লাভ জিহাদ নিয়ে হিন্দুদের ভণ্ডামি

Love-Jihad (1)লাভ জিহাদ” নিয়ে চটকদার প্রচারে হিন্দুরা যতটা উৎসাহী, ততটা এর প্রতিকারে আগ্রহী নয়। হিন্দুরা অন্তর থেকে বিশ্বাস করে, এসবের প্রতিকার সম্ভবপর নয়। অন্ততঃ হিন্দুর দ্বারা এর সমাধান যে অসম্ভব, সেটা বিশ্বাসযোগ্য করতে, হিন্দুরা অবিশ্বাস্য সব তত্ত্ব খাড়া করেন। কেউ বলেন- “আরে, ওদের তো এসব কাজের জন্য ট্রেনিং দেওয়া হয়।” কেউ আবার মনে করেন-“এগুলোর জন্য তো ওরা মাসে মাসে টাকা পায়।” আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়ে কেউ কেউ বলেন- “ওরা তো পীরের কাছে নিয়ে গিয়ে জলপড়া খাইয়ে দেয়। অমনি হিন্দুরা ওদের প্রেমের বশ হয়ে যায়।” সম্প্রসারণটা যে সুস্থ স্বাভাবিক কোন জাতির সম্পূর্ন প্রাকৃতিক চিন্তা হতে পারে, এই ভাবনাটাই হিন্দুদের মাথা থেকে পুরোপুরি লোপ পেয়েছে। প্রকৃতি পূজা করতে করতে যে কেউ এতদূর অপ্রাকৃতিক হয়ে উঠতে পারে, সেটা হিন্দুদের দেখলে বোঝা যায়।

হিন্দুরা মনে করে, তারা নিজের ধর্মকে নিজের কোলে গুটলি পাকিয়ে লুকিয়ে রাখে বলে, সবাইকেই তাই করতে হবে। হিন্দু আর মুসলমানে বিয়ে হলে হিন্দু পুরুষ যথেষ্ট উদারতা দেখিয়ে বলে- “আমি হিন্দু, বউ মুসলমান, তাই আমাদের সন্তান হিদুলমান”! এতে কাগজে কাগজে হাততালি, টিভিতে রেডিওয় পিঠ চাপরানি অনেক কিছুই জোটে। সেজন্য হিন্দুরা আশা করে এর প্রতিদানে আমির খানও নিজের হিন্দু স্ত্রীর সন্তানদের হিঁদুলমান কিংবা মুন্দু বানিয়ে বড় করবেন। কিন্তু মুশকিল হল হিন্দুর কল্পিত পাপবোধ কিংবা পিঠ চাপরানির লোভ ওনাদের মধ্যে একেবারেই নেই। তাই এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আমির খান যখন গর্বভরে ঘোষণা করেন, মায়ের ধর্ম যাই হোক, পিতার ধর্মই সন্তানের ধর্ম হবে- অবাক বিস্ময়ে হিন্দুদের মুখের ভিতর এত বড় বড় হাঁ হয়ে যায়। সন্তানের পরিচয়ের উপর পিতার যে একটা স্বাভাবিক অধিকার বোধ থাকে, এটা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে মেরুদন্ড বিকিয়ে দেওয়া হিন্দুদের মনে থাকার কথা নয়। তাই এসব ঘটনা দেখে শুনে, এগুলোকে “লাভ জেহাদ” নাম দিয়ে, হায় হায় করে বেড়ানো ছাড়া হিন্দুদের আর কিছুই করণীয় নেই।

হিন্দুরা সবেতেই গভীর চক্রান্ত খুঁজে পায় এবং সমাধানের বদলে সমস্যা গুলোকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আরো বড় করে দেখিয়ে আনন্দ পায়। কারণ সমস্যা যত বড় হবে, তার সমাধান তত বেশি করে হিন্দুর হাতের বাইরে হবে। সমাধান হিন্দুর হাতের যত বেশি বাইরে থাকবে, ততই হিন্দুর পক্ষে অকর্মা হয়ে বসে অদৃষ্ট ভরসায় থাকা সহজ হবে। যার সমাধান হিন্দুর হাতে নেই, তার জন্য ঈশ্বরের উপর ভরসা করা ছাড়া তো আর কোন উপায় নেই। হিন্দুও ঠিক ঐটাই চায়। এইসব বিষয়ে বাঙালি হিন্দু বা অবাঙালি হিন্দুর মধ্যে তিলমাত্র ফারাক নেই। তাই নিজের সমস্যা নিজে সমাধানের বদলে হিন্দুরা একেকটি করে অবতার পাকড়ায়। কখনো সেই অবতারের নাম মোদি, কখনো যোগী আদিত্যনাথ, কখনো আবার বিজেপি। অবতার আসে, অবতার যায়; হিন্দুর অবস্থা পাল্টায় না। এক অবতারের পতন হলে হিন্দু নতুন অবতার খুঁজে নেয়। মনে স্থির বিশ্বাস, আগের অবতার না পারলেও, নতুন অবতার এলেই সব দুঃখ ধুয়ে মুছে যাবে। অবশ্য বিশ্বাস না রেখে উপায় আছে? শক্তিহীন, দুর্বল, অকর্মাকে তো অবতারের ভরসাতেই পথ চলতে হবে।

শুধু লাভ জেহাদ বলে নয়, সংখ্যা যুদ্ধের কোন অংশেই হিন্দুর অবতার নির্ভরশীলতা কমে না। সন্তান উৎপাদনের ক্ষেত্রেও হিন্দুরা এক ডজন গোলে পিছিয়ে। সমতা ফেরাতে হিন্দুদের ভরসা নিজের জৈবিক ক্ষমতায় নয়; বরং “জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিধি” নামের একটি কাল্পনিক আইনে। অবতার এখানে আইন রূপে আবির্ভুতা। এই আইন বলে দুটির বেশি সন্তান নেওয়া নিষিদ্ধ হলেই, হাসতে হাসতে হিন্দু বজায় রাখতে পারবে নিজের সংখ্যাগুরুর খেতাব। আইন দিয়ে অন্যদের জনবৃদ্ধিতে লাগাম টানার চিন্তায় হিন্দুরা এতই মশগুল, যে ভেবেও দেখে না যে ভারতের সমস্ত আইনের মত এই আইনেও জব্দ হবে হিন্দু নিজেই। অন্যদের জনবৃদ্ধি বন্ধ হবার প্রশ্নই নেই, উল্টে শাস্তির ভয়ে যে গুটিকয় হিন্দু দুটির বেশি সন্তান নিচ্ছিলেন, তারাও ক্ষান্ত দেবেন। এই আইন নিজের পায়ে কুড়াল মারার অব্যর্থ অস্ত্র। আসলে নিজে ভাল খেলে জেতায় হিন্দুদের আস্থা নেই। হিন্দুরা চায় অন্যেরা খারাপ খেলে হারুক। এখন হিন্দুকে জেতানোর দায় যেহেতু অহিন্দুদের নেই, তাই হিন্দুদেরও আর অন্যকে হারানো হয়ে ওঠে না। হিন্দু যতবার নিজের শক্তির উপর ভরসা না করে চতুর্দিকে অবতার খুঁজে বেড়াবে, ততবার এই অন্ধ বিশ্বাস হিন্দুকেই রক্তাক্ত করবে।

হিন্দুদের মুশকিল হল, তারা যেটাকে মুসলমানের দোষ বলে মনে করে, সেটা মোটেই দোষ নয়, গুন। আর হিন্দুরা যেটাকে নিজেদের গুন বলে মনে করে নিজেরাই নিজেদের পিঠ চাপড়ে বেড়ায়, সেটা কোন গুন নয়, মারাত্মক দোষ। আপনি সম্প্রসারণে অনিচ্ছুক হলে, তার দায় মুসলমানের? বিধর্মী বিয়ে করে সন্তানকে উভধর্মী নামক হাঁসজারু বানিয়ে হিন্দুসংখ্যা কমাব আমরা, আর দোষ হবে মুসলমানের? স্বধর্মের প্রচার ও প্রসারে আপনার অনীহা থাকলে, তার দোষ মুসলমানের? নিজের দোষ না দেখে সর্বত্র অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানো চূড়ান্ত অক্ষমের লক্ষ্মণ। কারণ দোষটা নিজের হলে আপনি সেটা শুধরে নিতে পারেন। দোষটা যদি অন্যের হয়, তবে সেটা শুধরে দেওয়া আপনার কর্ম নয়। নিজেদের সমস্যা সমাধানের উপায় নিজেদেরই খুঁজতে হবে। কোন অবতার এসে আকাশবাণী ছড়িয়ে হিন্দুকে বাঁচিয়ে দিয়ে যাবে না। বাঁচতে হলে, রাজত্ব করতে হলে, তার জন্য হাসিমুখে অনেক ত্যাগ স্বীকারও করতে হবে। নয়তো একদিন ভারতের শেষ হিন্দু অঞ্চলের শেষতম হিন্দুটির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, গলা নামিয়ে চুপিসারে বলতে হবে- “দেখেছেন, দেশটাকে কিরকম মিনি পাকিস্তান বানিয়ে ফেলেছে”?

লেখা- স্মৃতিলেখা চক্রবর্তী

বীর সাভারকার ও সেলুলার জেল

savarkarপোর্ট ব্লেয়ার, যেখানে অবস্থান বৃহৎ এক কারাগার যার নাম সেলুলার জেল। এ কারাগারের নাম সেলুলার এ কারণে যে, এর সাতটি উইং ছিল, যা মাঝখানে একটি সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তিন তলাবিশিষ্ট উইংগুলো এমনভাবে তৈরি ছিল যে এর সামনে-পেছনে আরেক উইং থেকে দেখা যেত না। কাজেই এক উইংয়ের বন্দিরা অন্য উইং সম্পর্কে কোনো ধারণাই পেত না।
এ কারাগারে সর্বমোট ৬ হাজারের উপরে কারাকক্ষ ছিল। এখন মাত্র তিনটি উইং আর পর্যবেক্ষণ টাওয়ারটি সংরক্ষিত রয়েছে। পোর্ট ব্লেয়ারের অবশ্যদর্শনীয় স্থান এ সেলুলার জেল। আগেই বলেছি, এর সঙ্গে জড়িত ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন।
সেলুলার জেলে বিপ্লবীদের শুধু বন্দি করেই রাখা হয়নি, প্রায় ৯০ জনকে ফাঁসিও দেয়া হয়েছিল। ফাঁসির জায়গাটিও সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। গভীর রাতে পাগলা ঘণ্টা বাজিয়ে বিপ্লবী বন্দিদের চোখের সামনেই ফাঁসি দেয়া হতো, হয়তো তাদের মধ্য থেকেই কোনো একজনকে।
আন্দামানে প্রথমদিকে কোনো নির্দিষ্ট কারাগার ছিল না। সমগ্র দ্বীপটিই ছিল কারাগার। অষ্টাদশ শতাব্দীতে লেফটেন্যান্ট ব্লেয়ার এ জায়গায় প্রথম স্থাপনা গড়ে তোলেন। পরে আন্দামানকে খোলা জেলে রূপান্তরিত করা হয় ১৮৫৭ সালের ‘সিপাহী বিদ্রোহ’ বা প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের ব্যর্থ চেষ্টার পরের বছর, ১৮৫৮ সাল থেকে।
 যদিও ১৭৮৯ সালে তৎকালীন বেঙ্গল সরকার সমগ্র দ্বীপাঞ্চলকে কারাগার হিসেবে ঘোষণা দিয়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের দ্বীপান্তর করে কালাপানিতে পাঠাত। আদতে আন্দামানের চারদিকে জলরাশি কোনোভাবেই কালো রঙের নয়, বরং অদ্ভুত সুন্দর নয়ন জুড়ানো নীল স্বচ্ছ জল।
কালাপানি হিন্দু ধর্মমতে ধর্মচ্যুত হওয়ার ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। হিন্দুদের কালাপানি পার হওয়া ছিল ধর্মবহির্ভূত কাজ। এ কারণেই তৎকালীন ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির হিন্দুসেনাদের অন্যতম শর্ত ছিল সমুদ্র পার না হওয়া। পরে অবশ্য এ মতবাদ টেকেনি। সেই সময় থেকে কালাপানি মানে গভীর সমুদ্র আর আন্দামান যেহেতু বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, চারদিকে সমুদ্র, তাই এ নামে পরিচিত হয়েছিল। এখনও কালাপানি আর আন্দামান একাকার হয়ে আছে।
প্রথম জেল তৈরি হয় ভাইপার দ্বীপে। তবে আন্দামান উন্মুক্ত ছিল জাতীয়তাবাদী কয়েদিদের জন্য।
আন্দামানের পোর্ট ব্লেয়ারের কারাগার তৈরির পরিকল্পনা বহু আগের হলেও ১৮৫৭ সালের সিপাহী যুদ্ধের কারণে সময়মতো নির্মাণকাজ শুরু করা যায়নি। তবে সেলুলার কারাগার তৈরি ত্বরান্বিত হয় ১৮৭২ সালের ফেব্য়রির ৮ তারিখে।
সেলুলার জেল তৈরির কাজ শেষ হয় ১৯০৬ সালে। তারপর থেকেই সেখানে যাবজ্জীবনের জন্য দেশান্তরী করা হতে থাকে বিপ্লবীদের। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন বাংলার বিপ্লবী। বাঘা যতিনের সমর্থক থেকে শুরু করে ‘যুগান্তর’ ও ‘অনুশীলন সমিতি’র শত শত সদস্যকে বন্দি রাখা হয়। এর মধ্যে অনেকের মৃত্যু, ফাঁসি হয় পোর্ট ব্লেয়ারের সেলুলার জেলে। আরও পরে পাঞ্জাবের ভগৎ সিং এর আন্দোলনের বহু সহযাত্রীকে আন্দামানে অন্তরীণ রাখা হয়, যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন বটুকেশ্বর দত্ত। অনেকে অনশন ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে জীবন দান করেন উপমহাদেশের স্বাধীনতার জন্য।
সেলুলার জেলের অন্যতম বিখ্যাত বাসিন্দা ছিলেন ভারতে হিন্দুত্ববাদের প্রবক্তা  বিনায়ক দামোদর সাভারকার, যার নামে পোর্ট ব্লেয়ারের বিমানবন্দরের নাম বীর সাভারকার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। হিন্দু ঐক্য দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে কখনোই তার বনিবনা হয়নি।
ভারতে ইতিহাসে সাভারকার কে দীর্ঘতম কঠোর জেলখানায় (৫০ বছর) দণ্ডিত করা হয়েছিল এবং ব্রিটিশ হোম বিভাগের ‘ডি (বিপজ্জনক) কারাগারে’ শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছিল ভিডি সাভারকারকে।
সেলুলার জেলখানায় নির্দোষ বন্দিদের মধ্যে সবচেয়ে তারঁ ওপর সবচেয়ে অধিক অমানবিক নির্যাতন হয়, দাঁত হ্যান্ডক্যাফ, শিকল গেজ, ক্রস-বার শাখা, তেজস্ক্রিয়তা ইত্যাদি ছাড়াও তেল-মিলিংয়ের মতো অত্যাচার তিনি পেয়েছিলেন ও সহ্য করেছিলেন।
সশস্ত্র প্রহরী পরিবেষ্টিত হয়ে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে ৪ ঠা জুলাই বীর সাভারকার আন্দামানে উপনীত হলেন। ১৮৫৭ সালে সিপাহী যুদ্ধের পর থেকে ভারতে মুক্তিকামী বীর যোদ্ধাদের উক্ত দ্বীপে অভ্যন্তরীণ রাখা হতো । দুশ্চর তপস্যারত দেশপ্রাণ  বীর পুরুষদের স্মৃতিবিজড়িত ভূখণ্ডে পদার্পণ করে বীর সাভারকার নীরবে স্বদেশ ভক্ত বীরপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন ।
বিখ্যাত সেলুলার বন্দি নিবাসে তিনি নির্দিষ্ট কক্ষে প্রবেশ করছেন , এমন সময় উপস্থিত হলেন মিস্টার বেরি । তিনি উপস্থিত হয়ে অত্যন্ত রুক্ষ স্বরে বীর সাভারকার কে প্রশ্ন করলেন “
 আপনিই মার্সেই থেকে পলায়নের চেষ্টা করেছিলেন?’
তা শুনে বীর সাভারকার গম্ভীরভাবে উত্তর করলেন, ” সে চেষ্টা করেছিলাম বৈকি । কিন্তু তাতে আপনার কি প্রয়োজন ? “
নবাগতের সঙ্গী অপরাপর বন্দীদের যে স্বাতন্ত্র আছে প্রথম আলাপেই মিস্টার বেরি তা উপলব্ধি করলেন।
 পরের দিন সকালে কয়েকজন ইউরোপীয় ভদ্রলোক বীর সভারকারকে দেখাবার জন্য মিস্টার বেরির সঙ্গে কারা কক্ষে উপস্থিত হলেন। মিস্টার বেরি সাভারকার  কে লক্ষ্য করে বললেন , “ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আপনিতো সংকলন করেছেন এবং সিপাহিদের শহীদ বলে বর্ণনা করেছেন ।”
বীর সাভারকার বললেন , “এ বিষয়ে আমি অনেক বই পড়েছি।”
 মিস্টার বেরি প্রশ্ন করলেন , “তা হলে এসব লুণ্ঠনকারী দস্যুদের স্বদেশ ভক্ত বীর পুরুষ বলে বর্ণনা করলেন কেন ? সিপাহী বিদ্রোহের সময় আমার বাবা ওইসব উশৃংখল জনতার হাতে ধরা পড়েছিলেন । আমি তার কাছে শুনেছি যে , ,নরপিচাশ  নানাসাহেব এমনকি সম্ভ্রান্ত বংশের ইংরেজ মহিলাদের উৎপীড়ন করেছিলেন .”
সাভারকর তৎক্ষণাৎ উত্তর করলেন ,”আপনার বাবা মিথ্যাবাদী । তিনি কি নিজে তা দেখেছেন?”
 হতমভব মিস্টার বেরি বললেন, ” যিনি প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি তাঁর নিকট শুনেছেন ।”
বীর সাভারকার বললেন, ” লখনৌতে ইংরেজ নর-নারী যখন বন্দী হয়েছিলেন তখন নানাসাহেব যে কানপুরে ছিলেন এটি ঐতিহাসিক সত্য ।”
সমাগত জনৈক ইংরাজ ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন , ” আপনি এইসব রাজদ্রোহীদের কে ঘৃণা করেন না ?”
বীর সাভারকার গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন , “আমি আমার জাতীয় নেতাদের অপমান সহ্য করতে পারব না। আপনারা আত্ম মর্যাদা রক্ষা করে কথা বলবেন । “
তাদের হতভম্ব ও নির্বাক দেখে বীর সাভারকর পুনরায় বললেন, ” নানাসাহেব, তাতিয়া তোপি ,প্রমূখ সংগ্রামী নায়কদের স্বার্থান্বেষী, নরহত্যা কারী কেন বলছেন ? তার প্রমাণ দেখাতে পারবেন? নানাসাহেব রাজদন্ড গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন আর তাতিয়া টোপি সুখ্যাতি চেয়েছিলেন, আপনারা এটি বড় অপরাধ বলে মনে করেন । কিন্তু আপনারা কি  জানেন  না, ভিক্টটর ইমান রাজ্য শাসন করতে চেয়েছিলেন, ওয়াশিংটন ও নেতৃত্বের জন্য ,নাম যশ এর জন্য লালায়িত ছিলেন। যদি তারা কেবল  তাদের মহানুভবতার জন্য আপনাদের স্মরণীয় ও বরণীয় হতে পারেন, তাহলে নানাসাহেব তাতিয়া তোপি কি অপরাধ করেছেন?”
 মিস্টার বেরি আর বাক্যালাপ না করে সঙ্গীগণ কে সাথে নিয়ে চলে গেলেন।
  সেলুলার জেল দেখতে বিশাল। কিন্তু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কক্ষে বিভক্ত ছিল ।মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারদিকে দেওয়া স্পর্শ করা যায় । অন্ধকার ময় এই রূপ ক্ষুদ্র কক্ষেই বন্দি দের বাস করতে হতো । তার উপর  আন্দামানের  আবহাওয়া অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর এবং নিরানন্দময় ছিল। বছরে বাতাসে তিন মাস অত্যন্ত উত্তাপ থাকে এবং বৃষ্টি এত অধিক হয় যে কখনো কখনো কয়েক সপ্তাহ সূর্যালোক দৃষ্টিগোচর হয় না। এর নৈসর্গিক পরিস্থিতি এবং কারাগারের অন্ধ আবেষ্টনী সাভারকারের মনে কোনো প্রভাববিস্তার করতে পারল না ।
কারণ তার দেহ ক্ষুদ্র কক্ষে আবদ্ধ থাকলেও তার কবি মন অন্তশূন্যে,  দিগন্তে, সাগর সৈকতে, কুসুম কাননে আনন্দে ঘুরে বেড়াতো । সেই আনন্দ লহরী সুললিত হয়ে ছন্দে উদগত হয়ে উঠত ।
কিন্তু তার ব্যক্ত করার বা লিপিবদ্ধ করার কোন উপায় ছিল না। আলোকের কোন ব্যবস্থা ছিল না এবং কাগজ-কলম বন্দির পক্ষে স্বপ্নরাজ্যের সামগ্রী ছিল।
 সুতরাং কাগজ-কলম অভাবে দেওয়ালেই অঙ্গার  ইটের টুকরো  বা নখের  সাহায্যে লিখে ও মুখস্ত করে রাখতেন। এজন্য তাকে দীর্ঘকাল কোনো কারা কক্ষে রাখা হত না। ঘন ঘন কারা পরিবর্তন করা হত।
এই কক্ষ পরিবর্তন করা তার লেখবার স্থানাভাবই পূরণ করত। তিনি এই সব কবিতা মুখস্থ করে রাখতেন। কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে আসবার সময় প্রায় দশ সহস্র কবিতা তিনি কন্ঠে বহন করে আনেন।  স্মৃতিশক্তি প্রাচীন বৈদিক মুনি ঋষিদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
আন্দামানের সেলুলার জেল বা কারাগারের সঙ্গে এই ভূখণ্ডে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সমাপ্তি এবং স্বাধীনতার ইতিহাসের এক বিরাট অংশ জড়িত। সে কারণেই বর্তমানে এ কারাগার অন্যতম দর্শনীয় স্থান। আন্দামানের পর্যটনের অন্যতম বা কেন্দ্রীয় আকর্ষণ সেলুলার জেল।
 স্বাধীনতা অর্জন অত্যন্ত কঠিন; কিন্তু হারানো মোটেও কঠিন নয়। প্রশ্ন জাগে, যাদের আত্মত্যাগে আমরা স্বাধীন হয়েছি, আমরা কি তাদের ত্যাগের মর্যাদা দিতে পেরেছি?
লেখা :- দুর্গেশনন্দিনী 

ঝান্ডার আড়ালে মার খাওয়াই কি পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুর ভবিষ্যৎ?

সময় বদলেছে, শাসক বদলেছে। কিন্তু হতভাগ্য হিন্দুর সুদিন ফেরেনি। বাম জমানায় লাল ঝান্ডার আড়ালে জিহাদি মুসলিমরা পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুর ওপর অত্যাচার চালিয়েছে। সেই দীর্ঘ অত্যাচার রাজনীতির সংঘর্ষের পরিচয়ে হিন্দুর সামনে তুলে ধরেছে মিডিয়া। ফলে এ রাজ্যের আপামর হিন্দু বুঝতেই পারেনি যে রাজ্যের অন্য প্রান্তে হিন্দুর ওপর জিহাদের স্টিম রোলার চালানো হয়েছে।
বর্তমানে শাসকদল পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু হিন্দুর ওপর অত্যাচার বিন্দুমাত্র কমেনি। টার্গেট সেই একই- হিন্দু; মার খেয়ে, ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালানো হিন্দু। তাই এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। এবার টিএমসির ঝান্ডা নিয়ে ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের হিন্দুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো সশস্ত্র জিহাদি মুসলিমরা। পুড়ে গেল ঘর-বাড়ি, ধানের গোলা, হিন্দুর দোকানঘর।
ঠিক আগের মতোই কোনো মিডিয়া দেখতে পেল না সেই ঘটনা। সেই আগের মতোই এই ঘটনাকে রাজনৈতিক সংঘর্ষ বলে চালানোর চেষ্টা করছে একদল লোক। এর মধ্যেই বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালাচ্ছেন কিছু হিন্দু। তাঁরা জানেন না, তারা ভোট দিতে গ্রামে ফিরে আসতে পারবেন কিনা। তবুও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গভীর নেশায় বুঁদ।
কিন্তু আজ পশ্চিমবঙ্গের তামাম হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে প্রশ্ন- এর শেষ কোথায়?
একবারও কি আপনারা ভেবে দেখবেন না ঝান্ডার আড়ালে টার্গেট আপনি, আপনার মন্দির, আপনার সম্পত্তি?

শুধুই কি মার খাবেন? নাকি পাল্টা মার দেবেন?

পশ্চিমবঙ্গ দিবস


Calcutta killing২০ শে জুন – পশ্চিমবঙ্গ দিবস। এই তথ্যটি হয়তো পাঠককে হতচকিত করে দিতে পারে কারণ ইতিপূর্বে তিনি এটি শোনেন নি বা এজাতীয় কোন তথ্য তাঁর কাছে নেই। কিন্তু এটিও ঠিক পাঠক অবহিত নন বলেই যে এরকম কোন দিবসের অস্তিত্ব বা যৌক্তিকতা নেই তাও কিন্তু নয়। এই সসাগরা পৃথিবীতে অনেক কিছুই ঘটে, তা প্রতি বছর স্মরণ ও করা হয়, যা আমরা জানিনা। পশ্চিমবঙ্গ দিবসটি কতকটা সেরকমই – এই দিনটিতে ১৯৪৭ সালে বর্তমান ভারতে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যটির জন্ম হয়েছিল, এক তীব্র মরণপণ সংগ্রাম ও রক্তস্নানের মাধ্যমে। এবং এটি দৃঢ়তার সাথেই বলা যায় যদি এই ভূখণ্ডটি সৃষ্টি না হতো, পূর্বতন অখণ্ড বঙ্গের অন্তত একটি অংশেও pluralism বলে কিছু অস্তিত্ব থাকতনা। সহস্র সহস্র হিন্দুর, সুমন জাহিদ, শাহজাহান বাচ্চুর রক্তস্নাত পার্শবর্তী বাংলাদেশ থেকে তা অন্তর্হিত হয়েছিল ‘৪৭ সালেই – তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ ১৯৪৯ র পূর্ব পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ২৯% র অধিকারী হিন্দুরা আজ সেখানে মাত্র ৮% এসে পৌঁছেছে এবং গবেষকদের মতে, উত্তরোত্তর ইসলামী বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার কল্যাণে সেটি শূন্য তে পৌঁছতে বেশী সময় নেবেনা। মুক্তমনা বা liberal দের অবস্থাও তথৈবচ এবং অভিজিৎ রায়, সুমন জাহিদ, ওয়াশিকুর রহমান, আসিফ মহিউদ্দিন, আহমেদ রাজীব হায়দার, হুমায়ুন আজাদ বা সদ্য নিহত শাহজাহান বাচ্চু তারই প্রমাণ। অর্থাৎ, ১৯৪৭ এ তৎকালীন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হিন্দু রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দেশবিভাগের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে পশ্চিমবঙ্গ র সৃষ্টি করেছিলেন তার সার্থকতা এই ভয়ঙ্কর সময়েই, যখন নিরন্তর আঘাতে সুস্থ, ধর্মীয় ও মানবিক চিন্তা রক্তাক্ত, বোঝা যায়।

আমাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষেরই ধারণা নেই যে ভারতে অবস্থিত প্রত্যেক অঙ্গরাজ্যেরই একটি করে রাজ্য দিবস আছে। অথচ সাম্প্রদায়িক বিভক্তি, রক্তস্নানের মধ্য দিয়ে বাঙালী হিন্দু জাতি র জন্য নির্মিত, ঐতিহাসিক ভাবে সত্য পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনে কেউ উৎসাহ প্রদৰ্শন করেননি। ভাবীকাল যদি জানতে চায় এই অনুৎসাহের কারণ – বাঙালী হিন্দু মনন কে অবদমিত করার জন্যেই কিনা – তখন তার উত্তর দিতে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্ব প্রস্তুত থাকবেন তো? পয়লা মে পালিত হয় মহারাষ্ট্রে “মহারাষ্ট্র দিবস” হিসেবে, ১ লা নভেম্বর কর্ণাটক দিবস ও ৩০ শে মার্চ রাজস্থান দিবস পালিত হয়। কিন্তু পশ্চিমবংগর ক্ষেত্রেই এতো বিড়ম্বনা কেন? সমস্যা হল রাজনীতির সেই ব্যবসাদারদের যাদের কাছে দেশপ্রেম, স্বজাতিপ্রীতি ও চেতনা বিক্রেয়। তাঁরাই এই ক্ষেত্রে বৃহত্তম প্রতিবন্ধকতা। তবুও জাতির নিদ্রাভঙ্গ হয়, চেতনা র উন্মেষ ঘটে, কালের চাকা পরিবর্তিত হয় ও ইতিহাস তার নয়া দাবী নিয়ে জাতির সম্মুখীন হয়। এটি স্মরণে রাখা প্রয়োজন, পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্ট হয়েছিল দেশভাগের সময়, বিশেষত জাতীয় স্বাধীনতা প্রাপ্তির আগে, অন্যান্য রাজ্যগুলির অধিকাংশের জন্ম হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের একক সিদ্ধান্ত হেতু। পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্ট হয়েছিল এই ভূখণ্ডের হিন্দু জনসাধারণের ঐকান্তিক ইচ্ছায়, বিশিষ্ট হিন্দু বুদ্ধিজীবিদের নেতৃত্বে ও রাজ্যবাসীর নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের বঙ্গীয় আইনসভায় সম্মিলিত ভোটদানের মাধ্যমে। তাই পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন এক ঐতিহাসিক ও আবশ্যিক কর্তব্যও বটে।

১৯৪৭-এ ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আইন অনুসারে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের ব্যবস্থা হল। যেহেতু বঙ্গীয় আইনসভা ভারত বা পাকিস্তানে যুক্ত হবার ব্যাপারে একমত ছিল না ফলে ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় আইনসভা ভেঙে তৈরি হল পূর্ববঙ্গ আইনসভা ও পশ্চিমবঙ্গ আইনসভা। মুসলমান প্রধান অঞ্চল নিয়ে হল পূর্ববঙ্গ ও হিন্দু প্রধান অঞ্চল নিয়ে হল পশ্চিমবঙ্গ। ঐ দিনেই পশ্চিমবঙ্গ আইনসভার সদস্যরা ৫৮-২১ ভোটে বাংলাভাগের পক্ষে ও পাকিস্তানে যোগদানের বিপক্ষে ভোট দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ গঠন সুনিশ্চিত করেন। ১৯৪৭ সালের ২০শে জুন তৈরী হল পশ্চিমবঙ্গ ও তার আইনসভা। ভারত স্বাধীন হল ১৫ ই আগস্ট, ১৯৪৭। কিন্তু ইতিহাসে এই প্রশ্নটি রয়ে যায় – অন্য কোন পন্থার কি সম্ভাবনা ছিল এই যন্ত্রণাময় পদ্ধতির পরিবর্তে? এই জিজ্ঞাসা এখনো দেখা দেয় গবেষক, চিন্তাবিদদের মনের গহনে কিন্তু পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিবেচনা করল বাঙালী হিন্দু জাতির অস্তিত্ব রক্ষার্থে পৃথক হওয়া ছাড়া অন্য কোন পথ ছিলোনা।

সংক্ষেপে, আলোকিত, ধীশক্তিসম্পন্ন, তেজস্বী বাঙালীকে ধ্বংস করার জন্য উদ্যত হয়েছিল মহাশক্তিরা যাঁর মধ্যে অন্যতম বা সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। বস্তুতপক্ষে, ১৯১১ সালে ব্রিটিশরাজ কর্তৃক বঙ্গভঙ্গ রোধের সময় থেকেই ঘনিয়ে এলো বাঙালী হিন্দুর কাল। যে সময়ে পৃথিবীজুড়ে উচ্চারিত হতো “Rule, Britannia! rule the waves: Britons never will be slaves”, সেই একই যুগে বাঙালী হিন্দুদের তেজস্বী প্রতিবাদ ও প্রত্যাঘাত হেতু বঙ্গভঙ্গ রোধ ব্রিটিশ রাজের কাছে চূড়ান্ত অপমানজনক মনে হয়েছিল। ফেব্রুয়ারী ১৭, ১৯০৪ সালে লর্ড কার্জন, ভারতবর্ষের তৎকালীন ভাইসরয়, একটি চিঠি লেখেন William St John Fremantle Brodrick (Secretary of State for India) কে,

“The Bengali is who like it themselves as a nation and who dream of a future when the English will be turned out and a Bengali Babu will be installed in the Government House, Calcutta, of course, bitterly resent any interfere that will be likely to interfere with the realization of this dream. If we are weak enough to yield to their clamor now, we shall not be able to dismember or deduce Bengal again; and you will be cementing and solidifying on the Eastern flank of India, a force already formidable and certain to be a source of increasing trouble in the future.”

– “Genesis of Pakistan” – Nagarkar.

বাঙালি হিন্দুর সম্বন্ধে লর্ড কার্জনের এই মূল্যায়ন আমাদের সাহায্য করে পরবর্তী যুগে ব্রিটিশ কর্তৃক বাঙালীর ধ্বংসের ধারাবাহিকতাকে অনুধাবন করতে। ব্রিটিশের যোগ্য সহযোগী হিসেবে মুসলিম লীগের পাকিস্তান গঠন ও হিন্দু জাতির নিশ্চিহ্নকরণের অভিমুখে ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কার্যাবলী এক নব অধ্যায়ের সৃষ্টি করে।

সমগ্র বাংলাতে হিন্দু আধিপত্য ক্রমাগত ক্ষুণ্ন করার সাথে ১৯৩২ সালের Communal Award, ভারত রক্ষা আইন – ১৯৩৫ প্রণয়নের মাধ্যমে অবস্থা এই পর্যায়ে পৌঁছল যে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ শ্রী নীরোদ চন্দ্র চৌধুরী পর্যন্ত স্বীকার করলেন হিন্দুদের দেখার কিছু থাকলো, বলার কিছু থাকলো কিন্তু করার কিছু থাকলোনা। অর্থাৎ ১৯৩৫-৩৬ সালের মধ্যেই অবিভক্ত বঙ্গের একদা প্ৰচণ্ড শক্তিশালী বাঙালী হিন্দু, কি শিক্ষা, কি অর্থনীতিতে, পথের কপর্দকহীন ভিক্ষুকে পরিণত হল প্রায়। যেটুকু বাকি ছিল তাও সম্পূর্ণ হল ১৯৩৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক শ্রীপদ্মর বিদায়ের মাধ্যমে। শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে এই প্রথম মুসলমান ও হিন্দুর সম্মুখ সমর হল ও শিক্ষাক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক কর্ম সত্বেও হিন্দু সমাজ পরাজিত হল। ৪০ র দশকের বাংলার মুসলিম লীগ সরকার দ্বারা আনীত মহা বিতর্কিত ও সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতদুষ্ট “Secondary Education Bill” এবং তার বিরুদ্ধে শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হিন্দু সমাজের সংগ্রাম রাজনৈতিক উত্তাপকে এক নয়া মাত্রা প্রদান করে। সংগ্রাম এতো গুরুতর হয়ে ওঠে যে জনাব আবু হোসেন সরকারের মতো ব্যক্তিও বলে ওঠেন যে এই bill শিক্ষাক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হলে, “হিন্দুস্তান বা পাকিস্তান র পরিবর্তে চারিদিকে শুধু গোরস্থানই থাকবে।”

কিন্তু পাকিস্তান গঠনের নেশায় উন্মত্ত মুসলিম লীগ ও জিন্না এই জ্ঞানগর্ভ উপদেশ শোনার জন্য অপেক্ষা করেননি। বাংলার বিধানসভায় একের পর এক bill এনে হিন্দুজমিদারশ্রেণীর ক্ষতিসাধন করে কৃষক দরদী সাজার উন্মাদনা তখন লীগ কে গ্রাস করেছে কিন্তু অচিরেই বোঝা গেল দরদের পরিবর্তে সমগ্র বাংলাতে এক ইসলামিক রাজত্ব গড়ার জন্যে সে মরিয়া। তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ হল আগস্ট ১৬, ১৯৪৬ র সম্মুখ সমর, ইতিহাসে যা প্রসিদ্ধ “Direct Action Day” হিসেবে। একইসময়ে ক্রমশ রসাতলে যাওয়া পরিস্থিতির ওপর রাশ টানার পরিবর্তে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ সরকার উত্তাপ অনুভব করলেন সেই আগুনের যা সমগ্র ভারতকে দগ্ধ করল। ১৬ ই আগস্ট ও তারপরের কয়েকটি দিন কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যা ঘটল তাকে বোধহয় নারকীয় আখ্যাও দেওয়া চলেনা। তার প্রারম্ভ হয়েছিল মুসলিম লীগের নেতৃত্বে নৃশংসতম ইসলামী আক্রমণে, শেষ হল হিন্দুদের ভয়াল, ভয়ঙ্কর প্রত্ত্যুত্তরে। অক্টোবর ১০, ১৯৪৬ – কোজাগরী লক্ষী পূর্ণিমার রাত্রে গোলাম সারওয়ারের নেতৃত্বে নোয়াখালীর সংখ্যালঘু হিন্দুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কাশেমের ফৌজ, যে অগ্নি নির্বাপিত করতে স্বয়ং গান্ধীজিকে ছুটে আসতে হয়েছিল সেখানে এবং নোয়াখালীর প্রতিক্রিয়ায় অক্টোবর ২৬ এ বিহারে হিন্দুরা ঝাঁপিয়ে পড়ল সেখানকার মুসলমান অধিবাসীদের ওপর। তারপরই জ্বলে উঠল উত্তরপ্রদেশের গড়মুক্তেশ্বর। এর মধ্যেই ঘটলো শ্রীহট্টের গণভোটের এক কলঙ্কজনক অধ্যায় – যেদিন গণতন্ত্রের সমস্ত ধ্যানধারণার বলাৎকার করে শ্রীহট্টকে তুলে দেওয়া হল পূর্ব পাকিস্তানের হাতে ও তার সাথেই পূর্ণ হল বাঙালী হিন্দু সমাজের সর্বনাশের ইতিবৃত্ত। বাঙালীর সেই পলায়ন আজও থামেনি। ‘৪৭ এ তার পরিচয় ছিল ধুবুলিয়া উদ্বাস্তু ক্যাম্পের অধিবাসী হিসেবে, আজ তার পরিচয় আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পের উদ্বাস্তু হিসেবে।

কিন্তু ১৬ ই আগস্ট যে ভয়ঙ্কর ঘটনাপ্রবাহ শুরু হল কলকাতায় (ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একদা রাজধানী) তা থামলোনা ভারতের স্বাধীনতার পরেও, এমনই ভয়ঙ্কর ছিল পারস্পরিক বিদ্বেষ, তৎসহ হিন্দু প্রতিক্রিয়া।

“২৭ ডিসেম্বর, ১৯৪৬ অখিল ভারত হিন্দু মহাসভার গোরক্ষপুর অধিবেশনে দেশভাগের দাবী তুলে ‘স্বধর্ম রক্ষার কারণে রক্তস্নানের জন্যে’ হিন্দুদের প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন এল. বি. ভোপটকর। মহাসভা এই উদ্দেশ্যে একটি কমিটি গঠন করে ফেলে; চারমাস পরে সাতচল্লিশের এপ্রিল মাসে বঙ্গীয় হিন্দু মহাসভার তারকেশ্বর অধিবেশনে নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় দেশভাগকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন। নির্মলচন্দ্র বলেন, হিন্দুদের কাছে এটা জীবন-মরণের প্রশ্ন; ‘বাঙলার হিন্দুরা জাতীয় সরকারের অধীনে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ গঠন করবে।’ দিল্লীর একটি সভায় শ্যামাপ্রসাদ এমনও বলেন যে, পাকিস্তান যদি নাও হয়, তাহলেও বাঙলার হিন্দুদের জন্য একটা আলাদা প্রদেশ চাই: Even if Pakistan is not conceded….we shall demand the creation of a new province composed of the Hindu majority areas in Bengal. সাতচল্লিশের গোড়াতেও শ্যামাপ্রসাদ দেশভাগের কথা বলেননি; কিন্তু এখন তাঁর মনে হয়, দেশভাগ ছাড়া অন্য কোন সমাধান তিনি দেখতে পাচ্ছেন না।“

“কলকাতার নাগরিক জীবন তখন একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। টানা কারফিউ চলে অঞ্চলে অঞ্চলে। দাঙ্গার পিছনে সরকারের মদত রয়েছে। হিন্দু পত্র-পত্রিকার ওপরেও দমনপীড়ন চলছে। এক বিশেষ অর্ডিন্যান্স বলে অমৃতবাজার পত্রিকা, হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড, আনন্দবাজার পত্রিকা, মডার্ন রিভিউ-এর ওপর জরিমানা ধার্য করা হয়; বাজেয়াপ্ত করা হয় জমা রাখা টাকা (ডিপোজিট)। ক্রমাগত দাঙ্গায় উৎপীড়িত হিন্দুর ক্ষোভ তাই একটা সমাধানের দিশা দেখতে পায় হিন্দু মহাসভার দাবীতে; হিন্দু পত্র-পত্রিকাও সমর্থন করেন সেই দাবী।“

‘অর্চনা’ পত্রিকা (শ্রাবণ, ১৩৫৪) তারকেশ্বর অধিবেশনের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ লেখা ছাপে। মডার্ন রিভিউ (মে, ১৯৪৭) মন্তব্য করে: ‘দেশভাগ এখন একটা “গৃহীত সত্য” (accepted fact) হয়ে গেছে।’ ডিসেম্বর মাসেই ‘প্রবসি লিখেছিল: ‘দুই সম্প্রদায়ের মিলনের আশা সুদূর পরাহত। ……বঙ্গ বিভাগের প্রস্তাব স্থিরভাবে বিচার করা প্রয়োজন হইয়াছে।’ সেই কথারই পুনরাবৃত্তি করে এখন ‘প্রবাসী’; ‘শনিবারের চিঠি’ (বৈশাখ, ১৩৫৪) পরিষ্কার লেখে: ‘পৃথক হইয়া যাওয়াই ভাল।’ হিন্দু পত্র-পত্রিকার প্রচারে হিন্দু মহাসভার দাবী প্রায় গণদাবীর চেহারা নেয়। গ্যালপ পোলের ভেতর দিয়ে ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ প্রমাণ করে দেয়, পাঠকদের ৯৮ শতাংশই বাঙলা ভাগ চায়; বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করার জন্যে অমৃতবাজার পত্রিকা ‘বেঙ্গল পার্টিশন ফান্ড’ নামে একটা তহবিলই খুলে ফেলে। “ইতিহাসের দিকে ফিরে দেখা – ছেচল্লিশের দাঙ্গা” – শ্রী সন্দীপ বন্দোপাধ্যায়

কে ছিলেন না এই মহতী সংগ্রামে? পশ্চিমবঙ্গের দাবী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্য্যায় একাকী কিন্তু ক্রমে যুক্তি ও বোধে শাণিত হয়ে তাঁর পাশে দৃঢ়চিত্তে এসে দাঁড়িয়েছিলেন শ্রী প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ, শ্রী নলিনাক্ষ সান্যাল, পন্ডিত লক্ষীকান্ত মৈত্র, শ্রী নীহারেন্দু দত্ত মজুমদার, মেজঃ জেনাঃ এসি চ্যাটার্জি, শ্রী নলিনীরঞ্জন সরকার, শ্রী যাদবেন্দ্রনাথ পাঁজা, শ্রী বিধানচন্দ্র রায়, ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ডঃ মেঘনাদ সাহা, স্যার যদুনাথ সরকার, ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার, ডঃ মাখলাল রায়চৌধুরী, অমৃতবাজার-যুগান্তর পত্রিকা গোষ্ঠী, আনন্দবাজার পত্রিকা, দৈনিক বসুমতি, Modern Review ও প্রবাসী গোষ্ঠী, ডঃ রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায়, ডঃ বিনয় সরকার প্রমুখ ব্যক্তিগণ।

এমতাবস্থায়, ২০শে জুন, ১৯৪৭ অখণ্ড বাংলার হিন্দু প্রধান অঞ্চলের সদস্যরা পৃথকভাবে বসেন। কংগ্রেসের সঙ্গে হিন্দু মহাসভা ও কম্যুনিস্ট প্রতিনিধিরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ভোট দেয় এবং পক্ষে সর্বমোট ভোট পড়ে ৫৮টি। মুসলিম লীগ বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের বিরোধী হিসেবে দলবদ্ধভাবে ভোট দেয়; তাদের পক্ষে ভোট পড়ে ২১টি। ৫৮-২১ ভোটে বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব, সমস্ত প্রতিকূলতার বিপক্ষে আসীন হয়ে, গৃহীত হয়ে। এটি বলা প্রয়োজন, মাউন্টব্যাটেন রোদেয়াদে এটি পূর্ব থেকেই সিদ্ধান্ত ছিল, একটি বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিরা বাংলা ভাগে ইচ্ছুক হলেই, প্রস্তাব গৃহীত হবে। হিন্দু বিভাগে সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেস সেই পথেই যায়, সৃষ্টি হয় পশ্চিমবঙ্গের।

গত ৭০ বছরে ভাগীরথী দিয়ে বহু জল গড়িয়ে গেছে। মূলত, হিন্দুদের জন্য গঠিত হলেও পশ্চিমবঙ্গ এখন হিন্দুদের হাতছাড়া; অবস্থা এমন যে তাঁরা বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত প্রকাশ, প্রতিবাদে আগ্রাসী হওয়ার সাহসটুকুও হারিয়েছেন. এই হতশ্রী অবস্থা বর্তমানে কেন তা নিয়ে চর্চার প্রয়োজন।সমস্যাটি আত্মস্থ করে, আপন ত্রুটি সংশোধনের মাধ্যমে বাঙালী হিন্দুর পক্ষে পুনরায় অগ্রসর হতে আজ মণীষা র প্রয়োজন, প্রজ্ঞার প্রয়োজন।

 সৌজন্য: বঙ্গদেশ পত্রিকা

লেখক: অনিমিত্র চক্রবর্তী

মহারাজা প্রতাপাদিত্য – বাঙালির এক গর্বিত ও বিস্মৃত ইতিহাস

অঞ্জন বসু 

pratapadityaবঙ্গের বীর যোদ্ধা মহারাজা প্রতাপাদিত্য,বাঙালির এক গর্বিত ও বিস্মিত ইতিহাস।।
 গুহ বংশীয় কায়স্থ, মহারাজা বিক্রমাদিত্য ও রাজা বসন্ত রায় যশোর রাজ্যের কর্ণধার ও স্রষ্টা। এই বংশের স্বনামধন্য রাজা। মহারাজা প্রতাপাদিত্যই এখন আমাদের আলোচ্য বিষয়।১৫৬০ খৃষ্টাব্দে বা তার অব্যবহিতর পরে, শ্রীহরি বিক্রমাদিত্যর ঔরসে বসু কন্যার গর্ভে একটি সন্তানের জন্ম হয়। তার নাম রাখা হয় প্রতাপ গোপীনাথ। এই প্রতাপই বিশ্ববিশ্রুত বঙ্গেশ্বর মহারাজা প্রতাপাদিত্য। যুবরাজ অবস্থায় তিনি প্রতাপাদিত্য নামে পরিচিত হয়েছিলেন।
রাম রাম বসু প্রতাপ সম্পর্কে লিখেছেন, “জ্যোতিষিরা বললেন সব বিষয়েই উত্তম কিন্তু পিতৃদ্রোহী। হরিষেবিষাদ মনে রাজা অন্নপ্রাশনে পুত্রের নাম রাখলেন প্রতাপাদিত্য।” কার্যক্ষেত্রে প্রতাপ মাতার মৃত্যুর কারণ হয়েছিলেন এবং পিতৃদ্রোহী হয়েছিলেন। তাঁর বয়স যখন মাত্র ৫দিন তখন সুতিকাগৃহে তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। শ্রীহরি পত্নী বিয়োগে যেমন মর্মাহত হলেন তেমনি পুত্রের পিতৃঘাতী হওয়া নিশ্চিত মেনে নিয়ে অশান্তি ভোগ করতে লাগলেন। সুতরাং প্রথম হতেই তিনি প্রতাপের উপর বিরক্ত হলেন।
প্রতাপ পিতৃস্নেহ তিনি বিশেষ পাননি। অল্প বয়সে মা মারা যাওয়ায় কাকীমা বসন্ত রায়ের প্রথমা স্ত্রীর স্নেহে লালিত পালিত হতে থাকেন। পিতা তাঁর উপর বিরক্ত থাকলেও স্নেহমমতার মুর্তিমান অবতার রাজা বসন্ত রায়ের স্নেহগুণে তাঁর বিশেষ কোন ক্ষতি হয়নি। খুল্লতাত পত্নীর অতুল স্নেহে প্রতাপের যে নিজের জননী নাই তা তিনি জানতেন না। প্রতাপ কাকীমাকে মা জ্ঞান করে বড় ভক্তি করতেন। তাঁর ঔদ্ধত্য মায়ের স্নেহের কটাক্ষে বিলুপ্ত হতো। প্রতাপের রাজত্বকালে এই মাতাই “যশোহরের মহারাণী” বলে পরিচিত ছিলেন।
অতি শিশুকালে প্রতাপ শান্ত ও নিরীহ ছিলেন। আপত্য স্নেহের প্রভাবে বাল্যকালেই প্রতাপ চঞ্চল ও অস্থিরমতি হয়ে উঠলেন। এই সময় প্রতাপ বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও মেধাবী ছিলেন। তিনি জীবনে সংস্কৃত, ফারসী ও বাংলা ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি সংস্কৃতি তান্ত্রিক স্তবাদি অতি সুন্দর আবৃত্তি করতেন। ফারসীতে পত্র লিখতে ও অতি সুন্দরভাবে কথা বলতে পারতেন। প্রাদেশিক বাংলায় তিনি সৈন্যগণের সহিত কথা বলতেন। এই সব শিক্ষাই তাঁর তত মত ছিল না। তিনি শাস্ত্র অপেক্ষা শস্ত্র শিক্ষায় অধিক পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁর সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট শিক্ষক ছিলেন রাজা বসন্ত রায় স্বয়ং। তিনি পিতৃব্য বসন্ত রায়ের সুযোগ্য অভিভাবকত্বের উত্তর কালে যশোর রাজ্যের সুযোগ্য ব্যাক্তিত্ব হিসেবে গড়ে ওঠেন। পূর্ব থেকেই রাজা বসন্ত রায় উদীয়মান যুবকের অদম্য উদ্যম ও লোক পরিচালনায় ক্ষমতা দেখে প্রতাপের সম্পর্কে অনেক কিছু আশা করতেন।
বাল্যকালে প্রতাপ যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। তিনি তরবারী, তীর চালনা ও মল্লযুদ্ধে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। জন্মাবধি সুন্দরবনের সাথে প্রতাপের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। তিনি সুন্দরবনের জঙ্গলে বাঘ, হরিণ, গন্ডার (পূর্বে ছিল) প্রভৃতি শিকার করতেন। প্রতাপ বন্ধুবান্ধবসহ অরণ্যে প্রবেশ করে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেন। এই সময় বালক প্রতাপের উচ্ছৃঙ্খলতায় বিক্রমাদিত্য ও বসন্ত রায় বড়ই বিপদে পড়লেন। অবশেষে উভয়ে পরামর্শ করে স্থির করলেন যে, বিবাহ দিলে প্রতাপের মতির পরিবর্তন হতে পারে। এই জন্য তারা উভয়ে উদ্যোগী হয়ে প্রতাপের বিবাহ দিলেন। ঘটকারিকায় প্রতাপের তিন বিবাহের কথা উল্লেখ আছে। সর্বপ্রথম প্রতাপের বিবাহ হয় পরমকুলীন, জগদানন্দ রায়ের (বসু) কন্যার সাথে। ১৫৭৮ খৃষ্টাব্দে প্রতাপ সম্মানিত জিতামিত্র নাগের কন্যা শরৎকুমারীর সাথে মহাসমারোহে বিবাহ করেছিলেন। এই শরৎকুমারীই তাহার পাটরাণী বা প্রধান মহিষী ছিলেন। প্রতাপের তৃতীয় বিবাহ হয়েছিল প্রতাপের রাজা হবার অনেক পরে। বিবাহ হইল পরমাসুন্দরী, গুণবতী, প্রণয়িনী রূপে স্ত্রী পেলেন, কিন্তু তার ঔদ্ধত্য ও মৃগয়াভিযান কমিল না।১৫৭৮ খৃষ্টাব্দের শেষভাগে প্রতাপ সূর্যকান্ত ও শংকরের সহিত রাজা বসন্ত রায়ের পত্র নিয়ে আগ্রার দরবারে উপস্থিত হন।এবং দিল্লির দরবারের সনদ নিয়ে নাম মাত্র বাৎসরিক করের বিনিময়ে যশোর রাজ্য শাসনের অনুমতি লাভ করেন, এভাবে প্রতাপ কৌশলে পিতাকে অপসারণ করে যশোর রাজ্যের অধীশ্বর হলেন।এবং বাংলায় ফিরে নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।।
প্রতাপ রাজ্যের অধীশ্বর হবার পর রাজধানী স্থানান্তরের পরিকল্পনা করেন। ১৫৮৩ সালে রাজা বিক্রমাদিত্যের মৃত্যুর পর যশোর নগরের ৮/১০ মাইল দক্ষিণে যমুনা নদী ও ইছামতী নদীর সংগম স্থলে সুন্দরবন ঘেষে ধুমঘাট নামক স্থানে এক নতুন নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। তথায় প্রতাপাদিত্যের রাজাভিষেক সম্পন্ন হয়। ধুমঘাটের ধ্বংসাবশেষ বর্তমানে বাংলাদেশের তীরকাটি জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত। ধুমঘাটের দূর্গ নির্মাণের প্রধান ভার ছিল পাঠান সেনাপতি কামাল খোজার উপর। প্রবাদ আছে যে, প্রতাপের রাজ্যভিষেক উৎসবে এক কোটি টাকা খরচ হয়েছিল।
মহারাজা বিক্রমাদিত্যের মৃত্যুর পর যশোর রাজ্য দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছিলেন। প্রতাপ ও বসন্ত রায়ের মধ্যে জমিদারির সম্পত্তি বিভক্ত হইল। প্রতাপ জমিদারির দশ আনা অংশ এবং বসন্ত রায় জমিদারির ছয় আনা অংশ পেলেন। বসন্ত রায় এ অসম বন্টন আপোষেই মেনে নেন এবং স্বীয় পুত্রদের ভবিষ্যতে এ নিয়ে প্রশ্ন না তোলার জন্য নির্দেশ দেন। রাজ্য বিভাজনের পরও বসন্ত রায় অনেক দিন রাজ্যের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন।
বাংলার বার ভূঁইয়াদের অন্যতম প্রতাপাদিত্য সিংহাসনে আহরণ করেই সৈন্যবল বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করেন। সুচতুর প্রতাপ প্রথম থেকেই মোঘলদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন।যেসব যুদ্ধযাত্রা করেন উড়িষ্যা অভিযান উল্লেখযোগ্য। উড়িষ্যা থেকে তিনি গোবিন্দ দেব বিগ্রহ এবং উৎকলেস্বর থেকে শিব লিংগ এনে গোপালপুর ও বেদকাশী নামক স্থানে স্থাপন করেন।
 মহারাজা প্রতাপাদিত্য রাজদন্ড গ্রহণ করে বঙ্গোপসাগরের উপকূল ভাগে মগ ও পর্তূগীজ জলদস্যুদের অত্যাচার দমনে মনোনিবেশ করেন। মগ ও ফিরিংদের অত্যাচারে ভারতের ভূস্বর্গ বঙ্গ দেশে অরাজকতার সৃষ্টি হল। মগেরা কোন শাসন মানত না। মগেরা যে মুল্লুকের যেত সে এলাকাকে একেবারে ধ্বংস করে ছাড়িত। তৎকালে দক্ষিণ বঙ্গ জলদস্যুদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল। তারা এদেশের নারী পুরুষ ধরে নিয়ে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করতো। বন্দীদেরকে হাতের তালুতে ছিদ্র করে সরু বেত ঢুকিয়ে হালি করে জাহাজের পাটাতনের নীচে বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হতো। ভাগীরথী থেকে সুদুর চট্টগ্রাম পর্যন্ত তারা এরুপ উপদ্রব চালাত। এসব জলদস্যুদের হার্মাদ বলা হত। প্রতাপাদিত এদের বশীভূত করেন। অনেকেই তাঁর সেনাবাহিনীতে যোগদান করেছিল। প্রতাপ আরাকান রাজ কে পরাজিত করে তার কাছথেকে সন্দীপ নামক দ্বীপ জয় করেন।। মহারাজা প্রতাপাদিত্য ও মহারাজা কেদার রায় এর সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। মহারাজ কেদার রায়ের মৃত্যুর পরে তার সেনাপতি কে কোবালো কে হত্যা করেন।
প্রতাপ রাজনীতি বিশারদ ছিলেন। প্রতাপের রাজত্বকালে তিনি প্রয়োজন বুঝে নানা স্থানে দূর্গ নির্মাণ করেন। প্রতাপের দূর্গসমূহ পশ্চিমে হুগলী নদী থেকে পূর্বে বালেশ্বর নদী পর্যন্ত এলাকা জুড়ে ছিল। তিনি বেশ কয়েকটি দূর্গ নির্মাণ করেন। সেগুলোর নাম হল – যশোর দূর্গ, ধূমঘাট দূর্গ, কমলপুর দূর্গ, বেদকাশী দূর্গ, শিবসা দূর্গ, জগদ্দল দূর্গ, সালিখা দূর্গ, সাতলা দূর্গ, আড়াই বাকী দূর্গ, মনি দূর্গ, রায়মঙ্গল দূর্গ, তকশ্রী দূর্গ ইত্যাদি। এই সমস্ত দূর্গের অনেকগুলি গভীর অরণ্যে অবস্থিত ছিল। এখনও কিছু কিছু দূর্গের ভগ্নাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়।
প্রতাপাদিত্য নিম্নবঙ্গ ও সুন্দরবন অঞ্চলে নদীনালা ও খাল বিলের কথা বিবেচনা করে নৌশক্তি ও নৌবাহিনীর দিকে মনোনিবেশ করেন। দেশে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংস্থান, নদীর অবস্থা ও উপকূলের প্রকৃতি বিচার করে কাতরী নির্মাণ করেন। প্রতাপ বাহিনীর ব্যবহৃত দ্রুতগামী নৌকা সমূহের মধ্যে ছিল – ঘুরাব, বেপারী, কোশা, বলিয়া, পাল, মাচোয়া, পশতা, জালিয়া, পিয়ারা, মহলগিরি প্রভৃতি। এই সকল নৌকাসমূহের মধ্যে ঘুরাব সবচেয়ে শক্ত ওশক্তিশালী। তার সময়ে যশোরের কারিগরগণ জাহাজ নির্মাণে বিশেষত্ব লাভ করেছিল। তৎকালে শায়েস্তা খাঁ যশোর হতে অনেক জাহাজ প্রস্তুত করে নিয়েছিলেন। প্রতাপাদিত্যের উৎকৃষ্ট কাতরীর সংখ্যা সহস্রাধিক ছিল। ইসলাম খাঁর নবাবী আমলে আব্দুল লতীফ নামে একজন ভ্রমণকারীর বিবরন হতে জানা যায়, “প্রতাপাদিত্য বঙ্গদেশের শক্তিশালী রাজা। তাঁর যুদ্ধসামগ্রীতে পূর্ণ সাতশত নৌকা এবং বিশ হাজার পদাতিক সৈন্য ছিল এবং তার রাজ্যের আয় পনের লক্ষ টাকা।” কালীগঞ্জ – শ্যামনগর সড়কের পূর্ব পার্শ্বে মৌতলার নিকট তার জাহাজ ঘাটা কুআর বন নামক স্থানে জাহাজের পোতাশ্রয় ছিল। নিকটবর্তী দুদলিয়া গ্রামে ছিল তার কাতরী নির্মাণের বন্দর। জাহাজঘাটার নৌবিভাগের সর্বাধ্যক্ষ ফ্রেডারিক ডুডলির নামে একটি গ্রাম আছে। বন্দরের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন নৌসেনার অধ্যক্ষ ছিলেন অগাষ্টস পেড্রো।
প্রতাপাদিত্যের সেনাপতিদের মধ্যে সূর্যকান্ত ও শংকর প্রতিপত্তিশালী ছিলেন। সুপন্ডিত, ধীরস্থির কর্তব্যকাসার এবং ব্রাহ্মনোচিত প্রতিভা সম্পন্ন শংকর চক্রবর্তী রাজস্ব ও রাজ্য শাসনের ব্যাপারে পরিদর্শন করতেন। মহাযোদ্ধা, অসমসাহসী, সবশাস্ত্র বিশারদ এবং লোক পরিচালনে অদ্বিতীয়, ক্ষমতাশালী সূর্যকান্ত  রাজত্বের প্রথম ভাগে রাজ্যের প্রধান সেনাপতি ছিলেন। তিনি সৈন্য রক্ষণ, যুদ্ধব্যবস্থা ও বলসঞ্চয়ের দায়িত্ব পালন করতেন। শঙ্কর দেওয়ান ও মন্ত্রণা বিভাগের কর্তা এবং সূর্যকান্ত সৈন্যবিভাগের অধ্যক্ষ। প্রতাপ হিন্দুরাজা হয়েও পাঠান ও পর্তুগীজ সৈন্যরা যুদ্ধে অধিকতর দক্ষ ছিলেন বলে তাদের নিযুক্ত করতেন। প্রতাপের সেনাবাহিনীতে নয়টি ভাগ ছিল। প্রধান সেনাপতির অধীন এর প্রত্যেক বিভাগে পৃথক পৃথক সেনানী ছিল। সেনাবাহিনীতে ঢালি বা পদাতিক সৈন্য, অশ্বারোহী সৈন্য, তীরন্দাজ সৈন্য, গোলন্দাজ সৈন্য, নৌ সৈন্য, গুপ্ত সৈন্য, রক্ষী সৈন্য, হস্তী সৈন্য, পার্বত, কুকী সৈন্য, এই নয় বিভাগে বিভক্ত ছিল। যুদ্ধে ঢাল, তলোয়ার, শড়কী, বল্লম, লেজা, কামান, বন্দুক, বর্শা, তীর প্রভৃতি অস্ত্র শস্ত্র ব্যবহৃত হতো। প্রতাপের ঢালী বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন মদন মল্ল। অশ্বারোহী বাহিনীর প্রধান অধ্যক্ষ প্রতাপ সিংহ দত্ত এবং সহকারী ছিলেন মাহিউদ্দীন, বৃদ্ধ নূরউল্লা প্রভৃতি। তীরন্দাজ বাহিনীর প্রধান ছিলেন সুন্দর ও ধুলিয়ান বেগ। গোলন্দাজ বাহিনীর অধ্যক্ষ ছিলেন ফ্রান্সিসকো রড়া। নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন অগষ্টাস পেড্রো। সুখা নামক এক দুঃসাহসী বীর গুপ্ত বাহিনীর প্রধান ছিলেন। রক্ষী বাহিনীর প্রধান ছিলেন রত্নেশ্বর বা যজ্ঞেশ্বর নয়, বিজয় রাম ভক্ত চৌধুরী প্রমুখ। হস্তী সৈন্য বাহিনীর কোন অধ্যক্ষের নাম পাওয়া যায় না। পাত্রি কুকী বাহিনীর প্রধান ছিলেন রঘু। মহারাজ প্রতাপাদিত্যের আরাধ্য দেবী ছিলেন মাদুর্গা যিনি যশোরেরস্বরি নামে পরিচিত ছিলেন।
প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় যে, ১৫৮৭ খৃষ্টাব্দে প্রতাপাদিত্য নিজ হাতে রাজ্য শাসন শুরু করেন। ঐ বছরই ধুমঘটি দুর্গ নির্মাণ শুরু হয় এবং অচিরেই কাজ সমাপ্ত হয়। উড়িষ্যা যুদ্ধ থেকে ফিরবার পরে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণার মনস্থ করেন এবং মোঘলদের বিরুদ্ধাচারণ করতে শুরু করেন। পিতৃব্য বসন্ত রায় তাঁকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করেন এবং ভয়াবহ পরিণামের কথা বুঝায়ে দেন। প্রতাপ নিষেধ বাণীর উল্টো মর্ম বুঝে বসেন। পিতৃব্য ও ভ্রাতুষ্পুত্র একে অপরের প্রতি বিশ্বাস থাকল না। প্রতাপ সর্বদা বসন্ত রায়কে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন।
প্রতাপ কিছুদিন তার খুড়ার সাথে সদ্ভাব রক্ষা করে চলেছিলেন। বসন্ত রায় নানাবিধ সৎকার্য সাধন করে প্রজাদের প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন। পিতৃব্যের এই সুনাম প্রতাপের মনে বিদ্বেষভাবের জন্ম দেয়। এক শ্রাদ্ধ উৎসবে নিমন্তণ পেয়ে প্রতাপ পিতৃব্যের বাড়িতে গমন করেন এবং সামান্য একটা কথায় সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তিন পুত্র সহ তাহাকে হত্যা করেন। এই হত্যাকান্ডের সময় বসন্ত রায়ের কনিষ্ঠ পুত্র রাঘব রায় এক কচুবনে আত্মরক্ষা করেন বলে পরবর্তীকালে তিনি কচুরায় নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন।
কেউ কেউ বলেন যে, প্রতাপ ও তাহার জামাতা রামচন্দ্র রায়ের মধ্যে যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়েছিল, তার মূলে বসন্ত রায়ের কারসাজি ছিল। প্রতাপ শুধুমাত্র পিতৃব্যকে হত্যা করে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। পিতৃব্যের মৃত্যুর পর প্রতাপাদিত্য সমগ্র যশোর রাজ্যের অধিকার লাভ করেন এবং মহারাজ উপাধি ধারণ করে রাজ্য শাসন করতে থাকেন।
এই সময় বাংলা ও উড়িষ্যার মোঘল-পাঠান শক্তির মধ্যে সংঘর্ষ চলতে থাকে। প্রতাপ স্বভাবতই পাঠান শক্তির অনুকূলে ছিল। সেসময় তার মনে ভাটি বাংলায় একটি স্বাধীন রাজ্য সংস্থাপনের আশাও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। ১৫৯৯ খৃষ্টাব্দের কাছাকাছি প্রতাপ বাংলার মোঘল সুবেদারকে অমান্য করে রাজ্য শাসন করে যেতে লাগলেন এবং স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন।
প্রতাপাদিত্যের সমর সজ্জার উদ্দেশ্য বাংলার সুবাদারের কর্ণগোচর হলে তিনি পর্যায়ক্রমে শের খাঁ এবং ইব্রাহীম খাঁ নামক দুইজন মোঘল সেনাপতিকে প্রতাপের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলেন। কিন্তু তার প্রতাপকে সামান্য ভূস্বামী মনে করে যশোহরে আসলে । প্রতাপও তার সেনা বাহিনীর নিকট পরাজয় স্বীকার করে পশ্চাদপসরণ করল।।
প্রতাপাদিত্যের এই সকল বিজয় বার্তা চারদিকে ছড়ায় পড়লো। বিভিন্ন এলাকার ভূইয়াগণ তাঁর সহিত মৈত্রী স্থাপন করে মোঘল বাদশাহের বিরুদ্ধে সমবেতভাবে যুদ্ধ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। প্রতাপাদিত্যের এই সকল কীর্তি কথা স্মরণে কবি ভরতচন্দ্র রায় গুণাকর তার ‘অন্নদামঙ্গল কাব্যে’ লিখিয়াছেন-
যশোর নগর ধাম  প্রতাপাদিত্য নাম
মহারাজ বঙ্গজ কায়স্থ
নাহি মানে পাতশায়  কেহ নাহি আঁটে তায়
ভয়ে যত নৃপতি দ্বারস্থ।।
বরপুত্র ভবানীর  প্রিয়তম পৃথিবীর
বায়ান্ন হাজার যার ঢালী
ষোড়শ হলকা হাতী  অযুত তুরঙ্গ
যুদ্ধকালে সেনাপতি কালী।।
প্রতাপাদিত্য পর পর দুবার মোঘল বাহিনীকে পরাজিত করে । তিনি মোঘল শাসনাধীন সপ্তগ্রাম বন্দর লুট করে ধন সঞ্চয় করতে অগ্রসর হলেন। সপ্তগ্রামের ফৌজদার প্রতাপাদিত্যের অতর্কিত আক্রমণ রোধ করতে পারলেন না। ফলে সপ্তগ্রামের সমুদয় ধন সম্পদ প্রতাপাদিত্যের কুক্ষিগত হল।।
এই সময় আগ্রার দরবারে নানারকম অশান্তি বিরাজ করছিল। বাদশাহ আকবরের মৃত্যুর পর শাহজাদা সেলিম নুরুদ্দীন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর নাম ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। এইবার জাহাঙ্গীর দরবারে প্রতাপাদিত্য সম্পর্কে নানা অভিযোগ উত্থাপিত হলো। এই সময়ে বসন্ত রায়ের পুত্র কচু রায়ও সমগ্র কাহিনী বাদশাহের গোচরীভূত করল। সমুদয় অভিযোগ শুনে জাহাঙ্গীর তাঁর সেনাপতি মানসিংহকে পাঠালেন প্রতাপাদিত্যকে দমনের জন্য। মানসিংহ বাংলায় এসে সসৈন্য যশোর রাজ্যের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলেন এবং কপোতাক্ষ নদের তীরে শিবির স্থাপন করে থাকলেন। কিন্তু নদীমাতৃক বাংলার বর্ষার সম্পর্কে মোঘল সেনাপতির কোনো ধারণা ছিলোনা। একদিকে বর্ষা ও মহারাজা প্রতাপের নৌসেনায় আক্রমণে মোঘল সেনা বিপর্যস্ত ও ছত্র ভঙ্গ হয়েযায়,বাধ্যহয়ে মানসিংহ পিছুহটতে বাধ্য হয়।
এবং বর্ষার শেষে কিছুকাল পরে  আন্দুলিয়া নিবাসী ভবানন্দ মজুমদার নামক এক জমিদার কে উৎকোচ প্রদান করে,রাজা মানসিংহ তাকে নিজের পক্ষে আনে। তারই সাহায্যে মানসিংহ ধুমঘাট আক্রমণ করতে সমর্থ হন।
প্রতাপ এবং তার পুত্র উদয়াদিত্য ও অন্যান্য সেনানায়কগণ দীর্ঘদিন ধরে মোঘল বাহিনীর সাথে কতিপয় খন্ড যুদ্ধ করলেন। অসীম সাহস ও অসামান্য রণচাতুর্য প্রদর্শন করে প্রতাপ শেষ যুদ্ধে বন্দী হলেন। রাজা মানসিংহ বন্দী প্রতাপাদিত্যকে পিঞ্জরাবদ্ধ অবস্থায় আগ্রায় প্রেরণ করলেন। পথিমধ্যে বানারসী ধামে উপস্থিত হওয়ার সাথে সাথে প্রতাপাদিত্য শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তার সেনাপতি শংকর কে বন্দী অবস্থায় দিল্লি নিয়ে যাওয়া হয়।
তার সাথে বাংলার স্বাধীন হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ভূলুণ্ঠিত হয়।
যুদ্ধের পর মানসিংহ কচু রায়কে ‘যশোরে জিৎ’ উপাধি দিয়ে যশোহর রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি ভবানন্দ মজুমদারকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করেন।
তথ্যসূত্র :- ১) বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস।
                  ২) বাংলার বারো ভূঁইয়া এবং মহারাজা প্রতাপাদিত্য

পশ্চিমবাংলায় বিরিয়ানি বিপ্লব

স্মৃতিলেখা চক্রবর্তী 

আমাদের ছোটবেলায় এত বিরিয়ানি-টিরিয়ানির চল ছিল না। চপ-কাটলেট, পরোটা-মোগলাই, এসবই তখন বাঙালির প্রিয় খাদ্য ছিল। বাজারের আশেপাশের দোকানগুলোয় সন্ধ্যে নামলেই রমরমা ব্যবসা শুরু হয়ে যেত। মস্ত চাটুর মাঝখানে গনগনে আঁচে টগবগ করে ফুটত কালচে পোড়া তেল। তাতে উল্টে পাল্টে এ পিঠ ও পিঠ করে ভাজা হত মুচমুচে মোগলাই। কিংবা বিস্কুটের গুঁড়োয় মোড়া ভেটকির ফিসফ্রাই। আর ছিল পাড়ার মোড়ে মোড়ে নিরামিষ তেলেভাজার দোকান। সকালে গরম কচুরি-জিলিপি, আর বিকেল নামলেই আলুর চপ, বেগুনি, পিয়াজি এসবের পসরা সাজত। রোল-চাউয়ের ঠেলাও ছিল। তবে ভাজা-পোড়া খাবারের প্রতি বাঙালির তীব্র আকর্ষণকে সেগুলো খুব একটা টেক্কা দিতে পারেনি।
এরপর হঠাৎ একদিন কি যে হল। সব হিসেব ওলট-পালট করে গোটা কলকাতা জুড়ে ছোট বড় বিরিয়ানির দোকান খুলতে লাগল। আলু, ডিম আর মাংসের টুকরো দেওয়া লম্বা চালের নোনতা পোলাও। বাজারে আসতেই সুপার হিট। দেদার বিক্রি। বিক্রি যত বাড়তে লাগল, দোকানের সংখ্যাও তত বাড়তে লাগল। বিরিয়ানি মহল, বিরিয়ানি সেন্টার, আলিবাবা, নানান নামে বিরিয়ানি ব্যবসা। দু পা হাঁটলেই বিরিয়ানির দোকান। ঢাকাই বিরিয়ানি, কলকাতা বিরিয়ানি, হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি ইত্যাদি নানান বিরিয়ানির সম্ভার আক্ষরিক অর্থেই একটা বিরিয়ানি যুগের সূচনা করল। এরপর শুরু হল বিরিয়ানির দোকানে দোকানে টক্কর। কে কত ভাল বিরিয়ানি বানাতে পারে-র থেকেও বড় কথা হল, কে কত বিশুদ্ধ বিরিয়ানি বানাতে পারে। নিজেদের বিরিয়ানির বিশুদ্ধতা প্রমাণ করতে, দোকানগুলো নানা রকম কলা-কৌশল অবলম্বন করল। এদের মধ্যে কিছু দোকান, যারা একটু অতিরিক্ত বুদ্ধিমান, তারা রটিয়ে দিল, তাদের দোকানে খাঁটি মুসলমান রাঁধুনি দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করা হয়। এই প্রচারে বিপুল সাড়া মিলল। সব বাঙালিই মানে, বিরিয়ানি হল খাঁটি মুসলমানি রান্না। কাজেই মুসলমানি রান্না মুসলমানের থেকে ভাল কে রাঁধবে। যে বাঙালি দোকান থেকে কষা মাংস খাওয়ার আগে কখনো জানতে চায়নি, এর রাঁধুনি খাঁটি বাঙালি কিনা; সেই বাঙালিই দলে দলে ছুটল মুসলমান রাঁধুনির রাঁধা “খাঁটি বিরিয়ানি” খেতে।
মুসলমান ব্যবসায়ীরা এই ট্রেন্ড চিনতে ভুল করেনি। বাঙালি যে “খাঁটি বিরিয়ানি” বলতে তাদেরকেই বোঝাচ্ছে, এটা বাঙালি ক্রেতার হাবেভাবে বেশ পরিষ্কার হয়ে গেছিল। শুরুটা হল বড় দোকান গুলো দিয়ে। হঠাৎই বাঙালি পাড়ায় শাখা খুলতে শুরু করল আরসালান, আমিনিয়া, হাজী বিরিয়ানি, রহমানিয়ার দল। তারপরের ধাপে বাঙালি বিরিয়ানির দোকানগুলোর বদলে আসতে শুরু করল আসমা বিরিয়ানি, বরকত বিরিয়ানির মত দোকান। যেসব বাঙালি পাড়ায় আগে একটিও মুসলমান দোকান ছিল না, সেখানে বিরিয়ানির হাত ধরে একের পর এক পাখা মেলতে লাগল আসমা, বরকত, ফাতেমা, রহিমা-রা। মুখে তাদের মিষ্টি হাসি, আর মাথার উপর লেখা সাতশো ছিয়াশী।  আমি একে “বিরিয়ানি বিপ্লব” নামেই ডাকব, যে বিপ্লবের দখল মুসলমানেরা বাঙালির থেকে নিঃশব্দে কেড়ে নিয়েছে ।
বিরিয়ানি বিপ্লবের সাথে সাথে প্রায় নিঃশব্দে ঘটে গেল আরেকটা জিনিস। মুসলমানের বিরিয়ানির দোকানের হাত ধরেই বাঙালির খাবার প্লেটে ঢুকে পড়ল হালাল সংস্কৃতি। বিরিয়ানির লোভে গোগ্রাসে গেলা বাঙালি পাত্তাই দিল না যে সে হালাল খাচ্ছে। হালাল কি, হালাল কেন, সেটা সম্বন্ধে কিছু জানার আগেই হালাল খাওয়া নিয়ে বাঙালির মানসিক বাধা তৈরি হবার আগেই শূন্য হয়ে গেল। এখন KFC র মুরগি ভাজা থেকে মিত্র ক্যাফে-র ফাউল কাটলেট হালাল হলেও বাঙালির কিছু যায় আসে না।
 এতকিছু , কারণ বাঙালি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, বিরিয়ানি একটি মুসলিম খাবার। তাই, মুসলমানে চাল-মাংস ছুঁয়ে দিলেই সুস্বাদু কাবাব বিরিয়ানি তৈরি হয়ে যায়। বিরিয়ানির সাথে মুসলমানের সম্পর্ক নিয়ে বাঙালির এই মনোভাবের কথা আমি জানতেও পারতাম না, যদি না আমার এক অতিবাম স্কুলপাঠী ঠিক এই ঢঙে আমাকে এই কথাটা বলত। বিরিয়ানির মত প্রাক-ইসলামী যুগের রান্না নিয়ে এমন মনোভাব কেউ রাখতে পারে, কথাটা শুনেও ঠিক বিশ্বাস হয়নি। তবে ফেসবুকে বিভিন্ন খাবার গ্রূপে ঘুরে বিরিয়ানি সম্বন্ধে বাঙালির মনোভাব পড়ে আর অবিশ্বাস করতে পারিনি।
আজকে যদি বাঙালিদের ধরে ধরে প্রশ্ন করা হয়, তাদের প্রিয় খাবার কি, ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জন বাঙালিই হয়তো উত্তর দেবে- বিরিয়ানি। বিরিয়ানি নিয়ে আমার ব্যক্তিগত আদিখ্যেতা না থাকলেও, “বিরিয়ানি বিপ্লব”-এর পর গোটা পশ্চিমবঙ্গে বিরিয়ানির বাজার ঠিক কতটা বড়, তার ধারণা করতে পারি। রাস্তায় ঘাটে, বাজার হাটে, বিরিয়ানির দোকান এখন সর্বত্র। এখন প্রশ্ন হল এই বিরিয়ানির দোকানগুলোর মধ্যে বাঙালির দোকান ঠিক কত শতাংশ? বিরিয়ানি ব্যবসার কতটুকু লাভ বাঙালি ব্যবসায়ীরা পাচ্ছে? আরসালানের বিপুল ভিড় আর হাজি-র দোকানে বিশাল লাইন দেখে বিশ্বাস করতে ভরসা হয় না, বিরিয়ানি বিপ্লবের খুব বেশি লাভ বাঙালি পাচ্ছে। হয়তো দোষ সেই বাঙালি দোকানগুলোরই, যারা মুসলমান রাঁধুনি দেখিয়ে খদ্দের টানতে গেছিল। তারাই বাঙালি ক্রেতার মাথায় ঢুকিয়েছে বাঙালি রাঁধুনি অত ভাল বিরিয়ানি রাঁধতে পারবে না। সেক্ষেত্রে আর মাঝখানে শিখন্ডী রাখা কেন? চালাও পানসি আরসালান-আমিনিয়া। বাংলায় সব বিপ্লবেরই বোধয় একই পরিণতি হয়। বাঙালির কোলেপিঠে বড় হয়ে বিপ্লব একদিন বাঙালিকে ছাড়িয়ে অন্যত্র চলে যায়।

রানী ভবশঙ্করী- বিস্মৃত বাঙালি বীর কন্যা

অমিত মালী

পাঠান সেনাপতি ওসমান খানের নেতৃত্বে পাঠান সেনাবাহিনী এবং বিশ্বাসঘাতক চতুর্ভুজ চক্রবর্তীর সঙ্গে থাকা সেনাবাহিনী একসঙ্গে বাশুড়িতে আক্রমণ করেন। কিন্তু রানী ভবশঙ্করীর সেনাবাহিনী পূর্বেই প্রস্তুত ছিল ।ফলে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় দুই বাহিনীর মধ্যে। রানী ভবশঙ্করী নিজেই এই যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। রানী ভবশঙ্করীর সৈন্যরা যাদেরকে তিনি নিজে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, ক্ষিপ্রতার সাথে পাঠান সৈন্যদেরকে কচুকাটা করেন। সমসাময়িক পাওয়া সূত্র অনুযায়ী, রানী ভবশঙ্করী নিজে হাতির পিঠে চেপে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। এই যুদ্ধে বাগদি ও চন্ডাল সেনারা অসীম বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। কয়েক ঘন্টার যুদ্ধে পাঠান সেনাবাহিনী পরাজিত হয় এবং পাঠান সেনাপতি ওসমান খান পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন। পরে তিনি ফকিরের ছদ্মবেশে উড়িষ্যা পালিয়ে যান। এই যুদ্ধের পরে রানী ভবশঙ্করীর রাজ্যাভিষেক সম্পন্ন হয়।

রানী ভবশঙ্করীর বীরত্বের কথা, পাঠান সেনাদের কচুকাটা করার কথা মুঘল সম্রাট আকবরের কানে পৌঁছায়। এই খবর আকবরের কাছে পৌঁছনোর পর আকবর ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ্যের সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তুলতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এর পিছনেও কারণ ছিল। সেই সময় অবিভক্ত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা- যাকে সুবে বাংলা বলা হতো, তার সুবেদার ছিলেন মান সিংহ। কিন্তু সেই সময়ে অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন অংশে পাঠানদের অত্যাচার ছিল খুব। পাঠানরা মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্রে হামলা ও লুটপাট চালাতো। এ নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন আকবর- কারণ বাংলা ছিল সোনার ডিম দেওয়া হাঁস। কারণ বাংলা সেসময় ছিল সোনার বাংলা। কিন্তু রানী ভবশঙ্করী অসাধারণ রণকৌশল ও বীরত্বে সেই পাঠান সৈন্যদের পরাজিত করেছিলেন। ফলে আকবর ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যে মান সিংহকে পাঠান। মান সিংহ ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ্যের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেন। সেইসঙ্গে আকবর ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ্যের সার্বভৌমত্ব মেনে নেন। মুঘল সম্রাট আকবর রানী ভবশঙ্করীকে ‘রায়বাঘিনী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এরপর অনেক বছর রানী ভবশঙ্করী রাজ্য শাসন করেন। পরে তাঁর পুত্র প্রতাপনারায়ন প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাঁর হাতে রাজ্যের ভার দেন এবং তিনি কাশীতে চলে যান। আজও হাওড়া জেলার উদনারায়নপুরে রানী ভবশঙ্করী প্রতিষ্ঠিত রায়বাঘিনী মন্দির রয়েছে। আজও গড় ভবানীপুর রয়েছে। শুধু আমরা ভুলে গিয়েছি আমাদের গৌরবময় লড়াইয়ের অতীত কথা। মনে রাখতে হবে অতীত ছাড়া ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে না। (সমাপ্ত )
তথ্যসূত্র- ১. বীরত্বে বাঙালি; অনিল চন্দ্র ঘোষ
               ২. Land and Local Kingship in Eighteenth -Century Bengal ; John R. McLane

বাঙালিত্ব আর বেকারত্ব

স্মৃতিলেখা চক্রবর্তী

কলকাতার বাজার-হাটে ঘুরলে কিছু অদ্ভুত মানুষের সাথে দেখা হয়ে যায়। একদল সুস্থ স্বাভাবিক জোয়ান ছেলে বিনা কারণে, এমনি এমনি পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ পার্কে বসে থাকে সারাদিন, কেউ বাজার ঘোরে, দোকানদারের সাথে গল্প করে। এদের মুখে একটা অন্যরকম অস্থির ভাব আছে, অভ্যস্ত চোখ দেখলেই চিনতে পারে। একবার এমনই এক অস্থির মানুষের কিছু কথা কানে এসেছিল। ছেলেটি সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরোয়, সারাদিন পথে পথে ঘোরে। আত্মীয়দের সাথে কথা বলে না, কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে যায় না, বন্ধুদের সাথেও সম্পর্ক রাখে না। কথা বলতে গেলেই চাকরির প্রসঙ্গ উঠবে। ছেলেটি সম্পুর্ন বেকার। চাকরি পাবার খুব যে আশা আছে, এমনটা সে মনে করে না। তাই পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন সকলকে সে সারাদিন এড়িয়ে থাকতে চায়, যতদিন পারে।
খবরে আজকাল প্রায়ই পড়ি চাকরিপ্রার্থীদের SSC আন্দোলনের কথা। নিয়োগ দুর্নীতি, রাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে কুতর্ক করব না। কিন্তু অনশন করে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা, শুনলে আমার বিন্দুমাত্র মায়া বা করুণা হয় না। বরং হাসি পায়। চাকরির জন্য কতটা বুভুক্ষু হলে একটা রাজ্যের জোয়ান ছেলেমেয়েরা  29 দিন না খেয়ে সরকারি চাকরি চাইতে পারে। তর্কের খাতিরে যদি ভবিষ্যতে চাকরিটা হয়েও যায়, তবে সেটা প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার জন্য নয়, না খেয়ে থাকতে পারার যোগ্যতার জন্য হবে। রাজ্যে একের পর এক বাংলা স্কুল বন্ধ হচ্ছে, আর বাঙালি SSC প্রার্থীরা আরো বেশি বেশি করে বাংলা স্কুলে চাকরি চাইছে। এরা হয়তো বুঝতে পারছেন না, এখন শুধু সরকারি স্কুল বন্ধ হচ্ছে। এরপর বন্ধ হতে শুরু করবে সরকারি কলেজ। শিক্ষার বেসরকারিকরণ কি জিনিস, সরকারি চাকরি প্রার্থী আর ডিগ্রিপ্রিয় বাঙালিকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে ছাড়বে।
পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে একটা অদ্ভুত ধারণা প্রচলিত আছে- “আমাকে চাকরি দেবার দায় সরকারের”। সরকারি চাকরি না পেলে বেকার থাকা ভাল। কে বোঝাবে এদের, সরকারের কাজ লোককে চাকরি দেওয়া নয়, সরকারটা ভালোভাবে চালানো। সরকার ততটুকুই লোক নেবে, যতটুকু সরকার চালাতে প্রয়োজন। দরকার না থাকলেও শুধুমাত্র বেকারদের চাকরি দিতে সরকারি নিয়োগ চালু রাখতে হবে, এ তো ভারী অন্যায় আবদার। আরেকটা মজার ব্যাপার হল, মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবসমাজের একটা বিরাট অংশ বেসরকারি চাকরিকে “অসম্মানজনক” বলে মনে করেন। শুধু তাই নয় বেসরকারি বহু কাজ এবং তাদের কর্মীদের এরা নীচু চোখে দেখে। এতটাই নিচু চোখে যে 5 বছর যাবৎ বেকার বসে থাকা ছেলেমেয়েরাও এইসব ক্ষেত্রে কাজ করতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছুক নয়। এদের অপছন্দের তালিকা এবং অভিযোগের ফিরিস্তিটা বেশ বড়। কল সেন্টার, হোটেল ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে এদের অভিযোগ হল- “রাত্রে রাত্রে কাজ” এবং “ছুটি নেই”! বিক্রি করার কাজ বা বিমার দালালি নিয়ে এদের অভিযোগ হল- “খুব চাপ” এবং “এসব চাকরি আজ আছে, কাল নেই”। আমি মনে করি, বাঙালির আসল রোগ হল মজ্জায় মজ্জায় ঢুকে থাকা আরামপ্রিয়তা, খাটতে ভয় পাওয়া এবং আলসেমি। বেকারত্ব তো স্রেফ রোগের একটা লক্ষণ মাত্র।
সরকারি চাকরির প্রতি বাঙালির যেটা আছে সেটা হল মোহ। কোন সৎ প্রচেষ্টাও নয়। সরকারি চাকরিতে সফল বাঙালিদের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, এরাই কলেজে বড় বড় নামজাদা কোর্স নেয়, মাইক্রোবায়োলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং। এবং শেষমেশ এমন সরকারি চাকরিতে ঢোকে যেখানে যে কোন বিষয়ে পাতি গ্র্যাজুয়েট হলেই চলত। দামি দামি সিটগুলোর কি অনর্থক অপচয়। IT নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস অথচ বেসরকারি চাকরিতে ভয়। কারণটা আর কিছুই না, খাটুনিতে প্রবল অনীহা। এরা যখন গ্র্যাজুয়েট যোগ্যতার সরকারি চাকরিতে ঢোকে, ইঞ্জিনিয়ারের একটা সিট নষ্ট করেই ঢোকে। এই ইঞ্জিনিয়ারিং সিটটা অন্য কারও হতেই পারত যে সত্যিই ইঞ্জিনিয়ার থাকতে চায়।
পাশের রাজ্য বিহারে সরকারি চাকরি প্রত্যাশীরা মোটামুটি মাধ্যমিকের আগে থেকেই নিজেদের লক্ষ্য ঠিক করে নেয়। 12 ক্লাস পেরোনোর আগেই টুকটাক সরকারি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কলেজে গ্র্যাজুয়েশন নেয় এমন বিষয়ে যাতে পাস করা সহজ। সেক্ষেত্রে চাকরির পরীক্ষা দেওয়ায় বাড়তি মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। ডিগ্রি তো উপলক্ষ্য, আসল লক্ষ্য তো চাকরি। গ্র্যাজুয়েশন পাশের পরও চাকরি না পেলে বিহারীরা অনর্থক টাইমপাস করে না পোস্ট গ্র্যাজুয়েট, ডবল পোস্ট গ্র্যাজিয়েশন ইত্যাদি করে। পুরো মনপ্রাণ লাগিয়ে দেয় সরকারি চাকরির পরীক্ষায়। এই সিস্টেমেটিক পড়াশুনার ফল কেন্দ্র সরকারি চাকরিতে গাদাগাদা বিহারের ছেলেমেয়ে ঢোকা। সবটাই হিন্দিতে উত্তর লিখতে পারার অবদান নয়।
এর সাথে বাঙালির কোন তুলনা হয়? সরকারি চাকুরী প্রত্যাশী বাঙালি প্রথমে 12 ক্লাস পাস করে, তারপর গ্র্যাজুয়েশন, তারপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন, চাইলে এমফিল কি পিএইচডি-তেও ভর্তি হয়ে যায়। মানে কিছু একটা করছি দেখিয়ে যতদিন বসে থাকা যায় আর কি। গ্র্যাজুয়েশন কি পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন পাস করার পর, হঠাৎ একদিন বাঙালি ছেলেমেয়েদের বোধোদয় হয় যে এবার সরকারি চাকরির পরীক্ষাগুলো দেওয়া দরকার। ততদিনে বয়স সরকারি পরীক্ষা দেবার সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
 এই দুনিয়ার নিয়ম হল, যে মানুষ যত বড়, তার গর্ব তত বড়। বাঙালিদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। যে মানুষ যত হেরো, সে নিজেকে তত বড় হিরো ভাবে। এক 28 বর্ষীয় বেকার একবার হোটেল ইন্ডাস্ট্রির এক সফল কর্মীকে দেখিয়ে আমাকে বলেছিল- “করে তো ওই হোটেলের চাকরি, আসলে তো পাতি গ্র্যাজুয়েট। আমি কিন্তু ডবল পোস্ট গ্র্যাজুয়েট।” মানেটা খুব স্পষ্ট। তোমার চাকরি থাকলে আমারও ডিগ্রি আছে। এই ডিগ্রিপ্রিয় বাঙালি চাকরি না থাকার দুঃখ দিব্যি ভুলে যায় একের পর এক ডিগ্রি দখল করে।
বেকার কথাটার বেশ কয়েক রকম অর্থ হয়। ভারতে যার রোজগার একেবারে শূন্য, তাকেই বেকার বলা হয়। উন্নত দেশগুলোয় রোজগেরে লোকদেরও বেকার বলা হয়, যদি সে নিজের জীবনধারণের প্রয়োজনীয় অর্থ রোজগার না করতে পারে। আমি এদের আধ-বেকার বলি। বাংলার শিক্ষিত বেকাররা যদি শিক্ষার গর্বে উদ্ধত হয়, এই আধ-বেকাররা তাহলে বেকারির সুপার-স্পেশালিস্ট। নানারকম কন্ট্রাক্টে এরা চাকরি করে এবং বেশি মাইনের সুযোগ থাকলেও নিজের ডিগ্রির বিষয় ছাড়া অন্য কিছুতে চাকরি করতে চায় না। শিক্ষাদ্ধত বেকার আর সুপার-স্পেশালিস্ট আধ-বেকাররা শিক্ষিত বাঙালি যুব-সমাজের একটা বিরাট অংশ। এই অনড়, গোঁয়ার অবস্থান এবং ভ্রান্ত শ্রেণী-গৌরব প্রায়ই এদের এতদূর অবসাদগ্রস্ত করে দেয় যে আত্মহত্যার মত দুঃখজনক জায়গায় চলে যায়। সম্পন্ন চাষীর ছেলে হঠাৎ কলেজ পাস করে মনে করল, এখন তার শ্রেণী পাল্টে গেছে। কলেজ পাস দিয়ে হাল ধরব? তার চাইতে আত্মহত্যা ভাল। বাবা কোটিপতি প্রমোটার কিন্তু ছেলেকে ব্যবসায় বসাবেন না। প্রমোটারির অনেক বদনাম, তার থেকে চাকরি করুক, ভদ্রলোক হোক। টাকা কম পেলেও বাঙালি সমাজে ভদ্দরলোকের সম্মান “ধান্দাবাজ ব্যবসায়ী”র থেকে বেশি। বাঙালির কাছে কাজের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল কাজের জাতিভেদ। উঁচু কাজ, নীচু কাজে ভেদাভেদ করতে না শিখলে কি আর বাঙালি ভদ্রলোক হওয়া যায়?
মহামতি গোখেল বাংলার সাথে বাকি ভারতের তুলনা করে বলেছিলেন, বাংলা যা আজ ভাবে, বাকি ভারত ভাবে কাল। আমি বাঙালির সাথে অবাঙালীদের তুলনা করে দেখেছি- সারা ভারত যা ভাবে, যা করে, বাঙালি ভাবে এবং করে ঠিক তার উল্টো। পৃথিবীর সর্বত্রই মানুষ সরস্বতীর সাধনা করে লক্ষ্মীলাভের জন্য। বাঙালির যে কারণে সরস্বতী সাধনা, তাকে “অকর্মার সরস্বতী” বললেও খুব একটা অত্যুক্তি হয় না। কারণ কর্মজগতে প্রবেশকে যতদিন এড়িয়ে থাকা যায়, সেই লক্ষ্যেই একের পর এক ডিগ্রি লাভের নিরলস প্রচেষ্টা করে যায় একদল বাঙালি। এইসব ডিগ্রির লক্ষ্য কি, লাভ কি- এগুলো অবাঞ্ছিত অবান্তর প্রশ্ন।
চাকরিতে আলসেমি, ব্যবসায় অনীহা- বাঙালি যুবসমাজ সম্পুর্ন পচে গেছে। তার শুধু সুখ চাই, সুখ পাবার আগের ধাপগুলো সে আর কষ্ট করে পেরুতে চায় না। বাংলার শিক্ষিত যুবসমাজের কোন দিশা নেই, কোন লক্ষ্য নেই। কেমন একটা বাঁধনছেড়া, পাগলপারা ভাব। এগুলো দেখে ছোটবেলায় পড়া একটা লাইন খুব মনে পড়ে যায়। সবল মানুষ সুসময় আনে, সুসময় আনে দুর্বল মানুষ, দুর্বল মানুষ দুঃসময় আনে, দুঃসময় আনে সবল মানুষ।
 বাঙালি মধ্যবিত্ত যুবসমাজ বড়ই সুখে মানুষ, মুখ গুঁজে পড়াশোনা ছাড়া একটু দায়িত্বও নিতে হয়নি কখনো।  মাথা গোঁজার জন্য পৈতৃক বাড়ি আছে। খরচাপাতির জন্য বাবার পেনশন আছে, দায়-দায়িত্ব কম। নিজের জন্য কোনরকমে একটা কুড়িহাজারী চাকরি, নিশ্চিন্ত জীবন। এই পচা-গলা রুগ্ন বাঙালিত্বই জাতির বর্তমান। বাঙালি এখনো নিজের চারদিকে ঘনিয়ে আসা দুঃসময়টাকে পুরোপুরি আঁচ করে উঠতে পারেনি। তাই নিজের জাতিগত বদভ্যাসগুলোর একটাকেও ত্যাগ করতে পারেনি। আমি বিশ্বাস করি এটাই শেষ নয়, খুব শিগগিরই আরো বড় দুঃসময় আসতে চলেছে বাঙালির। এমন এক দুঃসময় যেটা কেটে ছেটে নির্মূল করে দেবে জাতির দুর্বল মানুষগুলোকে। বেঁচে থাকবে কেবল সবল মানুষগুলো। সবল মানুষগুলোই বয়ে আনবে জাতির সুসময়। পচা-গলা বাঙালিত্ব ধ্বংস না হলে আর সৃষ্টি হবার নয়।

রানী ভবশঙ্করী- বিস্মৃত বাঙালি বীর কন্যা

  • অমিত মালী
পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির কাছে রানী ভবশঙ্করী নামটা ততটা পরিচিত নয়। কিন্তু রানী ভবশঙ্করী অবিভক্ত বাংলার মুসলমান শাসকদের কাছে একটা আতঙ্ক ছিল, যাকে বাংলার সুলতানি শাসক, পাঠান শাসকরা কোনোদিন পরাজিত করতে পারেনি। এমনকি রানী ভবশঙ্করীর শাসনকালে মুঘল শাসক আকবর ভুরীশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্ব মেনে নেন।  আসুন তাঁর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
রানী ভবশঙ্করীর জন্মসূত্রে নাম ছিল ভবশঙ্করী চৌধুরী। তাঁর জন্ম হয়েছিল ভুরীশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যে( ইংরেজি Bhurshut kingdom), সেই সময় ভুরীশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য বর্তমান হাওড়া ও হুগলি জেলা জুড়ে ছিল। তাঁর পিতার নাম দীননাথ চৌধুরী। তিনি রাজা রুদ্রনারায়ণের সাম্রাজ্যে একজন দুর্গরক্ষক ছিলেন। তাঁর পিতা দীনানাথ চৌধুরী দুর্গের রক্ষক ছিলেন, সেইসঙ্গে সেনাদের যুদ্ধ বিদ্যার প্রশিক্ষণ দিতেন। আর তাই ছোটবেলা থেকেই ভবশঙ্করী পিতার কাছে অস্ত্র শিক্ষা পান। তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করা, তরোয়াল যুদ্ধ, তীর ছোঁড়া ইত্যাদির প্রশিক্ষণ নেন। সেইসঙ্গে তিনি মাঝে মাঝে পিতার সঙ্গে যুদ্ধ অভিযান এবং শিকার অভিযানে যেতেন।এছাড়াও ভবশঙ্করী ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ পন্ডিতদের কাছ থেকে সমাজশাস্ত্র, রাজনীতি, দর্শন, কূটনীতি এবং ধর্মশাস্ত্র সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। এইভাবে সময় কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু এর কিছু সময় পরেই ভবশঙ্করীর মায়ের মৃত্যু হয়। তারপরেই দীনানাথ তাঁর কন্যার বিবাহ দেওয়ার জন্য উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান করতে থাকেন। কিন্তু স্বাধীনচেতা, যোদ্ধা ভবশঙ্করী এক অদ্ভুত শর্ত দেন যে যে পুরুষ তাকে তরোয়াল যুদ্ধে হারাতে পারবেন তিনি তাকেই বিয়ে করবেন।কিন্তু শেষপর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। কারণ সময়ের ফেরে ভবশঙ্করীর সঙ্গে রাজা রুদ্রনারায়ণ-এর বিবাহ সম্পন্ন হয়। এ নিয়ে আজও হাওড়া এবং হুগলী জেলার গ্রামে-গ্রামে লোকমুখে কাহিনী প্রচলিত আছে। একবার ভবশঙ্করী শিকার অভিযানে গিয়েছিলেন। সেখানে একদল বুনো মহিষ ভবশঙ্করীকে আক্রমণ করে। কিন্তু ভবশঙ্করীর তরোয়াল চালানোয় অসাধারণ দক্ষতা ছিল। সেই দক্ষতায় সবকটি বুনো মহিষকে তিনি হত্যা করেন এবং শিকার অভিযানে থাকা বাকিদের রক্ষা করেন। এই দৃশ্য রাজা রুদ্রনারায়ন দূর থেকে লক্ষ্য করেন এবং যুদ্ধ দক্ষতায় মুগ্ধ হন। তিনিই ভবশঙ্করীর পিতাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন এবং খুব শীঘ্রই তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয় গড় ভবানীপুর দুর্গের কাছে দামোদর রাজপ্রাসাদে। এরপরেই ব্রাম্ভন কন্যা ভবশঙ্করী চৌধুরী পরিচিত হন রানী ভবশঙ্করী নামে। বিবাহের পরেই রানী ভবশঙ্করী রাজ্য শাসন বিষয়ে রাজা রুদ্রনারায়নকে সাহায্য করতেন। একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো রানী ভবশঙ্করী দেবী চন্ডীর ভক্ত ছিলেন। সেই কারণে বিবাহের পরেই রাজপ্রাসাদের পাশেই দেবী চন্ডীর মন্দির নির্মাণ করান। তিনি রোজ নিষ্ঠাভরে  মা চন্ডীর পূজা করতেন। আজও হাওড়া ও হুগলী জেলার বিভিন্ন প্রান্তে যে বেতাই চন্ডী এবং মেলাই চন্ডীর পূজা হয়ে থাকে, তা ভবশঙ্করীর শাসনকালেই হিন্দুদের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে। তিনি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে দেবী চন্ডীর অনেকগুলি মন্দির নির্মাণ করেন।
rani vabashankari2এছাড়াও তিনি সাম্রাজ্যের সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে বিশেষ নজর দেন। রানী ভবশঙ্করী ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অনেকগুলো সামরিক দুর্গের নির্মাণ করেন। তিনি খানাকুল, ছাউনপুর, তমলুক, আমতা , উলুবেড়িয়া, নস্করডাঙ্গায় দুর্গ নির্মাণ করেন। সেই সঙ্গে রাজ্যের সামরিক প্রশিক্ষণের বিষয়টিও দেখভাল করতেন। তাঁর নজরদারির মধ্যেই অনেকগুলি সামরিক প্রশিক্ষণ শিবির পরিচালিত হতো। তিনিই প্রথম ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীতে মহিলাদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ দিয়ে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেন।সেই সঙ্গে তিনি নিয়ম করেন যে ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের প্রতিটি পরিবারের একজনকে যুদ্ধ প্রশিক্ষণ নিতে হবে, যাতে আপদকালীন পরিস্থিতিতে সেনার দরকার পড়লে যুদ্ধ যোগ দিতে পারে। রানী ভবশঙ্করীর প্রশাসনিক দক্ষতায় ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য হাওড়া ও হুগলী ছাড়িয়ে পূর্ব বর্ধমান, পূর্ব মেদিনীপুর এবং পশ্চিন মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ অংশে বিস্তার লাভ করে।সেই সঙ্গে তিনি নৌবাহিনীর দিকেও নজর দেন।রানী ভবসশঙ্করীর তত্বাবধানে ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের নিজস্ব নৌবাহিনী গঠন করেন, যা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। সেইসময় গৌড়ের শাসক ছিলেন পাঠান বংশীয় সুলেমান কারী। মুসলিম শাসকদের লুটেরা বাহিনী ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অতর্কিত হামলা করার লুঠ-পাট চালাতো। তাই এদের শায়েস্তা করতে রানী ভবশঙ্করীর পরামর্শে উড়িষ্যার রাজা মুকুন্দদেবের সঙ্গে জোট করেন রাজা রুদ্রনারায়ন । ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে ত্রিবেনির যুদ্ধে ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য এবং মুকুন্দদেবের মিলিত সেনাবাহিনী গৌড়ের সুলতান সুলেমান কারীকে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মুকুন্দদেবের সেনাপতি রাজীবলোচন রায়, যিনি কালাপাহাড় নামে বিখ্যাত। সুলেমানের মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র দাউদ খান গৌড়ের শাসক হন। তিনি মুঘলদের পরাজিত করার জন্যে রাজা রুদ্রনারায়নের সাহায্য চান। রুদ্রনারায়ন রাজি না হলে দাউদ খান তাঁর সেনাপতি কলটু খানকে ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য আক্রমণের নির্দেশ দেন  । রুদ্রনারায়নের সেনাবাহিনী কলটু খানের সেনাকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে এবং হত্যা করেন। এইযুদ্ধে বিশাল সংখক পাঠান সেনার মৃত্যু হয়। এরফলে বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল মুসলিম শাসনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়।এর পরেই রানী ভবশঙ্করী এক পুত্র সন্তান প্রতাপনারায়নের জন্ম দেন।প্রতাপনারায়নের বয়স যখন ৫ বছর, তখন রাজা রুদ্রনারায়নের মৃত্যু হয়।

(চলবে )

অনুশীলন সমিতি- বাঙালি হিন্দুর বিপ্লবের আঁতুরঘর

FB_IMG_1553401781312কলকাতার অনুশীলন সমিতির স্থাপন হয় ২৪ মার্চ, ১৯০২। এর  উদ্দেশ্য ছিল অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতা অর্জন।
অনুশীলন সমিতি বিশ শতকের প্রথমভাগে বাংলায় গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনগুলির মধ্যে অন্যতম। এ সমিতি ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল। বিশ শতকের প্রথম দশকে বাংলার যুবকদের শারীরিক, মানসিক ও নৈতিক উন্নয়ন- এ তিন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নিবেদিত ক্ষুদ্র যুবসংগঠনগুলির মধ্য থেকে বিপ্লবী দলগুলির জন্ম হয়েছে বলে ধরা যায়।  বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,  স্বামী বিবেকানন্দ ও অরবিন্দ ঘোষ কর্তৃক বিকশিত মতবাদের দ্বারা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁরা বাঙ্গালীদের আত্মিক, শারীরিক ও বুদ্ধিতে বলিষ্ঠ হওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁদের চিন্তা-চেতনাকে কার্যকর করার জন্য প্রকৃত বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদ শুরু হওয়ার বহুপূর্ব হতেই মানসিক যোগাভ্যাস ও শারীরিক ব্যায়ামের জন্য গ্রাম ও শহর এলাকায় অনুশীলন সমিতি নামে অসংখ্য যুব সংগঠন গঠিত হয়।
বিপ্লবী আন্দোলনের প্রস্তুতির অঙ্গ হিসাবে অতীস চন্দ্র বসুর উদ্যোগে এবং ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্রের সভাপতিত্বে ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে ২৪শে মার্চ কলকাতার ১২ নং মদন মিত্র লেনে অনুশীলন সমিতি স্থাপিত হয় । এই সমিতির আর একজন প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন সতীশচন্দ্র বসু । এই সময় সহসভাপতি হন চিত্তরঞ্জন দাস এবং অরবিন্দ ঘোষ এবং অনুশীলন সমিতির কোষাধ্যক্ষ ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
যে সব আশু ঘটনাবলির কারণে বিপ্লববাদ হঠাৎ করে শুরু হয়েছিল সেগুলি হলো লর্ড কার্জনের অপ্রিয় শিক্ষা সংস্কার ও বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫)। ১৯০৬ সালের মার্চ মাসে সমিতির সদস্যবৃন্দ যুগান্তর নামে একটি সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা প্রকাশনার কাজ শুরু করে। এতে বিদ্রোহের কথা খোলাখুলিভাবে প্রচার করা হয়। সারা বাংলায় সমিতির শাখা স্থাপিত হয়।
১৯০৫ সালে ঢাকায় বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বিপিনচন্দ্র পালের জ্বালাময়ী বক্তব্য  শ্রোতাদেরকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে এবং এতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিপিনচন্দ্র পালের বক্তব্যের  পর ঢাকা সরকারি কলেজের এককালের শিক্ষক ও পরবর্তী সময়ে ঢাকায় ‘ন্যাশনাল স্কুলে’র প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক পুলিনবিহারী দাসের নেতৃত্বে ৮০ জন যুবক ১৯০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায়  ঢাকা অনুশীলন সমিতি গঠন করে। এর প্রধান কার্যালয় ছিল ঢাকাতে। পুলিনবিহারী দাস কর্তৃক ঢাকা অনুশীলন সমিতি পরিচালিত হয়।
সমিতি ও স্বদেশী আন্দোলনের লক্ষ ও কার্যপদ্ধতি প্রায় একই রকম ছিল। কলকাতা অনুশীলন সমিতি ও ঢাকা অনুশীলন সমিতি অনেকটা রাশিয়া ও ইতালির গুপ্ত সংগঠন গুলির আদলেই গড়ে উঠেছিল। উনিশ শতকে শেষে ও বিশ শতকে প্রথমদিকে বিপ্লবী আন্দোলনের পথিকৃৎ ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্র ১৯০২ সালে কলকাতা অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। বরোদার মহারাজার আর্মি বাহিনী থেকে সামরিক ট্রেনিং প্রাপ্ত তরুণ বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ ব্যানার্জী ও অরবিন্দ ঘোষের ছোট ভাই বারীন্দ্রকুমার ঘোষ তাঁকে এটি প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে কলকাতা অনুশীলন সমিতি সদ্যসদের শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করার মাধ্যেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ করে রেখেছিল এবং ১৯০৭ বা ১৯০৮ সাল পর্যন্ত এ সমিতি তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ রূপ পরিগ্রহ করে নি।
১৯০৭ সাল হতে অনুশীলন সমিতির সদস্যগণ বিপ্লবী কর্মকান্ডে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। ১৯০৭ সালের ৬ ডিসেম্বর নব প্রতিষ্ঠিত পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নর যে ট্রেনে ভ্রমণ করছিলেন সেটি বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর অল্প কয়েকদিন পর ২৩ ডিসেম্বর তারা ঢাকার প্রাক্তন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি. অ্যালেনকে হত্যা করার চেষ্টা করে। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল তারা ভুলবশত দুজন নিরপরাধী মহিলা মিসেস ও মিস কেনেডিকে হত্যা করে। অথচ তাদের টার্গেট ছিল কলকাতার ম্যাজিস্ট্রেট ও পরবর্তীকালে বিহারের মুজাফ্ফরপুরের জেলা জজ ডগলাস কিংসফোর্ড। মুজাফ্ফরপুরের ঘটনার সাথে জড়িত প্রফুল্ল চাকি পরবর্তীসময়ে ধরা না দিয়ে আত্মহত্যা করেন এবং তাঁর সহযোগী ক্ষুদিরাম বসু ধরা পড়েন ও বিচারে তাঁর ফাঁসি হয়। বাংলার বিপ্লবের ইতিহাসে মুজাফ্ফরপুরের হত্যাকান্ড একটি বিখ্যাত ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত। এ ঘটনার পর থেকে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী বাংলার জনগণের নায়কে পরিণত হন। পরবর্তী সময়ে কলকাতার মানিকতলার বাগানে একটি বোমা তৈরীর কারখানা আবিষ্কার হয়। অনুশীলন সমিতির জনৈক নেতা বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে তথাকথিত আলীপুর ষড়যন্ত্র মামলার আওতায় বিচারাধীনে আনা হয়।
আলীপুর মামলার কারণে ধরপাকড় ও পুলিশি হানা ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। ফলে অনুশীলন সমিতিতে বিভাজন দেখা দেয়। যদিও সমিতিগুলি একটির থেকে অন্যটি স্বাধীন ছিল, তবুও প্রমথনাথ মিত্র, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং পুলিনবিহারী দাসের যৌথ পরিচালনায় সেখানে কেন্দ্রীয় অ্যাকশন কমিটির মতো একটি কমিটি ছিল। সরকার সমিতিগুলিকে দুটি প্রধান দলে চিহ্নিত করে- যুগান্তর দল ও ঢাকা অনুশীলন দল। মোটামুটিভাবে পুলিশ পশ্চিমবঙ্গের বিপ্লবীদেরকে যুগান্তরের নামানুসারে যুগান্তর দল এবং পূর্ববঙ্গের বিপ্লবীদেরকে ঢাকা অনুশীলন সমিতি বলে চিহ্নিত করে। পশ্চিমবঙ্গের বৈপ্লবিক কর্মকান্ড ১৯১০ সালের পর হতে কিছু কালের জন্য কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং তখন থেকে বৈপ্লবিক কর্মকান্ডের কেন্দ্র পূর্ববঙ্গে স্থানান্তরিত করা হয়।
সাংগঠনিকভাবে ঢাকা অনুশীলন সমিতি পুলিনবিহারী দাসের পরিচালনাধীনে একটি স্বাধীন সংগঠন ছিল। কিন্তু প্রমথনাথ মিত্রের কলকাতা অনুশীলন সমিতির সঙ্গে এর সংযোগ ছিল এবং পুলিনবিহারী দাস কলকাতা গেলে সেখানেই অবস্থান করতেন।
সদস্যদের অধ্যয়ন তালিকায় প্রধানত পৌরাণিক কাহিনীভিত্তিক রচনাই বেশি ছিল। তাদের জন্য সুপারিশকৃত বইগুলির মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দের গ্রন্থসমূহকে প্রথম স্থান দেওয়া হয়েছে। অনুশীলন সমিতিতে কেউ যখন ভর্তি হতো, তখন শপথ নিতে হতো।
ঢাকা অনুশীলন সমিতি শীঘ্রই এর কলকাতার মূল সংগঠনকে গুরুত্বহীন করে দেয়। পূর্ববঙ্গের অন্যান্য জেলাসমূহে এটি বিস্তার লাভ করে এবং ১৯৩২ সালের মধ্যে এর শাখার সংখ্যা হয় ৫০০। পুলিনবিহারী দাসের সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য ঢাকা অনুশীলন সমিতি দ্রুত প্রসার লাভ করেছিল এবং প্রধান অবস্থানে ছিল। বরোদির (ঢাকা জেলা) ভূপেশচন্দ্র নাগ পুলিনবিহারী দাসের যোগ্যতম সহকর্মী ছিলেন এবং পুলিনবিহারী দাস গ্রেপ্তার হলে তিনি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। যশোরের শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু ছিলেন একজন বিপ্লবী এবং শুরু থেকেই ঢাকা অনুশীলন সমিতির ‘শাখাসমূহের পরিদর্শক’ ছিলেন। এসব সমিতির সদস্যবৃন্দ অধিকাংশই ছিল ভদ্র পরিবার হতে আগত স্কুল ও কলেজের ছাত্র। ভর্তিকৃত সদস্যদের দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়, যথা: সন্ন্যাসী ও গৃহী (পরিবারের লোক)।
পুলিন দাস ঢাকায় ন্যাশনাল স্কুল প্রতিষ্ঠার সময় মনে করেছিলেন যে, এটি হবে বৈপ্লবিক শক্তি গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। পুলিনবিহারীর বৈপ্লবিক তৎপরতার সাফল্যের মূলে রয়েছে তাদের অনুশীন পদ্ধতি। তাঁর ছাত্ররা প্রথমে লাঠি ও কাঠের তরবারি দিয়ে অনুশীলন করত। পরে তারা অনুশীলন করত ছোরা ও পিস্তল দিয়ে।
পুলিনবিহারী দাস যখন গ্রেফতার হন এবং ডাকাতির দায়ে অভিযুক্ত করে তাঁকে যখন যাবজ্জীবন নির্বাসন দেওয়া হয়, বাহ্যত তখন থেকেই ঢাকা অনুশীলন সমিতি ভেঙ্গে যায়। এর পর সমিতি সম্পূর্ণরূপে গা ঢাকা দেয় এবং মফস্বলের সমিতির সদস্যদের সঙ্গে সাময়িককালের জন্য সমস্ত যোগাযোগ স্থগিত করে দেয়। কিন্তু ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী ও প্রতুলচন্দ্র গাঙ্গুলির নতুন নেতৃত্বে সমিতি শীঘ্রই তার কর্মকান্ড পুনরায় শুরু করে। ১৯১৩ সালের বিখ্যাত বরিশাল ষড়যন্ত্র মামলা প্রমাণ করে যে, শুধু বরিশাল জেলাতেই সমিতির শত শত বিপ্লবী অনুসারী ছিল।
প্রথম মহাযুদ্ধ পর্যন্ত যুগান্তর দলের সঙ্গে ঢাকা অনুশীলন সমিতির সম্পর্ক ছিল দুর্বল। মহাযুদ্ধের পরিস্থিতি বাংলারবিপ্লবীদেরকে  ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করার সুযোগ করে দেয়। যুগান্তর বৈপ্লবিক কেন্দ্রসমূহের জোট (ফেডারেশন) হিসেবে সারাদেশে আবার আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু সরকার সন্দেহভাজনদের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখত। নিরাপত্তা গোয়েন্দাদেরকে সহজেই স্থানীয় পর্যায়ে নিয়োজিত করা যেত বলে তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে সন্দেহভাজন লোকজন কদাচিৎই চলাফেরা করতে পারত। অসহযোগ আন্দোলনের সময় যুগান্তর দল গান্ধীর সাথে সহযোগিতা করে, কিন্তু ঢাকা অনুশীলনদল তাদের বৈপ্লবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। ১৯২৪ সালে মেদিনীপুর কেন্দ্রীয় জেলখানায় উভয় দলের বিপ্লবীদের  মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু নেতাদের একটানা বন্দিত্বের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে এ ঐক্য কার্যকর করা যায় নি।
মাস্টারদা সূর্যসেন পূর্ববঙ্গে শেষ বৈপ্লবিক কর্মকান্ড চালান। ঢাকা অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তর উভয় দলের সদস্য সূর্যসেন ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন-এর কাজ পরিচালনা করেন। এ ঘটনা সাংগঠনিক দিক ও শৌর্য-বীর্যে বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে অতুলনীয় ছিল। সূর্যসেনের বিচার হয় এবং ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি তারিখে তাঁকে ফাঁসিতে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। কিন্তু সূর্যসেনের যশ এবং সফলতা এমন এক সময়ে আসে যখন বিপ্লবী আন্দোলন তাঁর আদর্শ পরিবর্তন করে ফেলে এবং তা আংশিকভাবে কংগ্রেসের সাথে ও আংশিকভাবে সমাজতান্ত্রিক দলের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। সূর্যসেনের ওই ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপের পর আর কোনো উল্লেখযোগ্য বিপ্লবী কর্মকান্ডের কথা শোনা যায় নি।
লেখা – প্রতাপ সাহা।

এখনই বা কখনোই নয় – ইতিহাসের ক্রান্তিকালে ভারতবর্ষ

কদাচিৎ এক রাষ্ট্রের জীবনে একটি মুহূর্ত আবির্ভূত হয় যখন তার স্থায়িত্ব/ভবিষ্যৎ নির্ভর করে একটি সুতোর ওপরে। নিঃসন্দেহে, দ্বিতীয় সহস্রাব্দের ঊষালগ্ন থেকে ভারতবর্ষের মানব ও প্রাকৃতিক সম্পদের লুন্ঠনের কোন ইতি এখনো পর্যন্ত টানা যায় নি।  প্রত্যেকটি নব ঘটনা প্রমাণ করে তা এখনো এক অতি রূঢ় বাস্তব। পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল এক ভয়ঙ্করতম অত্যাচার, শিল্পকলার ধ্বংসসাধন ও সম্পদের লুন্ঠনের স্রোত একবিংশ শতাব্দীর ভারতীয়দের কেবল আত্মিকভাবে দরিদ্রই করেনি বরঞ্চ তাঁদের নিজস্ব অসামান্য অতীত সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করতেও শিক্ষা প্রদান করেছে। এবং এর মধ্যে সবচেয়ে দুঃসহ কালের প্রারম্ভ হয়েছে ১৯৪৭ সাল থেকে। কিভাবে ব্যক্ত করা যায় একে? এক অতীব লাঞ্ছনা ও দারিদ্র্যের উপাখ্যান রূপে যার কোন তুলনা সমকালীন বিশ্ব ইতিহাসে মেলে না। এবং তা হয়েছে দেশের অশিক্ষিত, আত্মসম্মানহীন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি – প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রীদের মাধ্যমে।  যদি অখণ্ড মনোযোগ সহকারে পেশাদারী রাজনীতিবিদদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিচার করা যায় তাহলে দেখা যাবে তাঁদের অধিকাংশই ১০ম শ্রেণীর আশেপাশে ঘোরাফেরা করছেন। এহেন বিধায়ক ও সাংসদদের ব্যবহার ৬ষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের চেয়েও নিম্নতর। এরূপ অবস্থায় যদি অভিযোগ পত্র ধার্য করা যায় সরকারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাহলে প্রমাণিত হয় যে কি প্রকারে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ণ হয়েছিল হিন্দু-শিখ জাতিদ্বয়ের প্রতি। যদিও স্বাধীনতাপ্রাপ্তির মাধুর্য ও আপন ঐতিহ্যের স্মৃতিবিলোপের জন্য প্রথম ১০ বছরে নেহেরুর কুকীর্তি বোধগম্য হয়নি। পরবর্তীকালে, এই শোষণের যাঁতাকলে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

তাহলে নতুন কি? নতুন কি কিছু আছে? অবশ্যই আছে এবং সেটি হল যা আগে একটি অকথিত তবুও প্রকাশ্য তথ্য ছিল বিভিন্ন স্তরে বিশিষ্ট লোকেদের মধ্যে, শুধুমাত্র শীর্ষতম রাজনৈতিক নেতৃত্বের তত্বাবধানে রাষ্ট্রায়ত্ত ও ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে তা আজ সর্বসমক্ষে উদ্ভাসিত ও প্রতি সময়ে তা প্রশ্নের সম্মুখীন। এবং এমন এক ক্ষণে যখন ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী হলেন শ্রী নরেন্দ্র মোদী।  বর্তমানে, প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবীদের দেখা যায় বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয়ে আলোচনা করতে এবং কোন প্রত্যাঘাতের সম্মুখীন হওয়ার কোন ভয় ব্যতিরেকে। যদিও প্রধানমন্ত্রী মোদিও সমালোচনার সম্মুখীন হন, বিগত কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভাগুলির ব্যর্থতার বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের এক পর্যায় রূপে। তাহলে – নতুন কি?

পাঞ্জাবী ভাষায় একটি প্রবাদ রয়েছে :-

পাঞ্জাবী – ইস হামাম উইচ তান সব নঙ্গে হুন

হিন্দি – ইস হামাম মে সব নঙ্গে হ্যা।

ইংরেজি – In this bathtub, everyone is naked

এবার আমি এটি লিখি – হুন যে হামাম সরহক দে চোরায়ে তে হে

হিন্দি – অব ইয়ে হামাম চোরাহে পর হ্যা।

ইংরেজি – Now the bathtub is in the public square.

পরবর্তী অনুচ্ছেদগুলিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রসঙ্গে চিন্তাভাবনা ব্যক্ত করা হয়েছে যার সাথে আপন কর্মে সদা ব্যস্ত জনগণ – প্রশাসনিক অত্যাচার, দৈনিক গয়ংগচ্ছতা ও সামান্য কিছু প্রাপ্তির আশায় নতজানু হয়ে থাকা। বস্তুত, ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধ্বংস প্রারম্ভ হয় ১৯৪৭ সালে – তার প্রথম অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে। এবং তার বংশধরেরা সমগ্র দেশটিকে পৈতৃক সম্পত্তি সাব্যস্ত করে তার ধবংসসাধনে (ইচ্ছামতো) সদা ব্যস্ত থেকেছেন।  অতএব, অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী দ্বারা শাসিত হাওয়া ভারতবর্ষের বিধি হয়ে দাঁড়ালো এবং এ ক্ষেত্রে প্রশ্নের সামান্যতম প্রচেষ্টাও এক নৈতিক অন্যায়তে রূপান্তরিত হল।

ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এই ক্ষমতা-ক্ষুধার্ত রাজনীতিবিদরা পরিকল্পনা করেন দেশকে বিভিন্ন সত্তায় বেঁধে রাখতে, পরস্পরবিরোধী ঘৃণা, মিথ্যা প্ররোচনা দেওয়া ও তীব্র মিথ্যাচার সৃষ্টি করা সমাজের অভ্যন্তরে। প্রাদেশিক পরিচিতি, সামাজিক নিম্নবর্গীয় পরিচিতি, ধর্ম ও ভাষা-বিষয়ক পরিচিতি। এইরূপ সৃষ্টির মাধ্যমে এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির উৎপন্ন হয়েছে যা যেকোন মুহূর্তে এক বিধ্বংসী গাথা সৃষ্টি করতে পারে। নিঃসন্দেহে, ছোটোখাটো দাঙ্গা ও বৃহৎ আকারের জঙ্গী আক্রমণ ভাৰতবর্ষে এক দৈনন্দিন বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ফলতঃ, সমাজ এক বিষময় বাষ্পে পরিপূর্ণ। এই বিষের সংজ্ঞা কি? বৈশিষ্ট্যই বা কি? যা  একজন সভ্য মানুষকে নিয়ন্ত্রণহীন অসভ্য পরিণত করে। এবং এটি হয় রাজনৈতিক নেতা-রুপী অসভ্যদের তত্বাবধানে।  প্রতিপদে আইনকে অমান্য করা হয়েছিল এবং সংবিধান এক তামাশায় পরিণত হল। এই ক্ষুদ্র সময়েই, রাষ্ট্রীয় রাজস্ব থেকে অর্থের লুঠ সম্পূর্ণ ব্রিটিশ রাজকেও ছাড়িয়ে গেল। দারিদ্যের ভিত্তিকে সম্বলিত করে যে স্বাধীন ভারতের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সাল থেকে তা কিছু ক্ষেত্রে একই থাকলেও, অন্য ক্ষেত্রগুলিতে তার অবস্থা অধিকতর খারাপ হল। ক্ষমতায় আসীন লুঠেরারা মাফিয়া গোষ্ঠীর সমর্থনে প্রাকৃতিক সম্পদ বিক্রয় ও জাতীয় সুরক্ষার ধ্বংসসাধনে আত্মনিয়োগ করল। ব্যর্থ দৌত্য ও পঞ্চশীলের ছটায় রচিত বিদেশনীতি প্রকাশিত হল চীনের আকস্মিক আক্রমণের ঘনঘটায়। ভারত একবারও আক্রমণাত্মক হয়নি; হয়তো মহান রাষ্ট্রনেতাদের কল্যাণে তার যৌক্তিকতা অনুধাবনের প্রয়োজনও বোধ করেনি। পাকিস্তানের সাথে প্রত্যেকটি যুদ্ধ রক্ষণাত্মক অবস্থানেই করা হয়েছে।  আমাদের জওয়ানদের অসামান্য বীরত্বই এক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে। শত্রূর সাথে ভয়ঙ্কর যুদ্ধের শেষে তাদের আন্তর্জাতিক সীমান্তের ওদিকে ঠেলে দেওয়া হয়। কিন্তু তথাকথিত গুণবান রাষ্ট্রনেতাদের অসামান্য কূটনৈতিক ব্যর্থতার ফলেই, যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত জয় কোনসময়েই দেশের উপকারে লাগেনি।

পাকিস্তানের সাথে প্রত্যেকটি যুদ্ধ এই রক্ষণাত্মক ভঙ্গীতেই লড়েছে ভারত। সমগ্র পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোন দৃষ্টান্ত নেই যেখানে এক ভয়াবহ, রক্তাক্ত যুদ্ধের পরে জয়ী পক্ষ বিজিতের অঞ্চলে প্রবেশ বা সেটিকে করায়ত্ত করেনা। এই মহান অথচ হাস্যকর্ ও অবান্তর বিদেশনীতির জন্যই হিমালয় ভূখণ্ডের হাজার হাজার মাইল ভূমি, আকসাই চীন ও কাশ্মীরের অর্ধেক হাতছাড়া হয়েছে ভারতের।

গত ৭ দশকে ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হল যে রাষ্ট্রজীবনে শ্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী (এক অতি স্বল্প সময়ের জন্য) ব্যতিরেখে দ্বিতীয় কোন রাষ্ট্রপ্রধান আবির্ভূত হন নি। নিঃসন্দেহে, শ্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী স্বপ্নদর্শী, প্রাজ্ঞ ছিলেন ও দেশকে ক্রমশ ধ্বস্ত হতে থাকা সমাজ ব্যবস্থা ও দুর্নীতির জাঁতাকল থেকে উদ্ধার করতে সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর অধীনে ভারতের অর্থনীতি ও সুরক্ষা – দু ক্ষেত্রেই উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছিল। কিন্তু তাঁর সময় ছিল স্বল্প ও তাঁর নিজস্ব কর্মীবাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত  স্বজনপোষণ বাজপেয়ীকে অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিহত করেছিল। বাজপেয়ী কালের অবসান, বিজেপির সরকারের পতনের পরে অর্থাৎ ২০০৪-২০১৪ র দশকে ভারতবর্ষের এক অত্যন্ত দ্রুত এবং সর্বাঙ্গীন ক্ষয়ের বিশ্লেষণ করতে গেলে একটি পৃথক গ্রন্থের প্রয়োজন। অতি সংক্ষেপে, উত্তরোত্তর কেলেঙ্কারী দ্বারা ভূষিত হয়েছিল এই দশক।

২০১৪ সালের মধ্যে সার্বিক অবস্থা এত সঙ্গীন হয়েছিল যে একজন আর্দালি পর্যন্ত প্রকাশ্যে সরকারী অফিসে কর্মরত অফিসারের সাথে দেখা করতে ইচ্ছুক সাধারণ ব্যক্তির কাছ থেকে ঘুষ চাইতো। রাষ্ট্রজীবনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের উশৃঙ্খলতা, নৈতিকক অধঃপতনই যে তাকে এই সাহস দিয়েছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। দেশাত্মবোধ পর্যবসিত হয়েছিল হাস্যকৌতুক ও জীবনের প্রত্যেক স্তরেই নৈতিকতার সূক্ষ বোধ অন্তর্হিত হয়েছিল এক প্রকার। ভ্যাটিক্যান, বিদেশী গোয়েন্দা ও গুপ্তচর সংস্থা এবং আইএসআইর মদতপ্রাপ্ত হাজারে, হাজারে এনজিও ভারতবর্ষকে খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত করার কার্যে রত ছিল প্রবলভাবে। হিন্দু-বিরোধীদের দ্বারা হিন্দু জাতির অপমান, লাঞ্ছনা এবং আঘাতপ্রাপ্তির কোন পরিসীমাই ছিলোনা। বস্তুতপক্ষে, হিন্দু শব্দটিই একটি তাচ্ছিল্যে পরিণত হয়েছিল হিন্দু-বৈরী তৎকালীন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির তত্বাবধানে এবং এই ধারাটি নিশ্চিন্তে ও সশব্দে প্রবাহিত হয়েছিল সমাজের নিম্নতম স্তর পর্যন্ত। ৬০ বছরের অধিক সময় ধরে ভারতবর্ষ এক অনুন্নত, তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। জানুয়ারী, ২০১৪ সালে এক পাঞ্জাবী ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এর প্রতিকার কি। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন নেই; ৬০ বছর পূর্বে খড়ের গাদায় হারিয়ে যাওয়া সূঁচ খুঁজে পাওয়ার কোন পথ নেই।

 গত ৬ দশকে, বিশ্ব মানচিত্রে দুর্নীতির নিরিখে ভারত তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিল; প্ৰাকৃতিক মানচিত্রে তা একটি উপদ্বীপ হিসেবে পরিগণিত হতো;  উন্নতির নিরিখে তা একটি তৃতীয় বিশ্বের বানানা রিপাবলিকে পরিণত হয়েছিল। একদিকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ, অন্যদিকে উৎকোচের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন শক্তির কাছে দেশীয় চিন্তাভাবনা পৌঁছে দেওয়া এক অত্যাবশ্যক কর্মে পরিণত হয়েছিল। কংগ্রেস পার্টি এবং তার সহযোগী দলসমূহের মধ্যে বাস্তবিকই এক লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল – ভারতকে কে কতটা পিছিয়ে রাখতে পারে। দেশীয় রাজ্যের, ক্ষমতাসীন রাজপুত্র ও ভূতপূর্ব-রাজাদের ব্যাক্তিগত সম্পত্তি ক্রমশ বিলীন হতে লাগলো এবিং অচিরেই তা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নিলাম কেন্দ্রগুলিতে দেখা যেতে লাগলো। জনগণকে বলা হল গৃহের পরিবর্তে এই অসামান্য শিল্পের স্থান একমাত্র জাদুঘর ও সংরক্ষণাগারে। ভারতের শিল্পের উন্নতি, তার অতীত গরিমার পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।

কংগ্রেসের অপকর্মের ওপরে তৈরী এই তালিকাটি নেওয়া হয়েছে মেজর জেনারেল কার্নিকের লেখা একটি সাম্প্রতিক প্রবন্ধ ‘Why Oppose Mr. Modi?’ থেকে।

মেজর জেনারেল ২০টিপ্রশ্নের একটি তালিকা প্রস্তুত করে ভারতবর্ষের বিগত কেন্দ্রীয় সরকাগুলিকে একটি দ্বন্দে আহ্বান করেছেন।

  • দেশভাগের দায় কার?

  • ১৯৪৭ সালের কাশ্মীরে জয়ের পূর্বমুহূর্তে আকস্মিক cease-fire কে ঘোষণা করল যার ফলে ২/৩ অংশ পাকিস্তানের গর্ভে চলে গেল? এই মূঢ় সিদ্ধান্তটি কি ভারতের পরবর্তী প্রজন্মগুলির ক্ষতিসাধন করেনি যথেষ্ট প্রকারে?

  • ক্ষমতায় কারা ছিলেন যখন চীন ভারতকে আক্রমণ ও পর্যদুস্ত করে?

  • কারা ক্ষমতায় ছিলেন মুম্বাইয়ে বিস্ফোরণের সময়ে?

  • কারা দাঙ্গায় ৪, ০০০ শিখের প্রাণহানির জন্য দায়ী?

  • কারা অনুপ্রাণিত ও সমর্থন করলেন বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের ভারতে বসবাসের জন্য?

  • কার নেতৃত্বে ভারতে সর্বাধিক দুর্নীতি হয়েছে?

  • কে ১৯৬৫ সালে রক্তের মাধ্যমে করায়ত্ত করা হাজিপির পাস্ এবং ১৯৭১ সালে এক লক্ষ পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দী ফিরিয়ে দিয়েছিলেন পাকিস্তানকে এবং কোন লাভ ছাড়াই?

  • কারা সরকারে ছিলেন যখন কাশ্মীর থেকে হিন্দু পণ্ডিতদের গণহত্যার মাধ্যমে তাড়িয়ে দেওয়া হয়?

  • কারা দূরদর্শনের “সত্যম শিবম সুন্দরম” প্রতীকটি সরিয়ে দেন?

  • কারা ভারতের মুদ্রা থেকে “সত্যমেব জয়তে” মুছে দেন?

  • কারা হিন্দুদের দ্বিতীয়-শ্রেণীর নাগরিক আখ্যা দিয়েছিলেন?

  • কাদের তত্বাবধানে, আর্টিকেল ৩০ (এ) অনুযায়ী, গীতা ও রামায়ণ স্কুলের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি কিন্তু কোরান এবং বাইবেলকে করা হয়েছে?

  • কারা ৭০% হিন্দু মন্দিরের আয় মসজিদে ও বাইবেলে দান করেছেন?

  • কারা হজের জন্য ভর্তুকি কায়েম রেখেছেন অথচ অমরনাথ যাত্রাকে করের আওতায় রেখেছেন?

  • কারা গত ৬০ বছর ধরে ৮০% ভারতীয়কে দরিদ্র শ্রেণীতে থাকতে বাধ্য করেছেন?

  • কারা মাত্রাতিরিক্তভাবে সংখ্যালঘু তোষণ করেছেন?

এর উত্তর একটিই – কংগ্রেস পার্টি, নেহেরু ও গান্ধী পরিবারের তত্বাবধানে লালিত ও পালিত একটি দেশদ্রোহী সংগঠন।

বিগত ৬০ বছর ব্যাপী কিছু হত্যার সংক্ষিপ্ত কাহিনী –

Ø  লাল বাহাদুর শাস্ত্রীকে হত্যা করার দায় কার যখন তিনি ইন্দিরা গান্ধীর সম্মুখে একটি বিপদ হিসেবে ক্রমশ প্রতিপন্ন হচ্ছিলেন?

Ø  ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্রী দীনদয়াল উপাধ্যায়, কংগ্রেসের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, এদের  হত্যার জন্য দায়ী কে?

Ø  বীর বাহাদুর সিংহ, রাজেশ পাইলট, শ্রী সিন্ধিয়া ও অন্যান্য ব্যক্তিরা, যাঁরা গান্ধী পরিবারের সম্মুখে ক্রমশ বিপদ হিসেবে প্রতিপন্ন হচ্ছিলেন, হত্যার দায় কার?

উত্তর একটিই – কংগ্রেস সরকার, নেহেরু এবং গান্ধী পরিবার।

যখন জনসাধারণ সম্পূর্ণ আশাহত হয়ে এক নির্জীব, জরাগ্রস্ত অবস্থায় অবস্থান করছিল – তখনই – ২০১৪ সালে আবির্ভূত হলেন এক ব্যক্তি – শ্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী। এবং উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি প্রাপ্ত হলেন এক অতীব জঘন্য, দুর্নীতিপরায়ণ, অপরাধমূলক এবং জীর্ণ ব্যবস্থার। অভিজ্ঞতা অনুসারে, পুরানো বিকৃত কাঠামোর নিরাময়ের পরিবর্তে নতুন অবয়ব গঠনই শ্রেষ্ঠ পন্থা। বিগত দশকগুলির মধ্য দিয়ে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যে ক্ষতিসাধন হয়েছে তাতে কাঠামোটি সম্পূর্ণ জরাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জনসাধারণের এক বৃহৎ অংশের মতে, সজীবতার আর কোন সম্ভাবনাই ছিলোনা আর ভারতও কোনদিন শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারতোনা। কিন্তু সকল দুরাশাকে হেলায় সরিয়ে ভারত পুনরায় প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠল। নব্য সরকার অতি দুর্মূল্য সময়ের কিয়দাংশও নষ্ট করল না, সূঁচ হারানোর দুঃখে বা তা ফিরে পাওয়ার চেষ্টায় বা তার বিলাপে। যাঁরা তাঁকে ভোট দিয়েছিলেন তাঁদের প্রত্যাশা হল আকাশচুম্বী – তাঁরা রাতারাতি কোন অলৌকিক পরিবর্তনের আশায় বুঁদ ছিলেন। তাঁরা চেয়েছিলেন নব্য প্রধানমন্ত্রী হিন্দুদের বিরুদ্ধে দশকের পর দশক ধরে প্রবাহিত বৈষম্য, দুর্নীতির নাশ করুন ও অর্থনৈতিক উন্নতির এক নতুন দিশা প্রণয়ন করুন।

গত চার বছর মোদী সরকারের কার্যপ্রবাহ ও তার বিশ্লেষণই হল এই প্রবন্ধের মূল লক্ষ্য। নিঃসন্দেহে, এক নিরাশাবাদীর কাছে জলের পাত্র সবসময়েই অর্ধেক অপূর্ণ থাকে; আশাবাদী সেটিকে অর্ধেক পূর্ণ দেখেন এবং একজন জ্ঞানীর মতে জলপাত্রটি অর্ধেক পূর্ণ ও অপূর্ণ। হিন্দুরা চতুর্থ গোষ্ঠীতে বিরাজ করছেন; তাঁদের পাত্র সম্পূর্ণভাবেই অপূর্ণ কারণ মোদী তাঁদের জন্য কিছুই করেননি। সর্বশেষ অংশটি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের এবং এই সরকারের প্রথম দুবছরের কার্যকালের পরে, তাঁদের মতে কোন কাজই হয়নি।

 এই প্রসঙ্গে গত ৪ বছরে ভারতের ঈর্ষণীয় সাফল্যটি উপস্থাপিত করা প্রয়োজন বিশেষ করে তাদের কাছে যাঁরা মনে করেন ভারতে সার্বিক সাফল্য এখনো অধরা রয়ে গেছে:

আধার নাম্বারের লিঙ্ক (বেস লিঙ্ক) স্থাপনের মাধ্যমে মহারাষ্ট্র থেকে ১০ লক্ষ দরিদ্র মানুষ অন্তর্হিত হয়েছেন।

৩ কোটির চেয়েও বেশী নকল এলপিজি কানেকশন বন্ধ করা হয়েছে।

মাদ্রাসা থেকে স্কলারশিপ লিস্টে ১ লক্ষ, ৯৫, ০০০ জাল বিদ্যার্থীর নাম অদৃশ্য হয়েছে।

১৫ লক্ষ জাল রেশন কার্ড অদৃশ্য হয়েছে।

প্রশ্ন – কি কারণে এসব অদৃশ্য হচ্ছে।

চোরেদের কালোবাজার আজ সর্বসম্মুখে। এবং সেই জন্য আজ চোরের একত্র হয়ে মাননীয় সুপ্রীম কোর্টের সামনে একটি পিটিশন দাখিল করেছে যে এই বেস লিঙ্ক হল আদতে মৌলিক অধিকারের সমতুল্য। এবং এই গ্রূপে  কিছু প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রীও রয়েছেন। চোরেদের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষার অর্থ কি? যেহেতু তাঁদের কোন আইনী আশ্রয় নেই, সেই জন্য তাঁরা গৃহযুদ্ধ আর রক্তপাতের মতো মারাত্মক হুমকি দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

অসামাজিক ক্ষেত্র, তৎসহ গুন্ডা এবং রাজনৈতিক সমর্থনপুষ্ট মাফিয়া গোষ্ঠীগুলি আজ সর্বসমক্ষে উন্মোচিত এবং তাঁদের লুটতরাজের শিল্পে আজ কালো ছায়া।

স্বভাবতই, এই মানুষগুলি আজ আহত ও রাগে কাঁপছে।

  • মোদী ৩ লক্ষেরও বেশী জাল কোম্পানী বন্ধ করেছেন।

  • রেশন ডিলাররা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ।

  • প্রপার্টি ডিলাররা আজ তুমুল্ভাবে বিরক্ত।

  • অনলাইন সিস্টেমের দরুন ব্রোকাররা আজ প্রচন্ড অসন্তুষ্ট।

  • ৪০, ০০০ এ চেয়ে বেশী এনজিও বন্ধ করা হয়েছে। তার জন্য এনজিও ব্যবসার নেতৃস্থানীয়র ভাঁড়ারে টান পড়েছে।

  • যে সব ব্যক্তি কালো টাকার মাধ্যমে সম্পত্তি কেনা-বেচা করেছেন আজ ভয়ানক ক্ষুব্ধ।

  • ই-টেন্ডারিং পদ্ধতি চালু করার মাধ্যমে সন্দেহজনক নৈতিকতাধারী সরকারী শত্রূরা দ্রুত উৎপাটিত  হয়েছে।

  • গ্যাস কোম্পানীর কর্মচারীরা তাঁদের টেবিলের নীচের উপরি অর্থ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

  • এখনো পর্যন্ত ১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ, যাঁরা এতদিন সরকারী কোষাগারকে ফাঁকি দিয়ে কালো টাকা উপার্জন করতেন, ইনকাম ট্যাক্স স্ক্যানের জন্য আজ রাগে অগ্নিশর্মা।

  • GST র সূচনা ব্যবসায়ীদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

  • দু নম্বরি কাজকর্ম সামগ্রিকভাবে বন্ধ হওয়ার মুখে।

  • কালো টাকাকে সাদা করার প্রক্রিয়ায় আজ আর কাজ হচ্ছেনা।

  • অলস সরকারী বাবুরা আজ ভয়ানক ক্ষুব্ধ, ঠিক সময়ে হাজিরা ও কঠোর পরিশ্রম করার জন্যে।

  • যাঁরা দেরীতে আসতেন কর্মক্ষেত্রে বা আসতেন না, তাঁরা আজ ভয়ানক সমস্যায় পড়েছেন। জনসেবা নিমিত্ত সরকারী চাকুরে হয়েও তাঁরা মালিকের মতো ব্যবহার করেছেন। এটি সর্বজনবিদিত ছিল যে তাঁরা উৎকোচ গ্রহণের পরেই কাজ করবেন। পরিস্থিতি এই ছিল যে ফাইল খোলার আগে একজন করণিকও একই ব্যবহার করতেন। উৎকোচ বা ঘুষ এক স্বাভাবিক, আবশ্যিক ব্যাপার হিসেবে বিবেচিত হতো। স্বাস্থ্যব্যবস্থার কর্মচারীরাও ময়লা পরিস্কারের আগে অর্থ সংগ্রহের জন্য দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়াত। এটিকেই হাফতা বলা হতো।

পরিবর্তনের মুক্ত হাওয়া অনুভব করছেন অসংখ্য মানুষ যদিও দুর্নীতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের মাধ্যমে, জোচর আর চোরেরা মানুষকে বোঝানোর চেষ্টায় রত যে গত ৪ বছরে বিশেষ কোন উন্নতি ঘটেনি।

বর্তমানে, ভারতীয় অর্থনীতি গতিশীল ও ক্রমশ উন্নতির পথে। তার প্রাণোচ্ছলতা, প্রবল আত্মবিশ্বাস ও উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী নূতন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করছে।  ভূ-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে, কেন্দ্রীয় সরকার সক্ষম হয়েছে পাকিস্তানের কাছ থেকে অন্যান্য ইসলামিক দেশগুলিকে দূর করতে এবং তাদের মধ্যে এক বড় অংশকে ভারতের মিত্রে রূপান্তরিত করতে। এমনকি, প্যালেস্তাইনও অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের ওপর বেশী গুরুত্ব দিচ্ছে!  এই প্রথম ভারত ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দিলো এবং তার মাধ্যমে  সত্যিই এক অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য মিত্র খুঁজে পেলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী মোদী দ্বারা সৃষ্ট দেশের এই গরিমাকে ভারতীয়দের অবশ্যই সাধুবাদ দেওয়া উচিত। যে কোন দেশের পক্ষে এই সম্মান এক অত্যন্ত শক্তিশালী সম্পদ এবং এক্ষেত্রে ভারত কোনমতেই ব্যতিক্রম নয়। যদি এই পরিবর্তনগুলি অপ্রয়োজনীয় বলেই মনে হয়, তাহলে দেশবিরোধী শক্তিগুলি কেন এতো প্রবলভাবে মোদীকে পরাজিত করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে?

এই পরিপ্রেক্ষিতেই দ্বিতীয় প্রশ্নটি আসে।

কেন এই – এখনই বা কখনোই নয় – প্রসঙ্গ উঠছে বারংবার?

যতই আমরা ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি, মোদিকে অপসারণের দাবী ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে।  মনে হয়, আগামীদিনে এটি কোন এক ভয়ানক প্রতিক্রিয়াবাদী সংগ্রামের দ্যোতক হয়ে উঠবে। যদি কোন agenda/নির্দিষ্ট বিষয়ই না থাকে, তাহলে পূর্ববর্তী সরকার বা শক্তিসমূহের্ কারণ কি?

শ্রী নরেন্দ্র মোদী কি বিদেশী? তাঁর রাজনৈতিক জীবন এবং নৈতিক চরিত্র কি সন্দেহজনক? তিনি কি দুর্নীতিগ্রস্ত? তিনি কি তাঁর আত্মীয়স্বজনদের বিশেষ কোন সুবিধা প্রদান করেছেন তাঁর নিজ উচ্চ সাংবিধানিক ক্ষমতার মাধ্যমে? তিনি কি দেশবিরোধী? তিনি কি পরিশ্রম বিমুখ? তিনি কি দায়িত্বজ্ঞানহীন? তিনি কি অপ্রকৃতিস্থ?

যদি এই প্রশ্নগুলির উত্তর এক বৃহৎ শূন্য না হয়, তাহলে তাঁর প্রতি কিছু লোকের মধ্যে অসূয়া কেন? দেশবিরোধী শক্তিগুলি আর তাদের আদর্শহীন আঞ্চলিক দলগুলি ক্রমশ একজোট হচ্ছে। তাঁদের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি যে বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য তাঁরা যেকোন পন্থা নেবে প্রমাণ করে যে লাভ, ক্ষমতা ও কর্তৃত্বর প্রতি আদিম লালসা ব্যতিরেকে তাঁদের মধ্যে আর মিল নেই।

চীন ও পাকিস্তানের মতো অকৃত্রিম ভারত-বিরোধী দেশের থেকে সাহায্যের প্রত্যাশা করা হচ্ছে নির্লজ্জভাবে। এই মহাজোটবন্ধন যদি ক্ষমতায় আসীন হয় শেষ পর্যন্ত , তাহলে ইউপিএ আমলের কালান্তক ১০ বছরও এক স্বপ্ন রূপে প্রতিভাত হবে। সম্প্রতি একটি সমাবেশে, অংশগ্রহণকারীরা ফটো তোলার জন্য এক একত্রিত হলেন। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাইটে যে ফটোটি শেষ পর্যন্ত উপস্থিত হল – ২১ জন ব্যক্তি সম্বলিত ছবি; যার মধ্যে ১১ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে কয়েকজন জামিনে বাইরে আছেন।কয়েকজন বিষন্ন ব্যক্তি আবার ভোটে কখনো লড়েননি। এই গোষ্ঠীর নেতা কে? উত্তর – শ্রী রাহুল গান্ধী। তাঁর যোগ্যতা কি? নেহেরুর দৌহিত্রের পুত্র। যখন ভাঁড়েরা দেশশাসন করেন, সমগ্র দেশ এক কৌতুকে পরিণত হয়। স্যার উইনস্টন চার্চিলের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী – স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরে, ভারত শাসিত হবে প্রতারক, লুঠেরা ও গুন্ডাদের দ্বারা। অবশ্যই তিনি নির্ভুল ছিলেন। এক্ষেত্রে আমরা আরো দুটি যোগ করতে পারি – অশিক্ষিত ও নির্বোধ ভাঁড়।

এই অনাবাসী ভারতীয়রা ক্ষমতায় নেই কিন্তু যদি একবার ক্ষমতালাভ করতে পারে এঁড়ে সেই সব কাজগুলিই হবে যা গত ৬ দশকেও করে উঠতে পারা যায়নি। তাঁরা আর কোন মুহৃর্তের জন্য অপেক্ষা করবেন না। রাহুল গান্ধী পরিণত হয়েছেন এবং ক্ষমতালাভের জন্য নেহেরু-গান্ধীর উত্তরসূরীরা ক্রমশ ব্যস্ত হয়ে উঠছেন। এই দৃঢ়ক্তির মাধ্যমেই সহজে স্পষ্ট হয় যে তাঁদের রাষ্ট্রের উন্নতির কোন প্রয়োজন নেই। এখন সময় আগের চেয়েও ভয়াবহ, অতএব অধিকতরভাবে সঙ্কটজনক। মূল কারণ – আমরা শত্রূর সাথে সম্যক পরিচিত নই। আমরা কি জানতাম গান্ধী আমাদের কত বড় শত্রূ  ছিলেন? নিজ স্বার্থের জন্য নেহেরু দেশকে বিক্রী করতেও প্রস্তুত ছিলেন। এটাও কি জানা ছিল – নেহেরু কতবড় অপদার্থ, হিন্দু-বিদ্বেষী ছিলেন? এইবার ক্ষমতায় আরোহন করলে সমগ্র কংগ্রেস পার্টি হিন্দু-বিরোধী কর্মকান্ডের এক সদর ঘাঁটিতে পরিণত হবে এবং তা হেতু স্বার্থপরতা, দুর্নীতি আর বিশ্বাসঘাতকতার বান ডাকবে জনগণের মধ্যে। যদি ভারত বর্জ্য বঙ্গ এবং অন্ধ্র প্রদেশ, কেরালা এবং তামিলনাড়ুর কিছু দুষ্ট রাজনীতিবিদকে সামলাতে না পারে, মহাঠগবন্ধনের মধ্য দিয়ে সক্রিয় বিভিন্ন মাফিয়া গ্রূপকে সামলাবে কি করে?

বহু লোক মোদিকে দোষ দেন রাম মন্দির তৈরী না হওয়ার জন্য বা জম্মু-কাশ্মীরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে অক্ষম হওয়ার জন্য বা শেষ পর্যন্ত আচ্ছে দিন (ভালো সময়) আনতে না পারার জন্য। এঁদের প্রশ্ন করা যাক – সম্প্রতি নির্মিত মহাজোটবন্ধন কি তার বিষয়সূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেছে:

v  রাম মন্দির নির্মাণ;

v  আর্থিক দুর্নীতি মুক্ত, সবল সরকার;

v  ধারা ৩৭০র অপসারণ;

v  দারিদ্র্য ও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের (উচ্চ জাতির তকমা দেওয়া) প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সাথে মোকাবিলা করা;

v  সন্ত্রাসবাদের ছোবল থেকে মুক্তি এবং বৈদেশিক ষড়যন্ত্রের সমস্ত উদ্যোগ ব্যর্থ করা।

অতএব, এখনই বা কখনোই নয় নামক শুভ মুহূর্তটি এখন আগত।

আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের আগেই – যখন প্রতি মূহুর্তে রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘর্ষের আশঙ্কায় প্রহর গোনা হয়, বিদেশী সমর্থনপ্রাপ্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা কখন হাঙ্গামা শুরু করে এই ভয়ে থাকতে হয় – জনগণ এই প্রশ্নগুলির উত্তর দাবী করুন মহাঠগবন্ধনের কাছ থেকে –

তাঁরা জনগণের উন্নতির জন্য আর কি করবে?

তাঁদের আদর্শগত ভিত্তি কি?

তাঁদের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতি কি?

দেশের ক্রমশ উন্নতিসাধনের জন্য তাঁদের অর্থনৈতিক নীতি ও পথ কি? এটি অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন ১৯৯৯-২০০৪ র সময়ে অর্জিত সাফল্য ধরে রাখার ব্যর্থতার মধ্যেই অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও জাতীয় সুরক্ষার চূড়ান্ত ব্যর্থতা রূপ পেয়েছে।

তাঁদের নিজেদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁদের কিছু নেতা গৃহযুদ্ধের কথা বলছেন; অন্যরা ভাড়া করা সৈনিকদের সাহায্যে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ধর্মঘট, সম্পত্তি ধ্বংস ও কোটি কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি লুঠের কথা বলছেন। দাঙ্গা, হাঙ্গামা বাঁধানোর সমস্ত প্রকারের অপকৌশল ব্যবহৃত হচ্ছে, মানুষকে উস্কানি দেওয়া হচ্ছে যাতে সরকারকে দোষ দেওয়া যেতে পারে ক্রমাগত।২০১৪ সাল থেকে সংসদ ভবনে এমন কোন দিন যায়নি যেদিন হৈ হট্টগোলের মাধ্যমে দিনটিকে পণ্ড করার চেষ্টা হয়নি। নিঃসন্দেহে, এরকম কোন অসভ্যতা যদি কোন ক্লাসরুমে চলতো তাহলে পুরো ক্লাসের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হতো। কিন্তু এই নির্লজ্জ্ব ব্যক্তিরা গণমাধ্যমের সাহায্য প্রাপ্ত যারা এই সমস্যাকে একটি নতুন সংজ্ঞা প্রদানে সদা ব্যস্ত। যেকোন অতি সাধারণ ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে জনগণের সামনে উপস্থিত করা ও তার মাধ্যমে জনজীবনকে অস্থির রাখাই এদের মূল লক্ষ্য। অবস্থা এতদূর গেছে যে, এরা দেশপ্রেমিক ইন্ডিয়ান আর্মির দেশ হিতার্থে করা কাজ নিয়েও প্রশ্ন তোলে এবং জওয়ানদের বিরুদ্ধে কেস দায়ের করে জন আদালতে। এটি আশ্চর্য নয় যে দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারপতিরা এদের পক্ষই অবলম্বন করেন। আর্মি জওয়ানের কোন কেস একমাত্র মিলিটারি কোর্টেই করা যেতে পারে কারণ তাঁরা নিজেদের ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের আদেশ পালন করছেন মাত্র। কিন্তু – কোনদিনই বা গণমাধ্যম আর দেশবিরোধী শক্তি আইনকে পাত্তা দিয়েছে?

কোনভাবেই, আর্মির কর্মকান্ড রাজনীতির আলোচ্য বস্তু বা দুষ্ট বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকের চর্চার বিষয় হতে পারেনা। গান্ধী শান্তির আশ্বাস দিয়েছিলেন মুসলিমদের হাতে অবিভক্ত বঙ্গের এক বিশাল ভূখণ্ড তুলে দেওয়ার পর। সেই পরম আখাঙ্খিত শান্তি কোথায়? বর্তমানের জালি গান্ধীদের মধ্যে তাঁর আত্মা বেঁচে আছে এবং এই জালিয়াতরা কোন পরীক্ষায় পাশ করেনি বা কোন ক্ষেত্রেই নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেনি। যদি ভারতীয়রা এই জালিয়াতদের ভোট দেয় তাহলে অচিরেই তা ভারত রাষ্ট্রের প্রতি এক অস্তিত্বজনিত সঙ্কট উৎপন্ন করবে এবং তার প্রথম বলি হবেন হিন্দুরা। ক্রমশ দুর্বল হতে থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু – নিজেদের ভূমিতে থেকেও সন্ত্রস্ত হিন্দু শেষ পর্যন্ত অন্তর্হিত হয়ে যাবে পৃথিবী থেকে।  এবং এই কাজটি করতে যে হিন্দু-বিরোধী রাষ্ট্রশক্তি বেশী সময় নেবে না তা বলাই বাহুল্য।

সদর্থক পরিণাম আশা করে ভারত একই ভুল বারংবার করতে পারেনা। যাঁরা এখনো গুঞ্জন করেন, “দে দি হামে আজাদ বিনা খড়গ বিনা ঢাল” তাঁদের বাস্তবের সাথে পরিচয় করানো অত্যন্ত প্রয়োজন। মানুষ স্বাধীনতা পায়নি, কংগ্রেস পার্টি পেয়েছিল। এবং তাও শস্ত্র ব্যতিরেকে? হিন্দু ও শিখদের ছাগলের মতো হত্যা করা হয়েছিল শত্রূর রক্ততৃষ্ণা মেটানোর জন্য। লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁদের বিষয় সম্পত্তি, পূর্বপুরুষের গৃহ ত্যাগ করে প্রাণের দায়ে পালিয়ে গিয়েছিল। গান্ধী সর্বতো প্রচেষ্টা করেছিলেন যাতে হিন্দু এবং শিখেরা পাকিস্তানে থেকে যায় তাঁদের ওপর নারকীয় অত্যাচার অনুভব করার জন্যে। সৌভাগ্যবশতঃ, মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে প্রায়, তাঁরা চেতনা প্রাপ্ত হলেন।  হয় পদব্রজে অথবা অন্য কোন উপায়ে তাঁরা পলায়ন করলেন।

শৈশবে আমি নিজে এই ভয়াবহ গণহত্যার সাক্ষী হয়েছিলাম। শিশুরা পিতা মাতা বঞ্চিত হয়েছে; কোথায় যাবে জানে না, পরিজনেরা হাঁটছেন কপর্দকহীন অবস্থায়। এবং সেই পাঞ্জাবের বিধায়ক, এন এস সিধু পি[পাকিস্তানের প্রতি তাঁর প্রেম নিবেদন করছিলেন সম্প্রতি।

যদি মানুষ তাঁদের নির্লিপ্ততা পরিহার না করে, নিরুদ্যমই থেকে যায়, তাহলে সমগ্র ভারত একটি পশ্চিমবঙ্গে পরিণত হবে যেখানে রক্ত বয় নদীর মতো অথবা কেরালার মতো যেখানে হিন্দু হলেই তোমার সর্বনাশ ঘনিয়ে আসবে। বিকল্পটিও মনে রাখা উচিত এই লগ্নে – প্রধানমন্ত্রী মায়াবতী, প্রধানমন্ত্রী রাহুল গান্ধী, প্রধানমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা প্রধানমন্ত্রী অখিলেশ – যাঁরা সোনিয়া গান্ধী দ্বারা সৃষ্ট নাগপাশের মধ্যেই ছটফট করবে। প্রত্যেক রাজ্যের অধিবাসীদের সুরক্ষার বিষয় ও তাঁদের নিজ সন্তান সন্ততিদের নিয়ে ভাবতে হবে নইলে রাজনীতির পঙ্কিল আবর্ত তাঁদের গ্রাস করবে।

বিপর্যয় ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে ভারতীয়দের ওপরে; শুধুমাত্র সঠিক নির্দেশ এবং সামান্য কনুইয়ের গুঁতো প্রয়োজন গৃহযুদ্ধ আরম্ভ করতে। যাঁরা ধর্ণা ও আমৃত্যু অনশনের পক্ষে আছেন তাঁরা শুধু মিডিয়ার পর্দায় নিজের মুখমণ্ডল দেখতেই ব্যস্ত। যাঁরা খণ্ডিত সমাজ চান তাঁদের শেষ পর্যন্ত কেউই পাত্তা দেয় না। মহাঠগবন্ধন সেটিই করছে এবং এর মাধ্যমে প্রাক-২০১৪ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায় যখন সন্ত্রাসই একমাত্র রাজত্ব করতো। এই কি মানুষ তাঁদের ভাগ্য হিসেবে পেতে চান? ভারতীয় ভোটাররা কী চান দেশের এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের পতন হোক এবং আর্থিক দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারী দ্বারা আচ্ছন্ন হোক রাষ্ট্র জীবন। অতএব, এখনই বা কখনোই নয় অবস্থাটি হল ভারতীয় ভোটারের প্রজ্ঞার পরীক্ষা।  পিরিয়ড।

অতএব, সর্বশেষ প্রচেষ্টার সময় উপস্থিত যদি আমরা ভারত রাষ্ট্র ও ধর্মের বিলোপ রক্ষা করতে চাই। এই প্রবন্ধটিকে একটি সাবধান বাণী এবং বিবেকবান মানুষের কাছে একটি আবেদন হিসাবে সাব্যস্ত করা যেতে পারে যাতে তাঁরা সময়ের গুরুত্ব ও সার্বিক অবস্থার সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন। শীঘ্র একটি তালিকা প্রস্তুত করুন আবশ্যিক কার্যের ওপরে এবং কিভাবে প্রধানমন্ত্রী মোদীজি এদিকে অগ্রসর হতে পারেন। এটি সর্বদা স্মরণে রাখা উচিত যে রোম শহরটি একদিনেই সৃষ্টি হয়নি কিন্তু অবশেষে তৈরী হয়েছিল। পার্লামেন্টে দুষ্টদের দ্বারা সৃষ্ট প্রতিকূল অবস্থার ক্ষেত্রে মোদীজি সময় নিতে পারেন কিন্তু তিনি তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছোবেনই।

পরিশেষে, ২০১৯ র নির্বাচন আগামী টেস্ট সিরিজের জন্য ক্রিকেট ক্যাপ্টেন নির্বাচিত করার জন্য নয়; যাতে বলা যেতে পারে ওঁদের আর একটু সময় দেওয়া হোক। যদি তাঁরা ব্যর্থ প্রমাণিত হন তখনই বিকল্পের কথা ভাবা যাবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আগামী ৫ বছরের জন্য দেশের ভাগ্য নির্ধারিত হবে এবং তাতে আমরা অকৃতকার্য হলে আগামী ৫ বছরেই দেশ ভেঙে টুকরো টুকরো হবে ও ধর্ম চিরতরে বিলীন হবে শূন্যে।

এখন মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।

আমরা কি প্রাক-২০১৪ ছটি দশকের পুনরাবৃত্তি চাই? আমরা কি একদা এক অসামান্য সভ্যতার এবং সংস্কৃতির (যা বাকি পৃথিবী অনুসরণ করে অক্ষরে অক্ষরে) ধ্বংস চাই? দেশবিরোধী শক্তি নিজেদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সর্ব প্রচেষ্টায় মগ্ন – এমনকি ভারত-বিরোধী বিদেশী শক্তির সাহায্য নিতেও তারা পিছপা নয় যাতে প্রকৃত রাষ্ট্রবোধ ও আত্মবিশ্বাসকে ধ্বংস করা যায় এক নিমেষে। ২০০৯ সালে শ্রী বাজপেয়ীকে সমর্থন করা হয়নি; ফলতঃ, সমগ্র দেশ এক ভয়ঙ্কর আর্থিক-সামাজিক দৈন্য, পরবর্তী ১০ বছর ব্যাপী আর্থিক কেলেঙ্কারী, কুশাসনের শিকার হয়েছিল। এখন যদি শ্রী মোদী প্রত্যাবর্তনে ব্যর্থ হন ভারত আগামী ১০০বছরের জন্য মাৎস্যন্যায়ের কবলে পড়বে, খণ্ডিত হবে এবং পুনরায়, বিশেষত হিন্দুরা (যদি বেঁচে থাকে শেষ পর্যন্ত) দাসে পরিণত হবে। ভারতীয়দের মনে রাখতে হবে নিজেদের অভীষ্ট লক্ষ্য এবং ভারতের অপার ক্ষমতার ওপরে।

‘যুগ যুগ ধরে প্রবাহিত ভারতবর্ষ মৃত নয়; তাঁর নিজ অন্তরের শেষ শব্দটিও তাঁর দ্বারা উচ্চারিত হয়নি; তিনি বেঁচে আছেন এবং এখনো নিজের ও মনুষ্য সমাজের হিতার্থে তাঁর ভূমিকা অমলিন আছে।’ – শ্রী অরবিন্দ।

লেখক: শ্রীমতী কমলেশ কাপুর, ঐতিহাসিক এবং অধ্যাপক, বহু গ্রন্থের প্রণেতা –

ভারতীয় সভ্যতায় লালিত এক গর্বিত পাঞ্জাবী।

গো-হত্যা নিয়ে কমিউনিস্টদের ভণ্ডামি

  • দেবাশীষ লাহা 
কম্যুনিস্ট স্বর্গরাজ্য কিউবাতে ১৯৭৯ সাল থেকে গোহত্যা তথা গোমাংস ভক্ষণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। Article ২৮২ এবং ২৪১ এই নিষেধ নথিভুক্ত হয়েছে। Decree no ২৫৫ তে গোহত্যাকে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কেবল মাংস ভক্ষণ নয়,  গরু কেনা বেচা বা লেনদেন পর্যন্ত নিষিদ্ধ। গৃহস্থ কেবল দুধ দোয়াতে পারেন। অন্য কাজে লাগাতে পারেন। আইন ঠিকঠাক মানা হচ্ছে কিনা তা দ্যাখার জন্য নিয়মিত অনুসন্ধান ও গরু গণনা হয়। গোমাংস নিয়ে ধরা পড়লে দশ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে। এতে কারও ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত লাগছে কিনা জানা নেই। আর লাগলেও কিছু করার নেই। খাদ্যের স্বাধীনতা,  ধর্ম পালনের স্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা ইত্যাদি নিয়ে কোনো আন্দোলনের কথাও শোনা যায় না। বিফ পার্টিও হয় না। দেশটা যে কিউবা। একটিই দল। কম্যুনিস্ট পার্টি। সে-ই ভাগ্যবিধাতা।  আর কোন রাজনৈতিক দল সেখানে নেই। থাকার প্রশ্নই নেই। কারণ সেটা বেআইনি। আর তাই নির্বাচনের ঝামেলাও নেই। পান থেকে চুন খসলে যে ফেসবুকে জানাবেন, প্রতিবাদ করবেন, তারও উপায় নেই। মাসের মধ্যে একদিন ইন্টারনেট পেলে আপনার সৌভাগ্য। নেতা টেতা হলে অবশ্য ভিন্ন কথা।
যাচ্চলে!  এসব কি বলছি!  এ যে মহাপাপ!  চে গুয়েভরা থুড়ি গুয়েভারা, কাস্ত্রোর দেশ!  অর্থকরী দৃষ্টিভঙ্গিতে গোহত্যা নিষিদ্ধ হতেই পারে, সে মহান ব্যাপার। কিন্তু বৃহৎ ভাবাবেগে আঘাত লাগবে বলে গোহত্যা বন্ধ?  নৈব চ নৈব চ! শুধু কি তাই?  যে কোন সভ্য দেশে প্রাণিহত্যার ক্ষেত্রেও বিবিধ বিধিনিষেধ আছে৷ যেমন stunned করে হত্যা, ধর্মীয় হত্যার আগে অনুমতি নেওয়া,  ভেটেনারি সার্জনের বাধ্যতামূলক উপস্থিতি ইত্যাদি ইত্যাদি। ও হরি তবে তো আবার হালাল হবেনা! ভাবাবেগে আঘাত লাগবে।   আর তাই দমদম এয়ারপোর্টে একটি বেআইনি মসজিদটি নিছক ভাবাবেগের কারণেই ভাঙা তো দূরের কথা, বাবা বাছা করে অন্যত্র সরানো পর্যন্ত যাচ্ছে না। হাজার হাজার কোটি টাকা অনুমোদিত হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু নতুন রানওয়ে তথা বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কাজটি আটকে আছে।
কী বললেন?  আপনি আধুনিক ভারত নির্মাণের পক্ষে?  তাই ধর্ম নির্ভর খাদ্যাখাদ্য বিচার, কুসংস্কার ইত্যাদি থেকে বেরিয়ে আসতে চান?  খাদ্য স্বাধীনতার পূজারি?  বাহ বেশ!  তা কমরেড কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষকেই “সভ্য, আধুনিক” বানানোর টেণ্ডার নিলে যে আপনার জেণ্ডার চেঞ্জ হয়ে যাওয়ার আশংকা আছে।  নিউজিল্যান্ডের হামলাটি কেন হল বলুন তো?  আধুনিক আইন কানুন সবার জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে মাথায় তুলে রাখলে পালটা প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য। তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম আপনি প্রকৃতই ধর্মনিরপেক্ষ।  আধুনিক জীবন যাপনে বিশ্বাস রাখেন। কথায় কথায় প্রথম বিশ্বের উদাহরণ দেন। কটি ইউরোপীয় রাষ্ট্রে প্রকাশ্যে হিজাব পরা, কোরবানির অনুশীলন নিষিদ্ধ হয়েছে জানেন?  কোন দেশে কটি মসজিদ, কেন, কোন পরিপ্রেক্ষিতে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে খবর রাখেন?  মসজিদ, মাদ্রাসায় যাতে বিদেশী টাকা না ঢুকতে পারে সেই উদ্দেশ্যে কোন কোন দেশ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে জানেন কি?  হা হা হা!  আপনি যদি ধর্মনিরপেক্ষ হন, তবে ছাগলও মঙ্গলগ্রহের জীব।   ধর্মের অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে ভেবে আপনি অভিন্ন দেওয়ানি বিধির  প্রস্তাবে হেঁচকি তোলেন, রাস্তা আটকে নামাজ পড়লে সম্প্রীতি আওড়ান, “সুশিক্ষিততম” রাজ্যটিতেও বাল বিবাহের অনুশীলনে কাঁড়ি কাঁড়ি ছানা প্রসব হলে মুখে কুলুপ আঁটেন!  কেরালা মুর্শিদাবাদ, কোলন, বার্মিংহামে যে কোনো ফারাক নেই বেমালুম চেপে যান!  আর সেই আপনিই গোরু খাওয়ার স্বাধীনতা আছে বলে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তোলেন!  হে মহান বামাবতার!  কেবল সংখ্যালঘুদিগেরই কি ধর্মীয় অনুভূতি আছে?  সংখ্যাগুরুরা গরু পূজা করিয়া থাকে বলিয়াই কেবল পুচ্ছ নাচাইয়া সম্মতি জ্ঞাপন করিবে?  ভরতের জন্মভূমিটি অদ্যপি কিউবা হইয়া ওঠে নাই, সুদূর ভবিষ্যতেও তাহা সম্ভব হইবে না, ইহা নরওয়ে সুইডেনও নহে।।এদেশের সিংহভাগ মানুষ অদ্যপি হিন্দু। ভাবাবেগ তথা ধর্মীয় অনুভূতি কেবল মুসলমানের সম্পত্তি নহে, হিন্দুদিগেরও তাহাতে সমান অধিকার। কবে কোন দেবতা গরু/ ষণ্ড ভক্ষণ করিয়াছিল তাহার “শাস্ত্র নির্ভর” ব্যাখ্যা প্রদান করিয়া এই হিন্দু ভাবাবেগকে দূরীভূত করা যাইবেনা। যেরূপ, দাড়ি, বোরখা, হিজাব, আকিদা ইত্যাদি লইয়াও ইসলামিক শাস্ত্রে অজস্র পরস্পর বিরোধী ব্যাখ্যা এবং বিশ্বাস বিদ্যমান।  শিয়া সুন্নী আহমেদিয়ার বিভেদ এবং বিভাজন এখন দিবালাকের ন্যায় পরিস্ফুট।  আপনি আমি কতটা মুক্তমনা, গোরু ভক্ষণ করি কি করিনা, তাহা অপেক্ষা অনেক বড় প্রশ্ন এদেশের সিংহভাগ মানুষ কোন ইচ্ছাটি পোষণ করেন। সংখ্যালঘুর ধার্মিক অনুভূতিকে সম্মান জানাইলে সংখ্যাগুরুর আবেগটিকেও শিরোধার্য করিতে হইবে। ইহাই বিজ্ঞান, ইহাই গণতন্ত্র।  খাদ্যনীতি অর্থনীতির দোহাই দিয়া যতই ইহার অন্যথা ঘটিবে গরুটি ততই লেজের ব্যবহার কমাইয়া শিং নির্ভর হইয়া পড়িবে।  তাহারই সূত্রপাত হইয়াছে।  প্রকৃতিদেবী কেন তাহাকে এক জোড়া শিং প্রদান করিয়াছে,নিরীহ চতুষ্পদটি উপলব্ধি করিয়াছে।  অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসেবেই এই গোঁতানোর কার্যক্রম।  অতএব হে বামাবতার, পশ্চাৎ দেশটি সামলাইয়া রাখুন।

বলিউডের ইসলামীকরণ

  • – অমিত মালী 

 

ভারতবর্ষের হিন্দি সিনেমা বলিউড নামে পরিচিত, যা এতদিন ভারতবর্ষের সাধারণ থেকে ধনী এলিট শ্রেণীর জনগণকে আনন্দ দিয়ে এসেছে। সত্যিই আজকের দিনে বলিউড একটি শক্তিশালী  মাধ্যম। কিন্তু দীর্ঘ বছর ধরে বলিউড ভারতের হিন্দুদের পিছনে যে বাঁশ দিয়ে আসছে  এবং তা আমাদের হিন্দুদের অজান্তে,অনেকের প্রতিভা থাকা সত্বেও হিন্দুদেরকে বঞ্চনা করা হয়েছে, অনেক হিন্দু অভিনেতা ও অভিনেত্রী ও গায়িকা মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে,হিন্দি সিনেমার গানের মধ্য দিয়ে উর্দু ভাষা ও ”আল্লা”  শব্দটিকে ভারতের সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়েছে, সেটাই এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়।

হিন্দি সিনেমার কথা যখনই আলোচনা করা হয়- তা সে খবরের কাগজ বা টিভি চ্যানেল হোক, প্রথম যে কথাটা উঠে আসে ( এটা  মাঝে মাঝে হেডলাইনও হয়) যে বলিউড শাসন করছে তিন খান। তিন খান বলতে শাহরুখ খান, সলমান খান এবং আমির খান। এই তিন খান দীর্ঘ বছরে তাদের সিনেমার মধ্য দিয়ে ভারতের মানুষের মধ্যে মুসলিম ধারা ও তাদের সংস্কৃতি, মুসলিমদের পক্ষে এবং হিন্দুদের বিশাল ক্ষতি করে এসেছে এবং এখনো পুরো মাত্রাতে করছে। এরা  ছাড়াও বলিউডের বেশ কয়েকজন প্রযোজক যারা সিনেমা তৈরিতে টাকা দেয় যেমন মহেশ ভাট( নাম হিন্দুর মতো হলেও একজন মুসলিম), সাজিদ নাদিদওয়ালা প্রভৃতি। এছাড়া সংগীত পরিচালক সেলিম মার্চেন্ট ও তার ভাই সুলেমান মার্চেন্ট, আনিস বাজমি,লাকি আলী,অনু মালিক ও আরো অনেকে।

প্রথমে এই তিন খানের কোথায় আসা যাক। তিন খানের সবাই হলো এক একটা ”লাভ জিহাদি”  এবং এরা  ভারতের লক্ষ্য লক্ষ্য লাভ জিহাদির কাছে একটি প্রেরণা এবং তারা নিঃসন্দেহে এদেরকে অনুসরণ করে।শাহরুখ খান গৌরীকে বিয়ে করে তাকে মুসলমান বানিয়ে দিয়েছে এবং তার ছেলে মেয়ে সকলে মুসলিম হয়েছে। মুখে হাজারবার আমি মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়নি বললেও,আমি বাড়িতে হিন্দুধর্ম মেনে চললেও, গৌরী খান তার তিন ছেলেমেয়ের একজনের নামও হিন্দু নাম দিতে পারেনি। তারপর শাহরুখ খান তার অভিনীত সিনেমার মধ্য দিয়ে মুসলিম চরিত্রগুলিকে বড়ো করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। একটি সিনেমা হলো ”মাই নেম ইজ খান”। সলমন খানও লাভ জিহাদের চেষ্টা চালিয়ে এসেছিলো দীর্ঘদিন থেকে। প্রথমে ঐশ্চর্যা রাই, তারপর সোনাক্ষী সিনহা। কিন্তু কোনোটিই সফল হয়নি। তারপর সলমন খান মুসলিম উম্মাহ-কে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করলো তার ‘সুলতান’ সিনেমায়। তিনি এই সিনেমায় দেখালেন যে এক মুসলিম কুস্তিগীর হরিয়ানা থেকে  বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু বাস্তবে কি দেখা যায় ?  আজও পর্যন্ত হরিয়ানা থেকে একজনও মুসলিম কুস্তিগীর  আসেনি। কারণ সবাই জানে ভারতের মুসলিমরা মাওলানা-মৌলবী বা কাজী হয়, কুস্তিগীর নয়।

তবে একটি ধারণা দীর্ঘদিন ধরে কারওর অজানা নেই যে বলিউডে মুসলমান ডন দাউদ ইব্রাহিম-এর টাকা ঘুরপথে ব্যবহার করা হয়। আর সেই টাকাতে এতবছর বলিউডের ইসলামীকরণ হয়ে চলেছে ; যদিও ED অনেক তদন্ত করে তার কোনো হদিস পায়নি। দাউদের বোন হাসিনা পার্কার-যে দাউদের অনুপস্থিতিতে মাফিয়া রাজত্ব চালিয়ে গিয়েছে, তাঁর নামে সিনেমা বানানো হলো এবং হাসিনা পার্কারকে নির্দোষ হিসেবে দেখানোহলো। বলিউডের প্রযোজকদের মধ্যে ইসলামিক মানসিকতা ও  পাকিস্তানের প্রতি  ভালোবাসা অতিরিক্ত বেশি।বলিউডের প্রথম সারির প্রযোজকদের মধ্যে মহেশ ভাট ও সাজিদ-ওয়াজিদ নাদিদওয়ালা বিখ্যাত মহেশ ভাট নিজে পূজা বেদিকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করেছে। তারপর নিজের ভাগ্নে ইমরান হাশমিকে সিনেমাতে নামিয়েছে। ইমরান হাশমি  কিছুটা জোকার-এর মতো দেখতে। একের পর এক ছবিতে তাকে সুযোগ  দেওয়া হয়েছে মহেশ ভাট -এর প্রযোজনায়।পর পর বেশ কয়কটি ছবি ফ্লপ করলেও পরে আবার সে মহেশ ভাট-এর প্রযোজনাতে সিনেমাতে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছে একসময় ছবি হিট করানোর জন্যে  ছবিগুলিতে অতিরিক্ত সেক্স ঢোকানো হয়। সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো এই যে তার প্রতিটা সিনেমার বিপরীতে হিন্দু নায়িকা। ভাবটা এইরকম যে আমরা আমাদের মেয়েকে ঢেঁকে রাখবো, কিন্তু হিন্দু মেয়েদের  সেক্স-এর অভিনয় করাবো। তাতে সিনেমাগুলি বেশ কিছুদিন চললেও বেশিদিন টেকেনি।কিন্তু হিন্দু অভিনেতা রণবীর সিং-এর একের পর এক সিনেমা ‘ব্যান্ড বাজা বারাত”, ”লেডিস ভার্সাস রিকিবহল”, ”গুণ্ডে”, ”বাজিরাও মাস্তানি”, ”পদ্মাবত” আরো বেশ কয়েকটি সিনেমা সুপারহিট করলেও মহেশ ভাট-এর ব্যানারে সিনেমা করার সুযোগ পাননি। একটা ছবি করার জন্য যে রণবীর সিং-এর মত প্রতিভাবান অভিনেতাকে অপেক্ষা করতে হয় কখন হিন্দু প্রযোজক-পরিচালক রামগোপাল বর্মা বা সঞ্জয় লীলা বনশালীর কাছ থেকে অভিনয়ের ডাক আসবে।তারপরতো মহেশ ভাট এখন তার মেয়ে আলিয়া ভাটকে, 

যার মুখে এখনো বাচ্চা মেয়ের ভাব এখনও কাটেনি, সিনেমাতে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে ব্যাস্ত । পিতার দয়ায় হিন্দু অভিনেত্রী শাসিত বলিউডে সে  দ্রুত উঠে আসছে উপরের দিকে । যদিও ইমরান হাশমিকে ফিরিয়ে আনার একটা চেষ্টা ”আজহার (২০১৬)” সিনেমা দিয়ে করা হয়েছিল। এখানে সেই মুসলিম উম্মাহ-কে তুলে ধরাই  প্রধান উদ্দেশ্য। সিনেমাতে দেখানো হল সংগীতা বিজলানিকে বিয়ে করা, ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা, আজহার উদ্দিন  জাতীয় নায়ক-   এটা ভারতের জনগণকে মনে করিয়ে দেওয়া ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু হাজার চেষ্টা সত্বেও, সিনেমাটা চলেনি একদম। এখানে মহেশ ভাট-এর প্রযোজনাতে হায়দার(২০১৪) সিনেমার কথা না বললেই নয়। এই সিনেমাতে কাশ্মীরের মুসলিমদের ওপর ভারতীয় সেনার অত্যাচার, তার ফলে এক কাশ্মীরি মুসলিম যুবকের পাগল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি দেখানো হলো। পরিষ্কার ভাবে ভারতের সাধারণ  কাছে আমাদের দেশের গর্ব সেনাবাহিনীকে ছোট করে দেখানো হল। এই সিনেমাতে একটি দৃশ্য দেখানো হয়েছিল যা হিন্দু ধর্মের অপমান। এই সিনেমার একটি দৃশ্যে কাশ্মীরের সূর্য মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ  দেখানো হয়েছিল। ওই দৃশ্যে পাগল হায়দার মন্দির ভিতর থেকে বেরিয়ে আসার সময় বলছে যে ওখানে নাকি শয়তানের বাস, ওখানে আগুন জ্বলছে, ওই শয়তান তার বাবাকে লুকিয়ে রেখেছে। পাগল হলেও কি হবে , মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে একজন জিহাদির মতো।  তারপর মহেশ ভাট ক্রমাগত প্রচার চালিয়ে আসছেন যে কাশ্মীরে ভারতীয় সেনা ওখানকার স্থানীয় মুসলমানের ওপর অত্যাচার করছে, সাধারণ জনগণের মানবধিকার হরণ করছে। কিন্তু একজন সেনাও যে মানুষ এবং তারও যে মানবধিকার আছে সেটা ভুলে গেছেন মৌলবাদী মানসিকতার চাপে। বলিউডের আর এক অভিনেতা হৃত্তিক রোশনের কথা ভাবলে হিন্দুদের বঞ্চনার কথা আমার চোখের সামনে জলের মতো পরিষ্কার হয়। একজন অভিনেতা হওয়ার সব গুন তার মধ্যে থাকা সত্বেও  নতুন ছবি করতে হলে  পিতা  রাকেশ রোশনের প্রযোজনার ওপর নির্ভর করতে হয়। একজন আদর্শ অভিনেতা হবার সব গুন যেমন লম্বা, সুঠাম শরীর, অভিনয়ের দক্ষতা থাকা সত্বেও বলিউডের পাকিস্তান প্রেমী প্রযোজকদের নজর কোনোদিন এর ওপর পড়েনি। ”ধূম ২”  সুপারহিট হলেও কোনো এক অজানা কারণে ”ধুম ৩” থেকে বাদ পড়তে হয়। তার বদলে ধূম ৩ তে আমির  খানকে নেওয়া হলো। পুরো ছবিতে আমির খানকে একবারের জন্যেও নায়ক বলে মনে হয়নি-যেন একজন জোকার। কারণ নায়িকা ক্যাটরিনা কাইফ অনেক লম্বা আমির খানের থেকে, তাই পুরো সিনেমাতে একবারের জন্যেও দুজনের একটিও ক্লোজ সিন্ দেখানো হয়নি। তারপর অনেক অপেক্ষা করার পর তার পিতার  প্রযোজনাতে হৃতিক রোশন ”ক্রিস ২” সিনেমাতে অভিনয় করলেন। সিনেমা হিট করলো, কিন্তু তা সত্বেও পাকিস্তান প্রেমী কোনো প্রযোজকের কাছ থেকে নতুন সিনেমা করার ডাক পেলেন না। এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে শুধুমাত্র হিন্দু  হবার কারণে ঋত্বিক রোশনের প্রতি এই বঞ্চনা। তাছাড়া ঋত্বিক রোশন বলিউডের একমাত্র অভিনেতা যে একজন মুসলিম সুজান খানকে হিন্দু ধর্মমতে বিয়ে করেছে। তাই তাঁর ওপর ক্ষোভ থাকাই স্বাভাবিক। কারণ এই প্রযোজকেরা প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত হিন্দু অভিনেতাকে বাদ দিয়ে সইফ আলী খান-এর মতো ফ্লপ অভিনেতা, আরশাদ ওয়ারসি-এর মতো আনকোরা অভিনেতা, পাকিস্তান-এর অভিনেতা ফাওয়াদ খান, আলী জাফরকে নিয়ে একের পর এক সিনেমাতে অভিনয় করিয়েছেন। পুরো দুই  বছর অপেক্ষা করার পর ২০১৭তে পিতার প্রযোজনাতে ”কাবিল” ছবিতে একজন অন্ধ ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করলেন। কিন্তু ঠিক একই দিনে আর মুসলিম শাহরুখ খানের ”রইস ” মুক্তি পেলো। এই সিনেমাতে শাহরুখ খান একজন মুসলিম ডন-এর ভূমিকায় অভিনয় করলেন, যে ডন অনেক হিন্দু ব্যবসায়ীদের ঠেকে তোলাবাজি করে,হিন্দু ডনকে খুন করে সে তার রাজ্ কায়েম করে। পুরো দেশের মানুষের মধ্যে এই ধারণাকে জোরদার করা হলো যে মুসলিমরা শুধু ডন হয়। শাহরুখ খান এই সিনেমাতে তার জন্যে ভারতে একটাও নায়িকা পেলেন না, পাকিস্তান থেকে মাহিরা খানকে নিয়ে এসে অভিনয় করালেন। এটা একটা চেষ্টা বলিউডের হিন্দু নায়িকাদের প্রাধান্য কমানোর।  সবথেকে যে ব্যাপার তা অবাক করে যে বেশ কয়েকবছর শাহরুখ খান মুসলিম চরিত্রে অভিনয় করছেন। তিনি ”মাই নেম ইজ খান” সিনেমাতে দেখালেন মুসলিমরা কত হেনস্তার শিকার হয়। এর দ্বারা তিনি মুসলিম জনমানসে মুসলিম ‘উম্মাহ’ জাগিয়ে তোলার  কাজ করলেন। অনেক লেখালেখি ও প্রচার সত্বেও এই সিনেমা ফ্লপ করল। কিন্তু ঋত্বিক রোশনের কাবিল সিনেমা কিন্তু সুপারহিট হলো।

লিউডে হিন্দু অভিনেত্রীদের প্রাধান্য  বরাবর। রানী মুখার্জী, মাধুরী দীক্ষিত, কাজল, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, দীপিকা পাডুকোন, ঐশ্চর্য রাই,বিদ্যা বালান , কঙ্গনা রানাউত, অনুষ্কা শর্মা দীর্ঘদিন ধরে রাজ্ করছেন।  কিন্তু এখানেও হিন্দু প্রাধান্য কমানোর চেষ্টা চলছে জোর কদমে। এক্ষেত্রে পাকিস্তান প্রেমী  অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালক নিজেদের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। এদের মধ্যে শাহরুখ খান এক নম্বরে রয়েছেন। তিনি নিয়ে এলেন হুমা  কুরেশি ও মাহিরা খানকে। এই মাহিরা খান যিনি ‘রইস’ সিনেমায় অভিনয় করলেন শাহরুখ খানের সঙ্গে।  সাজিদ নাদিদওয়ালা নিয়ে এলেন মওরা হুসেনকে,মহেশ ভাট নিয়ে এলেন বিনা মালিক, নার্গিস ফকরিকে। সলমন খান নিয়ে এলেন ক্যাটরিনা কাইফকে, কারণ জোহর  নিয়ে এলেন শ্রীলংকা থেকে খ্রিস্টান জ্যাকলিন ফার্নার্ন্ডেজকে। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে কোনোরকম মডেলিং ব্যাকগ্রাউন্ড  না থাকা  সত্বেও একের পর এক সিনেমাতে এরা অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে চলেছে। বোঝা  যায় এক্ষেত্রে পরিকল্পিত ভাবে পাকিস্তান থেকে অভিনেত্রিদের এনে হিন্দু প্রাধান্য  কমানোর জোর চেষ্টা চলছে।

বলিউডে হিন্দু গায়কদের প্রাধান্য দীর্ঘদিন। কিন্তু সেখানেও হিন্দুদের বঞ্চনা করা হয়েছে এবং এখনো করা হচ্ছে পাকিস্তান প্রেমী প্রযোজক ও পরিচালকদের  দ্বারা।পাকিস্তান থেকে আতিফ আসলাম, শাফাকাত আমানত আলী, রাহাত ফতে আলী খান, মুস্তাফা জাহিদ, মুহাম্মদ ইরফানদের দিয়ে একের পর এক ছবিতে গান গাওয়ানো হয়েছে।  নামকরা হিন্দু গায়করা যেমন-হিমাচল প্রদেশের মোহিত চৌহান, আসামের জুবিন গর্গ, উত্তর প্রদেশের অংকিত তিওয়ারি -এর মতো গায়কদের বঞ্চনা করা হয়েছে।মোহিত চৌহান ” রকস্টার” ছবিতে গানের জন্যে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন , তাকে আর নতুন করে ডাকা হয়নি। ”মার্ডার ২” সিনেমার গায়ক হরষিত সাক্সেনা, যার গান ‘হাল-এ -দিল’ কয়েক কোটি ডাউনলোড হয়েছিল; এইরকম একজন প্রতিভাবান গায়ক কিন্তু আর গান গাওয়ার সুযোগ পাননি। তার বদলে পাকিস্তান থেকে আসা এই সমস্ত গায়করা একের পর ছবিতে গান গেয়ে চলেছেন।   শুধুমাত্র অরিজিৎ সিং মারাত্বক প্রতিভাবান ও  জনপ্রিয়, তাই তিনি টিকে গিয়েছেন।  কারণ সিনেমা হিট করানোর জন্যে অরিজিৎ সিংকে দরকার।   অন্যদিকে আরমান মালিক, জাভেদ আলি  এরা গান গেয়ে চলেছে।জনপ্রিয় গায়ক শানও অনেকদিন কোন ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ পাননি, যদিও পাকিস্তান থেকে আমদানি করা গায়করা গান গেয়ে চলেছেন একের পর এক ছবিতে। আর এক জনপ্রিয় গায়ক সোনু নিগম, যাকে বাদ পড়তে হয়েছে বলিউডের পাকিস্তান প্রেমের জন্যে। তবে কিছুদিন আগে তিনি বিরক্তিকর মসজিদের আজান নিয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন, তারপরে তিনি আর কোনো ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ পাবেন কিনা, সেটাই সন্দেহ।   সুনিধি চৌহান-এর মতো গায়িকা প্রযোজক আনিস বাজমিকে বিয়ে করলো, যদিও এখন ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে তাদের। কিন্তু ”মুন্নি বদনাম”-এর গায়িকা মমতা শর্মা নিজে বদনাম হয়ে গেলো। সে বিয়ে করলো তার সেক্রেটারি আশরাফ আলীকে আর ধর্মান্তরিত হলো ইসলাম ধর্মে, নতুন নাম হলো আসমা আলী। যদিও এই নতুন নামে সে খুব একটা বিখ্যাত নয়। তারপর বলিউডের গানের ভাষা যথেষ্ট জিহাদি টাইপ। যত দিন যাচ্ছে গানের মধ্যে প্রচুর উর্দু ভাষার ব্যবহার, ‘আল্লাহ’, ‘খুদা’, ‘রব’ ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার মারাত্বক হারে বেড়ে চলছে। এইসব হচ্ছে গীতিকার (গান লেখক ) ইরশাদ কামিল, কুমার, এলাহাবাদের অমিতাভ ভট্টাচার্য, সেলিম -সুলেমান -দের জন্যে। সিনেমার একজন হিন্দু চরিত্র গানের মধ্যে বলছে ”তওবা কেয়ামত হো গায়ি , আল্লাহ মাফ ক্যারো”, ‘মওলা’, ‘ইবাদত’, ইত্যাদি শব্দ। ”ফ্যাশন” সিনেমাতে একটি গান শুরু হচ্ছে ”শুকরান আলা -আলী হামদুলিল্লাহ” দিয়ে -যার দায়িত্বে ছিলেন সঙ্গীত  পরিচালক সেলিম -সুলেমান। ”রেস” সিনেমাতে হিন্দু চরিত্রের মুখে গান শুরু হচ্ছে ”আল্লাহ দুহাই হে”। শাহরুখ খান আর আলিয়া ভাট-এর নতুন ছবি ‘ডিয়ার জিন্দেগী’-তে একটি গানের লাইন হল  ”মেরে মহল্লা মে ঈদ যো  লায়া হে”।  আর এইসব গান কোটি কোটি হিন্দু যুবক-যুবতী শুনছে প্রতিনিয়ত। আর ধীরে এইসব তাদের মনের ভাষা ও মুখের ভাষাতে পরিণত হচ্ছে।  ইসলাম  নামক জিনিসটি তাদের কাছে সহজ ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। এর ভবিষ্যৎ ক্ষতি খুব মারাত্বক।

দীর্ঘ বছর ধরে বলিউড ইসলামী ধর্মান্তকরণের আখড়া হয়ে আছে। বর্তমানেও তার পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। নাসিরুদ্দিন শাহ নিকাহ করল রত্না পাঠক-কে আর জন্ম দিলো এক মুসলমানের, যার নাম ইমরান খান। ইমরান খান আবার নিকাহ করল দিল্লীর অবন্তিকা শেঠকে। নাসিরুদ্দিন-এর ভাগ্নে আমির খান আবার ডাবল সেঞ্চুরির মালিক। প্রথমে নিকাহ করল রিনা দত্তকে ; জন্ম দিলো দুই মুসলমানের- জুনেদ আর ইরা। যেসময় আমির খানের হাতে কাজ ছিল না, ট্রাভেল এজেন্সির মালিক রিনা দত্ত প্রযোজনা করেছিলেন ”লাগান” ছবিটির। এই ছবিটি আমির খানের জায়গা বলিউডে অনেক শক্ত করে তোলে। কিন্তু কোনো মুসলমান যেরকম উপকার মনে রাখে না, উল্টে তার ক্ষতি করে, আমির খানও তার ব্যতিক্রম নয়। ”লাগান”-এর সহপরিচালক কিরণ রাও-এর সঙ্গে প্রেম করলেন এবং কয়েক মাসের মধ্যে রিনা দত্তকে তালাক দিয়ে কিরণ রাওকে নিকাহ করলেন। মুসলমান কিরণ রাও জন্ম দিলেন আর এক মুসলমান আজাদ-এর। শাহরুখ খান নিকাহ করল গৌরিকে আর জন্ম দিল তিনটে মুসলমানের-আরিয়ান, ,সারা আর আবরামের। আর এক অভিনেত্রী অমৃতা  সিংহ , ২৫বছর বয়সে  আর ধৈর্য ধরল না , নিকাহ করল ১৯ বছরের সইফ আলি খানকে। তারপর জন্ম দিল দুটো মুসলমানের -ইব্রাহিম আলী খান আর সারা আলী খানের। তারপর তালাক দিল একদম সাচ্চা মুসলমানের  মত। তারপর তার মন গিয়ে পড়লো করিনা কাপুর-এর। তারপর নিকাহ করলো তাকে -জন্ম দিলো আর একটা মুসলমানের , তৈমুর আলি খানের। ফারহান আখতার নিকাহ করল অধুনাকে ,তারপর তাকে বাদ দিয়ে এখন আবার নতুন শিকার শ্রদ্ধা কাপুর -এর পিছনে। যদিও  শক্তি কাপুর-এর কড়া মনোভাবের জন্যে এ যাত্রায় বেঁচে গেলো একটি হিন্দু মেয়ে।

 বর্তমান ভারতে এক মারাত্বক বিপজ্জনক হাওয়া বইতে শুরু করেছে। তার ফল বলিউডের সিনেমাগুলিতে বিগত কয়েকবছর  ধরে দেখা যাচ্ছে। আমির খানের একটা ভারত বিরোধী মন্তব্য তার অনেক ক্ষতি যেমন সিনেমা ফ্লপ হওয়া, স্ন্যাপডিল-এর ব্র্যান্ড এম্বাসেডর থেকে বাদ পড়া এইসব হয়েছিল।ঠেলায় পড়ে করণ জোহরকে লিখিত দিতে হয়েছে যে তিনি তার সিনেমাতে আর কোনোদিন পাকিস্তানী অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে কাজ করবেন না। কোনো সিনেমাতে পাকিস্তানী বা মুসলিম ভাব থাকলে তা এখন আর ঠিকমতো চলছে না সিনেমা হলগুলিতে বা লোকেরাও দেখতেও চাইছে না। তাছাড়া সিনেমা হল ভাঙচুর করছে হিন্দু জনতা।  তাইতো মুসলিম মুসলিম ভাব ছবি ”রইস” ফ্লপ করলেও ”বাহুবলি ২” মারাত্বক ব্যবসা করেছে। প্রতি সিনেমাতে কম করে একটা গনেশ পুজোর দৃশ্য বা হনুমান পুজোর দৃশ্য রাখা এখন কমন ব্যাপার দাঁড়িয়েছে। একের পর এক হিন্দু অভিনেতা যেমন-রণবীর সিং, বরুন ধাওয়ান, মনোজ  বাজপেয়ী, রাজকুমার রাও, অর্জুন কাপুর, সুশান্ত সিং রাজপূত-দের মতো হিন্দু অভিনেতারা দ্রুত গতিতে উঠে আসছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে একই সঙ্গে সিনেমা মুক্তি পেলেও তিন খানকে এরা ছাপিয়ে যাচ্ছে, এটাই আশার আলো।

অবিভক্ত বাংলার মুসলমান উদ্বাস্তু হয়নি কেন ?রাজর্ষি বন্দোপাধ্যায়

IMG-20190204-WA0004গোদা বাংলায় কিছু সত্য না লিখলে, বাঙালির পক্ষে তা অনুধাবন করা কষ্টসাধ্য হয়। আদতে, বাঙালি একটি নির্লজ্জ্ব, ইতিহাস বিস্মৃত জাতি, মানতে কষ্ট হলেও এটাই সত্য। তাই বারেবারে ইতিহাস ঘেঁটে, তাদের সামনে তুলে ধরতে হয় এই আশায় যে, কোনোদিন হয়তো বাঙালির সম্বিত ফিরবে, সে প্রকৃত ইতিহাসকে মর্যাদা দিয়ে ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নেবে।
গান্ধী বলেছিলো :”আমার মৃতদেহের উপর দিয়ে দেশভাগ হবে”, আর জিন্নাহ বলেছিলো :’আমি পোকায় কাটা পাকিস্তান চাই না।” বস্তুত, অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই দুই কুলাঙ্গারের কোনো অবদানই নেই। একপা এগিয়ে বলতে হয়, অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যে কজন হাতেগোনা মুসলমানের নাম ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া যায়, তাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল ভারতে ব্রিটিশ শাসন হঠিয়ে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা।
ইসলামী জীবন বিধানের পূর্ণাঙ্গ কিতাব কোরানে নির্দেশিত দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা জিন্নাহ ও তার অনুসারী মুসলিম লীগের টাউটরা জেলও খাটনি, দ্বীপান্তরেও যায়নি, গুলি-লাঠিও খায়নি ! স্রেফ হিন্দু নিধনের মাধ্যমে আর ‘ মু মে বিড়ি হাত মে পান. লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ করে একটি মোটামুটি বিশাল রাজত্ব পেয়ে গিয়েছিলো ! (এখন সেটিও দ্বিখণ্ডিত-ইতিহাসের প্রতিশোধ !) । বাঙালি হিন্দুর জীবনে এই স্বাধীনতা এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ! ১৯৪৬ সাল থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দুই বাংলাতেই শুরু হয়েছিল, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববঙ্গে হয়েছিল একতরফা পরিকল্পিত হিন্দু নিধন ও বিতাড়ন । পশ্চিমবাংলার সাম্প্রদায়িক হানাহানি মূলত শুরু হয় বসবাসকারী অবাঙালি মুসলমানদের উস্কানিতে । শুরুটা তারাই করেছিল । পরবর্তীতে, জোরদার প্রতিরোধ ও পাল্টা জিঘাংসায় পশ্চিমবাংলার এই অবাঙালি মুসলমানেরা পূর্ববঙ্গে পালিয়ে যায় । এদের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ২৫-৩০ হাজার । এছাড়াও সাম্প্রদায়িক হানাহানি শুরু হলে পশ্চিমবাংলার সীমান্ত জেলাগুলো থেকেও কিছু সংখ্যক বাঙালি মুসলমান জমি-সম্পত্তি বিনিময়ের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায় । এদের সংখ্যা প্রায় আনুমানিক ৪০ হাজার ছিল । ভারত সরকারের অনুরোধে পরবর্তীতে এদের প্রায় ২০ হাজার ফেরৎ আসে । পশ্চিমবঙ্গ ত্যাগী মুসলমানের সংখ্যা এত কম হওয়ার পেছনে যে কারণগুলো কাজ করেছে, সেগুলো হলো :
১.ভারত সরকারের সার্বিক ধর্ম নিরপেক্ষ কাঠামো ধরে রাখা ।
২.পশ্চিমবাংলার মুসলমানদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা ।
৩. পূর্ব বাংলার সামাজিক পরিস্থিতিতে পশ্চিমবাংলার মুসলমানদের মানিয়ে নিতে না পারা ।
৪. সেই সময়ে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতির অভাব ।
একতরফা সাম্প্রদায়িক বাঙালি হিন্দু নিধনযজ্ঞে, পূর্ববঙ্গে সংখ্যালঘুর টেঁকা দায় হবে, এটাই স্বাভাবিক ছিল, আর হয়েও ছিল তাই । বাংলা ভাগের সময় পূর্ববঙ্গে ১.২০ কোটি সংখ্যালঘু হিন্দু জিম্মি ছিল । পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমান দ্বিজাতিতত্ত্বকে ১০০% আঁকড়ে ধরে এদের যেন তেন প্রকারে নির্মূল করতে, ভূমিহীন করতে, উঠেপড়ে লেগেছিল ! ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববঙ্গ থেকে ৬০-৭০ লক্ষ সংখ্যালঘু হিন্দু বিতাড়িত করা হয়েছে । অগণিত সংখ্যালঘু হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছে, মাত্রাহীন হিন্দু নারী ধর্ষিতা হয়েছে এবং পরিশেষে অগুনতি জীবন বাঁচাতে ধর্মান্তরিত হয়েছে । ১৯৪৭ থেকে প্রথম ১০ বছরে ৪১.১৭ সংখ্যালঘু হিন্দু নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়। সুপরিকল্পিত উপায়ে সংখ্যালঘু হিন্দুকে নিশ্চিহ্ন করতে যা যা করা দরকার সকল প্রক্রিয়া রাষ্ট্রের মদতে  হয়েছে যেমন, লুট,ধর্ষণ,ডাকাতি, মিথ্যে মামলা, চাকরি ক্ষেত্রে অযথা হেনস্থা, বঞ্চনা ইত্যাদি । এমনকি ‘৭১ এ স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পরেও আজও পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলেই আসছে ! বাঙালি হিন্দুই তাই বঙ্গভঙ্গের একতরফা উদ্বাস্তু, আর এর প্রধান কারণগুলো হলো :
১.দ্বিজাতিতত্ত্ব নামক ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগকে পূর্ববঙ্গের মুসলমান ১০০% প্রত্যক্ষ সমর্থন দিয়েছিল।
২.ইসলামী নিয়ম মেনে ভূখণ্ডকে অমুসলিমহীন করা ।
৩.পশ্চিমবাংলার সেকুলাঙ্গারদের না না অছিলায় এই জঘন্য নীতিকে ডিফেন্ড করা ।
৪.পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের বেক্তি স্বার্থের জন্য ঐক্যের অভাব ।
কথাগুলো রূঢ় জানি, আর এও জানি যে, অনেকেই পড়ে মনে মনে গাল দেন। দিন, আপত্তি নেই, তবু যদি আপনা.দের সম্বিৎ ফেরে.

দ্যাশের বাড়ি :- অনির্বান দাশগুপ্ত।

hindu refugeeছোট বেলায় দেখতাম ‘দ্যাশের বাড়ি’ র কথা উঠলেই বাবার মুখটা কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠত। পরিষ্কার বুঝতে পারতাম ঐ মূহুর্তে বাবার চোখের সামনে একে একে ভেসে ওঠছে শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত পুকুর ঘাট, কাঁচা মিঠা আম গাছটা, ধবলী নামের সাদা গরুটা, পাট ক্ষেত, শ্যামগ্রাম খাল, শ্যামগ্রাম স্কুল থেকে কৈশোরের নরসিংদী শাঠিপাড়া স্কুল হয়ে যৌবনের কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ। কিন্তু অনেক খুঁটিয়ে লক্ষ্য করেও বাবার মুখে কোনদিন জন্মভূমি বা দেশত্যাগজনিত রাগ, ক্ষোভ বা এমনকি দুঃখের অভিব্যক্তিও ফুটে উঠতে দেখি নি। এটাই আমার কাছে খুব অবাক লাগত। এভাবে সাত পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে একবস্ত্রে সব ফেলে চলে আসতে হল, শিকড় থেকে উপড়ে ছুঁড়ে ফেলা হল, অথচ কোন ক্ষোভ নেই, অভিযোগ নেই। এখন আর বাবাকে সেভাবে ‘দ্যাশের বাড়ি’ র কথা বলতে শুনি না। যে বাবাকে গর্বভরে ‘দ্যাশের বাড়ি’ র কথা বলতে শুনেছি, যে ‘দ্যাশের বাড়ি’ র কথা উঠলে বাবার চোখ চকচক করে উঠত, নস্টালজিক হয়ে উঠত, সেই গর্বের ‘দ্যাশে’ ফেরার স্বপ্ন কেন দেখে না আমাদের বাবারা? কেন তারা ফেলে আসা ভিটেমাটিতে  যাবার ইচ্ছেপোষণ করে না ?আমার বাবা উদাহরণ মাত্র, পুরো জাতি হিসেবেই হিন্দু বাঙালির মনস্তত্ত্বটাই এরকম অদ্ভুত। সবটাই যেন ভবিতব্য, হাসিমুখে মেনে নিতে হবে, আবারো, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। যেন জন্মলগ্ন থেকেই হিন্দু বাঙালির কপালে লেবেল সেঁটে দেওয়া হয়েছে ‘উদ্বাস্তু’।
আমরা তো জানি না ছেচল্লিশের’ দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং ‘এবং নোয়াখালী কি, চৌষট্টির খুলনা বা একাত্তরের পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গের হিন্দু নিধন যজ্ঞ কি। আমরা তো জানি না কিভাবে বাবার সামনে মেয়েকে, ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণ করে যৌনাঙ্গে বেয়নেট দিয়ে, বল্লম বা তলোয়ার দিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়েছে। আমরা তো জানি না কিভাবে ‘গণিমতের মাল ‘হিসেবে অগণিত নারীকে তুলে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করেছে হায়েনার দল। আমাদের জানা নেই কত বাবা তার আদরের মেয়েকে নিজের হাতে খুন করেছে ঐ নোংরা হাতগুলির অত্যাচার থেকে বাঁচাতে। আমরা জানি না কিভাবে ছোট্ট শিশুদের আছাড় মেরে বা বাড়িতে আগুন লাগিয়ে সেই আগুনে ছুঁড়ে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের জানতে দেওয়া হয় নি। না আমাদের পাঠ্য বইয়ের বিকৃত গেলানো ইতিহাস থেকে জানতে পেরেছি, না আমাদের পারিপার্শ্বিক শিখিয়েছে, না আমাদের আগের প্রজন্ম বলেছে। অথচ আমাদের আগের প্রজন্মের প্রত্যেকটা লোক এই একই বা এর চেয়েও বেশি নিদারুণ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জীবন পার করে এসেছেন।
   মাঝে মাঝে মনে হয়, পারিবারিক ভাবে আমাদের জমিজমা , ধন সম্পদ ফেলে আসা ছাড়া আর তো বিশেষ কোন ক্ষতি হয় নি, আমাদের বংশের কারোর সম্মানহানীও হয় নি।  মোটামুটি ভালোই আছি। তার জন্যই কি স্বভাব স্বার্থপর বাঙালি হিসেবে আমাদের এই নির্লিপ্ততা, উদাসীনতা? কিন্তু ওপারে যাদের হত্যা করা হয়েছিল, ধর্ষন করা হয়েছিল বা ওদেশে এখন যাদের অত্যাচার করা হচ্ছে, এই পারে আসার পর যে সম্পন্ন পরিবারগুলি আজ পথের ভিখারীতে পরিনত হয়েছে, যে সম্ভ্রান্ত ভদ্র ঘরের মেয়েদের ঠাঁই হয়েছে যৌন পল্লীতে, তাঁরা বুঝি আমার কেউ না?
পাঞ্জাবীদের কথাই ধরুন…
আমাদের মত এত ধাপে ধাপে না হলেও ওদেরও তো মোটামুটি সেই একই অভিজ্ঞতা। কিন্তু ওদের সামনে আর উদ্বাস্তু হওয়ার হাতছানি নেই। কারন কি জানেন? এদের ছোট থেকেই সেই ইতিহাসের সংগে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, সে যতোই নৃশংস হোক। গুরুদ্বারে গেলে দেখবেন, সেই নৃশংস ইতিহাস চিত্রকলা বা ভাস্কর্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা আছে। আর আমাদের ধর্মীয় স্থান গুলিতে কি শেখানো হয়? সঠিক ইতিহাস আমাদের জানানো হয় নি বলেই শত্রু মিত্র বোধটাই আজও আমাদের গড়ে উঠল না, শত্রু চিনতে ভুল করেছি আমরা বারবার। এতভাবে অত্যাচারিত হবার পরও অত্যাচারীদের আমরা ভাই বলছি। জানি না, তারা যে আড়ালে ছুরিতে শান দিয়েই যাচ্ছে , সুযোগ এলেই আবার বুকে বসিয়ে দেবে, দিচ্ছেও। মানুষ তো ইতিহাস থেকেই শিক্ষা নেয়, আছাড় খেয়েই মাটি চেনে। আমরা সেই শিক্ষা নিই নি বলেই একবার উদ্বাস্তু হয়ে আসার পর আবার উদ্বাস্তু হওয়াই আমাদের ভবিতব্য।
এবার তাকান  ইহুদীদের দিকে…
আঠারশো বছর ধরে জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে শিকড় হীন কচুরিপানার মত বিচ্ছিন্নভাবে জায়গায় জায়গায় ভাসতে ভাসতে শেষ পর্যন্ত কিন্তু মাতৃভূমি পুনরুদ্ধার করতে পারল। কারণ তাদের মধ্যে ছিল সেই জেদ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম সযত্নে সেই স্বপ্নের বীজ রোপণ করে গেছেন পরবর্তী প্রজন্মতে, মর্মে প্রোথিত করে গেছেন সেই বীজ মন্ত্র – ‘ফিরতে হবে, ফিরতে হবে Next year to Jerusalem -পরের  জেরুজালেমে ফিরে যাবো ‘। দুজন ইহুদীর মধ্যে দেখা হলে প্রথম সম্ভাষণই ছিল’ আবার দেখা হবে জেরুজালেমে ‘। এই জেরুজালেম হল ইসরায়েল এর’ শাশ্বত রাজধানী’, অর্থাৎ যতদিন একজন ইহুদীও জীবিত থাকবে, এই পবিত্র ভূমি থাকবে এদের রাজধানী। আর আমরা,পূর্ববঙ্গ থেকে পালিয়ে আসা বাঙালি হিন্দুরা কি চিরকাল শিকড়হীন কচুরিপানা হয়ে ভাসতেই থাকব, শেকড়ে ফেরা হবে না কোনদিন ?