দিল্লি থেকে ধৃত ভোল পাল্টানো জঙ্গি নেতা মিন্টু

সন্দেহ ছিলই। সেই মতো নজরদারি চালিয়েই মিলল সাফল্য। রক্ষীদের বোকা বানিয়ে জেল থেকে পালানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাই ধরা পড়ে গেল কুখ্যাত খলিস্তানি জঙ্গি নেতা হরমিন্দর সিংহ মিন্টু।২৮ নভেম্বর গভীর রাতে দিল্লির হজরত নিজামুদ্দিন রেল স্টেশনের পার্কিং লট থেকে তাকে পাকড়াও করে দিল্লি পুলিশের বিশেষ শাখা। যদিও চট করে দেখে চেনার উপায় ছিল না তাকে। গোঁফ-দাড়ি ছেঁটে ভোল পাল্টে ফেলার চেষ্টা করেছিল খলিস্তান লিবারেশন ফ্রন্টের এই শীর্ষ নেতা। দিল্লির দায়রা আদালত আগামী সাত দিনের জন্য পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে তাকে। গোটা ঘটনায় ধৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২।

২৮ নভেম্বর সকালে পঞ্জাবের পাটিয়ালা জেলার নাভা জেল থেকে ৬ বন্দিকে নিয়ে পালায় জনা বারোর এক দুষ্কৃতী দল। জেলে ঢুকে এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে জেল কর্তৃপক্ষের নাকের ডগা দিয়ে ৬ জনকে নিয়ে উধাও হয় দলটি। পুলিশ জানিয়েছে, পলাতকদের মধ্যে দু’জন সন্ত্রাসবাদী। বাকি ৪ জন বিপজ্জনক দুষ্কৃতী। এই ঘটনার পরেই তাই দেশ জুড়ে জারি হয় চূড়ান্ত সতর্কতা।

দিল্লি পুলিশের বিশেষ শাখার বিশেষ কমিশনার অরবিন্দ দীপ আজ সংবাদমাধ্যমকে জানান, ২৮ নভেম্বর সকালেই পঞ্জাব পুলিশ তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানায়, দিল্লিতে আসার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে হরমিন্দরের। সেই মতো রাজধানী ও হরিয়ানার থানাগুলোকে সতর্ক করা হয়। বিকেলের দিকে উত্তরপ্রদেশের শামলি থেকে ধরা পড়ে এই ঘটনার অন্যতম চক্রী পলবিন্দ্র সিংহ ওরফে পেন্ডা। তার বিরুদ্ধে মাদক পাচার-সহ একাধিক মামলা রয়েছে। জেরায় পেন্ডা পুলিশকে জানায়, হরমিন্দর ও আর এক ফেরার জঙ্গি  কাশ্মীর সিংহ তাকে হরিয়ানায় নামিয়ে দিয়েছিল। ওই দু’জন দিল্লি আসতে পারে।

পেন্ডার কাছ থেকে এই তথ্য পেয়েই সতর্ক হয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। বিভিন্ন থানার হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হয় দু’জনের ছবি। বিভিন্ন গেস্ট হাউস, বাস স্টপ ও রেল স্টেশনে নজরদারি বাড়ানো হয়।

অরবিন্দ জানাচ্ছেন, কাল রাতে হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনের পার্কিং লটে এক পঞ্জাবির গতিবিধি দেখে পুলিশের সন্দেহ হয়। মাথায় ‘পটকা’। গোঁফ-দাড়ি ছবিতে দেখা মিন্টুর চেয়ে কম। তবে অগোছালো ভাবে ছাঁটা। বুঝতে দেরি হয়নি অফিসারদের। টিকিট কেটে বেরোনোর সময় ধরে ফেলা হয় বছর আটচল্লিশের হরমিন্দরকে। তার কাছ থেকে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রচুর গুলি উদ্ধার হয়েছে। নাশকতার ১০টি মামলা ঝুলছে তার বিরুদ্ধে। পুলিশ জানিয়েছে, পানভেল যাওয়ার টিকিট কেটেছিল হরমিন্দর। মুম্বই হয়ে গোয়া যাওয়ার চেষ্টায় ছিল। এর আগে দীর্ঘ ১৮ বছর সেখানেই কাটিয়েছে সে। তাই গা ঢা়কা দিতে গোয়ার চেয়ে উপযুক্ত জায়গা মিন্টুর কাছে ছিল না বলেই মনে করছে পুলিশ। যদিও পুলিশের একটি সূত্র থেকে জানা গিয়েছে, গোয়া থেকে মালয়েশিয়া বা জার্মানি চলে যাওয়ার ছক ছিল তার।

জেল ভাঙার ঘটনায় ব্যবহৃত দু’টি গাড়িও উদ্ধার হয়েছে হরিয়ানার কইথাল জেলা থেকে। একটি গাড়ি থেকে মিলেছে কয়েকটি ফোন নম্বর লেখা কিছু ছেঁড়া কাগজ। আরও সূত্রের খোঁজে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞেরা গাড়ি দু’টি পরীক্ষা করছেন। জোর তল্লাশি চলছে পলাতক বাকি পাঁচ
বন্দির খোঁজে।

পুলিশকে পেন্ডা জানিয়েছে, আরও সাত জন তাকে সাহায্য করেছিল। হোয়াটসঅ্যাপে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত সে। দিল্লি পুলিশের বিশেষ শাখার অফিসারদেরও দাবি, জেরায় হরমিন্দর জানিয়েছে, গত ছ’মাস ধরে জেল ভাঙার ছক কষা হয়েছে। পেন্ডা একা নয়, গুরপ্রীত সিংহ সেখন এবং হরজিন্দর সিংহও এই ঘটনার অন্যতম চক্রী।

একটি সূত্র আবার দাবি করেছে, হরমিন্দর নয়, বাকি দাগি দুষ্কৃতীদের ছাড়ানোর জন্যই ছক কষা হচ্ছিল। কিন্তু জেলে বসে সেই সব পরিকল্পনার কথা শুনে ফেলে হরমিন্দর। আর সুযোগ বুঝে তাদের দলে ভিড়ে যায় সে। যদিও এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি পুলিশ। বরং পঞ্জাবে নির্বাচনের আগে মিন্টুকে ছাড়িয়ে নেওয়ার পিছনে কোনও বিদেশি জঙ্গি গোষ্ঠীর হাত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে তারা।

২৮ নভেম্বর-এর ঘটনার পরে নাভা জেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও বেশ কিছু প্রশ্ন উঠেছে। সেখানকার মূল ফটকের সামনে বেশি আলো নেই। এমনকী ঠিক ওই জায়গায় নেই কোনও সিসিটিভি ক্যামেরাও। রক্ষীর সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। অথচ পাক সীমান্ত লাগোয়া ওই জেলে প্রচুর ‘হাইপ্রোফাইল’ জঙ্গি ও দুষ্কৃতীদের রাখা হয়। এমন একটি জেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেন এত ঠুনকো, তা জানতে এখন নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন