আলিপুর জেল থেকে পালিয়ে গেলো তিন বাংলাদেশী বন্দি, গাফিলতির জন্যে সাসপেন্ড কারারক্ষীরা

গত ১৪ই জানুয়ারী, রবিবার ভোররাতের অন্ধকারে আলিপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারের উঁচু পাঁচিল টপকে পালিয়ে গেল তিন বন্দি। এদের মধ্যে দু’জন বিচারাধীন, অন্যজন সাজাপ্রাপ্ত। পলাতকরা সকলেই বাংলাদেশের নাগরিক বলে জানা গিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অপহরণ, খুন সহ একাধিক ধারায় অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, মোয়ার মধ্যে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অন্য দুই বন্দিকে অচৈতন্য করে গরাদ কেটে তারা সেলের বাইরে বেরোয়। এরপর পড়ে থাকা লোহালক্কর দিয়ে আঁকশি বানায়। নিজেদের ব্যবহারের শাল দিয়ে দড়ি বানিয়ে সেই আঁকশির সাহায্যে রবিবার ভোররাতে পাঁচিল টপকায় তারা।

জেল সূত্রের খবর, কারারক্ষীদেরও ওই ঘুমের ওষুধ দেওয়া মোয়া খাওায়ানো হয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ অবশ্য কারারক্ষীদের অচৈতন্য করার বিষয়টি মানতে চায়নি। যদিও কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে সাসপেন্ড করা হয়েছে তিনজনকে।পলাতকদের খোঁজে বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া জেলাগুলিকে সতর্ক করা হয়েছে। তাদের ছবিও পাঠানো হয়েছে সমস্ত জেলায়। বিষয়টি জানানো হয়েছে বিএসএফকেও। একইসঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশকে গোটা ঘটনার কথা জানানো হয়েছে।

তবে এই ঘটনায় জেলের সুরক্ষা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে। জেল সূত্রে খবর, গত ১৩ই জানুয়ারী, শনিবার রাতে কারারক্ষীরা শেষ টহল দিয়েছিলেন রাত ২টো নাগাদ। তারপর তাঁরা ঘুমটিতে ঘুমোচ্ছিলেন। তা থেকে অনুমান করা হচ্ছে, ভোর ৩টে থেকে ৪টের মধ্যে এই ঘটনা ঘটেছে। কারাকর্তাদের বক্তব্য, তাঁরা কারারক্ষীদের অচৈতন্য অবস্থায় দেখেননি। তাঁদের আচরণ সন্দেহজনক হওয়ায় ডাক্তারি পরীক্ষা করানো হচ্ছে। তবে তাঁদের কাজে যে গাফিলতি ছিল, মানছেন তাঁরা। সেই কারণেই সাসপেন্ড করা হয়েছে তিনজনকে। অন্যদিকে, প্রশ্ন উঠেছে, সশস্ত্র পুলিশের অফিসাররাও তো জেলের বাইরে নজরদারির দায়িত্বে ছিলেন। তাঁদেরও কেন বিষয়টি নজরে এল না? তাঁরাও ঘুমোচ্ছিলেন বলে বক্তব্য স্থানীয়দের।

তদন্তে জানা গিয়েছে, যে এলাকা দিয়ে তারা পালিয়েছে, সেখানে কোনও সিসিটিভি ছিল না। বোঝাই যাচ্ছে, বন্দিরা আগে থেকেই জানত, কোন এলাকা ক্যামেরার নজরের বাইরে রয়েছে। সেই কারণেই রাস্তায় থাকা সিসিটিভি ফুটেজ নেওয়া হচ্ছে।
পলাতক তিন বন্দির নাম ফিরদৌস শেখ, ইমন চৌধুরি ও ফারুক হাওলাদার। এদিন গুনতির সময়ে দেখা যায়, তিনজন জেলবন্দিকে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপরই বিষয়টি নজরে আসে কারাকর্তাদের। দেখা যায়, আদিগঙ্গার দিকে পড়ে রয়েছে বন্দিদের ফেলে যাওয়া শাল ও জ্যাকেট। তা থেকেই কারাকর্তারা বুঝতে পারেন, এই দিক দিয়েই তারা পালিয়েছে। এরপরই বিষয়টি জানানো হয় আলিপুর থানায়। ঘটনাস্থলে আসেন পুলিশের কর্তারা। আনা হয় পুলিশের কুকুরও।

পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে, ফারুক সোনারপুরে একটি ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার হয় ২০১৩ সালে। ইমনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে। ফিরদৌস ডাকাতি ও বেআইনি অনুপ্রবেশের ঘটনায় অভিযুক্ত। এরা ২০১৪ সালে ধরা পড়ে। এদের মধ্যে ইমনের পাঁচ বছরের সাজা হয়েছে। এরা সকলেই বাংলাদেশের নাগরিক।

কিন্তু জেলের সুরক্ষা ভেদ করে কী করে পালাতে সক্ষম হল এই তিন বন্দি? জেল সূত্রে জানা যাচ্ছে, তিন বন্দির ঠিকানা ছিল সাত নম্বর ওয়ার্ড। এখানে ৮০ থেকে ৯০ জন আসামি রয়েছে। ওয়ার্ডের পাশেই গরাদের ধারে তাদের শোয়ার ব্যবস্থা ছিল। ওই ওয়ার্ডে থাকা অন্য বন্দিরা কারাকর্তাদের জানিয়েছে, ফারুক বেশ কিছুদিন ধরেই জেল পালানোর ছক কষছিল। এজন্য বাংলাদেশি বন্দিদের নিয়ে সে আলাদা বৈঠকও করে।

জেল সূত্রে জানা গিয়েছে, যে ওয়ার্ডে তারা থাকত, সেখানকার গরাদ বেশ পুরনো হয়ে যাওয়ায় তা যথেষ্ট নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে। মরচেও ধরেছে। সেই কারণেই ওই জায়গাকেই তারা টার্গেট করে। জেলের মধ্যে থেকেই তারা করাত জোগাড় করে। যাতে কারও নজরে না আসে, সেজন্য কয়েকদিন আগে থেকেই তারা গরাদ কাটার কাজ অল্প অল্প করে শুরু করে। পাশাপাশি জোগাড় করা হয় লোহার স্ক্র্যাপ। যা ঘষেমেজে তৈরি করা হয় আঁকশি। যাতে তার সঙ্গে শাল দিয়ে তৈরি দড়ি বেঁধে সহজেই পাঁচিল বেয়ে নীচে নেমে আসা যায়। সমস্ত কিছু চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর শনিবার রাতে তারা পরিকল্পনা করে গরাদ কেটে পালাবে। পরিকল্পনামাফিক গরাদের কাছে থাকা অন্য দুই বন্দিকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়। তার জন্য জেল হাসপাতাল থেকে আগেই জোগাড় করা হয়েছিল ঘুমের ওষুধ। বাইরে থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল মোয়া। তা খেয়ে গরাদের কাছে থাকা দুই বন্দি অচৈতন্য হয়ে পড়ে। অন্যরা তখন অঘোর ঘুমে। বাইরে নেই কোনও রক্ষী। এই সুযোগে জেলের গরাদ কেটে তারা বাইরে আসে। পাঁচিলের উপরে ওঠে। আঁকশির সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হয় শাল। এরপর তা বেয়ে নীচে নেমে এসে তারা  অনায়াসে পালিয়ে যায়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s