ডঃ তমাল দাশগুপ্তর কলম

মহাভারত অশুদ্ধ হওয়া নিয়ে যে ইডিয়মটি আছে বাংলাভাষায়, সেটার উৎস কি?

আমি স্কুলজীবনে ক্লাস সেভেনের সংস্কৃত হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় সেটা টের পেয়েছিলাম। হাড়ে হাড়ে।

এই মহাভারত অশুদ্ধ হওয়ার প্রবাদটা এইভাবে তৈরি হয়েছে।

সংস্কৃত ভাষায় বিন্দুবিসর্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যই “বিন্দুবিসর্গ না জানা” প্রবাদের জন্ম হয়েছিল। বিন্দুবিসর্গ যে জানে না, সে কিছুই জানে না।

এই একটা বিসর্গ যদি, ধরা যাক, মহাভারতের হাতে লেখা একটা পাণ্ডুলিপিতে মিসিং হয়ে যায়, তাহলে পুরো বিশালাকার মহাভারতটাই অশুদ্ধ হয়ে পড়বে।

বলা বাহুল্য, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতেরা এই বিষয়টাকে যেভাবে নেন, সাধারণ মানুষে তো আর সেভাবে নেয় না। তাই মহাভারত অশুদ্ধ কথাটা মুখে মুখে চালু হয়েছিল। অর্থাৎ কি আর এমন ক্ষতি হয়েছে, কি আর এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে, এরকম অর্থেই এই প্রবাদের ব্যবহার।

আমি ক্লাস সেভেনের ষাণ্মাসিক পরীক্ষার সংস্কৃত খাতা হাতে পেয়ে দেখি, আমার নম্বর উঠেছে সাড়ে নিরানব্বুই। অবাক হবেন না, একটা কথাই প্রচলিত ছিল, যে সংস্কৃতে অঙ্কের মত নম্বর ওঠে। সাহিত্য নয়, আমাদের শেখানো হত ভাষা। মানে লিটারেচার নয়, আমরা ল্যাঙ্গুয়েজ শিখতাম। আর ল্যাঙ্গুয়েজে একশোয় একশো, অঙ্কের মতই, তোলা সম্ভব। শব্দরূপ ধাতুরূপ ঠিকঠাক লিখলেই হল।

অন্য লোকে হলে তো সাড়ে নিরানব্বুই পেয়ে আহ্লাদে আটখানা হত। কিন্তু আমি বরাবরই একটু বেশি পাকা, আমি ভাবতে শুরু করলাম যে বাকি আধখানা নম্বর আবার কিসে গেল রে বাবা!

তারপরে খাতায় দেখি একজায়গায় শব্দরূপে বিসর্গ বসাইনি বলে আধ নম্বর কেটেছেন স্যার।

আমি খাতা নিয়ে গিয়ে বিনয়ের সঙ্গে অনুনয় মিশিয়ে বললাম, স্যার, এই আধখানা নম্বর যে কেটেছেন একটা বিসর্গ না দেওয়ার জন্য, সেটা একটু কনসিডার করা যায় না?

সংস্কৃতের স্যার, তার নাম ছিল শ্রী গান্ধীচরণ মাইতি (নামেই মালুম, তার বাবা বেজায় গান্ধীভক্ত ছিলেন, আর ছিলেন মেদিনীপুরিয়া), মধুর হেসে বললেন, তা কনসিডার করা যায় বই কি। ওটা আধ নম্বর না, এক নম্বরই কাটা উচিত।

বলে আমার খাতার ওপরে নিরানব্বইয়ের সাড়েটা বাদ দিয়ে দিলেন।

বোঝো। একেই হিন্দিভাষীরা বলে, লেনে কে দেনে পঢ় গ্যয়ে।

আরেকটি ছেলে, তার নাম ছিল শশাঙ্ক (আমরা যথারীতি শশা বলে ডাকতাম তাকে), সে পেয়েছিল সাড়ে ছিয়ানব্বই, তার কি একটা উত্তরে স্যার নম্বর কম দিয়েছেন এই অভিযোগে সে তখনই স্যার সকাশে হাজির হচ্ছিল, এবং বোধহয় আমার ওপরে প্রতিশোধটি আরও মধুর করে তোলার অভিপ্রায়ে গান্ধীবাবু তার নম্বরটা তিন বাড়িয়ে দিলেন, শশাঙ্ক হয়ে গেল সাড়ে নিরানব্বই।

গান্ধীবাবু ঘোষণা করলেন, সাড়ে নিরানব্বই মানেই একশো।

সেদিন টিফিনে গোটা স্কুল জুড়ে শোরগোল পড়ে গেছে। একদল ক্লাস এইটের ছেলে দেখি ব্যাটবল না পিটিয়ে ব্যস্তসমস্ত হয়ে আলোচনা করছে, জানিস, সেভেন বি সেকশনের শশাঙ্ক বিশ্বাস সংস্কৃতে একশোয় একশো পেয়েছে।

আমি তখন পাশ দিয়েই যাচ্ছিলাম। একজন অবিশ্বাস প্রকাশ করছিল, তো তাকে কনভিন্স করানোর জন্য আমায় পাকড়ে ধরে আরেকজন বলল, এই তো, এও ওই সেভেন বি তেই আছে, এই, তোদের ওই শশাঙ্ক ছেলেটা সংস্কৃতে একশোয় একশো পেয়েছে না?

আমারই কাটা ঘায়ে এভাবে নুনের ছিটে পড়ার ছিল। আমি শুকনো মুখে বললাম, না, একশোয় একশো পায়নি মোটেই, সাড়ে নিরানব্বই পেয়েছে…

তারা আমায় থামিয়ে দিয়ে, ধ্যাত, যত্ত বাজে কথা, বলে আবার নিজেদের মধ্যে উত্তেজিত আলোচনায় মগ্ন হয়ে পড়ল।

সেই থেকেই আমার চূড়ান্ত গান্ধী বিদ্বেষের শুরু, নামটাই সহ্য হয় না

Advertisements