বাংলাদেশে ২০০১ সালে অক্টোবরের সেই রক্তাক্ত দিনগুলিঃ….

বাংলাদেশে ২০০১ সালে অক্টোবরের সেই রক্তাক্ত দিনগুলিঃ….

দুটি মোটরসাইকেল নিয়ে গতকালের মতো আজও রাহুলরা চারজন বেরিয়ে গেল। আজ বেরিয়েছে খুব ভোরে। সূর্য ওঠার আগে। প্রাতরাশ করবে দৌলতখান বাজারে গিয়ে। সেখানে স্পট ভিজিট করে যাবে লালমোহনের উমেদচর গ্রামে। তারা দৌলতখানের লেজপাতা গ্রামে এল প্রথম। আনিসই তাদের এই গ্রামে প্রথম নিয়ে এল। লেজপাতা গ্রামের সরকার বাড়িতে তেরোটি হিন্দু পরিবার বাস করে। বাড়ির কোন পুরুষের গায়েই কাপড় নেই। সবাই গামছা পরিহিত। নতুন গামছা। বাজার থেকে বাকিতে আনতে হয়েছে। ঘরের কিছু তো রাখেনি, পরনের কাপড়ও লুট করে নিয়েছে। উলঙ্গ করে সরকার বাড়ির প্রতিটি পুরুষকে হকি স্টিক দিয়ে পিটিয়েছে নির্বাচনের পরদিন রাতে। এ বাড়ির সকলেই যখন ঘুমিয়েছিল, পঁচিশ থেকে ত্ৰিশজনের একটি দল এসে বিকট শব্দে বাড়ির উঠোনে বোমা ফাটায়। বোমার শব্দে বাড়ির সবার ঘুম ভেঙে যায়। পরেশচন্দ্ৰ মিস্ত্রীর স্ত্রী প্রভারানি রাহুলদের জানায়, বোমা বিস্ফোরণের পর সন্ত্রাসীরা ‘নারায়ে তাকবির – আল্লা হু আকবর’ ধ্বনি দিয়ে আমাদের দরজায় আঘাত করে। প্রভারানি পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে ঘরের পেছনের পুকুরে লাফিয়ে পড়ে শুধু নাক ওপরে রেখে বাকি সমস্ত শরীর জলে ডুবিয়ে নিজেকে বাঁচানোর  প্রাণপণ চেষ্টা করে। কিন্তু নরপশুরা টর্চলাইট মেরে চুল ধরে টেনে তোলে প্রভারানিকে। পুকুরের পাড়েই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওরা। তার নাক-ফুলটি পর্যন্ত খুলে নিয়ে যায়। এসব বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে প্রভারানি। এই বাড়ির চার যুবতী মেয়ে বীণা, পলি, মিলন, শিপ্রা দৌড়ে হোগলাপাতার বনে গিয়েও ইজ্জত বাঁচাতে পারে নি, কাঁদতে কাঁদতে জানায় প্রভারানি। রিঙ্কু নামে পাঁচ বছরের একটি বাচ্চাকে দেখিয়ে বলে, ওর নাকের মাংস ছিড়ে নিয়ে গেছে নাক-ফুল লুট করার সময়। মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা ভ্যান ও রিক্সা নিয়ে এসেছিল। বাবা-মায়ের সামনে কন্যাকে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে উলঙ্গ করে উল্লাস করেছে প্রথমে। তারপর ধর্ষণ করেছে, পর্যায়ক্রমে। যাবার সময় পনেরোটি ভ্যান ও রিক্সা ভর্তি করে সরকার বাড়ির তেরো পরিবারের তৈজসপত্র, বিছানা, কাপড়, সামান্য ধান-চাল যা ছিল সবকিছু নিয়ে যায়। এ বাড়ির দুই পরিবারের তিনটি গরু ছিল, তাও নিতে ভুল করেনি।

এখান থেকে রাহুল্যরা আসে। চরপাতা ইউনিয়নের অঞ্জুরানি মেম্বারের বাড়িতে। অঞ্জরানি চরপাতা ইউনিয়নের নির্বাচিত সদস্যা। কিন্তু সে বাড়িতে নেই। মুখোশ পরে একদল যুবক  নির্বাচনের ভোটকেন্দ্ৰে যাওয়ার চারদিন আগে অঞ্জুরানির ঘর থেকে টেলিভিশন ও অন্যান্য আসবাবপত্র লুট করে। তার পনেরোদিন আগে খুন হয়েছে অঞ্জুরানির বডিগার্ড। রাহুলদের এসব জানায় অঞ্জুরানি মেম্বার বাড়ির নিত্যহরি রায়। হাওলাদার বাড়ির বৃদ্ধা পুষ্পাঞ্জলি হাওলাদার তাদের জানায় সুপারিবাগান, বাড়িঘর সবকিছু লুট করা হয়েছে। গত পাঁচবছর তাদের মধ্যে কোনো ভয়, আতঙ্ক ছিল না। কিন্তু নির্বাচনের পরদিন থেকে এখানকার আওয়ামিলিগের নেতারা সব পালিয়ে গেছে। তারা উপস্থিত থাকলে আমাদের এত বড়ো ক্ষতি হত না।

চরদুয়ারি গ্রামের হিন্দুবাড়ির যুবতীদের ওপর একের পর এক নির্যাতন করা হয়েছে। সব কিছু হারিয়ে বাড়ির মেয়েরা প্রায় উন্মাদ। তারা বাড়ির দরজা খুলে আছে এবং একটি বাড়ির গেটে লিখে রেখেছে ‘যা খুশি কর। এই মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার সাহস পেল না রাহুলরা। বারি অবশ্য কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু আনিস থামিয়ে দিল। এর আগে সে এই এলাকা একবার ঘুরে গেছে। পুরুষ দেখলেই এই মেয়েরা উলঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। তাদের উপর একদিন নয়, ধারাবাহিকভাবে পাশবিক অত্যাচার চালানো হয়েছে। তারা এখন উন্মাদ। বাইরের পুরুষদের দেখলে তারা আর ভীত হয় না। নরপশু তাদের শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলেছে। এজন্য বাইরের পুরুষ দেখলে তারা ভাবে নতুন কেউ এসেছে সেই ক্ষত আরও একটু বাড়ানোর জন্য।

পাগলের বেশে রাস্তায় হাঁটছে নূরজাহান বেগম। ওরা মোটরসাইকেল থামায়। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে নূরজাহান বলে, এসব কথা লিখবেন না। তাহলে ওরা আমাদের মেরে ফেলবে। অসিত বালার বাড়িতে কাজ করে নূরজাহান। বারো হাজার টাকা দিয়ে অত্যাচার থেকে রেহাই পেয়েছে। অসিত বালা। কিন্তু এই টাকার কথা কাউকে বললে তাদের সবাইকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে গেছে সন্ত্রাসীরা। বালা বাড়িতে প্রতি বছর ধূমধামের সঙ্গে দুর্গাপূজা হয়। এবার পূজামণ্ডপ খালি। পূজামণ্ডপের সামনে ব্যথিত কুকুর কঁদছে। অসিত বালা বারো হাজার টাকা দিয়ে নিজে নির্যাতন থেকে বেঁচেছে বটে,  কিন্তু ও বাড়ির অন্যান্য শরিকদের কেউ রেহাই পায়নি। অসিত
বালা নির্বাচনের আগে বাড়ির মেয়েদের মির্জাকালুর শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। নূরজাহান তার রান্নাবান্নার কাজ করে দিত। অসিত বালা রক্ষা পেলেও তার কাজের মেয়ে নূরজাহান রক্ষা পায়নি। তারপর থেকেই সে পাগলের মতো রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। নিজের কথা কিছুই বলে না। শুধু সাংবাদিক শুনলে বলে, এসব কথা লিখবেন না। ওরা আমাদের মেরে ফেলবে।

আনিস জানায় এবার আমরা চরকুমারী গ্রামে যাব।অক্টোবরের দুই তারিখে নির্বাচনের পরদিন রাতে কী ঘটেছিল সে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে চরকুমারী গ্রামের মধ্যবয়সী নেপাল রায়। গ্রামের তেলি বাড়িতে বসে সে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিল রাহুলদের। ফরিদ খালিফা এই গ্রামে ধাৰ্মিক মানুষ হিসেবে পরিচিত। সে এসে জানায়, বাড়িতে হামলা হতে পারে। হামলাকারীরা বাড়ির জিনিসপত্র নিয়ে গেলে তা ফিরে পাবে। নতুন করে কিনতে পারবে। কিন্তু বাড়ির আওরতদের ওপর হামলা হলে তা আর ফিরে পাবে না। নেপাল রায়রা আপদে-বিপদে ফরিদ খালিফার কাছে ছুটে গেছে সব সময়। তাকে মুরুব্বি হিসেবে মান্য করে। তিনিই যখন বাড়িতে এসে হামলার কথা বলছেন, তা অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।

নেপাল জিজ্ঞেস করে, তাহলে আমরা কী করব?
ফরিদ জবাব দেয়, আওরতদের দূরে কোনো আত্মীয়ের বাড়ি পাঠিয়ে দাও।
নেপাল বলে, কিন্তু এখন তো সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আপনার দল তো জিতেছে, আপনি একটু ওদের বলে আমাদের রক্ষা করুন |
ফরিদ কিছুটা রেগে গিয়ে বলে, যারা হামলা করবে তাদের তো আমি চিনি না। শুনেছি হামলা হতে পারে। একটা কাজ করতে পারো, আজকের রাতটা বাড়ির আওরতদের আমার বাংলাঘরে পাঠিয়ে দিতে পারো।

নেপাল সরল বিশ্বাসে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায়। ফরিদ খালিফা আজকের রাতটা বাড়ির ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন নারীকে বাড়িতে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়ে যে উপকার করলেন, তা সে সারা জীবন মনে রাখবে। রাত পোহালেই দূরের কোনো আত্মীয় বাড়ি পাঠিয়ে দেবে স্ত্রী, কন্যা ও বিধবা বোনকে। অন্যান্য শরিকরাও তাই স্থির করে। ফরিদ খালিফার বাংলাঘরে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ জন বিভিন্ন বয়সের নারীরা কেউ ঘুমিয়েছে, কেউ অন্ধকারে উপরের দিকে তাকিয়ে বাড়ির কথা, ঘরের কথা ভাবছে। এ সময় ফরিদ খালিফা এসে ডাক দেয়। প্রথম ডাকে কেউ জবাব দেয় না। দ্বিতীয়বারও নয়। তৃতীয়বার দরজায় ধাক্কা মেরে যখন ডাকে, তখন একজন উঠে দরজা খুলে দেয়। যে দরজা খুলে দেয় সে নেপালের কন্যা। এবার ক্লাস নাইনে পড়ছে। ফরিদ মেয়েটির মুখে লাইট মারে। তারপর পুরো শরীরে। এরপর পুরো ঘরে। তড়িৎগতিতে টর্চলাইট দরজার বাইরের দিকে ঘুরিয়ে কাদের যেন ভেতরে আসতে আহ্বান করে। একদল নরপশু হুড়মুড় করে ঘরে ঢোকে। ফরিদ নেপাল রায়ের মেয়ের হাত ধরে রেখেছে এক হাতে। সবার ভেতরে ঢোকা হয়ে গেলে অপর হাতে দরজা বন্ধ করে দেয়। এরপর একজনকে হারিকেন জালাতে বলে। সবার উদ্দেশ্যে একটি চকচকে ধারালো ছুরি দেখিয়ে জানিয়ে দেয়, কেউ চিৎকার করলে এই ছুরি তার গলায় বসে যাবে। তারপর নেপাল রায়ের মেয়েকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় ঘরের এক কোণে অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি জায়গায়। রাত বারোটা থেকে তিনটে পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশজন নরপশু এই নারীদের শরীর খুবলে খায়। নেপাল রায়ের মেয়েটি যখন অঞ্জন হয়ে পড়ে তখন ফরিদ ডাকে নেপালের স্ত্রীকে। রক্তাক্ত কন্যাকে দৌড়ে গিয়ে বুকে তুলে নিতে যাচ্ছিল সবিতা। কিন্তু ফরিদ এক ঝটকায় সেখান থেকে ছিনিয়ে আনে সবিতাকে। বিবস্ত্র করে মেয়ের পাশে ধাক্কা মেরে শুইয়ে দেয় সবিতাকে। আর বলতে পারে। না, নেপাল রায় – অজ্ঞান হয়ে পড়ে।

লেখকঃ প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শ্রী সালাম আজাদ… ।।
সৌজন্যেঃ স্বদেশ সংহতি সংবাদ। পূজা সংখ্যা ২০১৭; পৃষ্ঠা – ১২

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s