আপন কর্মফলেই সিনকিয়াঙে ভুগছে চীন

china-4.jpgচীনের সিনকিয়াং প্রদেশে এখন থেকে মহম্মদ, আরাফত, মদিনা সহ আরও অনেক মুসলিম নামই আর রাখা যাবে না৷ মোহাজির ইত্যাদি শব্দও আর উচ্চারণ করা যাবে না৷ চীনের কমিউনিস্ট শাসকরা এমনই হুকুম জারি করেছেন৷ যদি কেউ সেই আদেশ অমান্য করে, তাহলে তার ভিটেমাটি চাটি হয়ে যাবে৷ চীনের সিনকিয়াং প্রদেশের আদি বাসিন্দারা বেশিরভাগই মুসলমান৷ সেখানে কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদের উপদ্রব ঠেকাতে আপাতত এই সিদ্ধান্তই নিয়েছে বেজিং৷
মুশকিল হল, আজ যে কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদ ঠেকাতে চীনের সরকার এ রকম সব অদ্ভূত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, একদিন সেই সন্ত্রাসবাদকে কিন্তু তারাই উসকেছিল৷ ১৯৪৯ সালে চীনের ক্ষমতায় বসার পর মাও সে-তুং অন্যত্র অনেক ওলটপালট করে দিলেও সিনকিয়াং প্রদেশের কট্টরপন্থী তুর্কি নেতা বুরহান শাহিদিকে কিন্তু সেখানকার শাসকপদেই বহাল রেখেছিলেন৷ বুরহান শাহিদি ছিলেন চিয়াং কাই-শেকের পেটোয়া লোক৷ তা সত্ত্বেও মাও সে-তুং তাঁকে সরাননি৷ অথচ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেই শাহিদির সঙ্গে নাৎসিদের যথেষ্ট দহরম-মহরম ছিল৷ শুধু সিনকিয়াংয়ের শাসনকর্তা হিসাবে বহাল রাখা নয়, বেজিংয়ে ডেকে পাঠিয়ে মাও সে-তুং বুরহান শাহিদিকে খাতির করে ‘চীন-ইসলাম সমিতি’র মাথাও করে দেন৷ লালচীনের সঙ্গে আরব দুনিয়ার কট্টরপন্থীদের যোগাযোগ ঘটাতে এই বুরহান শাহিদিকে জেরুসালেমেও পাঠিয়েছিলেন মাও সে-তুং৷ সেখানকার মুফতি আল-হুসেনেরও এক সময় নাৎসি যোগ ছিল৷ সেই সূত্রেই তাঁর সঙ্গে পুরানো সম্পর্ক ঝালিয়ে বুরহান সিদ্দিকি লালচীনের দিকে আরব দুনিয়ার ইসলামি কট্টরপন্থীদের টেনে আনার কাজটা শুরু করেন৷
পরবর্তীকালেও সেই তৎপরতা বহাল রেখেছিল চীন৷ ১৯৭১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে হেনরি কিসিঞ্জার গোপনে ইসলামাবাদ থেকে বেজিংয়ে গিয়েছিলেন মাও সে-তুংয়ের সঙ্গে দেখা করতে৷ তাঁর সেই সাক্ষাৎকারের সমস্ত ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো৷ কিসিঞ্জারের সেই দৌত্যের সূত্র ধরেই ১৯৭২ সালে বেজিংয়ে পদার্পণ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন৷ আর তার কিছুদিনের মধ্যেই বেজিংয়ে সিআইএ-র দফতর প্রথম খোলাখুলি তাদের কাজ শুরু করে৷ ১৯৭২-৭৩-এর মধ্যে তিনবার ইরান সফরে যান চীনের বিদেশমন্ত্রী জু ওয়েংফেই৷ ইরানে তখন শাহ-র জমানা৷ আর শাহ-র প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল মার্কিন প্রশাসন৷ তেহরানে গিয়ে জু ওয়েংফেই আমেরিকার মদতে গড়ে ওঠা ১৯৫৫-র বাগদাদ চুক্তি বা সামরিক জোট সেন্টোকে ফের চাঙা করে তুলতে বলেন৷ সম্পর্কটা যে মোটেই সুবিধার নয়, সেটা আরও বেশি করে বোঝা যায় ১৯৭৩ সালে৷ ফের পশ্চিম এশিয়ায় ইজরায়েল-আরব লড়াই বেধে যাওয়ার পর৷ সেই সময় যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব নেওয়া হলে সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ভেটো দিয়েছিল কেবল চীন (ঠিক যেমনটা তারা এখন দিচ্ছে মাসুদ আজহারের ক্ষেত্রে)৷ ওই বছরেরই জুলাই মাসে আফগানিস্তানে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে৷ ‘জনগণতান্ত্রিক’ চীনের কমিউনিস্ট নেতাদের তাতে খুশি হওয়ার কথা৷ কিন্তু তাঁরা সেই ঘটনার নিন্দা করেছিলেন৷
কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসে চীনের পক্ষ থেকে সরাসরি মদতদানের পর্বটার শুরু আরও বেশ কিছু দিন বাদে৷ ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে রুশ ফৌজের অনুপ্রবেশের পর৷ যদিও তার ঠিক আগেই অধিকৃত কাশ্মীরের মধ্যে দিয়ে চীনা ইঞ্জিনিয়ারদের সহায়তায় তৈরি হয়ে গিয়েছে খুনজেরাব পাশ৷ সিনকিয়াং প্রদেশের কাশগড়ের দিক থেকেই সেই গিরিপথ অধিকৃত কাশ্মীরে ঢুকেছে৷ কোথাও কোথাও সেই গিরিবর্ত্মের উচ্চতা দশ হাজার মিটার৷ সরাসরি চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক যোগাযোগের সেই শুরু৷ তখন এই পথে যে চীনা অস্ত্রশস্ত্র ঢুকত তা মূলত জম্মু-কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ পাচারের কাজেই লাগত৷ পরবর্তীকালে আফগান যুদ্ধের সময় সিনকিয়াং থেকে কট্টরপন্থী মুসলিম জঙ্গি ও অস্ত্রশস্ত্র চালানের জন্য তা রণনীতিগতভাবে আরও বেশি কাজে লেগেছিল৷
আফগানিস্তানে রুশ ফৌজ ঢোকার পর ১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাসে বেজিং যান তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের প্রতিরক্ষা সচিব হ্যারল্ড ব্রাউন৷ সেই সময়েই দুই দেশের নেতৃত্ব আফগানিস্তানে রুশ ফৌজ ঢোকার নিন্দা করে প্রকাশ্যে যৌথ বিবৃতি দেয় এবং গোপনে আফগানিস্তানে বিদ্রোহীদের মদত দেবে বলে স্থির করে৷ এর কিছুদিনের মধ্যেই চীন ইরানে তাদের এক মৌলবি দূতকে পাঠায়৷ তাঁর নাম মহম্মদ আল ঝেং জি (চীন-ইসলাম সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট)৷ ইরানে তখন শাহকে হটিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন আয়াতোল্লা খোমেইনি৷ রুশ-বিরোধী যৌথ জেহাদে তাঁর সমর্থন আদায় করার জন্যই এই কট্টরপন্থী মুসলিম নেতাকে পাঠিয়েছিল বেজিং৷ সাদ্দাম হুসেনের ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহায়তার বিনিময়ে ইরানকে কাছে টানে বেজিংয়ের কমিউনিস্ট নেতৃত্ব৷
তার আগেই অবশ্য কাজটা অনেক গুছিয়ে দিয়ে এসেছিলেন চীনের গোয়েন্দা প্রধান তথা মাও সে-তুংয়ের (আরও নির্দিষ্ট করে বললে মাদাম মাওয়ের) অতি-ঘনিষ্ঠ কাং শেঙের ডানহাত কিয়াও শি৷ ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে তেহরানে গিয়ে কিয়াও শি প্রথমে শাহ-র সঙ্গে দেখা করেন এবং আফগানিস্তান সহ মধ্য এশিয়ায় রুশ প্রভাববিস্তার খর্ব করতে একত্রে কাজ করার ব্যাপারে তাঁকে রাজি করান৷ এর পর তাঁর সঙ্গে শাহ-র গোয়েন্দা সংস্থা তথা ঘাতক বাহিনী সাভাকের প্রধান নাসির মোঘাদামের কথাবার্তা হয়৷ উভয়েই রাশিয়ার বিরুদ্ধে গোপন যুদ্ধে নামার জন্য একমত হন৷ আরও আশ্চর্যের, রুশ-বিরোধী গোপন অভিযানে চীনের গোয়েন্দাদের সঙ্গে ইরানীয় গোয়েন্দাদের মধ্যে ঘটকালির কাজটি করেছিল ইজরায়েলি গুপ্তচর বাহিনী মোসাদ! যাদের সঙ্গে কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদীদের সম্পর্কটা নাকি সাপে-নেউলে৷ আফগানিস্তানে রুশ-বিরোধী অভিযানের জন্য ইরানের গোয়েন্দা বাহিনীর সঙ্গে চীনা গোয়েন্দা বাহিনীর যে সমঝোতা হয়েছিল তাতে এটাও ঠিক হয় যে, এক্ষেত্রে পাকিস্তানি আইএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার কাজটা করবেন ইসলামাবাদের ইরানীয় রাষ্ট্রদূত৷ সেই সময়ে ইসলামাবাদে যিনি ইরানের রাষ্ট্রদূত, তিনি আবার একসময় ছিলেন সাভাকেরই কর্তা৷
১৯৮০ সালে হ্যারল্ড ব্রাউনের বেজিং সফরের পর আফগানিস্তানে রুশ-বিরোধী জেহাদে মদতদানের কাজে যাতে বোঝাপড়ার অভাব না ঘটে তার জন্য চীনের নেতা হুয়ো কুয়োফেঙের সঙ্গে কথা বলতে গোপনে বেজিংয়ে যান সিআইএ-র অধিকর্তা স্ট্যানফিল্ড টার্নার৷ দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নেন, আফগানিস্তান লাগোয়া সিনকিয়াং প্রদেশের কিতাই এবং করলা-য় সিআইএ দুটি আড়িপাতার ঘাঁটি বানাবে৷ সেগুলির দায়িত্বে থাকবে চীনারাই৷ তবে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্সে দক্ষ করে তুলবে আমেরিকানরা৷ গোটা প্রজেক্টের তত্ত্বাবধানে থাকবে সিআইএ-র ডিভিশন অব সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি৷ যখন এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল তখন এই ডিভিশনের মাথায় ছিলেন লেসলি ডার্কস৷ এর পর ১৯৮৩ সালের অক্টোবরে ওয়াশিংটনে যান তদানীন্তন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী উ জিকুয়াং৷ সেখানে সিআইএ প্রধান উইলিয়াম কেসির সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা খুবই ভালোভাবে সাঙ্গ হয়৷ আফগান যুদ্ধে চীনারা সরাসরি কট্টরপন্থী মুসলিম বিদ্রোহীদের সামরিক সহায়তা দিতে আরম্ভ করে৷ যদিও রাশিয়ার দাবি— ১৯৭৯ সালের জুন মাসেই চীনা সামরিক সহায়তা আফগান জেহাদিদের কাছে পৌঁছানোর প্রমাণ তারা পেয়েছিল৷ ওই সময়ে করাচি বন্দরে পৌঁছায় ‘রুস্তম’ নামের একটি মালবাহী জাহাজ৷ চীন থেকে কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদীদের জন্য অন্তত ৮ হাজার টন অস্ত্রশস্ত্র বয়ে আনা হয়েছিল ওই পাকিস্তানি জাহাজে৷ করাচি থেকে সেইসব অস্ত্রশস্ত্র পেশোয়ারে পাঠানোর যাবতীয় বন্দোবস্ত করে আইএসআই৷ আফগান যুদ্ধে সমরাস্ত্র সরবরাহের গোড়ার দিকে চীনের পক্ষ থেকে পাক সামরিক কর্তাদের বলা হয়েছিল, তাদের পাঠানো অস্ত্রশস্ত্র যেন শোলা-ই-জাভেদ নামের রুশ-বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছায়৷ খাতায় কলমে শোলা ই-জাভেদ ছিল একটি আফগান মাওবাদী গোষ্ঠী৷ কিন্তু তাদের তালিম দিত আইএসআই৷
সিনকিয়াঙে আড়িপাতার ঘাঁটির প্রসঙ্গে আর একটা বলে নেওয়া ভালো৷ প্রথমে সেখানে যে আড়িপাতার ঘাঁটি বসানো হয়, সেটা বসিয়েছিল তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির গুপ্তচর বিভাগ বিএনডি৷ সেই সময় তার মাথায় ছিলেন ক্লাউস কিঙ্কেল৷ পরে দুই জার্মানি এক হলে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন৷ বিএনডি-র অনুরোধে ওই অত্যাধুনিক আড়িপাতার যন্ত্রটি দান করেছিল মোসাদ৷ তারা সেই সিগন্যালিং সিস্টেম তথা জ্যামারের নাম দিয়েছিল ‘সেরবেরাস’৷ গ্রিক পুরাণ অনুসারে সেরবেরাস হল নরকের দ্বাররক্ষী তিন মাথাওয়ালা কুকুর৷ এই সেরবেরাস সিস্টেম কাজে লাগিয়ে ইজরায়েল নাসেরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিতেছিল৷ বিএনডি-র অনুরোধে তাদের আরও বেশি নিপুণ প্রযুক্তির সেরবেরাস দিয়েছিল মোসাদ৷ আর আফগান যুদ্ধের সময়ে চীনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে সেই সেরবেরাসই জার্মান বিএনডি বসিয়েছিল সিনকিয়াঙে৷ সিআইএ-র লিসনিং পোস্ট বসানোরও আগে৷
আফগান যুদ্ধ যখন তুঙ্গে তখন হল্যান্ডের সাংবাদিক ভ্যান লাইডেনকে পাকিস্তান ছাড়ার নির্দেশ দেয় সেদেশের সামরিক কর্তৃপক্ষ৷ পরে মার্কিন সাংবাদিক, আমেরিকান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের প্রতিনিধি জন কুলি-কে লাইডেন জানান, চীনা অস্ত্রশস্ত্র কীভাবে এবং কোন পথে আফগান জিহাদিদের হাত পৌঁছাচ্ছে সেটার নিখুঁত বর্ণনা দেওয়াটাই তাঁর ‘অপরাধ’ হয়েছিল৷ ১৯৮৫ সালে পাকিস্তানের মাটিতেই অন্তত ৩০০ চীনা সামরিক উপদেষ্টা অফিসার বিভিন্ন জঙ্গি শিবিরে তালিম দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন৷ এছাড়া, ওই সময় সিনকিয়াঙেরই কাশগড়-খোটানের মতো জায়গায় নতুন করে আরও অনেক জঙ্গি শিবির খোলা হয়েছিল৷ তখন এই জঙ্গিদের দেখভালের দায়িত্বে ছিল চীনা সামরিক বাহিনী পিএলএ-র জেনারেল স্টাফের অধীনস্থ মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স৷ চীনা ভাষায় তার নাম ‘এর বু’ (সেকেন্ড ডিপার্টমেন্ট)৷ আফগান যুদ্ধের সময় এর বু-র তরফে কট্টরপন্থী মুসলিম জঙ্গিদের পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল জিয়ং গুয়ানকাই৷ আর তাঁর সহায়তা করতেন কর্নেল লি নিং৷
দুঃখের বিষয়, একদিন সিনকিয়াঙের মাটিতে যাদের তালিম দিয়ে মেজর জেনারেল জিয়ং গুয়ানকাই ও তাঁর সহকারী কর্নেল লি নিং আফগানিস্তানে রক্তগঙ্গা বওয়াতে পাঠিয়েছিলেন, যুদ্ধশেষে সেই কট্টরপন্থী সন্ত্রাসবাদীরাই সিনকিয়াঙে ফিরে পৃথক ইসলামি পূর্ব তুর্কিস্তান রাষ্ট্র গড়ার দাবিতে বিচ্ছিন্নতার আগুন জ্বালিয়ে দেয়৷ আর এখন তার প্রভাব রুখতে গিয়ে চীনা কমিউনিস্ট শাসককুল যা করছেন তাকে হাস্যকর বললেও কম বলা হয়৷

Advertisements