সুরেন্দ্র সিনহাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করলো হাসিনা সরকার

surendra sinhaগত ১৩ই অক্টোবর, শুক্রবার রাত ১১টা ৫৭ মিনিটে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা থেকে রওনা হলেন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রথম হিন্দু প্রধান বিচারপতি এস কে সিন্‌হা। ছুটি নিয়ে বিমানবন্দরের পথে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, “প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করলে এটি সহজেই অনুমেয় যে, সরকার উচ্চ আদালতে হস্তক্ষেপ করছে এবং এর দ্বারা বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হবে। এটি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।” বাংলাদেশের বর্তমান প্রধান বিচারপতির চাকরির মেয়াদ রয়েছে আরও সাড়ে তিন মাস।

বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করে বিচারপতি সিন্‌হার দেওয়া চিঠির উল্লেখ করে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ‌আমেরিকা এবং ব্রিটেন— এই চারটি দেশে যেতে চান। আগামিকাল ১৩ই অক্টোবর দেশ ত্যাগ করতে চান এবং ১০ নভেম্বর দেশে ফিরে আসবেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।” বাংলাদেশের আইন মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, বর্ধিত ছুটিতে প্রধান বিচারপতির বিদেশে অবস্থানের সময়ে, অর্থাৎ ২ নভেম্বর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত, অথবা তিনি দায়িত্বে না ফেরা পর্যন্ত বিচারপতি মহম্মদ আব্দুল ওয়াহাব মিঞা প্রধান বিচারপতির কার্যভার সামলাবেন। চলতি বছরের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ  রায় প্রকাশের পর থেকেই সরকারে থাকা আওয়ামি লিগের তীব্র আক্রমণের মুখে পড়েন বিচারপতি এস কে সিনহা।বাংলাদেশের বিচারপতিদের পদ থেকে অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফেরাতে আনা হয়েছিল সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী। সেই সংশোধনী বাতিল করে জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনকালে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ফিরিয়ে আনে সুপ্রিম কোর্ট। সাত বিচারপতির ঐকমত্যের ৭৯৯ পৃষ্ঠার এই রায়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নিজের পর্যবেক্ষণের অংশে দেশের বিভিন্ন বিষয়ের সমালোচনা করেন।

আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামি লিগের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রধান বিচারপতির তীব্র সমালোচনা করা হয়। পর্যবেক্ষণে বঙ্গবন্ধুকে ‘খাটো করা হয়েছে’ অভিযোগে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের দাবিও এসেছিল। তখন বিএনপি এ রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলে স্বাগত জানিয়েছিল। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রধান বিচারপতির বক্তব্য প্রসঙ্গে আওয়ামি লিগের আইন সম্পাদক রেজাউল করিম বলেন, “প্রধান বিচারপতি বিদেশ যাওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছেন। সেখানে তিনি অসুস্থতার কথা বলেছেন। কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয়, তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছে।” তিনি বলেন, “প্রধান বিচারপতি আইসিডিডিআরবিতে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। এর থেকেই বোঝা যায় তিনি অসুস্থ। তিনি তাঁর লিখিত আবেদনেও বলেছেন, তিনি অসুস্থ। তাঁর ছুটি চাওয়ার পেছনে আওয়ামি লিগ বা সরকারের কোনও চাপ ছিল না।”

Advertisements

হিন্দু হওয়ার মাসুল গুনছেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা

cj-sk-sinhaশুধুমাত্র হিন্দু হওয়ার অপরাধে একটি মুসলিম দেশে একজন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে কতটা হেনস্থার শিকার হতে হয়,তা সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ঘটনা প্রমাণ করে। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রথম হিন্দু প্রধান বিচারপতি।একজন হিন্দুকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ করায় প্রথম থেকেই তার ওপর আওয়ামী লীগ সরকারের অনেকেই বিরক্ত ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার,দেশের জিহাদি সন্ত্রাসবাদীদের বিচার, প্রভৃতি মামলায় তাকে দরকার ছিল শেখ হাসিনার। সেই কথা মাথায় রেখে তাকে বিচারপতি পদে আনেন শেখ হাসিনা। শুধু তাই নয়,তিনি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় যথেষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তি। সিনহা বরাবর নিরপেক্ষ রায়দান করতেন। হিন্দুদের জমিদখল নিয়ে তার রায়দানে আওয়ামী লীগের কিছু বড়ো নেতা তার ওপর দীর্ঘদিন ধরেই রুষ্ট ছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পূর্বে তার দেওয়া একটি রায়ের ফলে তাকে বিচারপতির পদ থেকে সরিয়ে দেবার  চক্রান্ত করে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কিছু প্রভাবশালী নেতা।  কিছুদিন পূর্বে বাংলাদেশের সংসদে  সংবিধানের ১৬ নম্বর ধারার সংশোধনী পাশ হয় এবং প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে দেবার ক্ষমতা সংসদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এর বিরুদ্ধে বিরোধীরা সুপ্রিম কোর্টে মামলা করলে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা সংবিধানের ১৬ নম্বর ধারার সংশোধনীকে বাতিল ঘোষণা করেন। এরপরেই আওয়ামী লীগ সরকারের আক্রোশ গিয়ে পড়ে সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ওপর। তাকে জোর করে গৃহবন্দী করে রাখা হয় প্রায় একমাস।কড়া নিরাপত্তার মধ্যে তাকে আটকে রাখা হয় তাকে। এমনকি কারোর সঙ্গে তাকে যোগাযোগ পর্যন্ত করতে দেওয়া হয়নি।  তাকে খুঁজে না পাওয়া যাওয়ায় বাংলাদেশে হৈচৈ পড়ে যায়। অবস্থা সামাল দেবার জন্যে তাকে জোর করে একমাসের ছুটির আবেদন লিখিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের বার আসোসিয়েশনের সভাপতি জয়নাল আবেদীন। এমনকি তড়িঘড়ি তার জায়গায় অস্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ করা হয় আব্দুল ওয়াহাব -কে। এমনকি তাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। কারণ তাকে বাধ্য করা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘমেয়াদি ভিসার আবেদন করতে। জয়নাল আবেদন জানিয়েছেন,সিনহা যথেষ্ট প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় হওয়ায় তাকে সরাসরি না সরিয়ে, চাপ সৃষ্টি করে শেখ হাসিনা সরকার তাকে বিচারপতির পদ থেকে সরাতে চাইছে, যাতে তার ভাবমূর্তিই ওপর কোনো কালী না পড়ে।

রোহিঙ্গা হিন্দুদের প্রতি বঞ্চনা করছে বাংলাদেশ সরকার

মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের জন্যে বুকের রক্ত ঝরছে এদেশের নেতা,মন্ত্রী থেকে শুরু করে মিডিয়া,সংবাদপত্রগুলির। কিন্তু কেমন আছে মায়ানমার থেকে সর্বস্ব হারিয়ে আসা হিন্দুরা,যারা ২৫ আগস্ট আক্রান্ত হয়েছিল রোহিঙ্গা মুসলিমদের জঙ্গি সংগঠন ‘রোহিঙ্গা সল্ভেসন আর্মি’-এর হাতে? সেদিন রাতে উত্তর রাখাইনের দিউ আন গ্রামে হামলা চালিয়েছিল ‘রোহিঙ্গা সল্ভেসন আর্মি’, প্রায় ১০০ অপহরণ করে নিয়ে যায় মুসলিম জঙ্গিরা। পরে তাদের গণকবর উদ্ধার করা হয়। অনেক হিন্দু প্রাণ হাতে করে নেফা নদী পেরিয়ে বাংলাদেশের কক্স বাজারে  আশ্রয় নেয়।তাদেরকে রাখা হয় রোহিঙ্গা মুসলিমদের সঙ্গে একই শরণার্থী শিবিরে। কিন্তু সেখানে হিন্দু শরণার্থীদের প্রতি বঞ্চনা  করা হতে থাকে, অনেক রোহিঙ্গা হিন্দু মহিলারা জানিয়েছেন তাদেরকে ধর্ম পরিবর্তন করার জন্যে চাপ দেওয়া হতে থাকে। ফলে তাদেরকে  সেখান থেকে সরিয়ে উখিয়া উপজেলার কুতুপালং-এর একটি পোল্ট্রি ফার্ম পরিষ্কার করে তাদের সেখানে থাকার ব্যবস্থা করে দেয় বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু সেখানে ত্রাণ ঠিকমতো সরবরাহ করা হয়না বলে অভিযোগ। পাশাপাশি পানীয় জলের অভাব রয়েছে। সরবরাহ করা হয় না নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য। শেষমেশ রোহিঙ্গা হিন্দুদের পাশে দাঁড়ালো ‘ইউনাইটেড শিখ’ একটি সংগঠন।

বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হিন্দুদের গণহত্যায় জড়িত ২২ রোহিঙ্গা জঙ্গি

গতকাল বাংলাদেশ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ২২ জন রোহিঙ্গা জঙ্গিকে। এরাই মায়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা হিন্দুদের গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ। নিজেদের অসহায় শরণার্থী বলে পরিচয় দিয়েছিল। ধৃতদের মধ্যে হিন্দুদের গণহত্যার মূল পাণ্ডা আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনিও রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় পাকিস্তান মদতপুষ্ট এই রোহিঙ্গা জঙ্গিরা। জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরেই রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের ভারতে থাকতে দেওয়ায় নারাজ নয়াদিল্লি। তার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বারবার সমালোচিতও হতে হয়েছে সরকারকে। রাজনীতির অন্দরমহলে মতপার্থক্য থাকলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের সুরে সুর মিলিয়েছে শেখ হাসিনা প্রশাসনও। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব দেওয়া দেশের পক্ষে বিপজ্জনক প্রমাণিত হতে পারে বলে মত ঢাকার। উদ্বাস্তুদের কূটনৈতিক তৎপরতায় মায়ানমারে ফেরত পাঠাতে এ মাসেই ওই দেশে যাবেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।রবিবারের ২২ জনের গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রমাণ করল, দুই দেশের আতঙ্ক অমূলক নয়। এক সংবাদসংস্থার দাবি, জঙ্গিমহলে ‘বস’ নামে পরিচিত জুনুনি ‘আরাকান রোহিঙ্গা সালভ্যাশন আর্মি’-র (আরসা) সদস্য। জন্ম পাকিস্তানে। বড় হয়ে ওঠা সৌদি আরবে। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটেও নাশকতামূলক প্রচারে সক্রিয়। পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের আর্থিক মদতেই মায়ানমারে নাশকতামূলক কাজকর্ম চালায় সে। রবিবারের ঘটনায় আর্সির পাক যোগ ফের স্পষ্ট হল। রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করায় বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, “শরণার্থীদের অনুপ্রবেশের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উদ্বাস্তু শিবিরগুলিতে তল্লাশি চালাচ্ছে বাংলাদেশি সেনা। এক বছরের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান না হলে আমরা একটি প্রত্যন্ত দ্বীপে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হব শরণার্থীদের। এছাড়া উপায়ও নেই।” জঙ্গিদের পাক যোগ নিয়ে তিনি বলেন, “ধর্মীয় ও আঞ্চলিক সম্প্রীতি ভঙ্গের কালো ইতিহাস রয়েছে পাকিস্তানের। ওরা বরাবরই এই অমানবিক কাজ করে এসেছে। যদিও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের দাবি, বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে পাকিস্তান। সুতরাং দেশে পাকিস্তান বা আইএসআইয়ের জঙ্গিবাদে সরাসরি মদত দেওয়ার প্রসঙ্গটি অবান্তর। তবে ওই দেশ থেকে অন্য পথে সন্ত্রাসবাদের আমদানির বিষয়টি উড়িয়ে দেননি তিনি।

বাংলাদেশের মায়ানমার সংলগ্ন কুতুপালংয়ের পশ্চিমপাড়া। সেখানকারই এক পোলট্রি ফার্মে রয়েছেন রোহিঙ্গা হিন্দু শরণার্থীরা। প্রায় ৫০০ জনের বেশি রয়েছেন সেখানে। তাঁদের দাবি, শুধুমাত্র হিন্দু হওয়ার কারণেই তাঁদের উপর হামলা করছে রোহিঙ্গা জঙ্গিরা। ‘আরসা’ সংগঠনের রোহিঙ্গা মুসলিম জঙ্গিরা তাঁদের নৃশংস আক্রমণ করেছে। ফকিরাপাড়া আলাকিয়ানদের আক্রমণে প্রায় ১০৮ জন হিন্দু প্রাণ হারিয়েছেন বলে শরণার্থীদের।