আদিনা মসজিদ কি সত্যিই মসজিদ?

ঐ যে বলে না, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, আমার হয়েছে তাই। গরমের ছুটিতে সহকর্মীরা সিমলা গেলো, বন্ধুরা গেলো কালিম্পং আর জুন মাসের তীব্র দাবদাহে আমি চলে এলাম মালদহে। উদ্দেশ্য একটি বিতর্কিত স্থাপত্য পরিদর্শন। নাম – আদিনা মসজিদ।

মালদহ জেলার গাজোল থানার ৩৯ নং মৌজায় অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় মসজিদ আদিনা মসজিদ। বলা হয় এই মসজিদ শুধু বাংলার সর্বাধিক আয়তনের মসজিদই নয় বরং পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে দ্বিতীয় সর্বাধিক আয়তনের মসজিদ। এর স্থান দিল্লীর জামি মসজিদের পরেই। তথ্য সংগ্রহ করা, ছবি তোলা ইত্যাদির সাথে অনেকগুলি ইতিহাসের বই এবং ইন্টারনেট ঘেঁটে পড়াশুনা করলাম। দেখলাম, ইতিহাসের বই থেকে ইন্টারনেট, আদিনা সম্পর্কে বেশিরভাগ রচনায় প্রামাণ্য সূত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে  খান সাহেব আবিদ আলি খান এর “গৌড়-পাণ্ডুয়ার স্মৃতি” নামক একটি গ্রন্থকে। আবিদ আলি খান ছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে বাংলা সরকারের পূর্ত বিভাগের কর্মচারী। তিনি দীর্ঘদিন গৌড় পাণ্ডুয়ার প্রাচীন পুরাকীর্তিগুলির বিশেষ মেরামতির দায়িত্ব প্রাপ্ত হওয়ার সুবাদে দীর্ঘদিন মালদহে অবস্থান করে তাঁর সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করেন। তাঁর কাজে খুশি হয়ে ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট তাকে “খান সাহেব” উপাধিতে ভূষিত করেন।

আদিনা মসজিদ সম্পর্কে কিছু জানার আগে তার গঠন সম্পর্কে প্রাথমিক পরিচিতি প্রয়োজন। আখতার হোসেন পর্যবেক্ষণে গৌড় পান্ডুয়া গ্রন্থে আবিদ আলিকে রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করে লিখেছেন “আবিদ আলির মতে, ১৩৬৪ থেকে আরম্ভ করে ১৩৭৪ সালে এর কাজ শেষ করা হয়। মসজিদটি অপূর্ব কাঠামোতে তৈরি। মসজিদের দক্ষিণপাসে জনসাধারণের নামাজ পড়ার স্থান নির্দিষ্ট ছিল। এখানে ১৮ টি মিম্বার রয়েছে এবং এগুলির প্রতিটির উপরের দিকে পাথরের কাজ রয়েছে। কেন্দ্রীয় হলঘরে মাটি থেকে ৮ ফুট উপরে একটি আসন রয়েছে যার নাম ‘বাদশাহ কি তখৎ’। এর প্রবেশ এবং বহির্গমনের পথ ছিল পশ্চিমদিকে। এখানকার মেহরাব অংশ চতুর্দিকে কোরানের বাণী দিয়ে ঘেরা। এখানে তিনটি মেহরাব এবং দুটি দরজা রয়েছে। সেগুলির চতুর্দিকে যে লেখা এবং ফুল আঁকা রয়েছে তা বিস্ময়ের সৃষ্টি করে।

পশ্চিমের দরজা দিয়ে ওঠার সময় দরজার উপরে (বৌদ্ধ) মূর্তি চেঁছে তোলার চিহ্ন দেখা যায়। দরজা পেরিয়ে যে স্থান টি দেখা যায় তা সিকান্দার শাহের কবর নামে পরিচিত। এই ঘরের গম্বুজটি সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। স্থানটি পেরিয়ে বাদশাহ কি তখ্‌তে যাওয়া যায়। এবং প্রবেশদ্বারের চৌকাঠে হিন্দু দেবদেবীর নৃত্যরত মূর্তি চেঁছে তোলার পরিচয় পাওয়া যায়। দরজার চৌকাঠগুলি বিভিন্ন নকশায় সজ্জিত, যা সেই যুগের হিন্দু ভাস্কর্যের পরিচয় বহন করে।

এর মিম্বারটি মধ্যে অবস্থিত না হয়ে একটু দক্ষিণে অবস্থিত এবং এটি দ্বিতল। যাতে উভয় তলের মানুষ তাকে দেখতে এবং খুতবা শুনতে পান। এই মঞ্চটির নিচের তলের ছাদের ভিতরদিকে অসংখ্য নকশি এবং পদ্মফুলের ছড়াছড়ি দেখা যায়। এর উপরের তলের ছাদটি ভেঙ্গে গেছে।

এই মিম্বারের সংলগ্ন রয়েছে এই কেন্দ্রীয় মেহরাবটি। এটি আকারে বিরাট। এর সর্ব উপরে রয়েছে জানালা। তাঁর নিচে দেখা যায় শিবলিঙ্গ যা পাথলা করে বসানো। এর নিচে রয়েছে একটি বিরাট পদ্মফুল ও তার নিচে রয়েছে কোরানের বাণী এবং তারও নিচে রয়েছে বিভিন্ন প্রকারের অলংকরণ এবং দুইপাশে দুটি বড় বড় পদ্মফুল। এই চিত্রকলা যেমন বিস্ময়কর তেমনি আরো বিস্ময়কর শিবলিঙ্গ, পদ্মফুল এবং কোরআনের বাণীর সহাবস্থান। এটি যদিও মসজিদ, তবু এর স্তম্ভের নকশাগুলির অমিল দেখে খুব ভালভাবেই বোঝা যায় যে এই মসজিদ তৈরির কোন ইঞ্জিনিয়ারিং পরিকল্পনা ছিল না। তাছাড়া আরো বোঝা যায় যে, হিন্দু বৌদ্ধ এবং জৈন মন্দিরের পাথরগুলি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে, সেই পাথরগুলি কোনো ভাঙ্গা মন্দির থেকে এনে ব্যবহার করা হয়েছে”

সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি, আবিদ আলির মতে, আদিনা মসজিদ আসলেই একটি মসজিদ, যা সুলতান সিকান্দার শাহ ১৩৬৪ থেকে ১৩৭৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই দশ বছর ধরে তৈরি করান। কিন্তু এটি সেভাবে সুপরিকল্পিত ভাবে তৈরি নয়। এর বিভিন্ন অংশ হিন্দু মন্দির থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু আদিনা মসজিদ সম্পর্কে এই সিদ্ধান্ত একেবারেই  গ্রহণযোগ্য নয়। তার কারণগুলি হলো —

প্রথমত, আদিনা মসজিদের গঠন কাঠামোর মধ্যে বিতর্কিত ‘বাদশাহ কি তখৎ’-এর অবস্থান। বাদশাহ কি তখত মানে রাজসিংহাসন। কিন্তু এটি কোন সিংহাসন নয়। বরং এটি মাটি থেকে আট ফুট উঁচু একটি ব্যালকনির মতো অনেক বড়ো স্থান। এটির নাম কেন এমন – এই বিষয়ে কোনও ঐতিহাসিক কোন স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেন নি। আবিদ আলি নিজেই বলেছেন “ইসলামী ইবাদত(উপাসনা)-এর স্থান মসজিদে এরূপ একটি স্বতন্ত্র কুঠুরি থাকা নিতান্তই অশোভন”।  আসলে মুসলমানদের উপাসনার স্থলে কি বাদশাহ আর প্রজা, সকলেই সমান। তাই মসজিদে ব্যবধান রাখা পৃথক স্থান কল্পনাও করা যায় না। “এমনকি বাংলার বাইরে ভারতের অপর কোথাও কোনও মসজিদে বাদশাহ কি তখৎ বলে কোনও কিছুর অস্তিত্ব নাই”। তবু তিনি এই স্থাপত্যটিকে কে মসজিদ বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন নি।

দ্বিতীয় যে বিষয়টি চোখে পড়ার মতো, তা হলো, বাদশাহ কি তখ্‌তের পশ্চিম পাসের দেওয়ালে কালো পাথরের  মিহরাব আছে তার চারপাশে কারুকার্য। এরকম কালো পাথরের সূক্ষ্ম কারুকার্যের মধ্যে স্বস্তিক চিহ্ন চোখে পড়ার মতো। এবং তার পাসে যে ইসলামিক শিলালেখ আছে তা কোরান থেকে নেওয়া। এবং তার সূক্ষ্মতা তুলনামুলকভাবে অনেক কম। এবং তুলনামুলকভাবে নবীনতর। আবিদ আলির মতানুসারে যদি ধরেই নেওয়া যায় যে, হিন্দু চিহ্নাঙ্কিত পাথরগুলি অন্য হিন্দু মন্দির থেকে নেওয়া হয়েছে, তাহলে বাদশাহ কি তখ্‌তের পাসের পশ্চিমের দেওয়ালে টেরাকোটার কারুকার্যে যে স্বস্তিকা রয়েছে, তাঁর ব্যাপারে তিনি তাঁর বইতে বিন্দুমাত্র উল্লেখ করেন নি কেন?

নামাজঘরের অর্থাৎ মসজিদের মূল কক্ষের পশ্চিম দিকের দেওয়ালে দুটি বড়ো আকারের প্রস্ফুটিত পদ্মফুল দেখতে পাওয়া যায়, যেগুলি আমরা প্রাচীন হিন্দু মন্দিরগুলিতে সর্বত্রই দেখে থাকি। পদ্ম হিন্দু ধর্মে অত্যন্ত পবিত্র প্রতীক হিসাবেই গণ্য করা হয়। মূল কক্ষের বাইরেও বাদশাহ কি তখৎ এবং সিকান্দারের কক্ষেও এরকম অনেকগুলি পদ্মফুল পাওয়া যায়। এছাড়াও মসজিদের মধ্যে আরো এমন বেশ কয়েকটি ছোট পদ্মফুল লক্ষ্য করা যায়। আবিদ আলীর মতে এগুলি সম্ভবত কোনও হিন্দু মন্দির থকে সংগ্রহ করে আনানো হয়েছিল। কিন্তু এই বড় পদ্মফুলগুলি বাইরের কোনও হিন্দু মন্দির মন্দির থেকে তুলে আনিয়ে লাগানো অত্যন্ত স্বাভাবিক বলে মনে হলেও ছোট পদ্মফুলগুলি মন্দির থেকে তুলে আনিয়ে লাগানোটা একেবারেই অযৌক্তিক ঠেকে। তাই অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রস্ফুটিত পদ্মগুলি আদি থেকেই ওই প্রাঙ্গণের অংশ ছিল।

এবার আমরা যদি কিবলা আর মিহরাবের দিকে চোখ ফেরাই, তাহলেও অসংগতি চোখে পড়ে। কিবলা এবং  মিহরাব মসজিদের গঠন কাঠামো-র একটি অপরিহার্য অংশ। কিবলা বলতে বোঝায় মসজিদের নামাজঘরের কারুকার্য করা দিক। এটি নির্দেশ করে যে কোন দিকে মুখ করে নামাজ পড়তে হবে। আর তার মধ্যে থাকে মিরহাব। মিরহাবের অর্থ হল নামাজঘরের ভিতরের এমন জায়গা যেটি কাবাঘরের সর্বাধিক কাছে। এটি কাবা ঘরের দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ এটি কাবার দিকে (পশ্চিমদিকে) মসজিদের সর্বাগ্র অংশ। এখানে ইমাম নামাজে নেতৃত্ব দেন। এটি দেখতে অনেকটা কুলুঙ্গির মতো।  যেহেতু এটা খুব ইঙ্গিতপূর্ণ স্থান তাই এর পশ্চিমে অন্য কোন স্থান বা কক্ষ থাকা উচিত না। কিন্তু এখানে সিকান্দারের কক্ষটি এমন স্থানে যা নিয়ম লঙ্ঘন করে। তাছাড়া আবিদ আলির দাবী ‘সিকান্দারের কক্ষ বাদশাহ আসলে তাঁর সহচরদের বিশ্রামকক্ষ’ যদি সত্য হয় তাহলে একমাত্র ওই স্থান থেকে বাদশাহ কি তখ্‌তে যাওয়ার পথ করা হল কেন, যা কিনা আবিদ আলির মতে ‘নারীগণের নামাজের স্থান’? এটি ইসলামী রীতির সঙ্গে চূড়ান্ত অসঙ্গতিপূর্ণ। আরো একটি বিষয় যা মসজিদের গঠন-কাঠামোয় অপরিহার্য্য, তা হল নামাজের স্থানে পর্যাপ্ত আলো। কিন্তু বাদশাহ কি তখৎ দিনেও প্রায় রাতের মতোই অন্ধকার থাকে। বস্তুতপক্ষে, আবিদ আলি খান সাহেব ওটাকে নারীদের জন্য পৃথক নামাজের জন্য স্থান বলে আন্দাজ করলেও তাঁর সপক্ষে তেমন কোন গ্রহণযোগ্য যুক্তি দেন নি।

এটিকে মসজিদ দাবী করার পক্ষে সবচেয়ে আপত্তিকর হলো মসজিদের ভিতরে থাকা একটি বেদী, যা কবর বলে দাবী করা হয়। কিন্তু, মসজিদের ভিতরে কোন মানুষকে দাফন করা তো ইসলামী রীতির চূড়ান্ত বিরোধী এবং ইসলামী দৃষ্টিতে অপরাধস্বরূপ। তাহলে সেটিকে কবর হিসাবে দাবী করা যায় কি করে? একে অনেকে সিকান্দার শাহের কবর বলে থাকেন। কিন্তু আবিদ আলি সাহেব নিজেই সেই বক্তব্য খণ্ডন করেছেন। এই প্রসঙ্গে আবিদ আলির সাহেবের দাবী ‘স্থানীয় লোকেরা বলে থাকে যে, মসজিদটা যখন জঙ্গলাকীর্ণ ছিল তখন জনৈক ফকির সেখানে বাস করতেন। ফকিরের মৃত্যুর পর তার শিষ্যরা তাকে মসজিদের প্রধান কক্ষের পশ্চিমদিকে খিলান করা স্থানে দাফন করে’। কিন্তু সেখানে কোন ফকির থেকে থাকলে এবং তার অনুগামীরা সেখানে যাতায়াত করে থাকলে স্পষ্টতই সেই স্থান তখনো পরিত্যক্ত হয়নি। সেক্ষেত্রে মুসলিমদের দ্বারা মসজিদের মধ্যে দাফন হতে পারে কি ?

এরপর যে মূল প্রশ্নটি উঠে আসে, সেটি হল, সিকান্দর শাহের মতো সুলতান, যিনি ১৩৬৯ খ্রিস্টাব্দে নিজেকে আরব ও পারস্যের সুলতানদের মধ্যে যোগ্যতম এবং পরে ‘মুসলিমদের খলিফা’ বলে ঘোষণা করেছিল তার পক্ষে এমন একটি মসজিদ স্থাপন করা সম্ভব কিনা কিনা যার দেওয়ালে হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি অঙ্কিত বা খোদিত থাকবে (বাংলাপিডিয়া)। বিশেষত তিনি যখন গোঁড়া মুসলিম ছিলেন এবং হিন্দুদের ইসলাম গ্রহণে উৎসাহ প্রদান করতেন (আবিদ আলি খান)। মন্দির গাত্রে বহু স্থানে হিন্দু দেবী দেবতা, যেমন গণেশ, বিষ্ণু, হনুমান দুর্গা ইত্যাদি উৎপাটিত, ক্ষতবিক্ষত, বা অক্ষত অবস্থায় বর্তমান।

খান সাহেব আবিদ আলি খান মহাশয়ের লেখনীকে আমাদের পক্ষপাত-মুক্ত বা নির্ভরযোগ্য বলে মনে হয় না। যে স্থাপত্য বিষয়ে মুসলিম এবং হিন্দুদের মধ্যে টানাপড়েন এখনো অবধি সমান-তালে চলে আসছে, যে বিষয় নিয়ে নিয়মিত আইন আদালত করে চলেছেন দুই পক্ষ – সেই বিষয়ে নিষ্ঠাবান মুসলিম খানসাহেব আবিদ আলি খান মুসলিমদের পক্ষ নেবেন সেটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া উনি এই বিষয়ের গবেষকও নন। তার রচিত অন্যান্য গ্রন্থগুলি হল – একটি ইংরাজি নামাজ শিক্ষার বই, একটা উর্দুও পার্সী গজলের বই এবং উর্দু এবং বাংলায় দুটি শিশুদের প্রথম শিক্ষার বই। এমনকি খান সাহেব আবিদ আলি যার ছাত্র ছিলেন সেই বিখ্যাত রজনীকান্ত চক্রবর্তীর লেখা ‘গৌড়ের ইতিহাস’ নামক অত্যন্ত সমাদৃত গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে অনেক বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করলেও দ্বিতীয় খণ্ডে আদিনা বিষয়ে একটি অতি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে সমস্ত বিতর্ক এবং ইতিহাস এড়িয়ে গেছেন দেখে অবাক হয়েছিলাম। হতাশও হয়েছিলাম এরকম একটি বই থেকে কোন সাহায্য না পেয়ে। কিন্তু পরে খেয়াল করলাম দ্বিতীয় খণ্ডটি প্রকাশ হয়েছিল খান সাহেব আবিদ আলি খানের অর্থে – সেখানে আদিনা বিষয়ক সত্য থাকবেনা এটাই স্বাভাবিক। আদিনা সম্পর্কিত ঐতিহাসিক তথ্য যে আজ অবধি প্রতিনিয়ত পরিকল্পনামাফিক লোপাট করা হচ্ছে — খান সাহেবও সেই একই অপরাধে অপরাধী ছিলেন। অবশ্য পরবর্তীতে দেখলাম  রজনীকান্ত চক্রবর্তী আমাদের ততটাও হতাশ করেন নি। প্রবাসী পত্রিকায় ‘পান্ডুয়া ভ্রমণ’ নামক রচনায় তিনি লিখেছেন, “আমি সাতাইশ বৎসর পূর্ব্বে একবার পান্ডুয়া দেখিতে গিয়াছিলাম…তখন আদিনার ভিতর বিস্তর হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি দিয়া খচিত নামাজের স্থানে উঠিবার সোপান দেখিয়াছিলাম। যেমন মসজিদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্খলিত হইতেছিল,অমনি মুসলমান ভয়ে লুক্কায়িত গণেশ কার্ত্তিকেয় কৃষ্ণ বিষ্ণু বাহির হইয়া পড়িতেছিল। সে সকল মূর্তির নাক প্রায় ভাঙ্গা ছিল। বেচারা কালাপাহাড়ের উপর তার কারণ অর্পিত হইত। এখন সে সকল মূর্তি দেখা গেল না। কোথায় গেল ?”

প্রসঙ্গত, সরকারী ফলকে তাকে সিকান্দার শাহের তৈরি মসজিদ হিসাবে উল্লেখ করা হলেও এই বিষয়ে  গবেষক অধ্যাপক ডঃ সুস্মিতা সোম একমত পোষণ করেন না। তিনি সিকান্দার শাহ কে এর নির্মাতা না বলে ‘সংস্কারক’ বলে মনে করেছেন।  তিনি লিখেছেন, “ সুলতান ইলিয়াস শাহের পুত্র সিকান্দার শাহ এই মসজিদটির নির্মাতা বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।  যদিও এটির প্রকৃত স্থাপত্যকাল এবং প্রকৃতপক্ষে এটি কি ছিল সেই বিষয়ে ঐতিহাসিক গবেষকদের অনুসন্ধিৎসা কৌতূহল এবং বিতর্কের অবসান হয়নি আজও … শোনা যায় আদিতে এটি জৈন পথপ্রদর্শক আদিনাথের মন্দির ছিল। পরে পরিণত হয় বৌদ্ধ বিহারে। কেউ বলেছেন এখানে একটি বিশাল মন্দির তৈরির কাজ শুরু হয়। শেষ হওয়ার আগেই মুসলমান এই প্রদেশ আক্রমণ করে ফলে তখন কাজ বন্ধ হয়ে যায়।  পড়ে মুসলমান বাদশাহের আদেশে ঐ মন্দির তৈরির কাজে জোগাড় করা মশলাগুলি ব্যবহার করে ইমারতটিকে মসজিদে রূপান্তরিত করা হয়”। অন্যত্র তিনি লিখেছেন, “দ্বাদশ শতাব্দীর একটি লিপি যা এখানে পাওয়া গেছে তার পাঠোদ্ধার করেছেন শ্রী দীনেশচন্দ্র সরকার। এই লিপিটির আটটি অক্ষরের শেষ দুটি অক্ষর হলো ‘শ্রীউতঙ্ক শিবা:’  অর্থাৎ এটি উতঙ্ক নামীয় কোনও ব্যক্তির প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দিরের লিপি। এছাড়া আদিনা মসজিদের পূর্ব প্রবেশ পথ, যা উত্তর দিকে রয়েছে, সেটি একটি মন্দিরের গর্ভগৃহ বলেই মনে হয়, যা হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী পূর্বমুখী। শুধু তাই নয়, ভগ্ন শিবলিঙ্গ স্থাপিত হয়েছে বাদশাহি তক্তপাশের কোষ্ঠিপাথরের  অলঙ্করণ করা দেয়ালের উপরিভাগে। শিবলিঙ্গ-বিহীন গর্ত সহ একটি গৌরীপট্টও অবহেলিত অবস্থায় পাওয়া যায় মসজিদ চত্বরেই। দুটি গণেশ মূর্তি সহ অক্ষত দুটি দ্বার আদিনা মসজিদের পূর্ব এবং পশ্চিমের প্রাচীরে লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া পশ্চিমদিকের বাইরের দেওয়ালে একটি পত্রাকৃতি খাঁজকাটা চৈত্যগবাক্ষও দেখা যায়। দুটি আয়তাকার লম্বা স্তম্ভের উপর রাখা এর শীর্ষদেশও মন্দিরের মতো।এর শিকড়টি একটি বসানো কুঁড়ির অর্ধাংশের মতো। স্তম্ভ দুটিতে সুন্দর কারুকার্য। এর মাঝখানে কোনও বড় মূর্তি ছিল যা বিনষ্ট করে ফেলা হয়েছে। এছাড়াও সমগ্র মসজিদটির পূর্ব-নির্মিতির গায়ে বহু জৈন বৌদ্ধ প্রতীকী চিহ্ন রয়েছে। আসলে পাল সেন আমলের বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কৃতির অনেকটাই ধারণ করে আছে এই সৌধ”

কিন্তু ডঃ সোমের সিদ্ধান্তে অসঙ্গতি চোখে পড়ে যখন তিনি বলেন, “মসজিদ তৈরির সময় পৌত্তলিকতায় বিশ্বাসী না হলেও সৌন্দর্য বা সুরক্ষা যে কোনও কারণেই হোক থেকে গেছে এই সব অলঙ্করণে”। মসজিদ পর্যবেক্ষণের সময় আমাদের মনে হয়েছে, যদি সিকান্দার শাহ ভগ্ন হিন্দু মন্দির থেকে প্রস্তরখণ্ডগুলি তুলে এনে মসজিদে স্থাপন করে থাকেন, তাহলে তার মাত্র দুটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে – সৌন্দর্য অথবা সুরক্ষা। যদি কারুকার্যের প্রতি মুগ্ধ হয়ে সেগুলি এনে মসজিদে স্থাপন করে থাকেন, তাহলে সেই কারুকার্য তিনি ভাঙতে যাবেন কেন? তাতে তো সেই সৌন্দর্য ক্ষুণ্ণ হয়ে তার উদ্দেশ্য নষ্ট হবে আর যদি মসজিদকে সুরক্ষা প্রদান অর্থাৎ মজবুতি প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রস্তরগুলি আনিয়ে স্থাপন থাকেন, তাহলে সেগুলি মসজিদের দেওয়ালের বাইরের দিকে দৃষ্টিযোগ্য অবস্থায় রাখা হলে তো মসজিদের উদ্দেশ্যই ক্ষুণ্ণ হবে। তাছাড়া সেটা  তো  সিকান্দার শাহের চরিত্রের সাথে খাপ খায় না।

বাস্তবিকপক্ষে, আদিনায় অমুসলিম কারুকার্যগুলি বাদ দিলে কয়েকটি কোরআনের খোদিত আয়াত ব্যতীত উল্লেখযোগ্য কোন কারুকার্য দেখতে পাওয়া যায় না। তাই, যদি ধরেই নেওয়া হয় যে, মসজিদের বাকি অংশ অর্থাৎ মূল কাঠামো সিকান্দারের তৈরি, তবু কেবল কাঠামোটি তৈরিতে ‘দশ বছর’ সময় লাগাটা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। এরপরও তাতে এতখানি পরিকল্পনার অভাব চোখে পড়াটা কি বিসদৃশ নয়?

এই সমস্ত বিষয় পর্যবেক্ষণ করে তাকে অমুসলিম স্থাপত্য মেনে নিতে দ্বিধা নেই। কারুকার্যগুলিতে হিন্দু-বৌদ্ধ মিশ্র রীতি দেখে সেই স্থাপত্য  হিন্দু পাল-সেন যুগের কোনও হিন্দু মন্দির বলেই মনে হয়। সন্দেহ নেই, বিভিন্নভাবে সরকারী কর্মচারী এবং স্থানীয় মুসলিমদের কোন একটি চক্রের দ্বারা প্রতিনিয়ত অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আদিনার হিন্দু অতীতের তথ্যপ্রমাণগুলি লোপাট করা হচ্ছে – রজনীকান্ত চক্রবর্তীর প্রবাসী পত্রিকার রচনা তার প্রমাণ। সেখানকার হিন্দুদের মধ্যে ক্ষোভ, ইদানীং পাণ্ডুয়ার মেলার সময় মুসলিমরা শয়তানকে পাথর ছোঁড়ার নামে আদিনার গায়ে থাকা হিন্দু  মূর্তিগুলিতে ইট পাথর ছুড়তে শুরু করেছে। তাদের মতে, এটিও প্রমাণ লোপাটের প্রচেষ্টার অঙ্গ। একাধিক মূর্তির গায়ে আমরা এরকম  ইটের দাগ দেখতে পেয়েছি। ভারত সরকারের পুরাতত্ত্ববিভাগ কর্তৃক অধিগৃহীত হেরিটেজ – ঘোষণা করে সরকারি সংরক্ষণ সত্ত্বেও সর্বসমক্ষে প্রতিরোধহীন ভাবেই চলছে এই ধরনের বেআইনি কাজ। ২০০৫ সালে পাণ্ডুয়ার হিন্দুদের পক্ষে ‘বৈদিক  হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতি জাগরণ মঞ্চ’-এর তরফ থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে একটি স্মারকলিপি দেন । সেই স্মারকলিপি অনুসারে, পাণ্ডুয়ায় সদ্যনির্মিত বহুতল মাদ্রাসার পরিচলনায় মুর্শিদাবাদ, কালিয়াচক, কিষণগঞ্জ ইত্যাদি এলাকা থেকে ট্রাক বাস ইত্যাদিতে করে লোক এনে হিন্দু এবং ভারত-বিদ্বেষী আওয়াজ তুলে সঙ্গে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করে হিন্দুদের মধ্যে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে চলেছে।

পরিশেষে পাণ্ডুয়ার বর্তমান পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য আমরা স্মারকলিপি এবং সরকারী তথ্য থেকে প্রাপ্ত দুটি বিষয়ের উল্লেখ করে নিবন্ধে ইতি টানবো । প্রথমটি হল, বিগত ২০০১ সালে পেন্টাগন এবং ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার হানার তিন দিন পর ,১৪ই সেপ্টেম্বর  পাণ্ডুয়ায় ১০-১২ হাজার মুসলমানের জমায়েত করা হয় যার উদ্দেশ্য ছিল পান্ডুয়া এবং আদিনার সৌধে নামাজ পরা এবং ইসলামী দখলদারি নেওয়া। তাঁরা পাণ্ডুয়াতে নামাজ পড়তে সক্ষম হলেও  আদিনায় তাঁরা  স্থানীয় হিন্দু জনসাধারণ এবং সৌধের গার্ডদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে নামাজ পড়তে পারে নাই। শেষে তাঁরা পরবর্তী জুম্মায় অর্থাৎ ২১ শে সেপ্টেম্বর তাঁরা আবার এসে নামাজ পড়ার এবং দখল নেওয়ার হুমকি দেয়। কিন্তু সেইদিন  পুলিশ সুপার এবং  জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের তৎপরতায় র‍্যাফ নামিয়ে মুসলিমদের রুখে দেওয়া যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে আজও আতঙ্ক আছে। আর দ্বিতীয়টি ঠিক আদিনা সম্পর্কে না হলেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সেটি হল এলাকার সচেতন কিছু মানুষের উদ্যোগে পান্ডুয়া এবং দেওতলা মৌজার একাধিক সরকারী C.S.রেকর্ড এবং R.S.রেকর্ড (যেমন -পান্ডুয়া মৌজা, জে এল নং- ৩৩, খঃনঃ-১/২, দাগ নং- ২৫০ ; দেওতলা মৌজা , জে এল নং- ১৭২, খঃনঃ-১/২, দাগ নং- ৪৭৫) উদ্ধার করা গেছে , যেগুলি ১৯৭৫ বা তার আগের। সেখানে যে স্থান মন্দির, হিন্দু জনসাধারণের ব্যবহার্য বলে উল্লেখ রয়েছে অথচ খুব রহস্যজনকভাবে বর্তমান সরকারী রেকর্ডে সেগুলি ওয়াকফ এস্টেটের সম্পত্তি হিসাবে দেখানো হচ্ছে। বলাবাহুল্য, সরকারি কর্মচারীদের একাংশ কর্তৃক এই রেকর্ডের অনধিকার পরিবর্তন (record tamper) ঘটানো হয়েছে। পাণ্ডুয়ার জমির বর্তমান রেকর্ড ত এমন একজনের নামে যে ভারতের নয় বরং বাংলাদেশের নাগরিক। যাই হোক এলাকার সচেতন হিন্দুদের মতে,এই ব্যাপারটি খালি পান্ডুয়া বা দেওতলার মধ্যেই বা একটি দুটি জমির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়,বরং সারা মালদহের হিন্দু দেবোত্তর সম্পত্তিগুলি এভাবেই গ্রাস করে নেওয়া হচ্ছে, ওয়াকফের বা কোন মুসলিম ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে দখল করা হচ্ছে।

যাই হোক, পান্ডুয়া সম্পর্কে এখনো অনেক কিছু বলার রয়ে গেল। সেসব আলোচনা পরে অবশ্যই করবো, তবে পাঠকবর্গকে আমার একান্ত অনুরোধ, প্লিজ সেখানে যান এবং সেখানে প্রতিনিয়ত যে নীরব এবং সরব আগ্রাসন চলে আসছে তা নিয়ে কলম ধরুন – জনমত গড়ে তুলুন।

তথ্যসূত্র –

১) পর্যবেক্ষণে গৌড় ও পাণ্ডুয়া –আখতার হোসেন

২) গৌড় পাণ্ডুয়ার স্মৃতি – খান সাহেব আবিদ আলি খান

৩) মালদহ জেলার ইতিহাস – প্রদ্যোত ঘোষ

৪) মালদহ: ইতিহাস-কিংবদন্তী – ডঃ সুস্মিতা সোম

৫) প্রবাসী পত্রিকা – আশ্বিন,  ১৩০৮

৬) বাংলাপিডিয়া : আদিনা মসজিদ