স্কুলে যদি সরস্বতী পুজো হতে পারে, তাহলে নবী দিবস কেন নয়

স্কুলে যদি সরস্বতী পুজো হতে পারে, তাহলে নবী দিবস কেন নয় ? – পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে নতুন বিতর্কের সুত্রপাতঃ

বিদ্যালয়টিতে তারাই শতকরা আশি শতাংশ। অতয়েব মাত্র কুড়ি শতাংশের জন্য সেখানে সরস্বতী পুজো হতে পারলে, তাদেরও নবি দিবস পালনে আপত্তি কোথায়? প্রশ্ন তুলে ৭ দিন ধরে বন্ধ স্কুল; ব্যহত আসন্ন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পড়ুয়াদের ফর্ম ফীলাপের কাজ। অবশেষে ১৫ মিনিটের জন্য নবি দিবস পালন করতে দিতে হবে এই শর্তেই কোনমতে সাত দিন পর খোলার অনুমতি পেল উলুবেড়িয়ার তেহট্ট উচ্চ বিদ্যালয়।

স্কুলে পালন করতে হবে নবীর জন্ম দিন। কোনমতেই ওই দিন স্কুল বন্ধ রাখা চলবে না। স্কুলের মধ্যেই করতে হবে উৎসবের আয়োজন। কারণ স্কুলে প্রতি বছর সরস্বতী পুজো করা হয়। নবী দিবস পালন না করা হলে ওই স্কুলে সরস্বতী পুজোও বন্ধ করতে হবে। এমনই ইসলামিক ফতোয়া সব না মানার কারণে গত সাত দিন ধরে বন্ধ হয়ে রয়েছে উলুবেড়িয়ার তেহট্ট হাই স্কুল।

নবী দিবসের কারণে গত ১২ই ডিসেম্বর সোমবার স্কুল ছুটি ছিল। কিন্তু, পরদিন অর্থাৎ মঙ্গলবার এলাকায় পালন করা হয় নবীর জন্ম দিবস। ওই দিন অর্থাৎ ১৩ই ডিসেম্বর স্কুল খোলা থাকায়, উলুবেড়িয়া দু’নম্বর ব্লকের অন্তর্গত বাসুদেবপুর তেহট্ট হাই স্কুলে তখন ক্লাস চলছিল পুরোদমে। খবরে প্রকাশ, এই সময়েই স্কুলের পাশ দিয়ে নবী দিবসের মিছিল থেকে আচমকা স্কুলে ঢুকে পড়ে বেশ কিছু মুসলিম যুবক। প্রধান শিক্ষক উৎপল মল্লিকের কাছে স্কুলে নবীর জন্মদিবস পালনের দাবি জানায় ওই যুবকেরা। প্রধান শিক্ষক উৎপল ভৌমিক তাতে রাজি হননি। বলেন, “স্কুলে এধরনের কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা যাবে না।” দাবি না মানায় দীর্ঘক্ষন আটকে রাখা হয় স্কুলের প্রধান শিক্ষককে। শুধু তাই নয়, স্কুলের মধ্যে টাঙিয়ে দেওয়া হয় চাঁদ-তারা মার্কা ধর্মীয় সবুজ পতাকা। পুলিশের তৎপরতায় অবশেষে মুক্তি মেলে প্রধান শিক্ষকের। যদিও বন্ধ করে দেওয়া হয় হাওড়া জেলার তেহট্ট হাই স্কুল। শুধু তাই নয়, স্কুল চত্বরের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় নবী দিবসের অনুষ্ঠান সভা। অভিযোগ, হামলাকারীদের মধ্যে ছিলেন হুগলির ফুরফুরা শরিফের ইমাম ত্বহা সিদ্দিকির ভাই পীরজাদা কাশেম সিদ্দিকি। এছাড়াও জানা গেছে, ওই স্কুলের তিনজন মাত্র মুসলমান শিক্ষক, বাকিরা সকলেই হিন্দু। যদিও হামলার সময়ে তাদের প্রতিক্রিয়া জানা যায় নি।

সেদিনের মতো ঝামেলা মিটে গেলেও তার রেশ আজও অবধি চলেছে। স্কুলে নবী দিবস পালন না করলে দেখে নেওয়া হবে, এখনও এধরনের হুমকি পাচ্ছেন প্রধান শিক্ষক সহ স্কুলের অন্যান্য শিক্ষক শিক্ষিকারা। স্বভাবতই স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে ছাত্রছাত্রী থেকে শিক্ষক শিক্ষিকা সকলেই। সাতদিন ধরে তাই বন্ধ রয়েছে স্কুল। প্রধান শিক্ষক উৎপল ভৌমিক জানিয়েছিলেন, তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না পুলিশ প্রশাসন নিরাপত্তার আশ্বাস দিচ্ছে ততক্ষণ তাদের পক্ষে স্কুলে আসা সম্ভব নয়।

এমত পরিস্থিতিতে অচলাবস্থা কাটাতে উদ্যোগী হয় স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যাক্তিরা। শেষমেশ, ১৫ মিনিটের জন্য নবি দিবস পালন করতে দিতে হবে, অবশেষে এই শর্তেই আজ সাত দিন পর উলুবেড়িয়ার তেহট্ট উচ্চ বিদ্যালয় খোলার অনুমতি দেয় এলাকার মুসলমানেরা। স্কুলের অচলাবস্থা কাটাতে আজ বিকেলে উলুবেড়িয়া মহকুমা শাসকের দপ্তরে স্কুল ও ফুরফুরা শরিফ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে বসে প্রশাসন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, এবছর স্কুলের ভিতরে ১৫ মিনিটের জন্য নবি দিবস পালন করতে দেওয়া হবে। তবে, স্কুলে টাঙানো যাবে না ধর্মীয় পতাকা। স্কুল সূত্রে খবর, এই শর্তে শেষপর্যন্ত আগামীকাল বুধবার অর্থাৎ ২১শে ডিসেম্বর থেকে পুনরায় খুলতে চলেছে স্কুলটি। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মহকুমাশাসক আনশুল গুপ্তা, ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা কাশেম সিদ্দিকি ও প্রধান শিক্ষক উৎপল ভৌমিক।

বৈঠকের পর প্রধান শিক্ষক উৎপল ভৌমিক বলেন, মহকুমাশাসক আনশুল গুপ্তার উপস্থিতিতে দু-পক্ষের আলাপ আলোচনার পর স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এখন বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের ফর্ম ফিলাপ চলছে। সেকারণে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানটি পরে কোন একদিন পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঠিক কবে? – বৈঠকে উপস্থিত থাকলেও এই নিয়ে মুখ খুলতে চাননি ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা কাশেম সিদ্দিকি।

পক্ষান্তরে আজকের প্রশাসনিক বৈঠকে মৌলবাদীদের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে, যেহেতু স্কুলে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হবে, এই শর্তেই শেষ পর্যন্ত রফা হয়, তাই এই সিদ্ধান্তের জেরে বেশ কিছু নতুন প্রশ্নের-ও উদ্ভব হয়েছে। তবে কী এবার থেকে স্কুলে ইসলামিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের-ও অনুমতি দেওয়া হবে ? অনেকে বলেছেন, এক্ষেত্রে যুক্তি হতে পারে, স্কুলে যদি সরস্বতী পুজো হতে পারে তাহলে নবী দিবস নয় কেন ? এক্ষেত্রে বিপরীত গোষ্ঠীর লোকজন বলছেন – সরস্বতী বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। স্কুল-কলেজে পুজিতা হন বহু বছর ধরে। তাই সরস্বতী পুজো এই বাংলার স্কুলে স্কুলে পালিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। গান-বাজনা-শিক্ষার পরিধির মধ্যে তার অবাধ সশ্রদ্ধ বিচরণ। অতয়েব এর সঙ্গে মৌলবাদের ফতোয়া’কে গুলিয়ে ফেলা সমীচীন নয় কোনওমতেই । এখন নতুন করে ইসলামিক ধর্মাচার জোর করে স্কুল-কলেজে শুরু করলে, তাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষুণ্ণ হবে না তো ?

এই যুক্তি এবং পাল্টা যুক্তির মাঝেই প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এবছর পুজোর সময় এরকমই একটি মামলায় রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন মহামান্য কলকাতা হাইকোর্ট। সেক্ষেত্রে, দশমীর পরের দিন মহরম ছিল বলে কলকাতা পুলিশ দশমীর দিন বিকেল ৪টের পর থেকে বিসর্জন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। সেসময়, সেই সংক্রান্ত মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতি সরকারি সিদ্ধান্তের রীতিমতো তীব্র ভর্ৎসনা করেন। তুলে আনেন এলাহাবাদের তাজিয়া প্রসঙ্গও। বলেন ভারতের সবচেয়ে বড় তাজিয়া বেরোয় এলাহাবাদে। তথাপি তারাও দশেরার জন্য তাজিয়া শোভাযাত্রা একদিন পিছিয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন তোলেন, এরাজ্যে কেন তাজিয়ার সময় আগে/পেছনে করা গেল না ? “ তবে কি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এলেও সরকার নিজেদের সুরক্ষিত বলে মনে করছেন না? ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন ইদ পড়লে প্রজাতন্ত্র দিবসের মহড়া ছেড়ে কি ইদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে রেড রোড ?” প্রশ্ন তোলেন তা নিয়েও। এই প্রশ্নেই সরাসরি ইঙ্গিত ছিল সরকারী তীব্র নির্লজ্জ তোষণনীতির। রাজনৈতিক মহলের একাংশের ইঙ্গিত এবারে সেই দিকেই। অতয়েব, নতুন করে ধর্মীয় আচার আচরন স্কুলে শুরু করে কি সেই পথেই এগোচ্ছে সরকার? – প্রশ্ন উঠছে তা নিয়েই।

Advertisements