তারপরেও এই সংস্কৃতি নাকি – ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি???

– বাদল চন্দ্র সাহা

আজকাল খুব একটা কথার প্রচলন হয়েছে – “দলিত সমাজ” অত্যাচারিত, ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দ্বারা অত্যাচারিত!! এবং এই অত্যাচারের ফলেই নাকি বহু নিম্ন বর্ণের হিন্দু ধর্মান্তরিত হয়েছেন – বলা ভালো মুসলিম হয়েছেন, খৃষ্টান হয়েছেন – সেই বহুকাল আগে থেকে! হিন্দু সমাজ বা হিন্দু সংস্কৃতি – নাকি ব্রাহ্মণ্যবাদী!! একটু আদিকাল থেকে দেখে আসা যাক

শ্রুতি থেকে বেদ যখন লিপিবদ্ধ হয় – যিনি লিপিবদ্ধ করেন – সেই ব্যাসদেব, তিনি ব্রাক্ষণ ছিলেন না ! ব্রাহ্মণ যখন পৈতা ধারণ করেন – তাঁকে যে “গায়ত্রী”মন্ত্র জপ করতে হয় সেই গায়ত্রী মন্ত্রের যিনি দ্রষ্টা – মহর্ষি বিশ্বামিত্র – তিনি জাতিতে ব্রাক্ষণ ছিলেন না! দেবতারা যাঁর সাহায্যে – স্বর্গ পুনরুদ্ধার করেন এবং যাঁর আত্মত্যাগ জগৎ স্মরণীয়, সেই দধীচি মুনি – শূদ্র ছিলেন – ব্রাহ্মণ ছিলেন না! যাঁকে দক্ষিণ ভারতের উদ্ধারকর্তা বলা হয় – সেই অগস্ত্য মুনি – শূদ্র ছিলেন, ব্রাক্ষণ ছিলেন না! এরপরেও হিন্দু সংস্কৃতি ব্রাহ্মণ্যবাদী ?

ত্রেতা যুগে রচিত রামায়ণ – যিনি রচনা করলেন – মহর্ষি বাল্মীকি, ব্রাক্ষণ ছিলেন না(আজও দেখুন – উত্তর প্রদেশের বাল্মীকি যাঁরা, তাঁরা এস.সি.)! রামায়ণে সব থেকে শ্রদ্ধেয় চরিত্র – রাম, ক্ষত্রিয় ছিলেন – ব্রাক্ষণ নয়! শ্রীরামের যুদ্ধ যাঁর বিরূদ্ধে – তিনি রাবণ, রাবণ ব্রাক্ষণ ছিলেন! এরপরেও হিন্দু সংস্কৃতি – ব্রাহ্মণ্যবাদী?

মহাভারতে তিন নীতির যুদ্ধ! ধর্মনীতি, রাজনীতি এবং কূটনীতি! ধর্মনীতি যিনি ধারণ করে আছেন তিনি শ্রীকৃষ্ণ! রাজনীতি যিনি ধারণ করে আছেন – তিনি মহামতি বিদুর! আর কূটনীতির ধারক – শকুনি ! ভারতীয় সভ্যতার প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রধানমন্ত্রী যাঁকে বলা হয় – সেই মহামতি বিদুর – ব্রাক্ষণ ছিলেন না, ছিলেন দাসীর পুত্র! মহাভারত যুগে শ্রীকৃষ্ণের পর যিনি সব থেকে জ্ঞানী ব্যক্তি – সেই মহামতি বিদুর শূদ্র ছিলেন – ব্রাক্ষণ ছিলেন না ! এরপরেও হিন্দু সংস্কৃতি ব্রাহ্মণ্যবাদী ?

প্রাচীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ তিন রাজবংশ – নন্দ বংশ (শূদ্র), মৌর্যবংশ(শূদ্র) এবং গুপ্ত বংশ(বৈশ্য) ! এঁরা কেউ ব্রাক্ষণ ছিলেন না ! এরপরেও যাঁদের রাজত্বের বিস্তৃতি, প্রায় মোগলদের রাজত্বের ভূখণ্ডের সমান বিস্তৃতি ছিল – সেই পালবংশও ব্রাক্ষণ ছিল না ! এমন কি সেন বংশও ব্রাক্ষণ ছিল না ! তাহলে কখন ব্রাহ্মণ্যবাদীরা অব্রাক্ষণদের উপর অত্যাচার করেছিলো বলতে পারেন ? যখন প্রাচীন সব গল্পই দেখা যায়, দরিদ্র ব্রাক্ষণ – ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে প্রতিদিন ভিক্ষা করতে বের হচ্ছেন, ঘরে ব্রাক্ষণপত্নী পথ চেয়ে আছেন – কখন ব্রাক্ষণ ফিরবেন, ভিক্ষা নিয়ে – তারপর রান্না হবে – সেই ব্রাক্ষণগণ অত্যাচারী ?

আধুনিক যুগের ভারতের দিকপুরুষ – যিনি ব্রাক্ষণশ্রেষ্ঠ শ্রী রামকৃষ্ণের শিষ্য এবং যিনি রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা করেন, সেই স্বামী বিবেকানন্দ ব্রাক্ষণ ছিলেন না! ভারত সেবাশ্রম সংঘের প্রতিষ্ঠাতা প্রণবানন্দ মহারাজ – ব্রাক্ষণ ছিলেন না! আজ সারা বিশ্বে শ্রীকৃষ্ণ নাম মাহাত্ম্য বিতরণ, মন্দির প্রতিষ্ঠা হচ্ছে- যেই সংঘঠনের মাধ্যেমে – সেই “ইসকন” এর প্রতিষ্ঠাতা শ্রীল প্রভুপাদ – ব্রাক্ষণ ছিলেন না! তাহলে বলতে পারেন – কোথায় এই সংস্কৃতি ব্রাহ্মণ্যবাদী????

হ্যাঁ এঁরা সকলেই – নিজ কর্ম গুণে ব্রাক্ষণ শ্রেষ্ঠ, এবং কর্ম দ্বারাই ব্রাক্ষণ ! গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন – তিনি গুণ ও কর্মের ভিত্তিতে চারিবর্ণের সৃষ্টি করেছেন ! চার জাতি নয় !

আমাদের সংস্কৃতি কখনো কারও মাঝে বিভেদ রাখেনি! নাহ্ – ব্রাক্ষণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র – কারো মাঝে না ! ব্রাক্ষণশ্রেষ্ঠ শংকরাচার্য যেমন – মেথর কে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে পিছপা হননি, তেমনই – আমাদের সংস্কৃতি – পিছপা হয়নি শূদ্র থেকে ব্রাক্ষণকে সম্মান জানাতে ! আমাদের সংস্কৃতি – ব্রাক্ষণ শ্রেষ্ঠ শংকরাচার্য, রামকৃষ্ণ দেব, চৈতন্য মহাপ্রভু সবাই কে সম্মান দিয়েছে – তাঁদের কৃতকর্মের জন্য!

তবে কি – সেই সমাজে বা এই সমাজে বিভেদ ছিলো না – অত্যাচার ছিলো না? অবশ্যই ছিলো – সেটা ধনী দরিদ্রের বিভেদ, দরিদ্রের উপর ধনীর অত্যাচার! তাহলে – কেনই বলা হয় – নিম্নজাতির প্রতি উচ্চজাতির অত্যাচার ছিল? কারণ – হাজার বছর পূর্বে সৃষ্টি হওয়া একটি চক্রান্ত যা আড়াই শত বছর পূর্বে আরও জোরদার হয় এবং এই হিন্দু সমাজ কে ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য যা – আজও সমান তালে চলছে ! না হলে বলুন তো প্রায় দুই কোটি “মতুয়া” সম্প্রদায় কেনো ইসলামিক পূর্ব পাকিস্থান বা ইসলাম প্রধান বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে এসে – ভারতে আশ্রয় নিতে হয় ? যদি – উচ্চবর্ণের অত্যাচারে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা মুসলিম হয়ে থাকে? আজও কেনো বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসতে হয় – প্রধানতঃ নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ! বাংলাদেশ সংলগ্ন বর্ডার সাইট গুলি লক্ষ্য করুন – দেখবেন, বেশীর ভাগই তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দু ! কেনো – তাঁরা আজও মুসলিম নয় ? কারণ – যা আমাদের ইতিহাস পাল্টে গুলে খাওয়ানো হচ্ছে – তা ভুল ইতিহাস ! উল্লেখ করা যেতে পারে – পূর্ব পাকিস্থানের মন্ত্রী – যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের কথা! তাঁকে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে আসতে হয়েছিলো – তিনি ক্ষমা পাননি – তিনি নিম্ন বর্ণের হিন্দু হলেও !

কোন সমাজ – ব্রাহ্মণ্যবাদী ছিলো ? কিভাবে ছিলো ? যেখানে হিন্দুদের সাতটি গোত্রই চতুর্বর্ণে দেখা যায় ! যেমন – ভরদ্বাজ গোত্র, ব্রাক্ষণের যেমন আছে তেমনি শূদ্রদেরও আছে ! কাশ্যপ গোত্র – ব্রাক্ষণ থেকে শূদ্র সবার মধ্যে আছে ! এতেই কি প্রমাণ হয় না – হিন্দুরা সাম্য? প্রাচীন তিনটি উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র, তক্ষশিলা – নালন্দা – কাশী তে দেখুন তো ক’জন ব্রাক্ষণ পণ্ডিত ছিলেন আর ক’জন অব্রাক্ষণ পণ্ডিত! তারপরেও এই সংস্কৃতি নাকি – ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতি???

সর্বশেষ উদাহরণ :- দলিত সম্প্রদায়ের – রামজী মালোজী শাকপাল ও ভীমারাই’র চৌদ্দতম তথা কনিষ্ঠ পুত্র ভীমরাও কে যিনি পুত্ররূপে “ভীমরাও অাম্বেদকর” নামে সারা পৃথিবী কে চিনিয়েছেন – তিনি ব্রাক্ষণ সম্প্রদায়ের “মহাদেব আম্বেদকর” (লক্ষ্য রাখুন – আম্বেদকর surname টি মারাঠি ব্রাক্ষণ surname) এবং যিনি – বাবাসাহেব ডঃ ভীমরাও রামজী আম্বেদকর কে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছিলেন – তিনি বরদা’র মহারাজা – সায়াজী রাও একজন ব্রাক্ষণ!

হিন্দু সংস্কৃতি কে ভাঙতে যাঁরা তখন থেকে এখন একই ভাবে চক্রান্ত করে গেছেন – তাদের কে উপযুক্ত জবাব দেওয়ার সময় এখনই ! কারণ আপনিও আপনার কর্মগুণে ব্রাক্ষণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র!
“ব্রাক্ষণ আমার ভাই – চন্ডাল আমার ভাই – সবার শরীরে মানুষেরই রক্ত !”