ধর্ষণ নাকি ষড়যন্ত্র ? কি হয়েছিল সেইদিন লাভপুরে সুবলপুর আদিবাসী গ্রামে ?

সুবলপুর গ্রামকে মনে আছে ? কি মনে নেই, তাহলে চলুন ছয় বছর আগের বীরভূমের এক আদিবাসী গ্রাম থেকে ঘুরে আসি। দিনটি ছিল ২০শে জানুয়ারি, ২০১৪। বীরভূম জেলার লাভপুর থানার অন্তর্গত আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম সুবলপুর। ঘটনাটির সূত্রপাত এই ঘটনা থেকে, সুবলপুর গ্রামের এক আদিবাসী তরুণীকে এক বিবাহিত যুবক শেখ খালেক এর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় যুবতীর ঘরে ধরে ফেলে গ্রামের আদিবাসীরা । সাঁওতাল সমাজের রীতি ও পরম্পরা অনুযায়ী বসে ‘মাঝিহাড়াম বইসি’ অৰ্থাৎ মোড়লের সালিশি সভা । যেখানে ছেলের বাড়ির লোককে ডেকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং যাতে ভবিষ্যতে এই ঘটনা গ্রামের মধ্যে না ঘটে তার জন্য আদিবাসী যুবতীকে ও তার মা’কে ডেকে সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়। এখানেই যদি ঘটনাটির পরিসমাপ্তি হতো তাহলে হয়তো আজকে এই স্মৃতিচারণের প্রয়োজন পড়তো না। ঘটনাটির মূল সূত্রপাত ঘটে তার ঠিক দুদিন পরে অর্থাৎ ২২শে জানুয়ারি বুধবার ২০ বছর বয়সী ওই আদিবাসী তরুণী নিজে সাইকেল চালিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করে বলেন যে তাঁর গ্রামের সালিশি সভার নির্দেশ অনুযায়ী মোড়ল সহ ১২ জন ব্যক্তি তাঁকে গণধর্ষণ করেছে। যথারীতি ধর্ষণের অভিযোগ পেয়ে গ্রামে পুলিশ আসে এবং আদিবাসী সমাজের মাথা ‘মাঝিহাড়াম’ অর্থাৎ মোড়ল সহ ১২ জন ব্যক্তি কে গ্রেফতার করে। এক প্রকার পুরুষ শুন্য হয়ে পরে সুবলপুর গ্রাম।

শুরু হয় তদন্ত ‘কেঁচো খুঁড়তে বেরোয় কেউটে ‘ পুরো ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক যোগ থেকে শুরু করে এক বড়ো চক্রান্তের পর্দা ফাঁস হতে থাকে ধীরে ধীরে। এই ঘটনা সারা পৃথিবীর সংবাদমাধ্যমগুলোতে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হতে থাকে , শুরু হয়ে যায় আলোড়ন। চারিদিকে শোরগোল পরে যায় এই বলে যে ভারতবর্ষের অশিক্ষিত আদিবাসী সমাজের সালিশি সভায় ভিন্ন ধর্মে প্রেমের সাজা রূপে তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়। যা ছিল সর্বৈব ভাবে মিথ্যা গ্রামবাসীরা প্রথম থেকেই অভিযোগ করে আসে ওই মেয়েটি ও তার পরিবার তাদের মিথ্যা ভাবে ফাঁসিয়েছে তারা বড়ো কোনো চক্রান্তের শিকার। গ্রামের মানুষরা দাবী করেন এক অনাদি-বাসী যুবকের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের কারণে ওই নারী এবং তাঁর পুরুষ সঙ্গীকে আটক করা হয়েছিল এবং রাতভর তাদের গাছে বেঁধে রাখা হয়।পরের দিন এক সালিশি সভায় দুজনের জরিমানা হয় – এবং দুজনকেই ছেড়ে দেওয়া হয়। তারা বলেন ওই তরুণীর অভিযোগ অসত্য।
ভারতের প্রধান বিচারপতির নির্দেশ অনুযায়ী বীরভূমের জেলা জজ শুভ্রদীপ মৈত্র একজন মহিলা বিচারপতি সহ মোট তিন বিচারকের দল এই তদন্ত শুরু করেন । তদন্ত জোরদার হতেই কেউটের দেখা মেলে, সালিশি সভায় অভিযুক্ত শেখ খালেক এবং তাঁর দাদা ফারুক শেখের সাথে লাভপুরের বিধায়ক মনিরুল ইসলামের যোগাযোগের প্রমাণ সামনে আসতে থাকে। হ্যা এ সেই মনিরুল যে একদা বামফ্রন্ট, তারপরে তৃণমূল এবং অবশেষে বর্তমানে বিজেপির নেতা, যে প্রকাশ্যে একটি জনসভা থেকে শিকার করে সে তার পা দিয়ে ইঁদুরের মতো হিন্দুদের টিপে মেরেছে । স্থানীয় গ্রামবাসীদের মতে এই মনিরুল ইসলামের অঙ্গুলি হেলনেই পুলিশ ১৩ জন গ্রামবাসীকে তথাকথিত গণধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার করে। সুপরিকল্পিত ভাবে যা করিয়ে নেওয়া ওই আদিবাসী তরুণী কে দিয়ে।
এবার প্রশ্ন উঠতে থাকে কেন মনিরুল রা এত উৎসাহিত আদিবাসীদের নিয়ে ? কেন মনিরুল জড়িত এই ঘটনার সাথে?
গ্রামের মোড়ল ওপেল মাড্ডির ভাগ্নে সুফল সোরেন এর সঙ্গে কথা হয় আমাদের তিনি জানান এক গভীর চক্রান্তের কথা প্রথমত বিশেষ করে সাঁওতালদের জমি দখলের কৌশল হিসেবে অ-আদিবাসী সম্প্রদায়ের গ্রামবাসীরা দীর্ঘ দিন যাবত্‍ সাঁওতাল মেয়েদের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে, বিয়ে করে থাকে ৷ আদিবাসী জমি আদিবাসী ছাড়া অন্য কোনও সম্প্রদায়ের ব্যক্তিকে হস্তান্তরিত করা যায় না ৷ এটা দেশের আইন ৷ এই আইনকে পাশ কাটিয়ে সাঁওতাল বা অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের মেয়েদের ব্যবহার করে অ-আদিবাসী সমাজের ব্যবসায়ীরা জমি নিজেদের নামে লিখিয়ে নেয়৷ এই অপকর্মে একাধিক বিবাহ করার ছাড়পত্র পাওয়া সম্প্রদায় অর্থাৎ ইসলাম বেশি যুক্ত ৷ তাঁদের বাড়িতে বউ থাকলেও সাঁওতাল মেয়েকে বিয়ে করতে অসুবিধে হয় না ৷ এ ক্ষেত্রে শোনা যাচ্ছে লাভপুর অঞ্চলের জমি কেনা-বেচার বাজার সম্প্রতি বেশ তেজী ৷ সাঁওতালদের জমি দখল করার ষড়যন্ত্রও শুরু হয়ে গিয়েছে ৷ গ্রামবাসীদের অভিযোগ, এই ষড়যন্ত্রে সাঁওতাল তরুণী ও তাঁর পরিবার সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করে আসছেন ৷
দ্বিতীয়ত আদিবাসী সমাজের পরম্পরাগত মোড়ল কেন্দ্রীক বিচার ব্যবস্থা যা তাদের জমি ,মা- বোনের সন্মান রক্ষা করতে সক্ষম। সেই বিচার ব্যবস্থা কে আক্রমণ করা। এই পরম্পরাগত বিচার ব্যবস্থার কারণে একদিকে মিশনারিদের অসুবিধা হচ্ছিল ধর্মান্তরকরণে, অন্যদিকে ইটভাটা কিংবা পাথর খাদানে দিনমজুরী করা আদিবাসী মহিলাদের যৌনশোষণে সমস্যা হচ্ছিল মালিক, ম্যানেজার কিংবা ঠিকাদারদের- কাকতালীয় ভাবে যাদের অধিকাংশই মুসলমান। এই ঘটনার আগে পাঁচামির খাদান এলাকায় একজন আদিবাসী মহিলার সাথে আপত্তিজনক অবস্থায় ধৃত একজন মুসলিম ব্যক্তির মৃত্যু হয় জনরোষে। প্রতিক্রিয়ায় প্রায় ১০০ আদিবাসী ঘর পুড়িয়ে দেয় মুসলিম দুষ্কৃতীরা। হাতে অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার আদিবাসী জনতা। প্রমাদ গণে প্রশাসন এবং এলাকা ছেড়ে চলে যায় মুসলমানরা। আদিবাসী সমাজের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধের ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার জন্যই হয়তো সুবলপুরে এই নাটকের স্ক্রিপ্ট লিখেছিল মনিরুলরা। সাঁওতাল সমাজের ‘দিশম মাঝি’ নিত্যানন্দ হেমব্রম একটি প্রতিবেদনে লাভপুর ঘটনার উল্লেখ করে বলছেন এই ভাবেই নিঃশব্দে আদিবাসীদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, দর্শন ধ্বংসপ্রাপ্ত করে তাদের জঙ্গল, জমি, প্রাকৃতিক সম্বল, স্বনির্ভর সমাজকেন্দ্রিক অর্থনীতি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে ৷ পশ্চিমী সংস্কৃতি ,বিদেশী মদ ও কাঁচা টাকা দিয়ে তাদের ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে দোষীদের কঠোর শাস্তি প্রদানের নির্দেশ দেয় এবং বোলপুর আদালত (অনেকের মতে গণধর্ষণের যথেষ্ট প্রমাণ হাতে পাওয়ার আগেই) অভিযুক্তদের ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের শাস্তি ঘোষণা করে।
অনেকের মনে হতেই পারে ৬ বছর পর আজ হটাৎ এই স্মৃতিচারণ কেনো ? কারণ আমরা হিন্দু সংহতি ,সেইদিন যখন পুরো বিশ্ব ওদের দিকে আঙ্গুল তুলে ছিল তখন আমরাই ছিলাম ওদের পাশে। অভিযুক্তরা যাতে ন্যায়বিচার পায়, সেই চেষ্টার সাথে সাথে আমরা অভিযুক্তদের অসহায় পরিবারগুলোর পাশে তখন থেকেই যথাসম্ভব দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। সেই তাগিদেই সুবলপুর গ্রামে গেলেন কেন্দ্রীয় সভাপতি দেবতনু ভট্টাচার্য । গ্রামবাসীদের সাথে কুশল বিনিময়, একসাথে মধ্যাহ্নভোজনের পাশাপাশি দুর্গাপুজার প্রাক্কালে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের হাতে নববস্ত্র তুলে দেওয়া হয় । তিনি বলেন বনবাসী সাঁওতাল ভাই বোনেরা আমাদের সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং আমরা এদের আপদে-বিপদে ,সুখে-দুঃখে এদের সাথেই থেকেছি,আগামী দিনেও সবসময় থাকবো।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s