কি হয়েছিলো ১৯৪৬ এ নোয়াখালীতে ? কেনো আজকের দিনে সেই বিগত সময়ের রক্তাক্ত ইতিহাসের স্মৃতিচারণা দরকার ?

”রাস্তা ঘাট কেটে দেওয়া হল,হাজার হাজার হিন্দুকে বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হল, হিন্দু নারীকে অপহরণ করে ধর্ষন করা হল অথবা জোরপূর্বক বিবাহ করা হল। তাদের পূজাস্থানকে করা হল অপবিত্র। এমনকি শিশুদের কোনরকম করুনা করা হলনা । হিন্দু বাড়ীগুলিতে গরু জবাই করে সকলকে খেতে বাধ্য করা হল। সদ্যবিধবা রমণীরা হলেন গনিমতের মাল। প্রশাসন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়, প্রাদেশিক সরকারও নিষ্ক্রিয় , ভাইসরয় হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করলেন” — নোয়াখালী নোয়াখালী।

১৯৪৬ সালের আজকের দিনেই এরকম এক ভয়াবহ , নৃশংস রাত দেখেছিলো সেই দিনের নোয়াখালী। সেই ১৯৪৬ সালের ১০ই অক্টোবর ছিল কোজাগরী লক্ষী পূজার দিন। সমগ্র বাংলার হিন্দুরা ছিলেন মা লক্ষীর আরাধনায় রত, চতুর্দিক ছিল চন্দ্রালোকে উদ্ভাসিত – অবিভক্ত বঙ্গ র দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত নোয়াখালী জেলার অতীব সংখ্যালঘু হিন্দু অধিবাসীরাও ছিলেন পুজার্চনায় ব্যস্ত। অকস্মাৎ রাত্রি র নিস্তব্ধতা খান খান করে ধেয়ে এলো কাশেম র ফৌজ, মুসলিম লীগ র নোয়াখালী অঞ্চলের নেতা কাশেম আলীর আদেশে। সঙ্গত দিল মুসলীম লিগের প্রাক্তন এম.এল.এ. গোলাম সারওয়ার র নিজস্ব বাহিনী। উদ্দেশ্য – হিন্দু বিনাশ। যে রাতে ঘরে ঘরে উলুধ্বনী-শঙ্খধ্বনী-ঘন্টাধ্বনী হওয়ার কথা ছিল নোয়াখালীর সেই রাত শুনলো শুধু হিন্দুদের আর্তনাদ। এ কোনো দাঙ্গা নয়,চললো একতরফা হত্যাকান্ড, ধর্ষণ ও ধর্মান্তর কর্মসূচি। নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ, বেগমগঞ্জ, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর, ছাগলনাইয়া ও সন্দ্বীপ থানা এবং ত্রিপুরা জেলার হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর, লাকসাম ও চৌদ্দগ্রাম থানার অধীনে সর্বমোট প্রায় ২০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে চলে এই তান্ডব।বেগমগঞ্জের এক ব্রাহ্মণপরিবারের মন্দিরের সামনে কুরবানির দিন গরু কেটে ওই ব্রাহ্মণ পরিবারকে পাঠানো হয় ঝুড়ি করে এবং তারা তা ফেরত পাঠালে তাদের ই জরিমানা হয় ও নাক খৎ দিতে হয় মুসলমানদের খোদার প্রসাদের অপমান করার জন্য।এক সার্বিক হিন্দু গণহত্যা র দরুণ কতজন যে প্রাণ হারালেন, কত হিন্দু নারী হলেন ধর্ষিতা, কতজন কে জোর করে গরুর মাংস খাওয়ানো হল, কতজন পুরুষকে জোর করে সুন্নত করিয়ে মেরে ফেলা হল, কতজন হিন্দু নারীকে গণধর্ষণ করে পা দিয়ে তাঁদের মাথার সিঁদুর ডলে দেওয়া হল, কতজন চিরতরে হারিয়ে গেলেন, কতজন হিন্দু নারী এক লহমায় গৃহবধূ থেকে বাণিতায় রূপান্তরিত হলেন তার হিসেব গত প্রায় ৭৫ বছরেও পাওয়া যায় নি।

কলকাতায় যে হত্যাযজ্ঞ ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, ১৬ ই আগস্ট, ১৯৪৬ – যা শুরু হয়েছিল মুসলমান র নৃশংসতম আক্রমণে কিন্তু শেষ পর্যন্ত হিন্দুরা রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং শেষ হয়েছিল ভয়াল, ভয়ঙ্কর প্রত্যুত্তরে। সেটা তারা মেনে নিতে পারেনি তাই ৮১% মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা নোয়াখালিকে বেছে নিয়েছিল প্রতিশোধ নেবার জন্য। মুসলিম লিগের লোকেরা ঘুরে ঘুরে দেখতো যাতে কেউ হিন্দুদের দোকানে কিছু কেনাকাটা না করে,করলে কান ধরে উঠবোস করতে হত। কোর্টে গিয়ে সকলকে সাবধান করেছিল যাতে মুসলমানরা হিন্দু উকিলের কাছে না যায়।হাটের দিনগুলিতে যাতে হিন্দুরা কোনভাবেই পান বিক্রি করতে না পারে লিগের কর্মীরা পিকেটিং করত ( নোয়াখালী তে বড় বড় পানের মৌজা ছিল)।এইভাবে প্রথমে হিন্দুদের ভাতে মারার কৌশল নেওয়া হয়।এরপর তাদের প্রাণে মারা হয়। প্রায় ৫০,০০০ হিন্দু আক্রান্ত এলাকায় মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকে। কিছু এলাকায় হিন্দুদেরকে স্থানীয় মুসলিম নেতাদের অনুমতি নিয়ে চলা ফেরা করতে হত। জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিতদের কাছ থেকে জোর করে লিখিত রাখা হয়েছিল যেখানে লেখা ছিল তারা স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হয়েছে। তাদেরকে একটি নির্দিষ্ট বাড়িতে বা ঘরে আবদ্ধ করে রাখা হত এবং যখন কোন আনুষ্ঠানিক পরিদর্শক দল পরিদর্শনে আসত তখন তাদেরকে ওই নির্দিষ্ট বাড়িতে যাবার অনুমতি দেয়া হত। হিন্দুদেরকে ওই সময় মুসলিম লীগকে চাঁদা দিতে হত যাকে বলা হত জিজিয়া (যা একসময় ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। মুসলিম শাসন আমলে হিন্দুরা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তৎকালিন শাষকদের ‍জিজিয়া নামক বাড়তি কর প্রদান করত।)
সেইসময় অমৃতবাজার পত্রিকায় সম্পাদকীয় তে লেখা হল ” নোয়াখালি থেকে রক্ত হিম করা খবর আমাদের দপ্তরে এসে পৌছেছে। সরকারি ও বেসরকারি উভয়ের বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার যে,এই দাঙ্গা পূর্বপরিকল্পিত” তবে খুন বা লুঠ নোয়াখালী দাঙ্গার মূল উদ্দেশ্য ছিল না। এটি ছিল ভবিষ্যৎ পাকিস্তান রাষ্ট্রের রূপরেখা কি হবে তার ছোট্টো প্রদর্শন। নোয়াখালীকে দার-উল- ইসলামে পরিনত করার জন্য খুন,ধর্ষন,লুঠের পাশাপাশি ‘হয় কোরান নয় মৃত্যু ‘ নীতি অবলম্বন করে হিন্দুদের ইসলাম ধর্ম গ্রহন করতে বাধ্য করা হল।এমনকি তাদেরকে দিয়ে জোর করে গো হত্যা করানো হল গোমাংস খাওয়ানো হল।
বঙ্গীয় আইন সভার নোয়াখালী থেকে একমাত্র হিন্দু প্রতিনিধি হারান চন্দ্র ঘোষ চৌধুরী এই দাঙ্গাকে হিন্দুদের প্রতি মুসলিমদের প্রচণ্ড আক্রোশের প্রকাশ বলে বর্ণনা করেন। বাংলার সাবেক অর্থ মন্ত্রী ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নোয়াখালী দাঙ্গাকে একটি সাধারণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হিসেবে দেখানোর বিতর্ককে প্রত্যাখান করেন। তিনি এ ঘটনাকে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর সংখ্যাগুরু মুসলিমদের সুপরিকল্পিত এবং সুসংঘটিত আক্রমন বলে বর্ণনা করেন।
মহত্মা গান্ধী নোয়াখালীতে ক্যাম্প করেন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য নোয়াখালী ও এর আশেপাশের এলাকা গুলো ঘুরে দেখেন। যদিও এই শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সফল হওয়ার কোনো সম্ভবনা ছিলনা, হয়ওনি। হিংস্র নরপশুদের কাছে অহিংসার বাণী হচ্ছে ” সন্তানের আকাঙ্খায় বন্ধ্যা গমনের” তুল্য। কংগ্রেস সভাপতি আচার্য্য কৃপালনির স্ত্রী সুচেতা কৃপালনি নোয়াখালিতে নারী উদ্ধার করতে যান। বেঁচে যাওয়া হিন্দুদের আত্মবিশ্বাস চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় এবং তারা কোন দিন তাদের নিজেদের গ্রামে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেনি। এর মধ্যে কংগ্রেস নেতৃত্ব ভারত বিভাগ মেনে নেন যার ফলে শান্তি মিশন এবং আক্রান্তদের জন্য ত্রান কার্যক্রম পরিত্যক্ত হয়। বেশির ভাগ বেঁচে যাওয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দুরা তাদের বাড়ি-ঘর ফেলে পশ্চিম বঙ্গ, ত্রিপুরা এবং আসামে চলে আসে।
এই ভয়াবহ ইতিহাসের সাক্ষী কি আমরা আবার হতে চলেছি ? বিগত এক যুগে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় ঘটে যাওয়া বিক্ষিপ্ত দাঙ্গা গুলো হিমশৈলর চূড়া নয়তো ? সেই ভয়াবহ রাত যেন হিন্দু বাঙালির জীবনে আর না ফিরে আসে তার জন্য হিন্দু সংহতি দৃঢ় ভাবে লড়াই করে চলেছে। হিন্দু বাঙালির স্বার্থে হিন্দু সংহতি আজ আর্থিক,সামাজিক ,রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক স্তরে লড়াই শুরু করেছে। বাংলার সমগ্র হিন্দু জাতিকে হিন্দু সংহতি আহ্বান করছে নোয়াখালী কে স্বরণে রেখে এই লড়াইয়ে সামিল হওয়ার জন্য।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s