।” বুখারী হাদিসের ৪নম্বর, ৫২ নম্বর এবং ১৯৬নম্বর হাদিসে মহম্মদ বলছেন, ”আমাকে কাফিরদের বিরুদ্ধে ততক্ষন যুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে, যতক্ষণ না পর্যন্ত সবাই স্বীকার করে নিচ্ছে যে এই পৃথিবীতে একমাত্র উপাস্য হলেন আল্লাহ।” আর এই মতবাদগুলি যেগুলি মহম্মদের জীবনের ওপর ভিত্তি করে সৃষ্টি হয়েছে, এটা হলো জিহাদ – যা কাফিরদের বিরুদ্ধে ততক্ষন চালিয়ে যেতে হবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। আর এই তত্ত্বের ফলে বিগত হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের সাধারণ মানুষ আক্রমণের শিকার হয়েছেন, তারা তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। আর এই পরিকল্পনা বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রসারের জন্যে করা হয়েছে। তবে সবসময় জিহাদের দ্বারাই যে ইসলাম প্রসার পেয়েছে তা নয়। আর একটি কারণ হলো ইসলামিক দেশ থেকে মুসলিমদের অন্য দেশে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করা এবং তাদের সংখ্যা বাড়ানো। আর ঠিক এই কারণে বর্তমানে পৃথিবীতে ইসলামের শক্তি দিন দিন বাড়ছে।
ইসলামকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা :-
প্রথমেই বলা হয়েছে যে ইসলাম প্রতিটি মুসলিমের ব্যক্তিগত জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করে। আর একটি ইসলামিক মতবাদ হলো এই যে সমস্ত বিশ্বকে ইসলামের অধীনে আনতে  হবে। রাজনৈতিক ইসলামের আর একটি অংশ হলো শরিয়া আইন। এটা ইসলামের নিজস্ব আইন ব্যবস্থা, যাকে  হাতিয়ার করে মুসলমানরা যে দেশে থাকুক না কেন, সে দেশের প্রচলিত আইনকে অস্বীকার করে এবং শরিয়া মেনে চলতে চায়। মুসলিমরা দাবি করে যে এটা হলো মহান আল্লাহ-এর আইন এবং প্রতিটি মুসলিম নারী-পুরুষ এই আইন মেনে চলতে বাধ্য। এই শরিয়া আইনে অনেক বিষয় ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যেমন – কিভাবে প্রাথর্না করতে হয়, বিবাহ, ব্যাংকের আইন, কিভাবে একজন আদর্শ স্বামী বা স্ত্রী হতে হয়, যৌনতা, কোন অপরাধের কি শাস্তি হওয়া উচিত, কোন খাদ্য মুসলিমদের জন্য গ্রহণ যোগ্য আর কোনটি নয়, কোন পোশাক মুসলিমরা পরবে আর কোনটি পরবে না, কিভাবে শৌচকর্ম করতে হবে, ইসলাম ত্যাগ যারা করবে তাদের কি শাস্তি দেওয়া হবে এইসব। আর শরিয়া আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হল এই যে কাফিরদেরকেও শরিয়া আইন মানতে হবে।
হজরত মহম্মদের মৃত্যুর পর আবু বকর, তার ঘনিষ্ঠ সঙ্গী প্রথম খলিফা হন। খলিফা হয়ে তিনি প্রথমে আদেশ দেন যে যারা ইসলাম ত্যাগ করে চলে যেতে চায়, তাদের হত্যা করা হোক। কারণ মহম্মদের সময়কালে অনেক মানুষকে জোর করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল। তাই তারা ইসলাম ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলো। আর এটাই রাজনৈতিক ইসলামের একটি অংশ। যদি কেউ একবার ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে আর সে কখনো ইসলাম ত্যাগ করতে পারবে না, তাকে মুসলিম হয়েই থাকতে হবে। আর যদি সে ইসলাম ত্যাগ করে, তাহলে তার জন্যে মর্মান্তিক মৃত্যু অপেক্ষা করে আছে। পরের খলিফা হন উমর, যিনিও ছিলেন মহম্মদের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। তিনি মোট দশ বছর শাসন করেন। আর দশ বছরে তিনি আরবের পাশে থাকা খ্রিস্টান অধ্যুষিত সিরিয়া এবং জরাথ্রুস্টের অনুগামীদের দেশ ইরানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে কাটিয়ে দেন। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না জিহাদের প্রথম এবং শেষ লক্ষ্য হলো অন্য ধর্মকে পরাজিত করে ইসলামের রাজত্ব কায়েম করা। আর এই কারণে আজ বিশ্বব্যাপী ইসলাম রাষ্ট্রের সংখ্যা এতগুলি। তুর্কির আগে নাম ছিল আনাতোলিয়া এবং একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু ইসলামী জিহাদের সামনে পড়ে আজ তুর্কির শতকরা ৯৫ শতাংশ মানুষ মুসলিম। আজ তার নামও পাল্টে হয়েছে তুরস্ক। উত্তর আফ্রিকা, মিশর, ইরাক, সিরিয়া এবং লেবানন এইসব দেশগুলি খ্রিস্টান দেশ ছিল। কিন্তু ইসলামিক জিহাদের ফলে আজ এই দেশগুলি ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত। আফগানিস্তান বৌদ্ধ রাষ্ট্র ছিল, পাকিস্তান এবং মালয়েশিয়া হিন্দুরাষ্ট্র ছিল। কিন্তু ইসলামিক আক্রমণের শিকার হয়ে আজ এই দেশগুলি ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আর এই জিহাদের একটি বৈশিষ্ট্য হল যে ইসলামিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হলেই জিহাদ শেষ হয় না, যতক্ষণ না পর্যন্ত সবকটি  কাফিরকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে ততক্ষন জিহাদ চলবে। আর এই কারণে ইসলাম আজ পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। আর ইতিহাসে ইসলাম হলো সবচেয়ে সফল সর্বগ্রাসী রাজনৈতিক মতবাদ, কমিউনিস্ট এবং নাৎসি মতবাদের থেকেও।(সমাপ্ত )

রাজনৈতিক ইসলাম – একটি সর্বগ্রাসী মতবাদ (পর্ব – ১)

ড: বিল ওয়ার্নার।

অনুবাদ: অমিত মালী।

প্রথমে বলে নেওয়া যাক সর্বগ্রাসী বলতে কি বোঝানো হচ্ছে। সর্বগ্রাসী মতবাদ অর্থাৎ এমন একটি সর্বোচ্চ ক্ষমতা, যেখানে রাষ্ট্রের কোনো ক্ষমতা নেই এবং যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন নিয়ন্ত্রিত হয়। তাছাড়া যেখানে অন্যান্য মতকে অস্বীকার করা হয়।
ইসলামের প্রকৃতি :-
ইসলামের সম্বন্ধে সবাই একটা বলে থাকেন এই যে এটি কোরান নির্দেশিত একটি ধর্ম। যদিও একটি জিনিস অনেকেই জানেন না তা হলো এর ধর্মীয় দিক হলো একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। তাছাড়া কোরান থেকে জানা সম্ভব নয় যে কিভাবে মুসলিমরা তাদের আল্লাহকে ডাকবে বা অন্যান্য ধর্মীয় নিয়ম পালন করবে। কোরানে আল্লাহ-এর কথা পাওয়া যায় এবং দুটি লেখায় মহম্মদের কথা পাওয়া যায়; একটি হলো সিরা বা সুন্নত-যা হলো মহম্মদের বিস্তারিত জীবনী এবং অন্যটি হলো হাদিস-যাতে আছে মহম্মদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির মধ্য দিয়ে ইসলামের শিক্ষা। এর মধ্যে হাদিস হলো একটু দীর্ঘ গ্রন্থ এবং পৃথিবী জুড়ে বেশ কয়েকরকম হাদিসের প্রচলন রয়েছে।
কোরানের প্রায় ৯০টি আয়াতে এই কথা বলা হয়েছে যে মহম্মদ হলেন মুসলিমদের জন্যে আদর্শ ব্যক্তি। প্রত্যেক মুসলমানের উচিত মহম্মদের মতো করে জীবনযাপন করা। মহম্মদ হলেন সর্ব গুনের অধিকারী। তিনি হলেন আদর্শ পিতা, আদর্শ স্বামী, আদর্শ বিচারক, আদর্শ নেতা, আদর্শ যোদ্ধা, আদর্শ ব্যবসায়ী এবং আদর্শ রাজনীতিবিদ। মহম্মদ তার জীবনে যা যা বলেছেন বা করেছেন সেগুলি সবই হলো সুন্নত। তাই ইসলাম এবং মুসলমানদের বুঝতে হলে কোরান, সুন্নত এবং হাদিস -এই তিনটি বইকে ভালো করে পড়তে ও বুঝতে হবে। শুধুমাত্র কোরান পড়ে ইসলাম বা মুসলমানকে বোঝা কখনোই সম্ভব নয়। অধিকাংশ লোকই এটা জেনে আশ্চর্য হবে যে কোরানে মহম্মদ শব্দটির ব্যবহার সর্বশক্তিমান আল্লাহ-এর থেকে ছ’গুন বেশিবার ব্যবহার করা হয়েছে। ইসলাম সম্পর্কে আর একটি প্রচলিত ধারণা হলো এই যে আপনি যদি ইসলামের সম্বন্ধে চান, তাহলে আপনাকে মুসলিম ব্যক্তির কাছ থেকে তা জানতে হবে। কিন্তু এই ধারণা ঠিক নয়। কারণ ইসলামের প্রথম এবং শেষ কথা হলো সর্বশক্তিমান আল্লাহ এবং মহম্মদ। তাই কোনো মুসলিম ব্যক্তির ইসলাম সম্বন্ধে করা কোনো মন্তব্যের কোনো মূল্য নেই। কারণ কোরান, হাদিস এবং সুন্নতে যা রয়েছে সেটাই হলো সঠিক ইসলাম। যদি কোনো কিছু কোরান, সুন্নত বা হাদিসে না থাকে, তাহলে সেটা ইসলাম নয় – তা সে যেই বলুক না কেন। পৃথিবীর একমাত্র মুসলিম ব্যক্তি যার ইসলামের ওপর কোনো কিছু বলার অধিকার রয়েছে, তিনি হলেন মহম্মদ। আর যদি আপনি একবার ইসলামকে জানতে পারেন, তাহলে মুসলিমদের বিষয়ে সবকিছু আপনি বুঝতে পারবেন। এই কথার অর্থ হলো এই যে যারা ইসলামকে জানেন, কেবলমাত্র তারাই ইসলামের ব্যাপারে মত দিতে পারেন। আর একটি ধারণা মুসলিমরা প্রচার করে আসছে যে যদি আপনি ইসলামকে জানতে চান, তাহলে আপনাকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলিম হতে হবে। এই ধারণা একেবারেই ভুল। কারণ বেশিরভাগ মুসলিম ব্যক্তি কোরান এবং সুন্নতের সম্বন্ধে খুবই কম জানে, তাই ইসলামের সম্পর্কে তাদের মন্তব্য একদম ঠিক নয়। তাই এই মতামত একান্তই তাদের ব্যক্তিগত।
 রাজনৈতিক ইসলাম :-
সুতরাং ইসলাম সম্বন্ধে সমস্ত মতই তিনটি বইতে পাওয়া যায় – কোরান, সুন্নত এবং হাদিস-এ। যদি আপনি ইসলামের সম্বন্ধে ধারাবাহিকভাবে পড়তে থাকেন, তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন যে বেশিরভাগ লেখায় কিন্তু এইসব লেখা নেই যে কিভাবে একজন আদর্শ মুসলিম হতে হবে, কিভাবে আল্লাহকে ডাকতে হবে; বরং কোরানের বেশিরভাগ কথাই অমুসলিমদের উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছে। যে আরবি শব্দটির মধ্য দিয়ে অমুসলিমদের বোঝানো হয়েছে, তা হলো ‘কাফির’, যার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় বিধর্মী বা অবিশ্বাসী হিসেবে। পুরো ইসলামের কোথাও কাফিরদের সম্বন্ধে একটাও ভালো কথা লেখা নেই। আল্লাহ কাফিরদেরকে ঘৃণা করেন এবং তাদের পরাজিত করার জন্যে পরিকল্পনা করতে থাকেন। মুসলিমরা দাবি করে থাকেন যে কাফিরদের মধ্যে খ্রিস্টান ও ইহুদিরা ইসলামে গ্রহণযোগ্য ‘জিম্মি’ হিসেবে, যাদের কিনা পবিত্র গ্রন্থ আছে। ইসলামের এই মতবাদকে একটু বিস্তারিত করলে বলা যায় যে খাঁটি খ্রিস্টান হলো তারাই, যারা স্বীকার করে নেয় যে মহম্মদ হলেন শেষ নবী এবং স্বীকার করে নেয় যে গসপেল লিখিত তত্বগুলি হলো ভুল এবং যে খ্রিস্টান যিশুখ্রিস্টের অলৌকিক ক্ষমতাগুলিকে অবিশ্বাস করে। আবার খাঁটি ইহুদি হলো তারাই যারা মহম্মদকে শেষ নবী বলে মেনে নেয় এবং তোরাহকে দুর্নীতিপরায়ণ বলে স্বীকার করে নেয়। আর যদি একজন খ্রিস্টান বা ইহুদি এইকথা মেনে না নেয়, তাহলে সেও ইসলামের চোখে একজন কাফির। একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখবেন যে ইসলাম দাবি করে যে সে হলো পৃথিবীর একমাত্র সত্য ধর্ম এবং সে পৃথিবীর সব ধর্মের বিচারক। একটা লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো এই যে ইসলাম বিষয়ক বইগুলির মধ্যে সমস্ত হাদিসের ৩৭ শতাংশ কাফিরদের নিয়ে, সুন্নতের ৮১ শতাংশ কাফিরদেরকে নিয়ে এবং কোরানের ৬৪ শতাংশ লেখা কাফিরদেরকে নিয়ে। সবমিলিয়ে দেখা যায় যে ইসলামিক মতবাদের অর্ধেক অংশই কাফিরদেরকে নিয়ে।  আর ঠিক এইখানে ইসলামের আসল উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়। ইসলাম বিষয়ক বইতে যাদের নিয়ে লেখা হয়েছে, তারা আসলে ইসলামের অংশ নয়। আর অর্থ এটাই দাঁড়ায় যে তাদেরকে অর্থাৎ কাফিরদেরকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার জন্যে পরিকল্পিতভাবে এই বিষয়টাকে ঢোকানো হয়েছে। রাজনৈতিক ইসলামই শুরু হচ্ছে কাফিরদেরকে নিয়ে। আর এই অংশের জন্যে আজ সারা বিশ্বের মানবসভ্যতা বিপদের মুখোমুখি এবং ব্যাপকভাবে ক্ষতির শিকার ইসলামের দ্বারা। তাই সবদিক বিচার করে দেখা যায় যে ইসলাম শুধুমাত্র একটি ধর্ম নয়, এটি একটি রাজনৈতিক মতবাদ ও সংস্কৃতি। কারণ ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত জীবনযাপন ও সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলাম তার সিদ্ধান্ত ও মত চাপিয়ে দেয় মানুষের ওপর যা অন্য কোনো ধর্ম করে না। কারণ ইসলাম পরিচালিত হয় একটি রাজনৈতিক পদ্ধতিতে এবং নিয়মশৃঙ্খলার ঘেরাটোপে। যদি ইসলাম শুধু মাত্র একটি ধর্ম হতো, তাহলে পৃথিবীর মানুষের চিন্তার কোনো বিষয় ছিল না। কিন্তু ইসলাম তা নয়। উদাহরণ হিসেবে বৌদ্ধ ধর্মের কথা আলোচনা করা যাক। বৌদ্ধ ধর্মের মানুষজন পৃথিবীর অনেক দেশেই আছে। কিন্তু তারা রাষ্ট্রের ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার দাবি বা চেষ্টা কোনোটাই করে না। কিন্তু ইসলাম রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এমনকি নিজেদের ক্ষমতার প্রমান রাখে প্রতিটি ক্ষেত্রে – ফতোয়া জারি করা, এটা করা যাবে বা ওটা করা যাবে না ইত্যাদি।
তাছাড়া ইসলামের নামের মধ্যে সর্বগ্রাসী মতের শুরু। ইসলাম কথার অর্থ হলো আত্মসমর্পণ, আত্মসমর্পণ কোরান এবং মহম্মদের সুন্নতের প্রতি। এখানেই মহম্মদের সর্বময় ক্ষমতার উৎস। তার জীবনের কয়েকটি ঘটনা আলোচনা করলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। মহম্মদ মদিনায় যাবার পর জিহাদি হয়ে ওঠেন এবং তার প্রতিবেশীদেরকে আক্রমণ করেন। কিন্তু  প্রথমে তিনি যখন মদিনায় এসেছিলেন তখন মদিনার জনসংখ্যার অর্ধেক ছিল ইহুদি। কিন্তু দুই বছরের মধ্যেই মদিনায় আর একটা ইহুদি অবশিষ্ট ছিল না। তাদেরকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, হত্যা করা হয়েছিল, বন্দি বানানো হয়েছিল এবং বেঁচে গিয়েছিলো তারাই যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তারপর মহম্মদ আক্রমন করেন আরবের বিভিন্ন অংশে থাকা মূর্তিপূজকদের – যারা বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তিপূজা করতো, যদিও আজ আর জানা সম্ভব নয় তারা সনাতন ধর্মের অংশ ছিল কিনা। পুরো আরব ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর মহম্মদ সিরিয়া ও ইরাক আক্রমণ করেন এবং এই দুটি দেশে থাকা খ্রিস্টানদের কচুকাটা করেন।
(চলবে,আগামীকাল সমাপ্য )