যশোর ও কলকাতার ইতিহাস

আজকের কলকাতা-সহ নদীয়া এবং চব্বিশ পরগণা যশোর রাজ্যের মধ্যে ছিল প্রতাপাদিত্যের সময়ে। তারও আগে এই যশোরকে প্রাচীন যুগে বলত উপবঙ্গ। ভাগীরথী নদীর পূর্বপার থেকে প্রকৃতপক্ষে পূর্বের বাঙালদেশের সীমানা শুরু হয়ে যেত এককালে। যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যর জীবনী রামরাম বসু যখন ১৮০১ সালে প্রথম লিখছেন, যা হবে প্রথম বাংলা গদ্যের বই, লিখছেন কলকাতায় বসে, তখন সেই প্রাচীন যশুরে স্মৃতি অবশ্যই কাজ করছে। যশোর রাজ্যের সেনাপতি শঙ্কর চক্রবর্তী ছিলেন বারাসাতের ছেলে। বাগবাজারে ছিল রাজা প্রতাপের অন্যতম দুর্গ, ১৭৫৬ সালে সিরাজের কলকাতা আক্রমণের সময়েও সে দুর্গ টিঁকে ছিল। আজকের কালীঘাটের বর্তমান মন্দিরটি স্থাপন করার পেছনে যশোর রাজ্যের ছোটতরফের রাজা বসন্ত রায়ের ভূমিকা ছিল। এরপর  প্রতাপাদিত্যকে হারিয়ে “তিন মজুমদারে বাংলা ভাগ” হয়েছিল বলা হয়। এই সময় মোগলের সঙ্গে কোল্যাবরেট করে তিনজন ব্যক্তি প্রতিপত্তিশালী হয়ে ওঠেন, এরা প্রত্যেকে প্রতাপের বিরুদ্ধে মোগল সেনাকে সাহায্য করেছিলেন, পুরস্কারস্বরূপ যশোর রাজ্য এদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে দেওয়া হয়।। এদের একজন নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বপুরুষ, আরেকজন সপ্তগ্রামের বাঁশবেড়িয়ার রাজবংশ স্থাপন করেন। তৃতীয় জন কলকাতার সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের পূর্বপুরুষ।

কলকাতা, যশোরের অংশ কলকাতা, একটু দুষ্টুমি করে বললে উপবাঙাল কলকাতার একটা ইতিহাস, একটা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা খুব দরকার। সেই পালরাজ্যের যুবরাজ যিনি সন্ন্যাসী হয়ে গেছিলেন সেই চৌরঙ্গীনাথের সময় থেকে শুরু করতে হবে, যার নামে আজকের চৌরঙ্গী। মধ্যযুগে ১৪১৫ সালে মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল কলকাতার উল্লেখ করছে। ১৫৯৬ সালে আইন ই আকবরিতে কলকাতার উল্লেখ আছে। এই কলকাতা বাঙালির মধ্যযুগের অস্তিত্বে মহীরুহের সুপ্ত বীজ। ১৪৯৯ থেকে ১৫০৬ সালের মধ্যে কোনও এক সময় নানক এসেছিলেন কলকাতায় ধর্মপ্রচার করতে, এখানে বেশ কিছুদিন ছিলেন।

কলকাতা যে আগামী দিনে বাণিজ্যকেন্দ্র সপ্তগ্রামের স্থান নেবে, তা সেদিনই স্থির হয়ে গেছিল যেদিন শেঠ বসাকরা এখানে এসেছিলেন সপ্তগ্রাম ছেড়ে ১৫৩৭ সালে। সরস্বতী নদী শুকিয়ে আসছিল। এরপর শেঠ বসাকরা একটা বিরাট তন্তুবয়ন ওয়ার্কশপ স্থাপন করেছিলেন গোবিন্দপুর গ্রামে (আজকের ময়দান, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল থেকে শুরু করে অ্যাকাডেমি নন্দন চত্ত্বর অবধি ছিল এই গোবিন্দপুর। আজ নন্দন যে পুকুরের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম ছিল বির্জিতলাও, ওই এলাকার নাম ছিল বির্জি)। তাতে বহু শ্রমিক কাজ করত, এবং ইংরেজ আসার বহু আগের কথা সেটা। ১৬৩২ সালে শেঠ বসাকদের গোবিন্দপুরের টেক্সটাইল ওয়ার্কশপে ২৫০০ শ্রমিক কাজ করত, জানা যাচ্ছে। কলকাতায় আর্মেনীয়রা এসেছিল, এবং রেজা বিবি  নামে এক আর্মেনিয়ান মহিলার সমাধি পাওয়া যাচ্ছে কলকাতায়, সময়কাল ১৬৩০ সাল। এই রেজা বিবির বর ছিলেন সুকিয়াস, তারই নামে সুকিয়া স্ট্রিট, এরকম একটা মত আছে। সঞ্জীব সান্যালের সাম্প্রতিক বই, ওশেন অভ চার্ন বলছে, সেযুগে প্রধান আন্তর্জাতিক পণ্য ছিল টেক্সটাইল।

ইংরেজরা নাকি নিতান্তই অ্যাক্সিডেন্টর ফলে হুগলি নদীর তীরে পা রেখেছিল, এখানে না এসে মহানদীতে গেলে উড়িষ্যাতেই রেনেসাঁস হয়ে যেত, তথাগত রায় বলেছিলেন। ইতিহাস একদল বাঙালি আজও জানে না। বঙ্কিমের সেই বিখ্যাত উক্তি “বাঙালির ইতিহাস চাই, নইলে বাঙালি মানুষ হবে না”-র এত বছর পরেও যে অনেক বাঙালি নিজের ইতিহাস জানে না, তথাগত রায়রা তারই প্রমাণ দেন বারবার। সুতানুটী নামটাও এসেছে ওই টেক্সটাইল শিল্পের বাড়বাড়ন্ত থেকেই। বাঙালির কলকাতার শ্রী ইংরেজ আসার আগে কিরকম ছিল, সেটা ইংরেজরা যে দিল্লির বাদশাকে ১৬০০০ টাকা দিয়েছিল এই তিনটে গ্রাম সুতানুটী, কলকাতা, গোবিন্দপুরের প্রজাসত্ত্ব কেনার জন্য ১৬৯৮ সালে, তা দেখলে টের পাওয়া যায়। সাবর্ণদের ১৩০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সাবর্ণরা তো দেওয়ার মালিক নয়, মোগল আমলে সমস্ত জমিই বাদশার, লোকে প্রজাসত্ত্ব (রেভেনিউ রাইট) কিনতে পারে কেবল, তো কলকাতার সেই প্রজাসত্ত্ব কিনতে বাদশার ফরমান আনতে হয়েছিল। এঁদো জমির জন্য কে ১৬০০০ টাকা দেয়? কলকাতা যদি গণ্ডগ্রাম হত, সেযুগে এই পরিমাণ টাকার ঝুলি হাতে নিয়ে বাদশার দ্বারস্থ হত না ইংরেজ।

বাঙালির কলকাতা অনেক পুরোনো। ইংরেজ জব চার্নক যে কলকাতার স্রষ্টা নন, সেটা কলকাতা হাইকোর্ট ২০০৩ সালে একটা রায়ে স্পষ্ট করে দিয়েছিল। ইংরেজ শাসনের শুরুর দিকে ১৭৮৩ সালে কালীঘাটে অনেকগুলি গুপ্তযুগের স্বর্ণমুদ্রা মিলেছিল। এই অঞ্চলে সভ্যতা বহু প্রাচীন। মহাশক্তিশালী যশোর রাজ্যের অংশ তো বটেই। তারও আগে পালযুগে দক্ষিণবঙ্গের এই অঞ্চল ছিল ব্যাঘ্রতটীমণ্ডল নামে খ্যাত, কলকাতা তার অংশ। আর গঙ্গারিডিদের সময়ে কলকাতার সামান্য উত্তরে চন্দ্রকেতুগড়ে ছিল গঙ্গারিডি সাম্রাজ্যের রাজধানী। সেনযুগেও বল্লাল সেনের একটি দানপত্রে কালীক্ষেত্রর উল্লেখ আছে, তা যে কলকাতা, সেটা নিয়ে সন্দেহ নেই।

ইংরেজরা বাংলা দখল করে ১৭৫৭ সালে। ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব ১৭৬০ সালে। এ দুয়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। বাঙালির সমৃদ্ধি বরাবরই ছিল, ইংরেজ আমাদের ছিবড়ে করতে এসেছিল, আমাদের আলাদিনের প্রদীপ দেখিয়ে রাতারাতি সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় নগরী বানাতে নয়। মধ্যযুগে সপ্তগ্রামের সমৃদ্ধি যা ছিল, তার কাছে লণ্ডন শহর ম্লান।

আমার কলকাতা জীবন কেটেছে যশোর রোডের খুব কাছে। যশোরের লোকেদের উপনিবেশে কাটিয়েছি ছেলেবেলা। শ্যামবাজার থেকে যে যশোর রোড শুরু হচ্ছে, তা একদিন কলকাতাকে তার শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত করত। সে নামটা রেখে দিয়েছে বাঙালি, পালটায় নি। অবচেতনে কি পূর্বমানুষের স্মৃতি সে আজও বহন করে চলে?
Dr. Tamal Dasgupta