লাভ জিহাদ নিয়ে হিন্দুদের ভণ্ডামি

Love-Jihad (1)লাভ জিহাদ” নিয়ে চটকদার প্রচারে হিন্দুরা যতটা উৎসাহী, ততটা এর প্রতিকারে আগ্রহী নয়। হিন্দুরা অন্তর থেকে বিশ্বাস করে, এসবের প্রতিকার সম্ভবপর নয়। অন্ততঃ হিন্দুর দ্বারা এর সমাধান যে অসম্ভব, সেটা বিশ্বাসযোগ্য করতে, হিন্দুরা অবিশ্বাস্য সব তত্ত্ব খাড়া করেন। কেউ বলেন- “আরে, ওদের তো এসব কাজের জন্য ট্রেনিং দেওয়া হয়।” কেউ আবার মনে করেন-“এগুলোর জন্য তো ওরা মাসে মাসে টাকা পায়।” আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়ে কেউ কেউ বলেন- “ওরা তো পীরের কাছে নিয়ে গিয়ে জলপড়া খাইয়ে দেয়। অমনি হিন্দুরা ওদের প্রেমের বশ হয়ে যায়।” সম্প্রসারণটা যে সুস্থ স্বাভাবিক কোন জাতির সম্পূর্ন প্রাকৃতিক চিন্তা হতে পারে, এই ভাবনাটাই হিন্দুদের মাথা থেকে পুরোপুরি লোপ পেয়েছে। প্রকৃতি পূজা করতে করতে যে কেউ এতদূর অপ্রাকৃতিক হয়ে উঠতে পারে, সেটা হিন্দুদের দেখলে বোঝা যায়।

হিন্দুরা মনে করে, তারা নিজের ধর্মকে নিজের কোলে গুটলি পাকিয়ে লুকিয়ে রাখে বলে, সবাইকেই তাই করতে হবে। হিন্দু আর মুসলমানে বিয়ে হলে হিন্দু পুরুষ যথেষ্ট উদারতা দেখিয়ে বলে- “আমি হিন্দু, বউ মুসলমান, তাই আমাদের সন্তান হিদুলমান”! এতে কাগজে কাগজে হাততালি, টিভিতে রেডিওয় পিঠ চাপরানি অনেক কিছুই জোটে। সেজন্য হিন্দুরা আশা করে এর প্রতিদানে আমির খানও নিজের হিন্দু স্ত্রীর সন্তানদের হিঁদুলমান কিংবা মুন্দু বানিয়ে বড় করবেন। কিন্তু মুশকিল হল হিন্দুর কল্পিত পাপবোধ কিংবা পিঠ চাপরানির লোভ ওনাদের মধ্যে একেবারেই নেই। তাই এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আমির খান যখন গর্বভরে ঘোষণা করেন, মায়ের ধর্ম যাই হোক, পিতার ধর্মই সন্তানের ধর্ম হবে- অবাক বিস্ময়ে হিন্দুদের মুখের ভিতর এত বড় বড় হাঁ হয়ে যায়। সন্তানের পরিচয়ের উপর পিতার যে একটা স্বাভাবিক অধিকার বোধ থাকে, এটা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে মেরুদন্ড বিকিয়ে দেওয়া হিন্দুদের মনে থাকার কথা নয়। তাই এসব ঘটনা দেখে শুনে, এগুলোকে “লাভ জেহাদ” নাম দিয়ে, হায় হায় করে বেড়ানো ছাড়া হিন্দুদের আর কিছুই করণীয় নেই।

হিন্দুরা সবেতেই গভীর চক্রান্ত খুঁজে পায় এবং সমাধানের বদলে সমস্যা গুলোকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আরো বড় করে দেখিয়ে আনন্দ পায়। কারণ সমস্যা যত বড় হবে, তার সমাধান তত বেশি করে হিন্দুর হাতের বাইরে হবে। সমাধান হিন্দুর হাতের যত বেশি বাইরে থাকবে, ততই হিন্দুর পক্ষে অকর্মা হয়ে বসে অদৃষ্ট ভরসায় থাকা সহজ হবে। যার সমাধান হিন্দুর হাতে নেই, তার জন্য ঈশ্বরের উপর ভরসা করা ছাড়া তো আর কোন উপায় নেই। হিন্দুও ঠিক ঐটাই চায়। এইসব বিষয়ে বাঙালি হিন্দু বা অবাঙালি হিন্দুর মধ্যে তিলমাত্র ফারাক নেই। তাই নিজের সমস্যা নিজে সমাধানের বদলে হিন্দুরা একেকটি করে অবতার পাকড়ায়। কখনো সেই অবতারের নাম মোদি, কখনো যোগী আদিত্যনাথ, কখনো আবার বিজেপি। অবতার আসে, অবতার যায়; হিন্দুর অবস্থা পাল্টায় না। এক অবতারের পতন হলে হিন্দু নতুন অবতার খুঁজে নেয়। মনে স্থির বিশ্বাস, আগের অবতার না পারলেও, নতুন অবতার এলেই সব দুঃখ ধুয়ে মুছে যাবে। অবশ্য বিশ্বাস না রেখে উপায় আছে? শক্তিহীন, দুর্বল, অকর্মাকে তো অবতারের ভরসাতেই পথ চলতে হবে।

শুধু লাভ জেহাদ বলে নয়, সংখ্যা যুদ্ধের কোন অংশেই হিন্দুর অবতার নির্ভরশীলতা কমে না। সন্তান উৎপাদনের ক্ষেত্রেও হিন্দুরা এক ডজন গোলে পিছিয়ে। সমতা ফেরাতে হিন্দুদের ভরসা নিজের জৈবিক ক্ষমতায় নয়; বরং “জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিধি” নামের একটি কাল্পনিক আইনে। অবতার এখানে আইন রূপে আবির্ভুতা। এই আইন বলে দুটির বেশি সন্তান নেওয়া নিষিদ্ধ হলেই, হাসতে হাসতে হিন্দু বজায় রাখতে পারবে নিজের সংখ্যাগুরুর খেতাব। আইন দিয়ে অন্যদের জনবৃদ্ধিতে লাগাম টানার চিন্তায় হিন্দুরা এতই মশগুল, যে ভেবেও দেখে না যে ভারতের সমস্ত আইনের মত এই আইনেও জব্দ হবে হিন্দু নিজেই। অন্যদের জনবৃদ্ধি বন্ধ হবার প্রশ্নই নেই, উল্টে শাস্তির ভয়ে যে গুটিকয় হিন্দু দুটির বেশি সন্তান নিচ্ছিলেন, তারাও ক্ষান্ত দেবেন। এই আইন নিজের পায়ে কুড়াল মারার অব্যর্থ অস্ত্র। আসলে নিজে ভাল খেলে জেতায় হিন্দুদের আস্থা নেই। হিন্দুরা চায় অন্যেরা খারাপ খেলে হারুক। এখন হিন্দুকে জেতানোর দায় যেহেতু অহিন্দুদের নেই, তাই হিন্দুদেরও আর অন্যকে হারানো হয়ে ওঠে না। হিন্দু যতবার নিজের শক্তির উপর ভরসা না করে চতুর্দিকে অবতার খুঁজে বেড়াবে, ততবার এই অন্ধ বিশ্বাস হিন্দুকেই রক্তাক্ত করবে।

হিন্দুদের মুশকিল হল, তারা যেটাকে মুসলমানের দোষ বলে মনে করে, সেটা মোটেই দোষ নয়, গুন। আর হিন্দুরা যেটাকে নিজেদের গুন বলে মনে করে নিজেরাই নিজেদের পিঠ চাপড়ে বেড়ায়, সেটা কোন গুন নয়, মারাত্মক দোষ। আপনি সম্প্রসারণে অনিচ্ছুক হলে, তার দায় মুসলমানের? বিধর্মী বিয়ে করে সন্তানকে উভধর্মী নামক হাঁসজারু বানিয়ে হিন্দুসংখ্যা কমাব আমরা, আর দোষ হবে মুসলমানের? স্বধর্মের প্রচার ও প্রসারে আপনার অনীহা থাকলে, তার দোষ মুসলমানের? নিজের দোষ না দেখে সর্বত্র অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানো চূড়ান্ত অক্ষমের লক্ষ্মণ। কারণ দোষটা নিজের হলে আপনি সেটা শুধরে নিতে পারেন। দোষটা যদি অন্যের হয়, তবে সেটা শুধরে দেওয়া আপনার কর্ম নয়। নিজেদের সমস্যা সমাধানের উপায় নিজেদেরই খুঁজতে হবে। কোন অবতার এসে আকাশবাণী ছড়িয়ে হিন্দুকে বাঁচিয়ে দিয়ে যাবে না। বাঁচতে হলে, রাজত্ব করতে হলে, তার জন্য হাসিমুখে অনেক ত্যাগ স্বীকারও করতে হবে। নয়তো একদিন ভারতের শেষ হিন্দু অঞ্চলের শেষতম হিন্দুটির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে, গলা নামিয়ে চুপিসারে বলতে হবে- “দেখেছেন, দেশটাকে কিরকম মিনি পাকিস্তান বানিয়ে ফেলেছে”?

লেখা- স্মৃতিলেখা চক্রবর্তী

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s