কে এই যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল? কেন‌ই বা ‘দলিত-মুসলিম ঐক্য’ সম্পর্কে মোহমুক্তি?

“পূর্ব পাকিস্তানের নিম্নবর্ণের হিন্দু মেয়েদের ধর্ষণের অনেক খবর আমি পেয়েছি।  এখানে হিন্দুদের ভবিষ্যত হলো ধর্মান্তরিত হওয়া অথবা পুরোপুরি নিশ্চিন্ন হয়ে যাওয়া।”

                      -যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল (পদত্যাগ পত্র , ৮ই অক্টোবর ,১৯৫০)

আজ ৮ই অক্টোবর ‘মোহমুক্তি দিবস ‘ আজ থেকে ৭০ বৎসর আগে আজকের দিনেই স্বাধীন পাকিস্তানের প্রথম মন্ত্রীসভার একমাত্র হিন্দু মন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে ভারতে ফিরে এসেছিলেন। কে ছিলেন এই যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল ? কেনই বা তার দলিত – মুসলিম ঐক্য সম্পর্কে মোহমুক্তি ঘটল?

১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ শে জানুয়ারী বরিশালের এক নমঃশুদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া যোগেন মন্ডল ছিলেন বাংলার ‘দলিত–মুসলিম ঐক্যের’ অন্যতম কট্টর সমর্থক। তিনি মনে করতেন মুসলিমদের সাথে নমঃশূদ্রদের অর্থনৈতিক স্বার্থের মিল রয়েছে, মুসলিমরা ছিল মূলত কৃষক-শ্রমিক, অস্পৃশ্যরাও তাই। মুসলিমদের একটি অংশের মত নমঃশূদ্রদের একটি অংশও ছিল জেলে, তারা উভয়েই ছিল লেখাপড়ার দিক দিয়ে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী তাই দলিত – মুসলিম ভাই ভাই। আর তার এই চিন্তাকে ভিত্তি করেই পাকিস্তানের ইসলামী শাসনে বাংলার ৭০ লক্ষ তফশিলী জাতিভুক্ত মানুষের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, এই আশ্বাস দিয়ে তফশিলী জাতিভুক্ত যোগেনবাবুকে দলে টেনেছিলো মহম্মদ আলি জিন্না। ডঃ আম্বেদকরের বিশ্বস্ত সহযোগী যোগেনবাবু লিয়াকত আলির মন্ত্রীসভায় আইন ও কাশ্মীর বিষয়ক মন্ত্রক পেয়েছিলেন।

যােগেনবাবুর সম্ভবত লীগের চরিত্র, রাজনীতি ও ভ্রাতৃত্ব, পাক কিতাবের শিক্ষা ও অনুশাসন এবং কাফেরদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ সম্পর্কে কিছুমাত্র ধারণা ছিল না। যেহেতু আরব সাম্রাজ্যবাদীরা ইসলামিক ব্রাদারহুড ব্যাতীত অপর কোন জাতি,ভাষিক পরিচয়ে বিশ্বাস রাখেন না,তাই হিন্দু বৌদ্ধসহ  পৃথিবীর কোন দেশে অন্য সম্প্রদায়ের সংখ্যালঘুরা তাদের ধর্মীয় বিধি-বিধান মেনে এদের সঙ্গে শান্তিতে সহাবস্থান করতে পারে না। স্বাধীনতার উষালগ্নে বঙ্গীয় রাজনীতি দেখিয়ে দিয়েছিলো যে উপমহাদেশে অস্তিত্ব, মুক্তচিন্তা, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের লড়াইয়ের অক্ষটি সম্পূর্ণভাবে আরব সভ্যতা বনাম মানব সভ্যতার ৷ বাবাসাহেব আম্বেদকর এই চরম সত্যটি পূর্বেই বুঝেছিলেন যা যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল বরিশালে লিগের পদাঘাত খাওয়ার পর বুঝলেন৷ ভারতীয় দর্শনে বর্ণিত বিশ্বজনীন চিন্তার ধারক বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন “পৃথিবীতে দু’টি ধর্মসম্প্রদায় আচ্ছে অন্য সমস্ত ধর্মমতের সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধতা। অগ্রগণ্য, হচ্ছে খ্রিস্টান আর মুসলমান ধর্ম। তারা নিজের ধর্ম পালন করেই সন্তুষ্ট নয়, অন্য ধর্মকে সংহার করতে উদ্যত। এ জন্য তাদের ধর্ম গ্রহণ করা ছাড়া তাদের সঙ্গে মেলার কোন উপায় নেই।

যােগেনবাবু  গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং এবং নোয়াখালীর দাঙ্গার পরও পুর্ববঙ্গের গ্রামে গ্রামে সভা করেছে বলেছেন, মুসলমান ও তফশীলীদের অর্থনৈতিক স্বার্থ এক ৷ এসব দাঙ্গা হাঙ্গামা ধনী বর্ণহিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যেকার উত্তেজনা, তফশিলীদের কোন ক্ষতি হয় নি ৷ খুলনার চিতলমারী গ্রামে এমনই এক জনসভায় তাকে জনসমক্ষে মিথ্যেবাদী বলে অভিহিত করেন বিশিষ্ট সমাজসেবী কিরণ ব্রহ্ম ৷ শুধু লিগের ডাইরেক্ট একশান ডে’র আহ্বান মঞ্চে উপস্থিত থাকাই নয়, লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবসের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বাংলা তফসিলী ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে মন্ত্রী যােগেনবাবু আনুষ্ঠানিক ভাবে ঐ প্রত্যক্ষ সংগ্রাম সমর্থন করলেন ।

‘দলিত–মুসলিম ঐক্যের’ কট্টর সমর্থক যোগেন মন্ডলেরও মোহভঙ্গ হলো ১৯৫০ সালে যখন পূর্ব পাকিস্তানে তাঁরই জেলা বাখরগঞ্জে তাঁরই স্বজাতির লোকজন মুসলিমদের দ্বারা আক্রান্ত হল, তখন চোখ খুলে গেলো তাঁর। লীগের আইন মন্ত্রী হয়েও রক্ষা করতে পারলেন না তার স্বজাতি মা-বোনেদের। তারা ধর্ষিতা হলেন, গ্রামের পর গ্রাম ধর্মান্তরিত হলো।

দীর্ঘদিনের মোহমুক্তি হলো যোগেন মন্ডলের ৮ই অক্টোবর, ১৯৫০ তারিখে। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে লিখলেন খোলা পদত্যাগ পত্র –

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

পূর্ব বাংলার পিছিয়ে পড়া হিন্দু সমাজের অবস্থা উন্নয়নের জন্য আমার প্রচেষ্টার ব্যর্থতার পর চরম হতাশা এবং দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমি আপনার মন্ত্রীসভা থেকে পরদত্যাগ করছি। আমার মনে হয় আমার জানানো উচিত কেন ভারতীয় উপমহাদেশের এই ক্রান্তিকালে আমি এই সিদ্ধান্ত নিলাম।

(এই লিঙ্কে https://debtanu1971.wordpress.com/2020/10/08/যোগেন-মণ্ডলের-পদত্যাগ-পত/ গিয়ে পুরো পত্র টি পড়ুন আমরা নিম্নে কয়েকটি অংশ উল্লেখ করছি )

১. কলকাতা হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৪৬ এর অক্টোবরে শুরু হয় নোয়াখালীর দাঙ্গা। সেখানে শত শত হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষকে(নমঃশূদ্র সহ) হত্যা করা হয় এবং জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়। হিন্দু মহিলারা অপহরণ এবং ধর্ষণের শিকার হন। আমার সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষেরও জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। তাৎক্ষণিকভাবে আমি ত্রিপুরা ও ফেনী যাই এবং কিছু দাঙ্গাপীড়িত এলাকা পরিদর্শন করি। হিন্দুদের দুর্দশা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে, কিন্তু আমি মুসলিম লীগের সাথে সহযোগিতা চালিয়ে যাই। কলকাতার বিশাল হত্যাযজ্ঞের পরপর সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে এক ভোটাভুটি আয়োজিত হয়। শুধুমাত্র আমার চেষ্টা দ্বারাই কংগ্রেসের পক্ষের চারজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সদস্য এবং চারজন অস্পৃশ্য সদস্যের সমর্থন যোগাড় করা সম্ভব হয় যা ব্যতীত মন্ত্রীসভার পরাজয় ছিল অবশ্যম্ভাবী।

২. ঢাকায় আমার ৯ দিনের অবস্থানকালে আমি শহর ও শহরতলীর বেশিরভাগ দাঙ্গা আক্রান্ত অঞ্চলে গিয়েছি। তেজগাঁও এর অন্তর্ভুক্ত মিরপুরেও আমার যাওয়া হয়েছে। আমি সবচেয়ে মর্মাহত হয়েছি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে ট্রেনে শত শত নিরপরাধ হিন্দু হত্যার খবরে। ঢাকার দাঙ্গার দ্বিতীয় দিনে আমি পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করে তাকে অনুরোধ করি দাঙ্গা যেন জেলা শহর ও গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ যেন তিনি অবিলম্বে জেলা কর্তৃপক্ষ গুলোর নিকট পৌঁছে দেন। ২০ ফেব্রুয়ারী, ১৯৫০ তারিখে আমি বরিশাল শহরে পৌঁছে সেখানকার ঘটনা শুনে বিস্মিত হয়ে যাই। জেলা শহরে বেশকিছু হিন্দু ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়, প্রচুর হিন্দু নিহত হয়। আমি জেলাটির প্রায় সব দাঙ্গা আক্রান্ত অঞ্চল পরিদর্শন করেছি। জেলা শহরের ৬ মাইলের মধ্যে অবস্থিত এবং গাড়ি চলাচলের রাস্তা দিয়ে সংযুক্ত কাশিপুর, মাধবপাশা, লাকুটিয়ার মত জায়গাগুলোয় ধ্বংসযজ্ঞের পরিমাণ দেখে আমি বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। মাধবপাশা জমিদার বাড়িতে প্রায় ২০০ মানুষ নিহত হন, আহত হন আরো অন্তত ৪০ জন। মুলাদী নামক স্থানে যেন নরক নেমে আসে। স্থানীয় মুসলিমদের ও কিছু কর্মকর্তার ভাষ্য অনুসারে শুধু মুলাদী বন্দরেই ৩০০এর বেশি লোক নিহত হয়। আমি মুলাদী গ্রামও পরিদর্শন করি এবং সেখানে মৃতদেহের কঙ্কাল পড়ে থাকতে দেখি। কুকুর এবং শকুন নদীর ধারে মৃতদেহ কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। আমাকে অবগত করা হয় যে সকল পূর্ণবয়স্ক পুরুষকে হত্যার পর সমস্ত যুবতীদের দুর্বৃত্ত দলের হোতাদের মাঝে ভাগ করে দেয়া হয়। রাজাপুরের অন্তর্গত কৈবর্তখালী নামক স্থানে ৬৩ জন নিহত হয়। থানা থেকে ঠিল ছোঁড়া দূরত্বে অবস্থিত হিন্দু বাড়িগুলোতেও লুটপাট করে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়, সেগুলোতে বসবাসকারীদের হত্যা করা হয়। বাবুগঞ্জ বাজারের সকল হিন্দু দোকানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, বহু হিন্দু নিহত হয়। বিস্তারিত বর্ণনা পাবার পর কম করে ধরলেও দেখা যায় শুধুমাত্র বরিশাল জেলাতেই ২,৫০০ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে পূর্ব বঙ্গে মৃতের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার! সব খোয়ানো নারী-শিশুদের স্বজন হারাবার হাহাকারে আমার হৃদয় দ্রবীভূত হয়ে গিয়েছিল। আমি নিজের কাছেই জানতে চাইলাম “ইসলামের নামে পাকিস্তানে কি ঘটতে চলেছে”।

(পুরো পদত্যাগ পত্র টি পড়ুন এই লিঙ্কে  https://debtanu1971.wordpress.com/2020/10/08/যোগেন-মণ্ডলের-পদত্যাগ-পত/ গিয়ে  )

আজ ৮ই অক্টোবর বাংলার সমস্ত যোগেন মণ্ডলদের মোহমুক্তি ঘটাতে হিন্দু সংহতি একটি আলোচনা সভার মাধ্যমে  ‘মোহমুক্তি দিবস ‘পালন করছে।  ইসলামের চোখে অমুসলমান মানেই কাফের, মালাউন। তাই হিন্দু সংহতি জাতপাতের উর্দ্ধে উঠে সমগ্র হিন্দু সমাজকে এই ইসলামী মৌলবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াবার আহ্বান জানায়।

1 Comment

  1. এই তথ্য গুলি সবার সামনে তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ।
    এই ইতিহাস আরও আরও মানুষের জানা দরকার।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s