হিন্দুদের হুমকির ঘটনা বাংলাদেশের পিরোজপুর সদর উপজেলায়, বহু হিন্দু এলাকাছাড়া

পিরোজপুর সদর উপজেলার সিকদার মল্লিক ইউনিয়নের দক্ষিণ সিকদার মল্লিক গ্রামের বাসিন্দা দেবাশীষ মাঝি ৪ জুন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের পর থেকে ঘরছাড়া। এলাকায় নবনির্বাচিত চেয়ারম্যানের লোকজন তাঁকে প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। অজ্ঞাত স্থানে বসে মুখোমুখি আলাপচারিতায় দেবাশীষবাবু বলেন, ‘ভোটের পর এক দিনও বাড়িতে ঘুমাইনি। মা বলছে দেশ ছেড়ে পালিয়ে বেঁচে থাক। আসলেই কি আমরা এই দেশে থাকতে পারব না?’

একই প্রশ্ন করেছেন ওই ইউনিয়নের কৃষ্ণেন্দু হালদার, সন্তোষ বৈরাগী, নয়ন মাঝি, রিপন মণ্ডলসহ আরও অনেকে। এই ইউনিয়নের হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে বলছেন, ৪ জুন সর্বশেষ দফা ইউপি নির্বাচন আতঙ্ক হয়ে এসেছে হিন্দু-অধ্যুষিত সাতটি গ্রামে। নির্বাচনের পর থেকে গত তিন সপ্তাহে অর্ধশত হিন্দু ব্যক্তি হুমকি ও মারধরের শিকার হয়েছেন। পুরুষদের মধ্যে অনেকেই ভয়ে এলাকাছাড়া।

সিকদার মল্লিক ইউনিয়নের নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পান সদ্য ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য হওয়া শহীদুল ইসলাম হাওলাদার। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান সিকদার ছিলেন বিদ্রোহী প্রার্থী। হিন্দুরা জানান, নির্বাচনে শহীদুল চেয়ারম্যান হলেও হিন্দু-অধ্যুষিত ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডে কামরুজ্জামান জয়ী হন। এরপর থেকে এই চার ওয়ার্ডের সিকদার মল্লিক, দক্ষিণ সিকদার মল্লিক, নন্দীপাড়া, উত্তর গাবতলা, দক্ষিণ গাবতলা, জুজখোলা ও পূর্ব জুজখোলা গ্রামে হিন্দুদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

উপজেলা ও ইউনিয়নের হিন্দু নেতারা বলছেন, শহীদুলের বাবা রফিকুল ইসলাম ওরফে রুনুও দুবার এই ইউপির চেয়ারম্যান ছিলেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচপাড়া বাজারের কালীমন্দিরের জায়গা দখলসহ হিন্দু ব্যক্তিদের নির্যাতনের অভিযোগ আছে। এসব কারণেই হিন্দুদের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী কামরুজ্জামানকে ভোট দেন। এতেই ক্ষুব্ধ হন শহীদুল। তবে তিনি এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলেছেন।

পিরোজপুর জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিমল চন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘সিকদার মল্লিক ইউনিয়নের হিন্দু লোকজন গত তিন সপ্তাহে হামলা, হুমকি, মারধরের ১০৯টি ঘটনার কথা আমাকে জানিয়েছে। আমি পুলিশ প্রশাসনকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছি।’

পরাজিত প্রার্থী কামরুজ্জামান সিকদার বলেন, ‘১, ২, ৩ ও ৪—এই চারটি ওয়ার্ডই হিন্দু-অধ্যুষিত। এর প্রত্যেকটায় আমি জয়ী হয়েছি। কিন্তু বাকি পাঁচটি ইউনিয়নে শহীদুল জয়ী হন। হিন্দুরা কেন আমাকে ভোট দিল, সে কারণেই নির্বাচনের দিন থেকেই হিন্দুদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’

এলাকায় গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ৪ জুন নির্বাচনের দিন হামলার শিকার হন সিকদার মল্লিক গ্রামের সন্তোষ বৈরাগী।সন্ধ্যায় গাবতলা স্কুলের কাছেই চিত্ত বড়াল, রতন খাঁ, সচীন শিকদার, সুকুমার সিকদার ও প্রবীণ মণ্ডলকে মারধর করা হয়। এ ছাড়া সিকদার মল্লিক গ্রামের অমূল্য মিস্ত্রির বাড়িতেও হামলা হয়। এসব ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে ওই রাতেই এলাকার কয়েকটি হিন্দু পরিবার বাড়ি ছেড়ে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন বাগান ও মাছের ঘেরে আশ্রয় নেয়।

হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন জানান, নির্বাচনের পরদিন ৫ জুন দক্ষিণ গাবতলা গ্রামের আকুল মিস্ত্রি, কুমুদ মাঝি, সোনা মিস্ত্রি ও অসীম মাঝিকে হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া ৬ জুন ভবতোষ মণ্ডল, ৭ জুন নির্ঝর মণ্ডলকে হুমকি দেওয়া হয়। ২০ জুন জুজখোলা মিরুয়া গ্রামের হ্যাপি ঘরামির কাপড়ের দোকান দখল করে ক্লাব করতে যায় চেয়ারম্যানের লোকজন। বাধা দিলে হ্যাপি ও তাঁর স্বামী বিমল ঘরামিকে মারধর করা হয়।

পিরোজপুর সদর থানার ওসি এস এম মাসুদ উজ জামান গতকাল বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’ নির্যাতন ও হুমকির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে শহীদুল ইসলাম এসব ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, ‘এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে।’

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s