হিন্দু সংহতির লক্ষ্য কি ? (৩)

মানুষের জীবনের সমস্ত কর্মোদ্যম সাধারণতঃ যে দুটো বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়ে থাকে তা হল কাম এবং অর্থ। মানুষ যে দিন জন্মগ্রহণ করে সেই দিন থেকেই তার কিছু কিছু চাহিদারও জন্ম হয়। জীবন ধারণের জন্য ন্যূনতম চাহিদা পূরণের সাথে সাথে সে জীবনে সুখ চায়, সমৃদ্ধি চায়, নাম-যশ চায় এবং এই সমস্ত কিছুর স্থায়িত্ব চায়। তাই সে ভবিষ্যতের জন্য রসদ সঞ্চয় করে রাখতে চায়। কিন্তু মানুষের এই চাহিদার কোনও সীমা থাকে না। চাহিদার সীমা কালক্রমে Sky is the limit হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের এই চাহিদা আবার একমুখী নয়, দশ ইন্দ্রিয় এবং মনকে পরিতৃপ্ত করার জন্য তার এই চাহিদা হয়ে ওঠে বহুমুখী। মানুষের এই বহুমুখী এবং সীমাহীন চাহিদার পরিপূরণের আকাঙ্খাকে বা সেই চাহিদা পরিপূরণের সংকল্পকেই আমাদের শাস্ত্রে ‘কাম’ বলা হয়েছে।

এখন এই চাহিদা পরিপূরণের জন্য মানুষকে হয় সরাসরি সেই প্রয়োজনীয় বস্তু উৎপাদন করতে হয় অথবা বিকল্প বস্তু উৎপাদন করে তার বিনিময়ে সেই বস্তু সংগ্রহ করতে হয় অথবা অন্য কোনও উপায়ে সেই বস্তুর উপযুক্ত বিনিময় মূল্য উপার্জন করতে হয়। মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য যা কিছু উৎপাদন অথবা উপার্জন করতে হয় তাকেই বলা হয় অর্থ।

অপ্রাপ্ত বস্তুকে করায়ত্ত করার সংকল্প এবং তা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ উৎপাদন- একে কেন্দ্র করেই তো আবর্তিত হয় মানুষের জীবনযাত্রা! এই দুটো জিনিষ বাদ দিলে মানুষের জীবন অচল। যে যত বেশী অর্থ উৎপাদন করতে পারে এবং তার বিনিময়ে তার চাহিদা পূরণ করতে পারে, তার জীবন তত বেশী সুখী এবং সমৃদ্ধশালী হয়। এই সুখী এবং সমৃদ্ধশালী জীবনই সফল জীবন। যার জীবনের প্রাথমিক চাহিদা পূরণ হয় না সে সুখী তো নয়ই, তার বেঁচে থাকাই কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং জীবনকে সফল করতে হলে পর্যাপ্ত অর্থ উৎপাদন করতে হবে এবং সেই অর্থের বিনিময়ে সুখ ও সমৃদ্ধিকে সুনিশ্চিত করতে হবে। সুতরাং অর্থ আর কামের সাধনাই সাধারণ মানুষের অন্যতম সাধনা। না, ‘অর্থ আর কামের সাধনা’ শুনেই রে রে করে উঠবেন না। পরের অংশগুলো পড়তে অনুরোধ করছি।

কাম মোটেই নিষিদ্ধ অথবা খারাপ জিনিষ নয়। কাম হল সম্পূর্ণরূপে একটা প্রাকৃতিক বিষয়। মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এই কাম। সনাতনী শাস্ত্রে মানুষের জীবনের চারটে স্তম্ভস্বরূপ চার পুরুষার্থের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ বলা হয়েছে এই কামকে। কাম হল প্রকৃতি। একে অস্বীকার করা অসম্ভব। কিন্তু Ecological Balance বজায় রাখার জন্য কামকে নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক। কারণ মানুষের কামনা যখন সীমাহীন হয়ে যায় তখন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। শুরু হয় শোষণ। নিজের সুখের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের নেশায় মানুষ প্রকৃতিকে শোষণ করতে শুরু করে, মানুষ মানুষকে শোষণ করতে শুরু করে। প্রকৃতির সমস্ত সম্পদকে নিজের করায়ত্ত করার জন্য শুরু হয় প্রতিযোগিতা, শুরু হয় লড়াই। কিন্তু এই লড়াই সৃষ্টির মূল সুরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই লড়াই সৃষ্টির সমন্বয়ের নিয়মের পরিপন্থী। এই লড়াইয়ে শেষমেষ Ecological Balance নষ্ট হয়, যার পরিণতি হচ্ছে সমূহ বিনাশ।

অর্থ আর কামের জন্য প্রতিযোগিতা বা লড়াই নয়, একে সাধনায় রূপান্তরিত করাই সনাতনী সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য। সেইজন্য চার পুরুষার্থের মধ্যে অর্থ এবং কামের আগে ধর্ম এবং পরে মোক্ষের কথা বলা হয়েছে। ধর্ম শব্দটি এসেছে ধৃ ধাতু থেকে। ধৃ মানে যা ধারণ করে রাখে। যে আচরণবিধি সৃষ্টির Ecological Balance কে ধরে রাখে তাই সনাতন ধর্ম। তাই ধর্মের পথে প্রচুর অর্থ উপার্জন করা, ধর্মের পথে উপার্জিত অর্থকে ব্যবহার করা এবং ধর্মানুসারে কামের পরিপূরণ করাই অর্থ আর কামের যথার্থ সাধনা। এই সাধনাই গৃহস্থের শ্রেষ্ঠ সাধনা।

মোক্ষ হল নিজের স্বরূপকে উপলব্ধি করা। নিজেকে জানতে পারলেই এই জীবনচক্র থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এই শরীরের মৃত্যু হল একটা চরম সত্য। কিন্তু মৃত্যুর পরে কি? সূক্ষ্ম উপলব্ধির কথা না হয় বাদই দিলাম, কারণ নিজের স্বরূপ উপলব্ধি করা অনেক সাধনার ফলেই সম্ভব হয়। স্থুল দৃষ্টিতেও যদি দেখা যায় তাহলে প্রশ্ন ওঠে- এই শরীরের পতনের পরে আমি আমার সঞ্চিত অর্থের কতটা সাথে নিয়ে যেতে পারবো? যদি ভাবি আমার অর্জিত সম্পদ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাবো, সেটাও কতটা যুক্তিযুক্ত? এই প্রসঙ্গে একবার আমার এক বন্ধু সন্ত কবীরের একটি দোহার উল্লেখ করে বলেছিলেন- সন্তান যদি অপদার্থ হয় তাহলে তার জন্য আমার সঞ্চিত অর্থ রেখে লাভ কি? সে তা তার অপব্যবহার করে শেষে নিঃস্ব হয়ে যাবে! আর যদি আমার সন্তান যোগ্য হয় তাহলে তার জন্য সম্পদ রেখে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তাই বা কি? সে তো নিজের যোগ্যতাতেই তার জীবনকে সফল করবে!

এই ধর্মের বোধ আর মোক্ষের চিন্তাই অর্থ আর কামকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মানুষের জীবনকে যদি একটা নদীর সাথে তুলনা করা যায় তাহলে সেই নদীখাতে প্রবাহিত উদ্দাম জলরাশি হল অর্থ আর কাম, যা হল জীবনের মূল চালিকাশক্তি। নদীর দুই পাড় হল ধর্ম, যা সেই প্রবাহের নিয়ন্ত্রক। আর মোক্ষ হল নদীর অন্তিম লক্ষ্য সেই মহাসাগর, যা নদীর প্রবাহের গন্তব্যকে সুনিশ্চিত করে সঠিক দিকনির্দেশ করে দেয়। জলই নদীর জীবন। যে নদীর জল যত বেগবান, সেই নদী ততই জীবন্ত এবং প্রকৃতির পোষক। জল শুকিয়ে যাওয়া মানে নদীর মৃত্যু। ঠিক সেইভাবেই, যে ব্যক্তির অর্থ আর কামের সাধনায় প্রেরণা নেই, সে জীবন্মৃত। সে নিজের জীবনে ব্যর্থ তো বটেই, সে অন্যেরও কোনও কাজে লাগে না। আবার নদীর জল যদি দুই পাড়কে ছাপিয়ে যায়, তাহলে সেই বন্যায় নদী নিজেও দিকভ্রষ্ট হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, সাথে সাথে সকলের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতিও করে। সেই রকমই অর্থ আর কামের এই প্রবাহ ততক্ষণই সকলের জন্য আশীর্বাদ, যতক্ষণ তা ধর্মের সীমা অতিক্রম না করে এবং লক্ষ্যচ্যূত না হয়।

সনাতনী বঙ্গবাসীকে যদি মাথা তুলে দাঁড়াতে হয় তাহলে আজ আমাদের অর্থ আর কামের সাধনায় রত হতে হবে। প্রচুর অর্থ উৎপাদন করতে হবে। ধর্মানুযায়ী সুখী ও সমৃদ্ধশালী জীবনযাপন করতে হবে। ধর্মানুযায়ী অর্থ সঞ্চয় করতে হবে এবং অতিরিক্ত অর্থ সমাজকল্যাণে দান করতে হবে। এই সাধনায় আমাদের জীবন শুধুমাত্র সফলই হবে না, আমাদের জীবন সার্থক হবে।

এই বঙ্গভূমির সন্তানরা কৃষি, ব্যবসা, কারীগরি বিদ্যা- কোনও বিষয়েই পিছিয়ে থাকে নি। ডক্টর নীহাররঞ্জন রায়ের বাঙালির ইতিহাসে আমরা পাই ‘মোটামুটি খ্রিষ্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতক থেকে ষষ্ঠ-সপ্তম শতক পর্যন্ত কিছুটা উন্নত ধরনের চাষবাস এবং গৃহশিল্প ধন-উৎপাদনের বড়ো উপায় হলেও, প্রধানতম উপায় ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য।’ ‘অন্যান্য শিল্পের মতো নৌ-শিল্পেও বাংলার একটা স্থান ছিল। সাধারণ লোকের যাতায়াত এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়াও নৌবহরের ওপর সামরিক শক্তি রীতিমত নির্ভর করত। বিভিন্ন লিপিতে নৌকার ঘাট এবং জাহাজঘাটার উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব থেকে নদীগামী ছোট বড়ো নৌকা এবং সমুদ্রগামী পোত ইত্যাদি নির্মাণ-সংক্রান্ত শিল্প ও ব্যবসার কথা সহজেই আঁচ করা যায়।’ ‘প্রাচীন বাংলায় শুধু যে দেশের ভেতরে ব্যবসা-বাণিজ্য হত তা নয়, বিদেশের হাটে-বাজারেও জিনিষপত্র রপ্তানি হত। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে দেখা যায়, বাঙালি বণিকেরা দক্ষিণ-ভারতের সমুদ্রপোকূল ধরে গুজরাট পর্যন্ত যেসব বাণিজ্যসম্ভার নিয়ে যেতেন, তার মধ্যে ছিল পান, সুপারি, নারকোল। সুপারির বদলে মাণিক্য, পানের বদলে মরকত এবং নারকোলের বদলে তাঁরা শঙ্খ আনতেন। বাঙালি বণিকরা সামুদ্রিক লবণের বিনিময়ে পাথুরে লবণ নিয়ে আসতেন। লবণের ব্যবসাতে যে প্রচুর লাভ হত, পরে লবণের ব্যবসা নিয়ে কাড়াকাড়ি থেকেই তা বোঝা যায়। স্থলপথের চেয়ে বাংলাদেশে নৌ-বাণিজ্যই প্রধান ও প্রশস্ততর ছিল। সেই কারণেই বাংলার প্রাচীন লিপি ও সাহিত্যে নৌকোর ঘাট এবং নদ-নদী-নৌকোর স্মৃতি এত প্রবল। সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান বন্দর ছিল গঙ্গাবন্দর ও তাম্রলিপ্তি। চতুর্থ শতকে সিংহলের সঙ্গে তাম্রলিপ্তির বাণিজ্যপথের আভাস পাওয়া যায়। তারও তিন-চারশো বছর আগে ভারতের দক্ষিণ-সমুদ্রতীর ধরে গঙ্গাবন্দর ও তাম্রলিপ্তির সঙ্গে সুদূর রোম সাম্রাজ্যেরও বাণিজ্য-সম্বন্ধের আভাস পাওয়া যায়।’

সাহিত্যিক শংকর তাঁর ‘বিজনেসে বাঙালি’ প্রবন্ধে বাঙালি ব্যবসায়ীদের রমরমা অবস্থা সম্পর্কে বলছেন- রাজা বল্লাল সেনের সময় বল্লভানন্দ আঢ্য নামে এক বনিকের সংগ্রহে ছিল ১৮ কোটি স্বর্ণমুদ্রা। অষ্টাদশ শতাব্দীর নিমাইচরণ মল্লিকের কলকাতায় অন্তত ৯৬ খানা বাড়ি ছিল। বড়বাজারে তার প্রাসাদ সদৃশ বাড়ির একধার থেকে আরেকধারে যেতে পালকি ব্যবহার করত বাড়ির মেয়েরা, এতটাই বড় ছিল সেই বাড়ি। শোভারাম বসাকের বাড়ি ছিল ৩৭ টা। ব্যাংকিং শিল্পে বাঙালির বিপুল অবদানের কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন ছেঁড়াকাঁথা থেকে ঐশ্বর্যলক্ষীর বরপুত্র হওয়া রামদুলাল দে-র কথা। যার জীবনকাহিনীর সাথে মিল পাওয়া যায় রিলায়েন্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ধীরুভাই আম্বানির। একই সাথে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বৈষ্ণবদাস শেঠ, লক্ষ্মীকান্ত ধর, গোবিনচাঁদ ধর, কৃষ্ণদাস মল্লিক প্রমুখের কথা। জানিয়েছেন এদেশে ইনসিওরেন্স ব্যবসার সূত্রপাত করেন হীরালাল শীল। কানাকড়ি হীন অবস্থা থেকে একজীবনেই অসম্ভব বিত্তের অধিকারী হয়েছিলেন মতিলাল শীল। সম্পত্তির বহর দেখলে মনে হবে আধখানা কলকাতাটাই মতিলাল শীলের।

এই ইতিহাসের খতিয়ান অনেক লম্বা। যারা এই নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী, তারা আমাদের জানাবেন বিস্তারিতভাবে আমাদের এই গৌরবময় ইতিহাসের কথা। আমাদের কাজ শুধুমাত্র ইতিহাস চর্চায় সীমাবদ্ধ রাখলেই হবে না। হিন্দু সংহতিকে সনাতনী বঙ্গবাসীর পুনরুত্থানের এই সাধনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s