রানী ভবশঙ্করী- বিস্মৃত বাঙালি বীর কন্যা

অমিত মালী

পাঠান সেনাপতি ওসমান খানের নেতৃত্বে পাঠান সেনাবাহিনী এবং বিশ্বাসঘাতক চতুর্ভুজ চক্রবর্তীর সঙ্গে থাকা সেনাবাহিনী একসঙ্গে বাশুড়িতে আক্রমণ করেন। কিন্তু রানী ভবশঙ্করীর সেনাবাহিনী পূর্বেই প্রস্তুত ছিল ।ফলে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় দুই বাহিনীর মধ্যে। রানী ভবশঙ্করী নিজেই এই যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। রানী ভবশঙ্করীর সৈন্যরা যাদেরকে তিনি নিজে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন, ক্ষিপ্রতার সাথে পাঠান সৈন্যদেরকে কচুকাটা করেন। সমসাময়িক পাওয়া সূত্র অনুযায়ী, রানী ভবশঙ্করী নিজে হাতির পিঠে চেপে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। এই যুদ্ধে বাগদি ও চন্ডাল সেনারা অসীম বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। কয়েক ঘন্টার যুদ্ধে পাঠান সেনাবাহিনী পরাজিত হয় এবং পাঠান সেনাপতি ওসমান খান পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন। পরে তিনি ফকিরের ছদ্মবেশে উড়িষ্যা পালিয়ে যান। এই যুদ্ধের পরে রানী ভবশঙ্করীর রাজ্যাভিষেক সম্পন্ন হয়।

রানী ভবশঙ্করীর বীরত্বের কথা, পাঠান সেনাদের কচুকাটা করার কথা মুঘল সম্রাট আকবরের কানে পৌঁছায়। এই খবর আকবরের কাছে পৌঁছনোর পর আকবর ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ্যের সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তুলতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এর পিছনেও কারণ ছিল। সেই সময় অবিভক্ত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা- যাকে সুবে বাংলা বলা হতো, তার সুবেদার ছিলেন মান সিংহ। কিন্তু সেই সময়ে অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন অংশে পাঠানদের অত্যাচার ছিল খুব। পাঠানরা মুঘল সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্রে হামলা ও লুটপাট চালাতো। এ নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলেন আকবর- কারণ বাংলা ছিল সোনার ডিম দেওয়া হাঁস। কারণ বাংলা সেসময় ছিল সোনার বাংলা। কিন্তু রানী ভবশঙ্করী অসাধারণ রণকৌশল ও বীরত্বে সেই পাঠান সৈন্যদের পরাজিত করেছিলেন। ফলে আকবর ভুরিশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্যে মান সিংহকে পাঠান। মান সিংহ ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ্যের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেন। সেইসঙ্গে আকবর ভুরিশ্রেষ্ঠ রাজ্যের সার্বভৌমত্ব মেনে নেন। মুঘল সম্রাট আকবর রানী ভবশঙ্করীকে ‘রায়বাঘিনী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এরপর অনেক বছর রানী ভবশঙ্করী রাজ্য শাসন করেন। পরে তাঁর পুত্র প্রতাপনারায়ন প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাঁর হাতে রাজ্যের ভার দেন এবং তিনি কাশীতে চলে যান। আজও হাওড়া জেলার উদনারায়নপুরে রানী ভবশঙ্করী প্রতিষ্ঠিত রায়বাঘিনী মন্দির রয়েছে। আজও গড় ভবানীপুর রয়েছে। শুধু আমরা ভুলে গিয়েছি আমাদের গৌরবময় লড়াইয়ের অতীত কথা। মনে রাখতে হবে অতীত ছাড়া ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে না। (সমাপ্ত )
তথ্যসূত্র- ১. বীরত্বে বাঙালি; অনিল চন্দ্র ঘোষ
               ২. Land and Local Kingship in Eighteenth -Century Bengal ; John R. McLane

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s