সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে তালাক বন্ধে বিল আনতে চলেছে কেন্দ্র সরকার

সংসদের আসন্ন শীতকালীন অধিবেশনেই তিন তালাক নিয়ে বিল আনতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার৷ সূত্রের খবর, এই বিলের খসড়া তৈরি করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্দেশে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছে বিশেষ মন্ত্রিগোষ্ঠী৷ সেই খসড়া পেশ করা হবে মন্ত্রিসভায়৷ সেখানে খসড়া অনুমোদন হলে তা বিল আকারে পেশ করা হবে সংসদে, যা পাশ করলে আইনে পরিণত হবে৷ তিন বার ‘তালাক’ বলে বিয়ে ভেঙে দেওয়ার এই প্রক্রিয়াকে (তালাক-এ-বিদ্দত) ইতিমধ্যেই অসাংবিধানিক ঘোষণা করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট৷ সর্বোচ্চ আদালতই কেন্দ্রকে নির্দেশ দিয়েছিল এই সংক্রান্ত আইন তৈরি করার৷ বিরোধীদের অবশ্য অভিযোগ, শীতকালীন অধিবেশনেরই যেখানে কোনও ঠিক নেই সেখানে এত আগে এই ঘোষণার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে মোদী সরকারের৷ গুজরাট নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই ঘোষণার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে৷ এমন অভিযোগের নেপথ্যে বিরোধীদের যুক্তি, রাহুলের মন্দির-রাজনীতির পাল্টা হিসেবে যে ভাবে সংখ্যালঘুদের দরজায় যাওয়া শুরু করেছে বিজেপি তাতেই স্পষ্ট তাদের গতিপথ কী? গুজরাট ভোটকে সামনে রেখে মহারাষ্ট্রের সংখ্যালঘু বিজেপি সদস্যাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মোদীর রাজ্যের প্রতিটি জেলায় গিয়ে তিন তালাক নিয়ে প্রচার চালানোর৷ এ বার তিন তালাক সংক্রান্ত প্রস্তাবিত বিলের আগাম প্রচারের মাধ্যমে তারা গুজরাটের মুসলিম মহিলা ভোটারদের কংগ্রেসের থেকে দূরে সরিয়ে নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একটা বড় অংশ৷

সরকারপক্ষ অবশ্য এসব যুক্তি উড়িয়ে দিয়েছে৷ তাদের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তিন তালাক নিষিদ্ধ হওয়ার পর এবার দেশ থেকে তিন তালাকের শিকড় উপড়ে ফেলতে উদ্যোগী হয়েছে মোদী সরকার৷ এই বিলের মাধ্যমে দেশের সব স্তরের মুসলিম মহিলাদের অধিকার সুরক্ষিত হবে৷ এতে সব কটি রাজনৈতিক দলের সম্মতিও রয়েছে বলে জানিয়েছে বিজেপি৷ দলের এক শীর্ষ স্থানীয় নেতা মঙ্গলবার জানিয়েছেন, ‘তিন তালাকের নামে সংখ্যালঘু সমাজের বিভিন্ন স্তরে মহিলাদের উপরে যে ভাবে অত্যাচার করা হয়, তা চিরতরে বন্ধ করার জন্য কঠোর আইন প্রণয়নের ভাবনা রয়েছে সরকারের৷ চেষ্টা করা হচ্ছে এই বিষয়ে সংসদের শীতকালীন অধিবেশনেই বিল আনার৷’ ২২আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে ‘তালাক-এ-বিদ্দত’-কে অসাংবিধানিক এবং অবৈধ আখ্যা দেওয়া হয়৷ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই প্রথা এদেশে ব্রাত্য, সাফ জানিয়েছিল আদালত৷ সেই রায় মেনে এ বার মুসলিম মহিলাদের অধিকার এবার আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত করতে চাইছে কেন্দ্র৷ বহু বছর ধরে চলে আসা এই প্রথার ফলে নানা ভাবে শোষণের শিকার হচ্ছিলেন মহিলারা৷ কখনও ফোনে তিন বার তালাক বলেই তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে দিচ্ছিলেন স্বামীরা, কখনও শুধুমাত্র এসএমএস পাঠিয়েই দায় সারা হচ্ছিল৷ থানা-পুলিশ করেও কোনও সুরাহা হচ্ছিল না৷ এমন অবস্থায় অনেকেই আদালতের দ্বারস্থ হন৷ তার পরই বিষয়টি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় সুপ্রিম কোর্ট৷ খতিয়ে দেখা হয় প্রাচীন এই প্রথার বৈধতা৷ শেষমেশ স্বস্তি পান মহিলারা৷ এ বার সেই স্বস্তিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার পালা৷ এমনটা হলে কোনও ব্যক্তি আইন অমান্য করে স্ত্রীকে তিন তালাক দিলে তাঁকে সাজা পেতে হবে৷ প্রসঙ্গত, আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও দেশের নানা প্রান্ত থেকে তিন তালাকের খবর আসছে, আইন পাশ হলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে পুলিশ৷

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ‘তিন তালাক’ বিলকে ভিত্তি করে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি তাদের পায়ের তলার মাটি আরও শক্ত করতে চাইছে, বিশেষত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত রাজ্যগুলিতে৷ ২০১৯-এর মহারণ যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে ভোটের হিসেব-নিকেশ৷ যোগ-বিয়োগ ঠিকঠাক হলে সেই হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ‘তিন তালাক’৷ বিজেপি ঠিক যেমনটা চাইছে৷ সেক্ষেত্রে চিরাচরিত ভোটব্যাঙ্ক নিয়ে ভাবনায় পড়তে হতে পারে কংগ্রেসকে৷

সায়রা বানো (৩৬ )উত্তরাখণ্ডের বাসিন্দা সায়রাকে ২০১৫-এর অক্টোবরে তালাক দেন স্বামী রিজওয়ান আহমেদ৷ দুই সন্তানকেও নিয়ে চলে যান৷ সায়রাকে ছ’বার গর্ভপাতে বাধ্য করিয়েছিল তাঁর শ্বশুরবাড়ি থেকে৷ তিনি তিন তালাক বাতিলের দাবিতে আর্জি জানান সুপ্রিম কোর্টে৷ তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্র হলফনামা দাখিল করে আদালতে৷ ইশরাত জাহান (৩১) ২০১৫-এর এপ্রিলে হাওড়ার ইশরাতকে দুবাই থেকে ফোন করে তালাক দেন তাঁর স্বামী মুর্তাজা৷ নিমেষে ভেঙে যায় ১৫ বছরের দাম্পত্য৷ অন্য মহিলাকে বিয়ে করে ইশরাতের চার সন্তানকে নিয়ে যান স্বামী৷ সন্তানদের ফেরত চেয়ে আদালতের শরণাপন্ন হন ইশরাতগুলশন পরভিন (৩১)৷ উত্তরপ্রদেশের রামপুরের গুলশনকে ১০ টাকার স্ট্যাম্প পেপারে বিচ্ছেদের নোটিস দেওয়া হয় ২০১৫-য়৷ দু’বছরের পুত্রকে নিয়ে ঘরছাড়া হন তিনি৷ পণপ্রথা ও গার্হস্থ্য হিংসার শিকার হয়েছেন আফরিন রহমান(২৬)৷ ২০১৪-য় বিয়ের পোর্টাল দেখে শুভ পরিণয়৷ বিয়ের তিন মাসের মধ্যে বিবাদের সূত্রপাত৷ দাবি ওঠে পণের৷ শারীরিক অত্যাচার চলতে থেকে৷ বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় আফরিনকে৷ রাজস্থানের জয়পুরের বাসিন্দা আফরিন পিত্রালয়ে আশ্রয় নেন৷ সেখানে স্পিড পোস্টে পৌঁছোয় তালাকনামা৷ আতিয়া সাবরির(৩০) বিয়ের তিন বছরের মাথায় ২৫ লক্ষ টাকা পণ চাওয়া হয় সাহারানপুরের বাসিন্দা আতিয়ার কাছ থেকে৷ থানায় অভিযোগ জানান দুই সন্তানের মা৷ তার জেরে একটুকরো কাগজে তালাকনামা লিখে বিয়ে ভেঙে দেন স্বামী৷

নিষিদ্ধ ‘তালাক-এ-বিদ্দত’, তিন তালাক নয় ‘তালাক-এ-বিদ্দত’ অনুযায়ী তিন বার তালাক উচ্চারণ করেই বিয়ে ভেঙে দিতে পারেন কোনও মুসলিম পুরুষ৷ এই উপায়ে ফোন, ইমেল এমনকি টেক্সট মেসেজ করেও তালাক দেওয়া সম্ভব৷ পরে স্বামী যদি ফের সম্পর্ক জুড়তে চান, তা হলে একমাত্র উপায় হল ‘নিকাহ হালালা’৷ অর্থাৎ অন্য কাউকে বিয়ে করে, সেই বিয়ে ভেঙে স্ত্রীকে ফিরে আসতে হবে৷ শুধুমাত্র এই ‘তালাক-এ-বিদ্দত’ই নিষিদ্ধ করল সুপ্রিম কোর্ট, তিন তালাক প্রথার অন্য দুই পদ্ধতি ‘তালাক-এ-সুন্নত’ এবং ‘তালাক-এ-এহসান’ আগের মতোই চালু থাকছে৷ ‘তালাক-এ-এহসান’ কী? বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সাধারণত মুসলিমরা এই পদ্ধতিকেই সবথেকে যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন৷ ‘এহসান’ কথার অর্থ সেরা৷ এই পদ্ধতিতে এক বারেই তিন বার ‘তালাক’ বলতে হয় স্বামীকে৷ তবে, সেই সময় স্ত্রীকে ‘পবিত্র’ অবস্থায় থাকতে হয়, অর্থাৎ মেনস্ট্রূয়েশন চললে হবে না৷ এরপর বিচ্ছেদ কার্যকর হওয়ার জন্য তিন মাস অপেক্ষা করতে হয় স্বামীকে৷ তবে, তার আগেই মিটমাট করে নেওয়া সম্ভব৷ ‘তালাক-এ-সুন্নত’ কী? এই পদ্ধতিতে প্রথম বার ‘তালাক’ বলার পর এক মাস পূর্ণ না হলে দ্বিতীয় বার ‘তালাক’ বলা সম্ভব নয়৷ এই উপায়ে স্ত্রী বিচ্ছেদের জন্য প্রস্ত্তত হতে তিনটি মেনস্ট্রূয়াল সার্কেল সময় পান৷ অনেক সময়ে তিন বার ‘তালাক’ বলার আগেই সমস্যা মিটে যায়৷

কী ছিল রায়? তিন বার ‘তালাক’ বলে তৎক্ষণাৎ বিয়ে ভেঙে দেওয়ার প্রথা (‘তালাক-এ-বিদ্দত’) নিষিদ্ধ করে দিল সুপ্রিম কোর্ট৷ আদালতের মন্তব্য, এই প্রথা অসাংবিধানিক৷ এটা কোনও ভাবেই ধর্মীয় স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়৷ এই প্রথা সাংবিধানিক নৈতিকতার পরিপন্থী আপাতত ৬ মাসের জন্য ‘তালাক-এ-বিদ্দত’-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আদালত৷ তার মধ্যে আইন তৈরি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারকে৷ ৬ মাসের মধ্যে কেন্দ্র আইন তৈরি করতে না পারলেও নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে৷ রাজনৈতিক দলগুলিকে নিজেদের বিভেদ সরিয়ে এই আইন তৈরিকে কেন্দ্রকে সাহায্য করতে বলেছেন বিচারপতিরা৷ কেন্দ্র তার সওয়ালে বলেছিল, তিন তালাক প্রথা মহিলাদের মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে, এদিন কার্যত সেই মতকেই মান্যতা দিল সুপ্রিম কোর্ট৷ ‘তালাক-এ-বিদ্দত’ প্রথার সুযোগ নিয়ে অনেকেই স্কাইপ, হোয়াটসঅ্যাপ, এমনকি কাগজে তিন বার ‘তালাক’ লিখেও বিয়ে ভাঙে৷

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s