ইসলামে ব্যভিচারের শাস্তি এবং ছাগলে খেয়ে ফেলা কোরানের পাথর ছুড়ে হত্যার আয়াত

আল্লাহ ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে পাথর-ছুড়ে হত্যার বিধান সম্বলিত এক আয়াত নাজিল করেছিলেন এবং নবী আয়াতটি তাঁর শিশু-স্ত্রী আয়শার হেফাজতে রেখেছিলেন, যা নাকি আয়শার অসতর্কতার কারণে ছাগলে খেয়ে ফেলে। ফলে আয়াতটি বিদ্যমান কোরানে সংকলিত হয় নি।

ব্যভিচারীদেরকে পাথর ছুড়ে হত্যার ঐতিহ্যের সূচণা ইসলামের জন্মলগ্ন থেকেই এবং আজও বেশকিছু মুসলিম দেশে বিদ্যমান, যদিও অনেক মুসলিম দেশ পাশ্চাত্য প্রভাবে এ-বর্বর শাস্তির প্রথাটি পরিহার করেছে। বর্তমান বিশ্বে ইরান, সৌদি আরব, মুসলিম-প্রধান উত্তর নাইজেরিয়া, তালেবান-শাসিত আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের অংশ-বিশেষ এবং ইসলামপন্থীদের নিয়ন্ত্রিত সোমালিয়ার অঞ্চল-বিশেষে ব্যভিচারের দায়ে পাথর ছুড়ে হত্যা আইনি শাস্তি। ২০০৯ সালে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে ব্যভিচারীদেরকে পাথর ছুড়ে হত্যার আইন চালু করা হয়।

শরীয়া-শাসিত দেশ, যেমন ইরান ও সৌদি আরবে পাথর-ছুড়ে হত্যা আইনি বিধান হওয়ায় দোষীদেরকে নিয়মিত পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয়, কিন্তু বহির্বিশ্বে তা সামান্য প্রচার পায়। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যভিচার ও বিবাহ-বহির্ভূত যৌনাচারের দায়ে দোষীদেরকে পাথর ছুড়ে হত্যার খবর এসেছে সুদান, তুর্কি, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান ইত্যাদি দেশ থেকে, যা অনেক সময় আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে স্থানীয় আদালতে ইমামদের নির্দেশে কার্যকর করা হয়। ১৯৯৭ সালে ২৩ জন বাংলাদেশী ইমাম সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ও তার পরকীয়া প্রেমিকা মিসেস মোশাররফকে জনসমক্ষে পাথর ছুড়ে হত্যা করার দাবী তুলেছিল।

ব্যভিচার সম্পর্কে নবী মুহাম্মদের বিধান

কোরানে ব্যভিচারীদেরকে পাথর ছুড়ে হত্যার বিধান সম্বলিত কোন আয়াত নেই, অথচ ইসলামের সূচনা থেকে তা ইসলামী সমাজে এক গভীরভাবে প্রোথিত ঐতিহ্য হিসেবে কার্যকর হয়ে এসেছে। এ ঐতিহ্যের সূচনা নবী মুহাম্মদ কর্তৃক তাঁর জীবদ্দশায় স্বয়ং ব্যবিচারীদেরকে শাস্তি দানের ঘটনা থেকে। অনেকগুলো সাচ্চা হাদিস রয়েছে, যা বিভিন্ন ঘটনায় নবীর আদেশে ব্যভিচারীদেরকে পাথর ছুড়ে হত্যার কাহিনী স্পষ্ট ও প্রাণবন্তরূপে বর্ণনা করেছে। আসুন এমন কয়েকটি হাদিস পড়ে দেখিঃ

সহি বুখারী ৪/৫৬/৮২৯ –

আব্দুল্লাহ বিন উমর বর্ণিতঃ ইহুদিরা আল্লাহর রসুলের কাছে এসে জানায় যে, তাদের এক পুরুষ ও নারী অবৈধ যৌনাচারে লিপ্ত হয়েছে। নবী তাদেরকে বলেন, “তাউরাতে পাথর ছুড়ে হত্যা সম্পর্কে কী আইনি শাস্তির বিধান রয়েছে?” তারা জবাব দেয়, “আমরা শুধুই তাদের অপরাধ ঘোষণা করি এবং তাদেরকে চাবুক মারি।” আব্দুল্লাহ বিন সালাম বললেন, “তোমরা মিথ্যে বলছো; তাউরাতে পাথর ছুড়ে হত্যার বিধান রয়েছে।” তারা তাউরাত আনল এবং তাদের একজন পাথর ছুড়ে হত্যার আয়াতটিকে হাত দিয়ে আড়াল করে তার আগের ও পরের আয়াতটি পড়ল। আব্দুল্লাহ বিন সালাম তাকে বললেন, “তোমার হাত সরিয়ে নাও।” সে হাত সরিয়ে নিলে দেখা গেল সেখানে পাথর ছুড়ে হত্যার আয়াতটি লিখা আছে। তখন তারা বলল, “মুহাম্মদ সত্য বলেছে; তাউরাতে পাথর ছুড়ে হত্যার আয়াত আছে।” নবী তখন নির্দেশ দিলেন যে, তাদের উভয়কে পাথর ছুড়ে হত্যা করা হোক। আব্দুল্লাহ বিন উমর বলেন, “আমি দেখলাম পুরুষটি মহিলার উপর ঝুকে পড়ে তাকে পাথর থেকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করছে।”

সহিহ মুসলিম ১৭/৪২০৭ –

ইম্রান বিন হুসেন জানান যে, জুহাইনা সম্প্রদায় থেকে এক মহিলা আল্লাহর নবীর কাছে এসে বলে যে, সে ব্যভিচারের মাধ্যমে অন্তঃসত্তা হয়ে পড়েছে। সে বলে, “আল্লাহর রাসুল, আমি এক অপরাধ করেছি যার শাস্তি আমাকে ভোগ করতে হবে, সুতরাং আমাকে সে শাস্তি দিন।” আল্লাহর রাসুল তার মালিককে ডেকে বললেন, “সন্তানের প্রসব পর্যন্ত ওকে ভালমত দেখাশুনা করিও; তারপর আমার কাছে নিয়ে এসো।” সে নবীর নির্দেশ মুতাবেক কাজ করল। তারপর আল্লাহর রাসুল তার সম্পর্কে শাস্তি ঘোষণা করলেন। এবং মহিলার কাপড় দিয়ে তাকে বেধে নবীর নির্দেশ মুতাবেক পাথর ছুড়ে হত্যা করা হলো।

নবীর নির্দেশে ব্যভিচারীদেরকে পাথর ছুড়ে হত্যার আরও বেশ কিছু কাহিনী বর্ণিত হয়েছে অন্যান্য হাদিসে, যেমন সহিহ বুখারী ৭/৬৩/১৯৬, সহিহ মুসলিম ১৭/৪২০৯, সহিহ মুসলিম ১৭/৪২০১ ও অন্যান্য। উপরে উল্লেখিত প্রথম হাদিসটি বিশেষ লক্ষ্যনীয়, যাতে নবীর আদেশে ইহুদী মহিলা ও পুরুষকে পাথর ছুড়ে হত্যার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। ইহুদীরা তাউরাতে বর্ণিত পাথর ছুড়ে হত্যার নিম্নোক্ত আয়াতগুলো নবী মুহাম্মদের কাছ থেকে লুকানোর চেষ্টা করেছিলঃ “যদি কোন পুরুষ অন্য পুরুষের স্ত্রীর সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হয়, কিংবা কোন পুরুষ তাকে শহরে পায় এবং তার সাথে সহবাস করে… তাহলে তোমরা তাদের উভয়কে শহরের সদর দরজায় এনে তাদের উপর পাথর ছুড়তে থাকবে যাতে তারা মারা যায়। কেননা উক্ত মহিলা চিৎকার করে নি এবং উক্ত পুরুষ তার প্রতিবেশীর স্ত্রীকে বশীভুত করেছে  সুতরাং তোমরা তোমাদের মাঝ থেকে এরূপ অপকর্ম দূরীভুত করবে।” (ডিউটেরোনোমি ২২/২২,২৪)

উক্ত হাদিসটি সম্পর্কে লক্ষ্যনীয় বিষয়টি হচ্ছে, ইহুদীরা নবী মুহাম্মদের সময়ে পাথর ছুড়ে হত্যার বর্বর বিধানটি পরিত্যাগ করেছিল, যদিও তা তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থে নির্দেশিত হয়েছে। এবং আল্লাহর ইহুদী-খৃষ্ট ধর্মকে মৌলিকরূপে পুনর্প্রতিষ্ঠার দাবীকারী নবী মুহাম্মদ ইহুদীদের দ্বারা পরিত্যক্ত আল্লাহর বিধানটিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন, হোক তা বর্বর ও নিষ্ঠুর।

সুতরাং ব্যভিচারীদেরকে পাথর ছুড়ে হত্যা সুস্পষ্টভাবে শক্ত ইসলামী ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে, কেননা নবী মুহাম্মদের কর্মকাণ্ড ও কথা মুসলিম সমাজের পরিচালনার চিরন্তন মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত – কেননা কোরান মুসলিমদেরকে আল্লাহ (অর্থাৎ কোরান) ও তাঁর রাসুলকে (অর্থাৎ হাদিস) মেনে চলার আদেশ করেছে বারংবার। (দেখুন কোরান ৩/৩২; ৪/১৩,৫৯,৬৯; ৫/৯২; ৮/১,২০,৪৬; ৯/৭১; ২৪/৪৭,৫১-৫২,৫৪,৫৬; ৩৩/৩৩; ৪৭/৩৩; ৪৯/১৪; ৫৮/১৩; ৬৪/১২)

মুসলিমদের দ্বারা ইসলামে ব্যভিচারের শাস্তি পাথর ছুড়ে হত্যার বিধান অস্বীকার

ইসলামের ইতিহাসে ব্যভিচারীদেরকে পাথর ছুড়ে হত্যার চিরাচরিত বিধান সত্ত্বেও আজকের প্রায়শ পাশ্চাত্যে বসবাসকারী অনেক শিক্ষিত মুসলিম তর্ক করে যে, ব্যভিচারের জন্য পাথর ছুড়ে হত্যার বিধান ইসলামের পরিপন্থী, কেননা ‘পাথর ছুড়ে হত্যা সম্পর্কে কোরানে কিছুই বলা হয় নি’ এটা সত্য যে, ব্যবিচারের শাস্তির ব্যাপারে পাথর ছুড়ে হত্যা সম্পর্কে কোরানে কোন আয়াত নেই, যদিও পাথর ছুড়ে হত্যা, বিপরীত দিক থেকে হাত-পা কেটে ফেলা, ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যার মত বর্বর শাস্তি কোরান আল্লাহর চোখে বৈধ শাস্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে (দেখুন কোরান ৫/৩৩,৩৮) অথচ এসব অত্যাধুনিক ও  সুশিক্ষিত মুসলিমরা মুহাম্মদকে তথা হাদিসকে কোরানের মত সমান গুরুত্ব সহকারে মান্য করার জন্য আল্লাহর পুনঃপুন স্বর্গীয় নির্দেশ অগ্রাহ্য করে দাবী করে যে, একমাত্র কোরান হচ্ছে ইসলামের পরিপূর্ণ ভিত্তি। সুতরাং ব্যভিচারের দোষে নবী মুহাম্মদের অনেককে পাথর ছুড়ে হত্যার কাহিনী হাদিসে বর্ণিত হওয়া সত্ত্বেও তারা ইসলামে ব্যভিচারীদেরকে পাথর ছুড়ে হত্যার বিধানের অস্তিত্ব অস্বীকার করে, কেননা তাদের কাছে হাদিস পুরোপুরি মিথ্যে এবং ইসলামে তার কোনই গুরুত্ব নেই।

অবৈধ যৌনকর্মের শাস্তি সম্পর্কে কোরানের নির্দেশ

অবৈধ বা বিবাহ-বহির্ভুত যৌনকর্মে লিপ্তদেরকে শাস্তি দানের ব্যাপারে কোরান বলেছেঃ

ব্যভিচার বা বিবাহ-বহির্ভুত যৌনকর্মের দোষে দোষীদের প্রত্যেককে এক শত বার কষাঘাত কর – তাদের প্রতি আল্লাহর শাস্তি দানের ব্যাপারে তোমাদের হৃদয়ে যেন মায়া-মমতা না জাগে, যদি তোমরা আল্লাহর ও শেষ বিচারের দিনে বিশ্বাস করঃ এবং বিশ্বাসীদের তাদেরকে শায়েস্তাকরণ দেখতে দাও। (কোরান ২৪/২)

আয়াতটি অবৈধ যৌনকর্মের শাস্তি ১০০ কষাঘাত ধার্য্য করেছে – হোক তা ব্যভিচার কিংবা অবিবাহিতদের মাঝে যৌনাচার। এবং এসব সুশিক্ষিত মুসলিমরা অনেকটা গর্বের সাথে দাবী করে যে, ইসলামের ব্যভিচারের শাস্তি ১০০ কষাঘাত মাত্র, পাথর ছুড়ে হত্যা নয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘ব্যভিচারী বা অবিবাহিতদের মাঝে যৌনকর্মের জন্য প্রকাশ্য জনসমক্ষে ১০০ কষাঘাতের শাস্তি দেওয়া কি ঠিক?’ – তাদের সিংহভাগ জবাব দেবে “না” এবং অবিবাহিতদের মাঝে যৌনকর্মের জন্য কষাঘাতের শাস্তি তারা অবশ্যই সমর্থন করবে না। কেবলই-কোরানে-বিশ্বাসী বেশকিছু মুসলিম বন্ধুর সাথে আলোচণার পর আমার সে উপলব্ধিই হয়েছে।

মজার কাহিনী, নয় কি? তারাই দাবী করে যে, ইসলামে ব্যভিচার ও অবিবাহিতদের মাঝে যৌনকর্মের বৈধ শাস্তি ১০০ কষাঘাত; আবার তারাই বলবে যে, সে শাস্তি ঠিক নয়। তারা কেবল আত্ম-বিরোধীতায় দুষ্টই নয়, বরং আল্লাহর উপর ‘দাদাগিরি’ করার চেষ্টাও করে। উল্লেখ্য সম্প্রতি বিভিন্ন মুসলিম দেশে নানান অপরাধে ১০০ কষাঘাতের শাস্তির দেওয়ার সময় অনেকেই মৃত্যবরণ করেছে।

আয়াতটি সম্পর্কে আরেকটি বিষয় বিশেষ বিবেচ্য – এবং তা হচ্ছে, অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের মাঝে যৌনকর্ম এবং ব্যভিচার তথা বিবাহিতদের মাঝে অবৈধ যৌনকর্মের অপরাধের জন্য একই শাস্তির বিধান। এবং যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয় – অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে যৌনকর্ম ও বিবাহিত স্বামী বা স্ত্রীর অবৈধ যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ার শাস্তি কি একই হওয়া উচিত – দুনিয়ার অন্যান্য সব মানুষের মতই তারাও অবশ্যই ‘না’ বলবে। সুতরাং আবারও একদিকে যৌন-অপকর্মের জন্য নির্ধারিত শাস্তির ব্যাপারে তারা কোরানের ২৪/২ আয়াতটি নিয়ে গর্ব করে, এবং সাথেসাথেই আয়াতটিতে ব্যভিচার ও অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে যৌনকর্মের জন্য একই শাস্তির বিধানকে বেঠিক রায় দেবে।

ছাগলে খেয়ে-ফেলা কোরানের পাথর ছুড়ে হত্যার আয়াত

মুসলিম কিংবা অমুসলিম, কোন সুস্থ-মনের মানুষই ব্যভিচার ও অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে যৌনকর্মের জন্য একই শাস্তির বিধানকে অন্যায় মনে করবে। এমনকি আজ পাশ্চাত্যে প্রাপ্ত-বয়স্ক অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে যৌন সম্পর্ককে আদৌ কোন দোষের কর্ম হিসেবে দেখা হয় না; বরং একেবারেই স্বাভাবিক, এমনকি প্রত্যাশিত, হিসেবে দেখা হয়; এবং তা তাদের মানবাধিকার হিসেবে বিবেচিত। তবে ব্যভিচারকে সাধারণত নিন্দা করা বা অনভিপ্রেত বিবেচনা করা হয় সর্বত্রই। অপ্রত্যাশিত যৌনাচারের জন্য যদি শাস্তি দিতেই হয়, তাহলে ব্যভিচারীরা অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে যৌনকর্মে লিপ্তকারীদের চেয়ে বেশী কঠোর শাস্তির দাবীদার। এবং যেসব শিক্ষিত মডারেট মুসলিমরা দাবী করে যে, ইসলামে ব্যভিচারের সঠিক শাস্তি কোরানের ২৪/২ আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, মুসলিমদের মধ্য থেকে তারাই সবচেয়ে আগে বলবে যে, আয়াতটিতে ব্যভিচার ও অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে যৌনকর্মের জন্য একই শাস্তির বিধান ঠিক নয়।

সুতরাং প্রশ্ন হচ্ছেঃ

  • আল্লাহ কি এতই নির্বোধ হবেন যে, তিনি ব্যভিচার ও অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে যৌনকর্মের জন্য একই শাস্তির বিধান দেবেন?
  • আল্লাহ কি এসব শিক্ষিত মডারেট মুসলিম ও প্রায় সমগ্র অমুসলিমদের চেয়েও বেশী বিচার-বুদ্ধিহীন হবেন, যারা ঠিকই মনে করে যে ব্যভিচারীরা যৌনকর্মে লিপ্ত অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকার চেয়ে কঠোর শাস্তি বা নিন্দা পাওয়ার দাবীদার?

এসব মডারেট মুসলিমরাই প্রথম বলবে যে আল্লাহ কারও চেয়েই বেশী নির্বোধ বা বিচার-বুদ্ধিহীন হতে পারেন না। এবং তারা আসলেই সঠিক! বাস্তবে আল্লাহ অবশ্যই ব্যভিচার ও অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে যৌনকর্মের জন্য একই শাস্তির বিধান দিতে পারেন না, এবং দেননিও। নির্ভরযোগ্য ইসলামি সূত্র অনুসারে, আল্লাহ ব্যভিচারীদের শাস্তির ব্যাপারে ‘পাথর ছুড়ার’ আয়াত নামে এক পৃথক আয়াত নাজিল করেছিলেন, কিন্তু খলিফা আবু বকরের অধীনে কোরানের সংকলণ শুরু হওয়ার আগে আয়াতটি কোন কারণে হারিয়ে যায়। নির্ভরযোগ্য হাদিস সংগ্রহকারক ইসলামী পণ্ডিত ইবনে মাজাহ জানান, আল্লাহ ব্যভিচারীদেরকে পাথর ছুড়ে হত্যার বিধান সম্বলিত এক আয়াত নাজিল করেছিলেন এবং নবী মুহাম্মদ আয়াতটিকে তাঁর শিশু স্ত্রী আয়শার হেফাজতে রেখেছিলেন, কিন্তু আয়শার অসতর্কতার কারণে এক ছাগল এসে আয়াতটি খেয়ে ফেলে। হাদিসটি এখানে দেওয়া হলোঃ

আয়শা বর্ণিতঃ পাথর ছুড়ে হত্যার এবং প্রাপ্ত-বয়স্ক পুরুষদেরকে স্তনের দুধ খাওয়ানোর আয়াত নাজিল হয়েছিল এবং একটা টুকরো কাগজে লিখে আমার বালিশের নীচে রাখা হয়েছিল। আল্লাহর নবী যখন মারা যান, তখন আমরা তাঁকে নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং তখন একটা ছাগল ঘরে ঢুকে কাগজটি খেয়ে ফেলে। (সুনন ইবনে মাজাহ, হাদিস ১৯৪৪)

নবীর প্রথম জীবনীকারক ইবনে ইসহাক সে আয়াতটি সম্পর্কে লিখেছেন (The Life of Muhammad, Karachi, p. 684):

আল্লাহ মুহাম্মদকে প্রেরণ করেন এবং তাঁর কাছে আসমানী কিতাব পাঠান। আল্লাহর প্রেরিত বাণীর অংশ ছিল পাথর ছুড়ে হত্যার আয়াত। ওমর বলতেন, “আমরা তা পড়েছি, আমাদেরকে তা শেখানো হয়েছিল, এবং আমরা তা শুনেছি। আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদ পাথর ছুড়ে হত্যা করেছেন, এবং তাঁর মৃত্যুর পর আমরা পাথর ছুড়ে হত্যা করেছি।

আয়াতটি সম্পর্কে সহিহ বুখারি ৮/৮১৭ বলছেঃ

(ওমর বর্ণিত) …আল্লাহ মুহাম্মদকে সত্যবাণী ও আসমানী কিতাব সহকারে প্রেরণ করেন, এবং আল্লাহর নাজিলকৃত বাণীর মাঝে ছিল বিবাহিত নারী ও পুরুষের জন্য পাথর ছুড়ে হত্যার আয়াত… আমার আশঙ্কা দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর কেউ কেউ বলবে, ‘আল্লাহর কসম আমরা আল্লাহর পবিত্র গ্রন্থে পাথর ছুড়ে হত্যার আয়াত খুঁজে পাই নি, এবং এভাবে তারা আল্লাহর নাজিলকৃত একটা বিশেষ বিধান পরিহার করে বিপথে যাবে। পাথর ছুড়ার শাস্তি আরোপিত হবে বিবাহিত নারী ও পুরুষের উপর, যারা অবৈধ যৌনকর্মের লিপ্ত হয়…

সহিহ মুসলিম হাদিসেও পাথর ছুড়ার আয়াত স্পম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

(ওমর বলেন) সত্যিই আল্লাহ মুহাম্মদকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেন এবং তাঁর উপর আসমানী কিতাব ন্যস্ত করেন, এবং তাঁর কাছে পাঠানো বাণীর মাঝে ছিল ‘পাথর ছুড়ার’ আয়াত। আমরা ইহা আবৃত্তি করি, মুখস্ত করি ও বুঝি। আল্লাহর নবী (বিবাহিত ব্যবচারীদেরকে) পাথর ছুড়ে হত্যার শাস্তি দিতেন, এবং তাঁর মৃত্যুর পর আমরাও পাথর ছুড়ে হত্যার শাস্তি দিয়েছি। আমি আশঙ্কা করি যে, সময়ে আবর্তে জনগণ তা ভুলে যাবে এবং বলবে, ‘আমরা পাথর ছুড়ার শাস্তি আল্লাহর ধর্মগ্রন্থে খুঁজে পাই না, এবং এভাবে তারা আল্লাহর নির্ধারিত দায়িত্ব পরিহার করার মাধ্যমে বিপথগামী হবে। পাথর ছুড়ার বিধান আল্লাহর কিতাবে লিখিত হয়েছিল বিবাহিত নারী ও পুরুষের জন্য, যারা অবৈধ যৌনকর্মে লিপ্ত হয়… (সহিহ মুসলিম ১৭/৪১৯৪)

উপসংহারঃ ব্যভিচারের জন্য পাথর ছুড়ে হত্যা অবশ্যই ইসলামী বিধান

সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যে, শুধুমাত্র ব্যভিচারের শাস্তির বিষয়ে আল্লাহ একটা আয়াত নাজিল করেছিলেন, এবং কোরান সংকলণ করার জন্য প্রথম খলিফা আবু বকর রেকর্ডকৃত সকল আয়াত জমা দেওয়ার আহবান করার আগেই সে আয়াতটি হারিয়ে যায় – সম্ভবত একটি ছাগলে তা খেয়ে ফেলার কারণে। যেহেতু মুসলিমরা-সহ সব সুস্থ মনের মানুষই স্বীকার করবে যে, ব্যভিচার ও অবিবাহিত ছেলেমেয়ের মাঝে যৌন সম্পর্কের সাজা এক হতে পারে না, কাজেই আমরা সিদ্ধান্ত টানতে পারি যে, কোরানের ২৪/২ আয়াতটি শুধুই অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে যৌনাচারের জন্য নাজিল হয়েছিল, যার সাজা ১০০ কষাঘাত। এবং ছাগলে খেয়ে-ফেলা পাথর-ছুড়ার আয়াতটির কথা বাদ দিলেও – কোরান বহুত আয়াতে বারবার মুসলিমদেরকে নির্দেশ দিয়েছে যে, তারা যেন আল্লাহ (অর্থাৎ কোরান) ও তাঁর রাসুল (অর্থাৎ হাদিস)-কে সমান গুরুত্ব দিয়ে অনুসরণ করে, এবং নির্ভরযোগ্য ইসলামী গ্রন্থে একাধিক ব্যভিচারের ঘটনায় নবী কর্তৃক পাথর ছুড়ে হত্যার নির্দেশ ও তা কার্যকর করার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং কোরানের নির্দেশ মতেই নবীর সেসব দৃষ্টান্ত ব্যভিচারের জন্য পাথর ছুড়ে হত্যাকে বৈধ ইসলামী শাস্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

এরপরও যদি মুসলিমরা দাবী করে যে, ইসলামে ব্যভিচারের শাস্তি পাথর ছুড়ে হত্যা নয়, তা হবে আল্লাহর উপর “দাদাগিরি” করার সমতূল্য। এবং তাদের সে অস্বীকৃতি এবং সেই সাথে ২৪/২ আয়াতকে ব্যভিচারের শাস্তির দাবী স্পষ্টই প্রমাণ করবে যে, আল্লাহ এক আহাম্মুক – কেননা আয়াতটি ব্যভিচার ও  প্রেমিক-প্রেমিকার মাঝে যৌনাচারের জন্য একই শাস্তির বিধান দিয়েছে – যা তাদের দৃষ্টিতেও বেঠিক ও অন্যায়।

সৌজন্যে : https://nobojug.org/node/431

Advertisements