দ্যাশের বাড়ি :- অনির্বান দাশগুপ্ত।

hindu refugeeছোট বেলায় দেখতাম ‘দ্যাশের বাড়ি’ র কথা উঠলেই বাবার মুখটা কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠত। পরিষ্কার বুঝতে পারতাম ঐ মূহুর্তে বাবার চোখের সামনে একে একে ভেসে ওঠছে শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত পুকুর ঘাট, কাঁচা মিঠা আম গাছটা, ধবলী নামের সাদা গরুটা, পাট ক্ষেত, শ্যামগ্রাম খাল, শ্যামগ্রাম স্কুল থেকে কৈশোরের নরসিংদী শাঠিপাড়া স্কুল হয়ে যৌবনের কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ। কিন্তু অনেক খুঁটিয়ে লক্ষ্য করেও বাবার মুখে কোনদিন জন্মভূমি বা দেশত্যাগজনিত রাগ, ক্ষোভ বা এমনকি দুঃখের অভিব্যক্তিও ফুটে উঠতে দেখি নি। এটাই আমার কাছে খুব অবাক লাগত। এভাবে সাত পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে একবস্ত্রে সব ফেলে চলে আসতে হল, শিকড় থেকে উপড়ে ছুঁড়ে ফেলা হল, অথচ কোন ক্ষোভ নেই, অভিযোগ নেই। এখন আর বাবাকে সেভাবে ‘দ্যাশের বাড়ি’ র কথা বলতে শুনি না। যে বাবাকে গর্বভরে ‘দ্যাশের বাড়ি’ র কথা বলতে শুনেছি, যে ‘দ্যাশের বাড়ি’ র কথা উঠলে বাবার চোখ চকচক করে উঠত, নস্টালজিক হয়ে উঠত, সেই গর্বের ‘দ্যাশে’ ফেরার স্বপ্ন কেন দেখে না আমাদের বাবারা? কেন তারা ফেলে আসা ভিটেমাটিতে  যাবার ইচ্ছেপোষণ করে না ?আমার বাবা উদাহরণ মাত্র, পুরো জাতি হিসেবেই হিন্দু বাঙালির মনস্তত্ত্বটাই এরকম অদ্ভুত। সবটাই যেন ভবিতব্য, হাসিমুখে মেনে নিতে হবে, আবারো, প্রজন্মের পর প্রজন্ম। যেন জন্মলগ্ন থেকেই হিন্দু বাঙালির কপালে লেবেল সেঁটে দেওয়া হয়েছে ‘উদ্বাস্তু’।
আমরা তো জানি না ছেচল্লিশের’ দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং ‘এবং নোয়াখালী কি, চৌষট্টির খুলনা বা একাত্তরের পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববঙ্গের হিন্দু নিধন যজ্ঞ কি। আমরা তো জানি না কিভাবে বাবার সামনে মেয়েকে, ছেলের সামনে মাকে ধর্ষণ করে যৌনাঙ্গে বেয়নেট দিয়ে, বল্লম বা তলোয়ার দিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়েছে। আমরা তো জানি না কিভাবে ‘গণিমতের মাল ‘হিসেবে অগণিত নারীকে তুলে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করেছে হায়েনার দল। আমাদের জানা নেই কত বাবা তার আদরের মেয়েকে নিজের হাতে খুন করেছে ঐ নোংরা হাতগুলির অত্যাচার থেকে বাঁচাতে। আমরা জানি না কিভাবে ছোট্ট শিশুদের আছাড় মেরে বা বাড়িতে আগুন লাগিয়ে সেই আগুনে ছুঁড়ে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের জানতে দেওয়া হয় নি। না আমাদের পাঠ্য বইয়ের বিকৃত গেলানো ইতিহাস থেকে জানতে পেরেছি, না আমাদের পারিপার্শ্বিক শিখিয়েছে, না আমাদের আগের প্রজন্ম বলেছে। অথচ আমাদের আগের প্রজন্মের প্রত্যেকটা লোক এই একই বা এর চেয়েও বেশি নিদারুণ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জীবন পার করে এসেছেন।
   মাঝে মাঝে মনে হয়, পারিবারিক ভাবে আমাদের জমিজমা , ধন সম্পদ ফেলে আসা ছাড়া আর তো বিশেষ কোন ক্ষতি হয় নি, আমাদের বংশের কারোর সম্মানহানীও হয় নি।  মোটামুটি ভালোই আছি। তার জন্যই কি স্বভাব স্বার্থপর বাঙালি হিসেবে আমাদের এই নির্লিপ্ততা, উদাসীনতা? কিন্তু ওপারে যাদের হত্যা করা হয়েছিল, ধর্ষন করা হয়েছিল বা ওদেশে এখন যাদের অত্যাচার করা হচ্ছে, এই পারে আসার পর যে সম্পন্ন পরিবারগুলি আজ পথের ভিখারীতে পরিনত হয়েছে, যে সম্ভ্রান্ত ভদ্র ঘরের মেয়েদের ঠাঁই হয়েছে যৌন পল্লীতে, তাঁরা বুঝি আমার কেউ না?
পাঞ্জাবীদের কথাই ধরুন…
আমাদের মত এত ধাপে ধাপে না হলেও ওদেরও তো মোটামুটি সেই একই অভিজ্ঞতা। কিন্তু ওদের সামনে আর উদ্বাস্তু হওয়ার হাতছানি নেই। কারন কি জানেন? এদের ছোট থেকেই সেই ইতিহাসের সংগে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, সে যতোই নৃশংস হোক। গুরুদ্বারে গেলে দেখবেন, সেই নৃশংস ইতিহাস চিত্রকলা বা ভাস্কর্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা আছে। আর আমাদের ধর্মীয় স্থান গুলিতে কি শেখানো হয়? সঠিক ইতিহাস আমাদের জানানো হয় নি বলেই শত্রু মিত্র বোধটাই আজও আমাদের গড়ে উঠল না, শত্রু চিনতে ভুল করেছি আমরা বারবার। এতভাবে অত্যাচারিত হবার পরও অত্যাচারীদের আমরা ভাই বলছি। জানি না, তারা যে আড়ালে ছুরিতে শান দিয়েই যাচ্ছে , সুযোগ এলেই আবার বুকে বসিয়ে দেবে, দিচ্ছেও। মানুষ তো ইতিহাস থেকেই শিক্ষা নেয়, আছাড় খেয়েই মাটি চেনে। আমরা সেই শিক্ষা নিই নি বলেই একবার উদ্বাস্তু হয়ে আসার পর আবার উদ্বাস্তু হওয়াই আমাদের ভবিতব্য।
এবার তাকান  ইহুদীদের দিকে…
আঠারশো বছর ধরে জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে শিকড় হীন কচুরিপানার মত বিচ্ছিন্নভাবে জায়গায় জায়গায় ভাসতে ভাসতে শেষ পর্যন্ত কিন্তু মাতৃভূমি পুনরুদ্ধার করতে পারল। কারণ তাদের মধ্যে ছিল সেই জেদ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম সযত্নে সেই স্বপ্নের বীজ রোপণ করে গেছেন পরবর্তী প্রজন্মতে, মর্মে প্রোথিত করে গেছেন সেই বীজ মন্ত্র – ‘ফিরতে হবে, ফিরতে হবে Next year to Jerusalem -পরের  জেরুজালেমে ফিরে যাবো ‘। দুজন ইহুদীর মধ্যে দেখা হলে প্রথম সম্ভাষণই ছিল’ আবার দেখা হবে জেরুজালেমে ‘। এই জেরুজালেম হল ইসরায়েল এর’ শাশ্বত রাজধানী’, অর্থাৎ যতদিন একজন ইহুদীও জীবিত থাকবে, এই পবিত্র ভূমি থাকবে এদের রাজধানী। আর আমরা,পূর্ববঙ্গ থেকে পালিয়ে আসা বাঙালি হিন্দুরা কি চিরকাল শিকড়হীন কচুরিপানা হয়ে ভাসতেই থাকব, শেকড়ে ফেরা হবে না কোনদিন ?
Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s