শক্ত হাতে শক্তি পূজা

স্মৃতিলেখা চক্রবর্তী 

bengali Hinduদুর্গাপুজো এলেই বাঙালিদের মধ্যে বেশ একটা শিল্পী-শিল্পী ভাব জাগে। ছবি তোলা, রবীন্দ্রসংগীতের মহড়া আর আবৃত্তি-নাচ-নাটকের প্রস্তুতি দেখলে এটাকে শক্তিপূজা কম, সংস্কৃতি-পূজা বেশি মনে হয়। বাঙালিদের মধ্যে যত বেশি সংস্কৃতি চর্চা হয়, তত বেশি ফুটে ওঠে ধর্মনিরপেক্ষতার উদগ্র ইচ্ছা। কেউ পুজো উপলক্ষ্যে তিতুমীর নাটক মঞ্চস্থ করছেন তো কেউ তুলে আনছেন অত্যাচারী “নবাব সিরাজের করুণ কাহিনী”! কেউ আবার অনুষ্ঠানের গান বাছার সময় খুঁজে বেড়াচ্ছেন হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান শব্দযুক্ত বাংলা বা হিন্দি গান। একটা ধর্মীয় পূজাকে যে ঠিক কি কারণে “ধর্মনিরপেক্ষ” হতে হবে, তার উত্তর বোধয় বাঙালিরাও জানেন না। সার্বজনীন পুজো হিসাবে যার প্রকাশ এবং বিকাশ; সেই পুজো এখন নিজের পরিবারের সাথে ঘোরা এবং খাওয়া ছাড়া বাঙালির জীবনে তেমন কোন ভূমিকা রাখে না। শক্তির আরাধনায় রবীন্দ্র-সঙ্গীত, বলিউডি নাচ কিংবা শ্রুতি-নাটকের ভূমিকা যে ঠিক কি, এসব প্রশ্ন তুলতে বাঙালি সমাজ সম্পুর্ন ভুলে গেছে।

অথচ কয়েক দশক আগেও দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে বাঙালি চর্চা করত তার সামরিক সংস্কৃতির। মাতৃমূর্তির সামনে বসত লাঠিখেলার আসর, কাটারীর লড়াই, হত কুস্তি প্রতিযোগিতা। হাজার হাজার উৎসাহী দর্শকের সামনে জমজমাট শক্তির প্রদর্শনী। পূর্ববঙ্গে পুজো উপলক্ষে হত নৌকার বাইচ-দৌড়, সাঁতার-ডুব সাঁতারের প্রতিযোগিতা। সাধারণ মানুষের টানটান উত্তেজনা থাকত এসব লড়াইকে কেন্দ্র করে। জেতা-হারা নিয়ে চলত তুমুল রেষারেষি। অষ্টমীর পূজায় বাড়ির যাবতীয় অস্ত্র পেশ করা হত অর্চনার অঙ্গ হিসেবে। স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী বলি হত জোড়া মোষ কিংবা জোড়া পাঁঠা। এমন কি, জোড়া শূকর বলিরও প্রচলন ছিল বহু পূজায়। ভাসান যাত্রায় থাকত ত্রিশূল নাচ, খড়্গ মিছিল ইত্যাদি। মোটকথা, বিনোদনের উপাদান হিসেবে সামরিক সংস্কৃতি কোনোভাবেই উপেক্ষার পাত্র ছিল না বাংলায়।

কিন্তু বাঙালি যত বেশি করে সুশীল থেকে সুশীলতর হয়েছে, তত বেশি করে উধাও হয়েছে তার শৌর্য্যের একেকটি অঙ্গ। কুসংস্কারের নাম করে বিদায় নিয়েছে বলি, নৃশংসতার নামে উধাও হয়েছে অস্ত্র-চর্চা, গ্রাম্য সংস্কৃতির নামে উঠে গেছে বাইচ-লাঠিখেলা। যবে থেকে দুর্গাপূজায় সামরিক সংস্কৃতির এসব প্রদর্শন বিদায় নিয়েছে, “শক্তির আরাধনা” একটা হাসির খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভক্তের হাতের অস্ত্র সুশীলতার নামে কেড়ে নেবার পর, এখন চলছে অতি-সুশীলতার নামে খোদ মা দুর্গার হাত থেকে অস্ত্রশস্ত্র তুলে ফেলার পালা। শাক্ত এবং বৈষ্ণবের কোন পার্থক্যই আর এরা রাখতে দেবে না।

যেমন করে দুর্গা পূজা আজকে দুর্গোৎসবে পরিণত হয়েছে, ভক্তি-শ্রদ্ধা মুছে গিয়ে পুজো মণ্ডপগুলো কেবল আমোদ-বিলাসের আখড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার্বজনীন পূজা মানে ভিড়ের কয়েকজন হয়ে এ পাড়া ও পাড়া ঘুরে বেড়ানো নয়। বরং সব ঝগড়া-দ্বন্দ মিটিয়ে ফেলে সকলে হাতে হাত লাগিয়ে পুজোটাকে সার্থক করে তোলা। সমস্ত এলাকাবাসীকে যদি একটা পুজো একত্রিত না করতে পারে, তাহলে সেটা সর্বজনের পূজা কিভাবে হবে? ক্যাটারার দিয়ে ভোগ রান্না, কুলি ভাড়া করে মাতৃ প্রতিমা ওঠা-নামা করিয়ে পূজা সারা-ই যায়, তবে তাতে প্রাণের যোগ-টা থাকে না। শুধু আনন্দের ভারটুকু নিলাম আর দায়িত্বের বোঝাগুলো পয়সা ফেলে পার করে দিলাম, এতে সম্পর্কের চেয়ে দূরত্ব বাড়ে। অথচ বাঙালির পূজাতেই এমন এক চিরন্তন বন্ধন সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে, যেখানে মা আসবেন তার ছেলেদের কাঁধে চেপে। এটা শুধু মায়ের সাথে তার সন্তানদের মধুর সম্পর্ক নয়, একটা শক্তি পরীক্ষার ময়দানও। কারণ, একমাত্র বলিষ্ঠ সবল কাঁধই দিতে পারে মাতৃ প্রতিমাকে সেই নিরাপত্তা। বইতে পারে বিপুল ওজনের মৃন্ময়ী মূর্তির ভার।

দুর্গা পুজো কেবল বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব নয়, মা দুর্গা হলেন বাংলার সর্বকালের সেরা পরিবার। উত্তর ভারতে হর-পার্বতীর সন্তান কেবল গণেশ হলেও আমাদের বাঙালির মা দুর্গা লিঙ্গসাম্যের মূর্ত প্রতীক। দুটি পুত্র সন্তান ছাড়াও তাঁর রয়েছে দুটি কন্যাসন্তান। চার চারটি সন্তান নিয়ে ভরপুর এই দৈব পরিবার “এক সন্তান নীতি” নিয়ে সংকটে পড়া বাঙালির জন্য আদর্শ হওয়া উচিত। এই পরিবার বাঙালির সমস্ত জাতীয় ইচ্ছা এবং সামাজিক ভাবনার মিলিত প্রতীক। বাঙালি সমাজে যদি সত্যিকারের হিন্দুত্ব জাগরণ ঘটাতে হয়, তবে সেটা দুর্গাপূজা দিয়েই শুরু করতে হবে। নাচ-গান-কবিতা-নাটক সরস্বতী পূজার জন্য তোলা থাকলেও চলবে। দুর্গা পূজা-কালী পূজায় ফেরত আসুক শক্তি চর্চা। বাংলার ঘরে ঘরে ফিরে আসুক সামরিক সংস্কৃতি। বাঙালি তাঁর শক্তিভূতা মায়ের যোগ্য সন্তান হয়ে উঠুক। “শক্ত হাতে শক্তি পূজা” দিয়েই শুরু হোক আমাদের দ্বিতীয় নবজাগরণ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s