তিন তালাক প্রথা অবৈধ এবং অসংবিধানিক: সুপ্রিম কোর্ট

downloadতিন তালাক প্রথা অবৈধ এবং অসংবিধানিক। ভিড়ে ঠাসা এজলাসে অপেক্ষমান কৌতুহলীদের সাক্ষী রেখে এই ঐতিহাসিক রায় শোনাল সুপ্রিম কোর্ট। দীর্ঘ শুনানির পর দেশের প্রধান বিচারপতি জে এস খেহরের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার রায়ে জানিয়ে দিল, মুসলিম সমাজে ‘তালাক-ই-বিদ্দাৎ’ অর্থাৎ একসঙ্গে পরপর তিনবার তালাক বলার যে প্রথা দীর্ঘ ১৪০০ বছর ধরে চলে আসছিল, তা বাতিল করা হল। নিঃসন্দেহে এই রায় মুসলিম মহিলাদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ঐতিহাসিক এই রায় ঘোষণা হতেই তাকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, এই রায় ঐতিহাসিক। এর ফলে মুসলিম মহিলারা শুধু সমানাধিকারই পাবেন না, এই রায় মহিলাদের সামাজিক অবস্থানকে আরও বেশি শক্তিশালী করবে। মামলার অন্যতম আবেদনকারী তিন তালাকের ভুক্তভোগী সায়রা বানু রায় শুনে আনন্দে প্রায় কেঁদেই ফেলেন। বলেন, আজ ভারতের একটি ঐতিহাসিক দিন।
দীর্ঘদিন ধরেই মুসলিম দম্পতির মধ্যে কোনও কারণে বনিবনা নাহলে পুরুষরা অনেক সময়ই পরপর তিনবার ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করে স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ করতেন। হাজার বছর ধরে এই প্রথা চলে আসছে। প্রায় একইভাবে চলে আসছে হালালা এবং বহুগামিতা। তবে সুপ্রিম কোর্ট বহুবিবাহ  বা নিকাহ হালালার মতো কোনও বিষয়ে মাথা ঘামাতে চায়নি। অথচ মামলার সাত আবেদনকারীর অন্যতম ভুক্তভোগী সায়রা বানু নিকাহ হালালা এবং মুসলিমদের বহুবিবাহ  নিয়েও বিচার প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ শুনানির সময় গোড়াতেই স্পষ্ট করে দেয়, তারা কেবলমাত্র তিন তালাকের বিষয়টিই বিচার করবে। সেই মতো টানা ছ’দিন শুনানি শেষে গত ১৮ মে রায় রিজার্ভ রেখেছিল শীর্ষ আদালত।
এরই মধ্যে গত ২২ মে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন করে বলেছিল, তিন তালাকের বিষয়টি ‘নিকাহনামা’য় বিশেষভাবে খেয়াল করা হবে। কাজিদের বলা হবে কোনও মুসলিম দম্পতি যেন তিন তালাকের বিষয়টিকে বিচ্ছেদের উপায় হিসাবে অবলম্বন না করে। অন্যদিকে, শুনানির সময় কেন্দ্রের পক্ষে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল রোহতগি আদালতে জানিয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট যদি তিন তালাক প্রথা বাতিল করে দেয়, তাহলে কেন্দ্রীয় সরকার প্রয়োজনে নতুন আইনও আনতে পারে।
এই ঐতিহাসিক রায় দিতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি জে এস খেহর সেই আ‌ইন তৈরির পক্ষেই মত দেন। বলেন, আগামী ছ’ মাস তিন তালাক প্রথা বন্ধ থাকবে এবং এই সময়ের মধ্যে কেন্দ্র নতুন আইন আনবে। তাঁকে সমর্থন করেন বিচারপতি এস আবদুল নাজির। একইসঙ্গে এই দুই বিচারপতি বক্তব্য, তিন তালাক সংবিধানের ১৪, ১৫, ২১ এবং ২৫ অনুচ্ছেদকে লঙ্ঘন করছে না। অর্থাৎ সমানাধিকার , নাগরিকের মধ্যে ভেদাভেদ না করা, ব্যক্তি স্বাধীনতার সুরক্ষা, ব্যক্তিগত পছন্দের ধর্ম পালনের মৌলিক অধিকারের মতো বিষয়গুলি লঙ্ঘন করছে না। তবে দুই বিচারপতি এ কথা বললেও সম্পূর্ণ উলটো কথা বলেন সাংবিধানিক বেঞ্চের অপর তিন বিচারপতি। দুই বিচারপতির মতের বিপরীতে গিয়ে রায় দেন বাকি তিন বিচারপতি ক্যুরিয়ন জোসেফ, রোহিংটন ফলি নরিম্যান এবং উদয় উমেশ ললিত। তাঁদের রায়, একসঙ্গে পরপর বলা তিন তালাক সম্পূর্ণ অবৈধ এবং অসংবিধানিক। তাই শেষমেশ পাঁচ বিচারপতির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ট অংশ (তিনজন) তিন তালাকের বিরোধিতা করায় ৩৯৫ পাতার রায়ের শেষে সিদ্ধান্ত হিসেবে স্পষ্ট লেখা হল, মত বিরোধ থাকলেও ৩:২ সংখ্যাগরিষ্ঠে  ‘তালাক-ই-বিদ্দাৎ’ প্রথা বাতিল করা হল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, তিন তালাকের শুনানির জন্য প্রায় সর্ব ধর্মের প্রতিনিধিত্বের কথা মাথায় রেখে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ তৈরি করেছিলেন দেশের প্রধান বিচারপতি জে এস খেহর। যিনি নিজে একজন শিখ। বাকি চার বিচারপতিরা হলেন খ্রিস্টান, পারসি, হিন্দু এবং মুসলমান।

Advertisements