রাতের আধারে মন্দিরে হামলা, ভাংচুর, উদ্দেশ্য উচ্ছেদ

বরিশাল নগরীতে রাতের আঁধারে  একটি মন্দিরকে উচ্ছেদের জন্য মুখোশধারী সন্ত্রাসীদের হামলা করে ভাংচুর করা হয়েছে। গত ২৭শে আগস্ট, রবিবার মুখোশ পরিহিত ১৫-২০ জন দুর্বৃত্ত ২০নং ওয়ার্ডস্থ মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর সংলগ্ন রাখাল চন্দ্র শীলের বাড়ির ওই মন্দিরে হামলা চালিয়েছে। এ ঘটনায় মন্দিরসংলগ্ন পরিবারের সদস্যরা বাধা দেয়ায় তাদের মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।খবর পেয়ে পুলিশ দফায় দফায় ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির পরিদর্শন করেছে। মন্দিরের মালিক এবং হামলার শিকার দম্পতির অভিযোগ জমি দখলের জন্য ভূমি দস্যুদের ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীরা মন্দিরে হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়েছে।মন্দিরসংলগ্ন পাশের তপন শীলের মেয়ে রানী বালা জানান, মন্দিরসহ তাদের প্রায় ২৭ শতক জমিতে ভূমিদস্যুদের দৃষ্টি পড়ে। তিন মাস ধরে তারা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ওই জায়গা ছেড়ে চলে যেতে বলে।

তিনি জানান, গত ৭-৮ দিন আগে ১৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সহযোগীরা তাদের ওই জমি ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেয়। পরবর্তীতে তিনি ঢাকায় অবস্থানকালে পাঁচ দিন পূর্বে ১৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর গাজী নঈমুল হোসেন লিটু জমির বিষয়টি ফয়সালা করার জন্য তাকে মোবাইল ফোনে তাগিদ দেয়। এরপরই ভোরে তাদের বাড়ির সামনের মন্দিরের চারপাশ এবং উপরের টিনের চালা খুলে নেয়। এসময় তার পিতা তপন শীল, বৌদিসহ পরিবারের লোকজন বের হলে তাদের মারধর করে মুখোশ পরিহিত দুর্বৃত্তরা।তিনি অভিযোগ করেন, ভূমিদস্যু শাহজাহান, সবুজ, জাহিদের কালো টাকার কাছে প্রভাবশালীরা বিক্রি হয়ে তাদের জমি লুট করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে।

মন্দিরের মালিকানা দাবিদার লিপি রানী দাস জানান, ওই এলাকায় তাদের ২৩ শতাংশ জমিতে বসতঘর, মনসা ও কালি মাতার মন্দির রয়েছে। গত ৮৫ বছর ধরে মন্দিরে কালিপূজা হয়ে আসছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া এবং জাল দলিল তৈরির মাধ্যমে মন্দিরসহ পৈত্রিক জমি জবরদখলের চেষ্টা করে আসছে একই এলাকার জাহিদুর রহমান ওরফে চাউল জাহিদ নামে এক ভূমিদস্যু। অনেক বছর আগে জমির মূল মালিক তাদের দাদি রানী বালা শীল জমি নিয়ে দায়ের হওয়া মামলা পরিচালনার জন্য জাহিদকে জমির পাওয়ার দেন। মামলায় পক্ষে রায় হলে তাদের ওই জমি থেকে ৩ শতাংশ জমি জাহিদ পাবে বলে তার সাথে চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই পাওয়ার মূলে দলিল কাজে লাগিয়ে ভুয়া এবং জালিয়াতির মাধ্যমে পুরো জমিই নিজের বলে দাবি করে আসছে। এমনকি ওই জমি থেকে কিছু পরিমাণ জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রিও করে। কিন্তু তা কেউ দখলে নিতে পারছে না।

লিপি দাস জানান, জমিটি নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু তার মধ্যেই জাহিদ তাদের জমি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করছে। তাছাড়া সপ্তাহখানেক আগে জমির পাশের ওয়ার্ডের কাউন্সিলর চার লাখ টাকার বিনিময়ে জমিটি লিপি রানী দাসকে ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাবও দেয়া হয়। এতে রাজি না হওয়ায় গত ২৪ আগস্ট লিপির বাবা তপন কুমার শীলকে মোটরসাইকেলে করে তুলে নেয়ার চেষ্টা করে। এই ঘটনায় ওই দিনই তপন কুমার শীল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এই ঘটনার তিন দিনের মাথায় রবিবার একদল মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা মন্দির ঘর ভেঙে প্রতিমা সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু মন্দিরের পাশেই বসবাসকারী জমির মালিক মিলন চন্দ্র পাল, তার স্ত্রী ঝুমা পাল এবং মা গৌরী রানী পাল বাধা দেন। এসময় মুখোশধারীরা ঝুমা পাল ও গৌরী রানীর সাথে ধস্তাধস্তি এবং মিলন চন্দ্র পালকে ধারালো অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া করে। তবে বাধার মুখে প্রতিমা ভাঙচুর ব্যর্থ হলেও মন্দিরের চার পাশে থাকা টিনের বেড়া তুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা, পাশাপাশি মন্দিরের বেড়া ভাঙচুরও করে। প্রত্যক্ষদর্শী ঝুমা পাল এবং মিলন চন্দ্র পাল জানান, যারা ভাঙচুর করেছে তারা মুখোশধারী থাকায় কাউকে চিনতে পারেননি। তবে মন্দিরের অদূরে বিএম কলেজের সামনে রাস্তায় ঘটনার সময় জমির জবর দখলের চেষ্টাকারী ভূমিদস্যু চাউল জাহিদ, শাহাজাহান এবং তার ছেলে সবুজকে রহস্যজনক ভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখেছেন। ঘটনার পরে মুখোশধারীদের পালিয়ে যাবার সাথে সাথে জাহিদসহ অন্যারাও নিরুদ্দেশ হয়ে যান। কোতয়ালী মডেল থানার উপ-পরিদর্শক খলিলুর রহমান জানান, খবর পেয়ে তিনিসহ পুলিশের কয়েকটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে এই ঘটনা ঘটতে পারে। তবে মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর হয়নি। মন্দিরের উপরে একটি চালা ছিল সেটি রাত সাড়ে ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে ভেঙে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তাছাড়া অভিযোগকারী ও মন্দিরের জমির মালিকানা দাবিদার লিপি রানী ও তার স্বজনদের থানায় আসতে বলা হয়েছে বলেও জানান তিনি। কোতয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আতাউর রহমান জানান, ভোরে খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক পুলিশ পাঠানো হয়। সন্ধ্যার পর জমিতে বসবাসকারীদের আসতে বলা হয়েছে। তাদের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

Advertisements