নিজের কর্মস্থলেই বিস্ফোরকটি তৈরি করেছিল বাংলাদেশী আইএস জঙ্গি আকায়েদউল্লা

nijer kormostholey bisforok bangladesh IS jongiসোমবার স্থানীয় সময় সকাল সাতটা। নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটানের সবচেয়ে বড় বাস টার্মিনালে যেতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে মানুষ। টাইম স্কোয়ার সাবওয়ে স্টেশন থেকে বাস স্টেশনে যাতায়াতের ভূগর্ভস্থ পথটি কিছুটা সরু। সেখানে মানুষের আনাগোনাও বেশি। আচমকা বিকট শব্দ আর ধোঁয়া! শুরু হয়ে গেল চিৎকার ও মানুষের ছোটাছুটি। ম্যানহাটানের পোর্ট অথারিটি বাস টার্মিনালে দিনের শুরুটা ছিল এমনই। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ততম বাস টার্মিনাল। প্রতিদিন নিউ ইয়র্ক থেকে নিউ জার্সি পর্যন্ত বিভিন্ন বাস এই টার্মিনাল থেকে যাত্রী পরিবহন করে। এ ছাড়া গ্রেহাউন্ড ও পিটারপ্যানের মতো দূরবর্তী স্থানগুলিতে যাত্রী পরিবহণকারী বাসগুলিও এখান থেকেই ছেড়ে যায়। গড়ে প্রতিদিন এই বাস টার্মিনাল দিয়ে আড়াই লক্ষ যাত্রী যাতায়াত করেন। আত্মঘাতী হামলার জন্য এই তল্লাটই বেছে নিয়েছিল আইএস জঙ্গি। গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, জঙ্গি সংগঠন আইএস-এর সঙ্গে নিজের যোগাযোগ স্বীকার করে নিয়েছে ধৃত ব্যক্তি। নিজেকে আইএস প্রচারক বলেও দাবি করেছে সে।

আতঙ্ক আর ভয়ের অনুভূতি কেড়ে নিয়েছিল সকালের স্নিগ্ধতা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জানা যায় হামলাকারীর পরিচয়। পুলিশ বলছে, সন্দেহভাজন হামলাকারীর নাম আকায়েদউল্লা। ২৭ বছরের এই ব্যক্তি বাংলাদেশী। তার বাড়ি ছিল চট্টগ্রামে। যদিও বাংলাদেশ পুলিশের দাবি, তাদের কাছে আকায়েদউল্লার অতীত অপরাধের কোনও রেকর্ড নেই।

সাত বছর আগে সে নিউ ইয়র্কে আসে। ইদানীং থাকে ব্রুকলিনের ইস্ট ফর্টি এইট স্ট্রিটে। আকায়েদ ও তাঁর পরিবার যে বাড়িতে থাকে, ঠিক তার পাশেই থাকেন অ্যালান বুতরিকো। সিএনএনকে তিনি জানিয়েছেন, আকায়েদ থাকত ভূগর্ভস্থ একটি কক্ষে। তাঁর বোন থাকত দোতলায়। তাঁর ভাইও থাকত একই বাড়িতে। বুতরিকো বলেন, গত দুই রাত ধরে আকায়েদের বাড়ি থেকে মারামারি, চিৎকার ও কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। আমার ভাড়াটেরা জানিয়েছেন, দু’রাত ধরেই এমন চলেছে। তাঁরা বলেছেন যে, কান্না ও গোঙানোর শব্দ শুনতে পেয়েছেন। তবে কী হয়েছে বুঝতে পারেননি। পুলিশেও খবর দেওয়া হয়নি। অ্যালান আরও জানান, মোটেই বন্ধুসুলভ ছিল না আকায়েদ। কারও সঙ্গেই খুব একটা কথা বলত না। তারা কেবল এখানে থাকত, ব্যস এটুকুই।

সিএনএন জানিয়েছে, নিজের কর্মস্থলেই বিস্ফোরকটি তৈরি করেছিল আকায়েদউল্লা। প্রাথমিক তদন্তে এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে। আকায়েদ তা স্বীকারও করেছে। তবে কারিগরি ত্রুটির কারণে বিস্ফোরণ হয়নি। আকায়েদ ইচ্ছে করেই নির্দিষ্ট স্থানে বিস্ফোরণটি ঘটিয়েছে। নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ কমিশনার জেমস ও’নিল জানিয়েছেন, আকায়েদউল্লা যে বিস্ফোরকটি ব্যবহার করেন, সেটি তার শরীরে লাগানো ছিল। বিস্ফোরকে ব্যবহৃত প্রযুক্তি উচ্চমানের ছিল না। তার কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের তার ও ডিভাইস পাওয়া গিয়েছে। নিউ ইয়র্ক পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, সম্প্রতি একটি বৈদ্যুতিন কোম্পানিতে কাজ করছিল আকায়েদ। সেখানে তার ভাইও কাজ করত।

কী কারণে এই হামলা? সিএনএন বলছে, গাজায় ইজরায়েলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড এ ধরনের হামলা চালাতে আকায়েদকে বাধ্য করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, গাজায় ইজরায়েলের ‘অনুপ্রবেশ’ সে মেনে নিতে পারেনি। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু ব্যাখ্যা করেনি।

অন্যদিকে, আকায়েদউল্লার নিউ ইয়র্ক শহরে ট্যাক্সি ও লিমোজিন গাড়ি চালানোর লাইসেন্স ছিল। ২০১২ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ওই লাইসেন্সের মেয়াদ ছিল। ২০১৫ সালের মে মাসের পর ওই লাইসেন্স আর নবীকরণ করা হয়নি। তবে শহরের ইয়েলো ট্যাক্সি বা উবের চালানোর লাইসেন্স তাঁর ছিল না। গুরুতর আহত আকায়েদউল্লাকে এখন বেলেভু হাসপাতালে পুলিশের হেপাজতে রাখা হয়েছে। বিস্ফোরণে তার হাত ও পেটের কিছু অংশ পুড়ে গিয়েছে। বিস্ফোরণে আরও চার ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তবে তাঁদের অবস্থা গুরুতর নয়। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় নিউ ইয়র্কের ফিল্ম অ্যাকাডেমির প্রাক্তন ছাত্র আলি পি রিহান সোশ্যাল সাইটে লিখেছেন, ‘‘নিউ ইয়র্কে আজকে বাংলাদেশী হিসেবে পরিচয় দিতে গিয়ে লজ্জা হচ্ছে।’’

নিউইয়র্কে চলতি বছরে এটি তৃতীয় জঙ্গি হামলার ঘটনা। গত মার্চ মাসে মার্কিন সেনাবাহিনীর এক প্রাক্তন সদস্য ছুরিকাঘাতে একজন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে হত্যা করে। এ ছাড়া গত অক্টোবর মাসে এক উজবেক বংশোদ্ভূত অভিবাসী পথচারীদের উপর ট্রাক চালিয়ে দিলে আটজনের মৃত্যু হয়। ওই দুই ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এখন বিচার চলছে। ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘‘তাঁর অভিবাসী নীতি সংস্কার যে সঠিক পদক্ষেপ ছিল তা আবার প্রমাণিত।’’

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s