হালাল কি এবং কেন এটি বর্জন করা প্রয়োজন

halalঅনেকের ধারণা একমাত্র জবাই করে কাটা পশুর মাংসই হলো হালাল। বাস্তবে হালাল শব্দের অর্থ ‘ইসলাম অনুযায়ী বৈধ’ অথবা ‘শরিয়া আইন দ্বারা অনুমোদিত’। ইসলামের অনুশাসন অনুযায়ী জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রেই হালাল(বৈধ) এবং হারাম(অবৈধ) এর বিধান নিশ্চিত করে বলা আছে। মুসলমানদের জন্য সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত সব কার্যকলাপ ফরজ(কর্তব্য), মুস্তাহাব(প্রস্তাবিত), হালাল(বৈধ), হারাম(অবৈধ) এবং মক্রুহ্(বৈধ নয়, আবার একেবারে নিষিদ্ধও নয়)- এভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা আছে।

খাদ্যের মধ্যে মূলতঃ শুকর, জবাই না করে কাটা পশুপাখী, আল্লাহ্-র নাম না নিয়ে জবাই করা পশুপাখী, রক্ত, নেশার বস্তু(মদ সহ), মৃত পশুপাখীর মাংস(তবে মৃত মাছ বাদে) – এগুলো হারাম। তবে কোরানে একথাও বলা আছে যে যখন হারাম খাবার না খেলে বেঁচে থাকা যাবে না, তখন জীবন রক্ষার্থে হারাম খাবারও হালাল হিসেবে খাওয়া যেতে পারে। এছাড়াও নামাজ পড়া, অজু করা, স্ত্রী সঙ্গম, লুটের মাল গ্রহণ থেকে শুরু করে মল-মূত্র ত্যাগেও হালাল-হারামের ব্যাপার স্যাপার আছে।

বিশ্বব্যাপী বিশাল মুসলিম জনসংখ্যা একটা লোভনীয় বাজার। এই বাজারকে কাজে লাগিয়ে ইসলামী উম্মা-র শক্তিবৃদ্ধি করা, বিশেষতঃ অমুসলমানদের কাছ থেকেও এই কাজে শক্তি সংগ্রহ করার কৌশলের নাম হলো হালাল সার্টিফিকেশন। পৃথিবীতে অনেকগুলো সংস্থা তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন প্রোডাক্ট, ব্র্যান্ড, রেস্টুরেন্টকে হালাল সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য। এই সার্টিফিকেটের বিনিময়ে মোটা টাকা বিভিন্ন কোম্পানীর কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। বিশ্বব্যাপী মুসলিম জনবাজারে নিজেদের মাল বিক্রীর লোভে বড় থেকে ছোট অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এই হালাল সার্টিফিকেট কেনে মোটা টাকার বিনিময়ে। ভারতে হালাল সার্টিফিকেশনের বড় সংস্থাগুলি হলো গ্লোবাল ইসলামিক শরিয়া সার্ভিসেস্ (GISS), হালাল ফুড অথরিটি (HFA), জমিয়ত উলেমা–এ–হিন্দ হালাল ট্রাস্ট প্রভৃতি। আমরা অনেকেই কেএফসি, জোম্যাটো প্রভৃতি ব্র্যান্ডের খাবার খেয়ে থাকি, যে ব্র্যান্ডগুলো হালাল সার্টিফায়েড। এছাড়াও ভারতের ছোট-বড় অধিকাংশ হোটেল-রেস্টুরেন্টেই হালাল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি বড় বড় হরফে লেখা থাকতে দেখা যায়। এখন পাড়ায় পাড়ায় মাংসের দোকানগুলোতেও হালাল ছাড়া পাওয়া যায় না। যদিও আগেই বলেছি হালাল সার্টিফিকেশন শুধুমাত্র খাদ্যাখাদ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ওষুধপত্র, এফএমসিজি প্রোডাক্টও এর আওতায় পড়ে।

ষ্টেট অফ গ্লোবাল ইসলামিক ইকোনমী নামক সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী  বিশ্বব্যাপী হালাল সার্টিফায়েড  সামগ্রীর বাৎসরিক বাজার মূল্য ২.১ লক্ষ কোটি ডলারেরও বেশী। এই বিপুল টাকার একটা অংশ নিয়মিতভাবে কট্টর ইসলামিক সংস্থাগুলোর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, যারা হালাল সার্টিফিকেট দেওয়ার অধিকারী। এখন এই টাকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ধর্মান্তরণের কাজে, শরিয়া আইন প্রচারের কাজে ব্যবহার হচ্ছে না কিংবা জাহাদী সন্ত্রাসবাদীদের হাতে অথবা ভারতের শত্রুদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে না তা নিশ্চিত করে কে বলতে পারে?

এবার একটু মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখা যাক এই হালাল এবং আমাদের ঝটকা মাংসের বিষয়টাকে।  হালালের সময়, একটি ধারালো ছুরিকে প্রাণীটির গলায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। তারপর ছুরিটিকে না তুলে বারবার গলায় চালানো হয় যাতে শ্বাসনালী, খাদ্যনালী, মস্তকে রক্তসংবহনকারী স্কন্ধদেশের ধমনী (carotid arteries), স্কন্দদেশের শিরা (jugular vein) এবং ভেগাস স্নায়ু খণ্ডিত হয়। এতে শরীর থেকে রক্ত নির্গত হতে থাকে এবং প্রাণীটি পরিণামে প্রাণ হারায়। এই পদ্ধতিকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বলে ventral neck incision (VNI)। এতে মেরুদণ্ডের স্নায়ুতন্ত্র প্রাণীটির মৃত্যু হওয়া পর্যন্ত অক্ষত থাকে। অপরপক্ষে আমাদের ঝটকা পদ্ধতিতে হত্যার সময়, ঘাড়ের পিছনের দিকে (dorsal neck) কাটা হয় যাতে মাথার খুলিকে মেরুদণ্ডের সুষুম্নাকাণ্ড (spinal cord) থেকে নিমেষে আলাদা করা হয়। কেবল ঘাড়ের কর্তন (cervical dislocation)-ই নয়, বরং এক আঘাতে মস্তকের শরীর থেকে বিচ্ছন্ন করাই এর উদ্দেশ্য। তাই এই পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয় অপেক্ষাকৃত ভারী এবং ধারালো অস্ত্র। সাধারণভাবে আমাদের শরীরের, আরও সঠিকভাবে বললে সোমাটিক কোষগুলো থেকে কোন অনুভূতি কিছু বিশেষ প্রোটিন (বৈজ্ঞানিক পরিভাষায়, cognate receptor proteins) লাভ করে যারা সেই অনুভূতিকে স্নায়ুর মাধ্যমে প্রেরণ করে। স্নায়ু আসলে কিছু নিউরোণ কোষের সমষ্টি মাত্র। স্নায়ু অনুভূতিকে মেরুদণ্ডের সুষুম্নাকাণ্ডের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রেরণ করে। মস্তিষ্ক এই অনুভূতির প্রতিক্রিয়া সেই সুষুম্নাকাণ্ডের নিউরোণের মাধ্যমেই পাঠায় মাংসপেশীগুলিতে (effector muscles)। মাংসপেশীগুলি মস্তিষ্ক প্রেরিত বার্তাকে ক্রিয়াতে রূপ দেয়। হালালের সময় এই তীব্র যন্ত্রণার অনুভুতি পাঠানোর স্নায়ু বিচ্ছিন্ন হয় না। ফলে পশুটি সেই যন্ত্রণা সম্পূর্ণ সচেতনভাবে অনুভব করতে থাকে। পক্ষান্তরে ঝটকার সময় এই পথটিকে নিমেষের মধ্যে ছিন্ন করা হয়। ফলে ঝটকার সময় বলিপ্রদত্ত প্রাণীটির ব্যথার অনুভূতি সেই মুহূর্তেই হারিয়ে যায়। ব্যথা পরিমাপের এক স্বীকৃত পদ্ধতি হল ইইজি বা ইলেক্ট্রো এনসেফ্যালোগ্রাম। এই যন্ত্রটি মস্তিষ্কের নিউরোণের বৈদ্যুতিক বার্তাকে পরিমাপ করে। গরু বা ভেড়ার মত শান্ত প্রাণীরা তাদের যন্ত্রণার অনুভূতিকে বাইরে সবসময় প্রকাশ করে না। কিন্তু ইইজি পদ্ধতিতে তাদের ব্যথা স্পষ্টতই প্রকাশ পায়। বৈজ্ঞানিকরা দেখিয়েছেন যে ঝটকা পদ্ধতিতে প্রাণীবধ করলে শিরচ্ছেদের ৫ সেকেণ্ডের মধ্যেই মস্তিষ্কের (cerebral cortex) কার্য বন্ধ হয়। কিন্তু হালালের ক্ষেত্রে প্রাণীটি অনেক সময়ে তার শরীর থেকে চামড়া ছাডিয়ে নেওয়া পর্যন্ত, এমনকি তার শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শরীর থেকে আলাদা করা পর্যন্ত সচেতন অবস্থায় সেই তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করতে থাকে। এবার আপনারাই ভাবুন কোন পদ্ধতিটা তুলনামূলক মানবিক!

এবার দেখা যাক আমাদের স্বাস্থ্যের উপরে হালাল এবং ঝটকা মাংসের প্রতিক্রিয়া কি। বিভিন্ন গবেষকরা বারবার প্রমাণ করেছেন যে হালাল পদ্ধতিতে প্রাণীবধের সময় প্রাণীগুলি ভীষণ বেদনা বা স্নায়ুমণ্ডলীর ধকল (stress) অনুভব করে। গরু-ষাঁড়, ছাগল ইত্যাদি প্রাণীর ক্ষেত্রে এর ফলে তিনটি ষ্ট্রেস হরমোন (stress hormones), যথা কর্টিসোল (cortisol), নর-এড্রিনালিন (nor-adrenaline) এবং ডোপামাইন (dopamine) ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। কারণটি খুবই সরল,  এই তিনটি হরমোন সমেত আমাদের বেশির ভাগ হরমোনের নিঃসরণই মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অঞ্চলের  দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আমেরিকান বৈজ্ঞানিক টেম্পল গ্র্যাণ্ডিন দেখিয়েছেন  যে প্রাণীদের সংজ্ঞাহীন করে (stunning) হত্যা না করলে রক্তে কর্টিসোলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং তাতে মাংসপেশীর তাপমাত্রাও বাড়ে। সাধারণত স্নায়বিক ধকলের কারণে এড্রিনালিন হরমোনের পরিমিত ক্ষরণে মাংসপেশীর গ্লাইকোজেন ল্যাকটিক অ্যাসিডে পরিণত হয়। ফলে মাংসের পিএইচ কমে (অর্থাৎ  মাংস অ্যাসিডিক হয়)। তার ফলে মাংস যে কেবল গোলাপী এবং নরম থাকে তাই নয়, উপরন্তু মাংসে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি পায় না। অপরপক্ষে প্রাণীটিকে যন্ত্রণাদায়ক পদ্ধতিতে হত্যা করলে স্নায়ুর ধকল বাড়ে। ফলে এড্রিনালিন হরমোনের অতিরিক্ত ক্ষরণে মাংসপেশীর গ্লাইকোজেন খুব তাড়াতাড়ি নিঃশেষিত হয়। ফলে মাংস যথন রান্না করা হয় ততক্ষণে তাতে আর ল্যাকটিক অ্যাসিড অবশিষ্ট থাকে না। ফলে মাংসের পিএইচ বাড়ে এবং ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়। অর্থাৎ, হালাল মাংস স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে।

সব থেকে বড় কথা, এই হালাল হলো মুসলমানদের জন্য শরিয়া অনুমোদিত ব্যবস্থা। এই শরিয়া ব্যবস্থা আমাদের মত অমুসলমানদের জন্য নয়। তাহলে আমরা আংশিক হলেও এই রিগ্রেসিভ, অবৈজ্ঞানিক এবং অমানবিক ইসলামিক শরিয়া আইন নিজেদের উপরে চাপিয়ে নিচ্ছি কেন? আমরা কি এতটাই অসহায় এবং অযোগ্য যে ইসলামের এই সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের সামনে আজ আমাদের নতজানু হয়ে আত্মসমর্পণ করতে হবে? আমাদেরও তো একশ কোটির বাজার আছে! প্রয়োজনে আমরাও কি বিকল্প একটা সনাতনী স্টান্ডার্ডের কথা ভাবতে পারি না?

যাইহোক, সব দিক থেকে বিচার করলে এই হালাল ব্যবস্থা অত্যন্ত অবৈজ্ঞানিক, অমানবিক, ইসলামের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের নামান্তর। সর্বোপরি আমাদের এই পদ্ধতির মাধ্যমে আংশিকভাবে ইসলামিক শরিয়া আইন পালনে বাধ্য করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত অপমানজনক। তাই আসুন আমরা আপাতত সংকল্প করি আর হালাল নয়, আর অবৈজ্ঞানিক এবং অমানবিক রিগ্রেসিভ ভাবধারার দাসত্ব নয়। আসুন আজ থেকেই সবাই হালাল বর্জন করি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s