সোমনাথ মন্দির

সোমনাথ মন্দির

অয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়

বর্তমানে গুজরাটে যে সোমনাথ মন্দিরটি দেখা যায় তা ১৯৫১ সালের ১১ই মে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। সোমনাথ দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম। হাজার বছরের অধিক সময় ধরে মন্দিরটি বারংবার ধ্বংস করা হয় ও বারংবার এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
সিন্ধের আরব গভর্নর আল জুনেইদ ৭২৫ সালে প্রথম সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করেন বলে জানা যায়। এরপর গুর্জর-প্রতিহার রাজা দ্বিতীয় নাগভট্ট ৮১৫ সালে মন্দিরটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। গজনীর মামুদ ১০২৬ সালে সোমনাথ মন্দির আক্রমণ করেন। আল বিরুণির গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, গজনীর সুলতান মামুদ সোমনাথ মন্দিরের শিব লিঙ্গটি ধ্বংস করেন। শিব লিঙ্গটির বেশ কয়েকটি টুকরো করা হয় এবং এর মধ্যে একটি টুকরো গজনীর মসজিদের দরজার সামনে রাখা হয় যেখানে নিজের পা ঘষে ময়লা পরিষ্কার করে তারপর মসজিদে প্রবেশ করা হত। মিনহাজউদ্দিন সিরাজের ‘তবাকৎ- ই- নাসিরী’ থেকে জানা যায় সুলতান মামুদ ‘‘সোমনাথের মূর্তিটিকে চার টুকরো করেন, একটি গজনীর মসজিদের প্রবেশপথে পোঁতা হয়, আরেকটি সুলতানের প্রাসাদের প্রবেশদ্বারে রাখা হয় এবং তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ডটি মক্কা ও মদিনায় পাঠানো হয়।’’ এই ঘটনাটির বিবরণ ইবন আসির-এর ‘কামিলৎ-উৎ-তারিখ’ বা ‘তারিখ-ই-কামিল’, খন্দমীরের ‘হাবিব-উস-সিয়ার’, মুল্লা আহমেদ ও আসাফ খানের ‘তারিখ-ই-আলফি’, খাজা নিজামুদ্দিন আকবরের ‘তবাকৎ-ই- আকবরি’সহ অসংখ্য মধ্যযুগের বইয়ে পাওয়া যায়। মন্দিরটি রক্ষা করতে গিয়ে প্রায় ৫০,০০০ মানুষ প্রাণ হারান-এই তথ্যটিও পাওয়া যায়।

আমির খসরু-র ‘খাজাইন-উল-ফুতুহ’ থেকে জানা যায় ১২৯৯-এর ২৩-এ ফেব্রুয়ারি সুলতান আলাউদিন খলজি গুজরাট আক্রমণের হুকুম দেন যাতে সোমনাথ মন্দিরটি ভাঙ্গা যেতে পারে। উলুঘ খানকে এই অভিযানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বহু মানুষকে হত্যা করার পর সোমনাথ পৌঁছে বহু মূর্তি ভাঙ্গা হয় এবং সবথেকে বড় মূর্তিটি সুলতানের দরবারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আলাউদ্দিন খলজি কর্তৃক সোমনাথ মন্দির ভাঙ্গার ঘটনাটি ওয়াসাফ-এর ‘তারিখ-ই-ওয়াসফ’ থেকেও জানা যায়- সোমনাথ মন্দিরের শিব লিঙ্গর টুকরো দিয়ে দিল্লির জামি মসজিদের প্রবেশ পথটি তৈরি করা হয়। এই বিবরণ ইয়াহিয়া বিন আহমেদ সিরহিন্দি-র ‘তারিখ-ই- মুবারক শাহী’ গ্রন্থেও পাওয়া যায়।
সিকন্দরের ‘মিরাৎ-ই- সিকান্দরি’ থেকে উদ্ধৃত করে ইতিহাসবিদ রিজভি (S.A.A. Rizvi) তাঁর ‘উত্তর তৈমুর কালীন ভারত’ গ্রন্থে দেখাচ্ছেন যে, গুজরাটের সুলতান প্রথম মুজ্জাফর শাহ ‘‘৭৯৯ হিজরি (১৩৯৪-৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) তে জুনাগড় অভিযান করেন, যা ছিল রায় ভারার রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত এবং সেখানে তিনি কাফেরদের হত্যা করেন। সেখান থেকে তিনি সোমনাথের দিকে অগ্রসর হন এবং সেখানের বিখ্যাত মন্দিরটি ধ্বংস করেন।”

১৬৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ঔরঙ্গজেব সোমনাথ মন্দিরটি পুনরায় ধ্বংস করেন। শেষপর্যন্ত ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেলের উদ্যোগে মন্দিরটি নির্মাণের কাজ পুনরায় শুরু হয়। এখানে থাকা একটি মসজিদকে একটু দূরে স্থানান্তরিত করা হয়। অবশ্য দুঃখের বিষয় প্যাটেল মন্দিরটির নির্মাণকার্য সম্পূর্ণ হতে দেখে যেতে পারেন নি। অবশেষে ১৯৫১ সালের মে মাসে ভারতের তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ সোমনাথ মন্দিরের উদ্বোধন করেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s