মঙ্গলসূত্র খুলিয়ে স্ত্রীকে কুলভূষণের সঙ্গে সাক্ষাত করতে দিল পাকিস্তান

নামেই ‘মানবিক’ সাক্ষাত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কুলভূষণ যাদবের সঙ্গে স্ত্রী ও মাকে সাক্ষাত করতে দিলেও প্রতিমুহূর্তে পাকিস্তান বুঝিয়ে দিয়েছে দিন ঘনিয়ে আসছে তাঁর। স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে পাক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে স্ত্রী চেতনকুলকে মাথার টিপ, হাতের বালা এমনকী মঙ্গলসূত্র পর্যন্ত খুলে ফেলতে হল। যে পোশাক পরে তাঁরা দেখা করতে গিয়েছিলেন, তাও খুলিয়ে দেওয়া হয়। পরতে দেওয়া হয় অন্য পোশাক। ফেরার সময়ে স্ত্রীর জুতো পর্যন্ত ফেরত দেয়নি পাকিস্তান। শুধু তাই নয়, বৃদ্ধ মা মাতৃভাষা মারাঠিতে স্বচ্ছন্দ হলেও, সেই ভাষায় তাঁকে ছেলের সঙ্গে কথাও বলতে দেওয়া হয়নি। গতকাল পাক বিদেশ মন্ত্রক তাদের ‘মানবিক মুখে’র কথা ঘটা করে ঘোষণা করলেও, আদতে যে একটি আতঙ্ক ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল, তা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।
গতকালই ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত প্রাক্তন নৌ কমান্ডার কুলভূষণ যাদবের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ও মাকে দেখা করতে দিয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নয়াদিল্লি সেই সাক্ষাতের ঘটনায় পাকিস্তানের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল। যেভাবে স্ত্রী ও মায়ের সঙ্গে কুলভূষণকে কথা বলতে দেওয়া হয়েছে তা দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার উদ্দেশ্যকেই নষ্ট করেছে বলে এদিন কঠোর নিন্দা করেছে বিদেশ মন্ত্রক। এক বিবৃতিতে বিদেশমন্ত্রক বলেছে, যেভাবে কুলভূষণের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী ও মা দেখা করেছেন, তাতে তাঁর স্বাস্থ্য কতটা ভালো রয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
এদিন বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বাসভবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন কুলভূষণ যাদবের পরিবার। গতকালের সাক্ষাতের বিষয়ে মন্ত্রীকে অবহিত করেন তাঁরা। এরপরেই ওই সাক্ষাতের ঘটনায় পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কড়া বিবৃতি দেয় বিদেশ মন্ত্রক। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমরা ওই সাক্ষাতের যে রিপোর্ট পেয়েছি, তাতে মনে হচ্ছে যাদব অত্যন্ত চাপের মধ্যে ছিলেন। এবং তাঁকে অবাঞ্ছিত পরিবেশের মধ্যে কথা বলতে হয়েছে। কাচের দেওয়ালের আড়ালে ইন্টারকমের মাধ্যমে স্ত্রী ও মায়ের সঙ্গে কথা বলতে হয় কুলভূষণকে। কিন্তু প্রায় দু’বছর পরে ছেলের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাওয়া মা অবন্তী মাতৃভাষা মারাঠিতে কথা বলতে পর্যন্ত পারেননি। পাক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ইংরেজিতে কথা বলতে হয়েছে স্ত্রী ও মাকে। ইংরেজিতে সড়গড় না হওয়ায় মাঝে মাঝেই মারাঠি বেরিয়ে আসছিল তাঁর স্ত্রী ও মায়ের। তৎক্ষণাৎ ওই আলোচনা বন্ধ করে দিচ্ছিলেন উপস্থিত পাক আধিকারিকরা।
বিদেশ মন্ত্রকের তরফে অভিযোগ করা হয়, যেভাবে এই আলোচনাটি সংগঠিত করা হয়েছে ততে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট, তারা যাদবের বিরুদ্ধে যে মিথ্যা অভিযোগ এনেছিল তাই বহাল রাখতে চাইছে। তাই পাকিস্তানের এই ভূমিকার কোনও বিশ্বাসযোগ্যতাই নেই। দু’দেশের সমঝোতার যে উদ্দেশ্য থাকে, তা-ই নষ্ট করে দিয়েছে পাকিস্তান। গতকাল পাক বিদেশ মন্ত্রক একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিল। তাতে দেখা গিয়েছিল স্ত্রী ও মাকে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়ায় পাক সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন কুলভূষণ। এদিন বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রবীশ কুমার স্পষ্টই বলেন, যাদব প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছেন এবং একটি ভয়ের পরিবেশে কথা বলেছেন। তাঁর অধিকাংশ মন্তব্যই শিখিয়ে পড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। চরবৃত্তির যে অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে পাকিস্তান এনেছে, তাকে সত্য প্রমাণিত করতেই এই মিথ্যার বেসাতি জোর করে বলিয়ে নেওয়া হয়েছে।
গতকাল কুলভূষণের স্ত্রী ও মায়ের সঙ্গে ছিলেন ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার জে পি সিং। কিন্তু পাকিস্তান কূটনৈতিক সৌজন্য পর্যন্ত দেখায়নি। তিনজনে এক সঙ্গে পাক বিদেশ মন্ত্রকের ভবনে ঢুকলেও, তাদের আলাদা করে দেওয়া হয়। জে পি সিংকে আলাদা বসিয়ে রেখে কুলভূষণের স্ত্রী ও মাকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। এরপরেই শুরু হয়ে যায় তাঁদের ‘সাক্ষাৎ’ পর্ব। আলোচনা যে শুরু হয়েছে তা জানতেও পারেননি তিনি। তখন জে পি সিং প্রতিবাদ করলে তাঁকে আলোচনাস্থলের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু মূল জায়গায় ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি। তাঁকে আলাদা জায়গায় রাখা হয়। সবমিলিয়ে পাকিস্তান যেভাবে কুলভূষণকে তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দিয়েছে তাতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নয়াদিল্লি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s