নিষিদ্ধ ‘আনসার আল ইসলাম’ আসলে ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’-এর আর এক নাম

রাতারাতি নিজেদের দলের নামটাই বদলে ফেলেছিল ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’ (এবিটি)। বাংলাদেশে ২০১৫ সালের মে মাসে ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’ নিষিদ্ধ হওয়ার পর এই জঙ্গিদলের সদস্যরাই ‘আনসার আল ইসলাম’ নামে সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম শুরু করেছিল। নব্য জেমবি জঙ্গি তামিম চৌধুরির নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়লেও সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত জঙ্গি মেজর জিয়ার নেটওয়ার্ক এখনও অক্ষত। তামিম ও জিয়ার নেটওয়ার্ক ভিন্ন হলেও তাদের আদর্শ অভিন্ন। বাংলাদেশে একাধিক ব্লগার হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে জঙ্গি সংগঠন ‘আনসার আল ইসলাম’-কেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় চলতি বছরের ৫ মার্চ।

বাংলাদেশ পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট সূত্রে জানা গিয়েছে, এক সময় ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ ছিল। তারা অনলাইনে প্রচার চালাত। এই ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’ই পরে ‘আনসার আল ইসলাম’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। যারা বাংলা টিমের ব্যানারে কাজ করত, তারা ‘আনসার আল ইসলাম’-এ কাজ করা শুরু করে। অতি গোপনে এরা জঙ্গি কাজকর্ম পরিচালনা করে। বিভিন্ন যোগাযোগ স্থাপন করে এবং নতুন কর্মী রিক্রুট করে। এরপর সদস্যদের প্রশিক্ষণও হয় গোপনে। এরপর কর্মীরা কেউ সামরিক দায়িত্ব নেয়, কেউ যোগাযোগ, কেউ অর্থের জোগান এবং কর্মীদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে। পুরো কাজটাই হয় গোপনে। ফলে শুধুমাত্র নিষিদ্ধ করে এদের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যায়নি। ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেনাবাহিনীতে ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার পরিকল্পনাকারী মেজর জিয়াউল হক এই সংগঠনের অন্যতম চাঁই। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল কায়েদা নেটওয়ার্কের ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ ‘আনসার আল ইসলাম’ নিজেদেরকে ওই সংগঠনের বাংলাদেশ শাখা হিসেবে দাবি করে।

ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট সূত্র বলছে, ২০১৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে হত্যার পর প্রচারের আলোয় আসে ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’। এরপর একাধিক ব্লগার হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উঠে আসে ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’-এর নাম। এই সংগঠনের শীর্ষপদের নাম সমন্বয়ক। এর তিনটি বিভাগ রয়েছে। তাদের প্রথমটি হল দাওয়া বিভাগ। এই বিভাগে লজিস্টিক ও রিক্রুটমেন্ট দেখা হয়। দ্বিতীয়টি হল আসকারি বিভাগ। সেখানে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তৃতীয়টি হল গণমাধ্যম শাখা। এটি আইটি এক্সপার্টরা পরিচালনা করে থাকে। সমন্বয়কের কাজ এই তিনটি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় করা। এছাড়া ‘অপারেশনের’ জন্য আরও দুটি বিভাগ রয়েছে। এগুলি হল মাশুল এবং মামুর। কোনও অপারেশন পরিকল্পনা ও পরিচালনার কাজটি দেখে মাশুল বিভাগ। আর অপারেশনে যারা অংশগ্রহণ করে সেই সদস্যরা মামুর বিভাগের অধীনে থাকে। কোনও টার্গেটের ওপর হামলা চালানোর আগে এই সংগঠনের নেতা-কর্মীরা নতুন একটি ‘সেফ হাউসে’ ওঠে। জঙ্গিদের ভাষায় এই বাড়িটিকে ‘মার্কাজ’ বলা হয়ে থাকে। মাসুলের দায়িত্বে থাকা জঙ্গিরা এই মার্কাজ ভাড়া নেওয়া থেকে শুরু করে অপারেশনের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে নিও জেএমবির একাধিক হামলার ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তোড়জোড় শুরু হলে কিছুটা চুপসে যায় ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’ ওরফে ‘আনসার আল ইসলাম’। তবে ভিতরে ভিতরে তারা হামলার জন্য সংগঠিত হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু মেজর জিয়া কোথায়? ‘আনসার আল ইসলাম’-এর নেতৃত্বে মেজর জিয়া সরাসরি অন্তত ৯টি টার্গেট কিলিংয়ের সঙ্গে জড়িত বলে ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের দাবি। এছাড়াও অন্তত ৩০টি টার্গেট কিলিং তার পরিকল্পনায় হয়েছে। ২০১৩-১৫ সালের মধ্যে পাঁচজন ব্লগার, একজন প্রকাশক ও সমকামীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা দু’জনকে হত্যা করেছে ‘এবিটি’। এসব ঘটনার তদন্ত শেষে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উঠে এসেছে মেজর জিয়ার নাম। জিয়াউল হক জিয়াকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ২০ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু মেজর জিয়াকে নিয়ে রহস্য বেড়েই চলেছে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s